বৃহস্পতিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২১

গল্প : মন কেমনের দিনে # কলমে ~ পল্লবী

 

 

 


 

 গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে, রাতুলের মনের ভিতরেও অবিরাম বর্ষিত হচ্ছে স্মৃতির বৃষ্টি! তার উপর আবার সিজনাল সর্দি, কাশি আর জ্বরে শরীরটা বেশ নাজুক ওর! স্মৃতির আকাশে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে, গতকাল রাত থেকেই দু চোখের বর্ষনে ওর মুখ চোখ ফুলে কিম্ভুতকিমাকার অবস্থা! বিশেষ করে, চোখ দুটো যেনো রক্ত জবার লাল বর্ণের রঙ নিয়েছে। 



ছুটির দিনের সকাল। বেশ বেলা করেই ঘুম ভাঙে রাতুলের। আজ টানা তিন দিন সে ছুটি কাটাচ্ছে জাগতিক সব কাজকর্ম থেকে। এতো লম্বা ছুটি, গত কয়েক বছরে ও এভাবে শুয়ে বসে কাটিয়েছে কিনা, মনে করতে পারেনা। বৃষ্টি ভেজা সকালের মিষ্টি রোদের সাথে আসা ঠান্ডা বাতাস, গায়ে মেখে রাতুল রুমের সঙ্গে লাগোয়া ছোট্ট বেলকনিতে এসে বসে। নিচে, রাস্তার ওপাশে বসে থাকা পাগলীটা, প্রতিটা ছুটির দিনের মতো আজও তার সুরেলা গলায় গান ধরেছে। মাঝে মাঝেই গানের ফাঁকে পাগলীর দু চোখ বেয়ে ঝরে পড়ছে অশ্রু! রাতুল এক দৃষ্টে পাগলীর দিকে চেয়ে ভাবে, নিজের অসহায়ত্বের কথা! ওর অবাধ্য মন আর বর্ষণরত দু চোখের  কথা!



পাঁচ বছর আগে, এমনই এক ছুটির দিনে, নিউ মার্কেটের ডায়মন্ড রেস্তোরাঁর সেই কর্নার ঘেঁষা কেবিনে বসে, বিশাল ফিস কাটলেটের বুকে নির্দয়ভাবে ছুরি- কাঁচি চালাতে চালাতে, মিলি নির্লিপ্ত মুখে জানিয়েছিল ওদের ব্রেকআপের কথা! ওর বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা! বিয়েতে মিলির রাজী হওয়ার কথা! সদ্য পিতৃহারা বেকার রাতুলের জীবনে , এ আঘাত বাবা হারানোর বেদনার চেয়েও বোধকরি ভয়াবহ ছিল! এ হেন দুঃসময়ে মিলির তো কথা ছিল ওর হাতটা শক্ত করে মুঠোবন্দী করে আগলে রাখার! ফিস কাটলেটের বড় একটা পিস মুখে দিয়ে মিলি, যেন কিছুই হয়নি, এরকম ভাব করে বলেছিল,," রাতুল প্যানিক করো না একদম! আমরা কেউ ছোট বাচ্চা না যে, ব্রেকআপে ভেঙে পড়বো কিংবা কান্না কাটি করে বিছানা বালিশ ভিজিয়ে ফেলবো! ওসব সিনেমা নাটকে হয়। বাস্তব বড়োই কঠিন। ট্রাই টু বি প্র্যাক্টিক্যাল! ছোট বোনটা ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলছে। বাবার চাকুরীর মেয়াদ আছে আর দুবছর। আমার নিজের ও এখনো অনার্স কমপ্লিট হয়নি। এদিকে তোমার কোন চাকরি নেই! কোন মুখ করে বাড়িতে তোমার কথা বলি বলোতো?!"



ব্রেকফাস্ট করতে টেবিলে গিয়ে বসতেই , মা কাছে এসে মুখটা তুলে ধরে রাতুলের। কিছুক্ষন চেয়ে থেকে , কিছু বলেন না ছেলেকে। মায়ের অভিজ্ঞ মনে তখন অন্য চিন্তা! ছোট বোন তৃণার ফ্রেন্ড হিসেবে, একই পাড়ার মিলির এ বাড়িতে ছিল অবাধ যাতায়াত! " একবার তৃণার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসবি কি?! অনেক দিন হলো, যাসনা ওদিকে।" মা জিজ্ঞেস করে কিচেন থেকে উঁকি দিয়ে। "দেখি" বলে ছোট্ট উত্তর দিয়ে, রাতুল রুটির টুকরো মুখে পুরে হারিয়ে যায় তিন দিন আগের দুপুরে। অফিস বিল্ডিংয়ে হঠাৎ সার্কিট ফল হওয়ায়, বেশকিছু জরুরি ডকুমেন্টস নিয়ে রাতুল অকাল বর্ষণে কাক ভেজা হয়ে গেছিলো, নিউ মার্কেটের ফটো ল্যাবে! ওদের নতুন বসানো ডিজিটাল প্রিন্টারে , খুব ভাল প্রিন্ট আসে। সময়ও বেশি লাগেনা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, ভিড় লেগে থাকেনা। যদিও চার্জ একটু বেশি নেয়। পার্কিং লটের শেডের নীচে দাঁড়িয়ে রাতুল  অপেক্ষায়, যদি কোন অটো পাওয়া যায়! বৃষ্টিতে ভিজতে মোটেও ইচ্ছে করছে না ওর। 



কিছুটা আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাতুলের সামনে, ধীরগতিতে একটা ওয়াইন রেড কালারের এক্সিও এসে থামে। অবহেলায় মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে, গাড়ির জানালায় অনেক বছর আগে, স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা সেই মুখ! সে এই শহরে কি করে?! তার  সুখের রাজ্যে তো হাজার হাজার মাইল দূরে!



রাতে ডিনার সেরে, রাতুল অনেক বছর পরে, আবার সেই বইটা নিয়ে বসে। জানে, প্রতিবারের মতোই এবারেও পড়া হবে না কিছুই। আজ তৃণার বাড়ি গিয়েও শুনলো মিলির কথা। ওর ফিরে আসার কথা! ওর মানিব্যাগ ভর্তি বড় বড় এমাউন্টের ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের এনআরবি বরের সাথে বিচ্ছেদের কথা! বাস্তববাদী মিলি তবে পারলো না কেন সুখের রাজ্যে ঘর করতে? আবেগী আর স্বপ্নীল রাতুলের কাছে বাস্তব বাদী মিলির ফিরে আসা কি সময়েরই দাবি ছিলো মাত্র??! 


একদা, যে দু জোড়া চোখ পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকতো সমান্তরালে, সেদিনের সেই বর্ষণমুখর দুপুরে, গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসা রাতুল আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছিল মিলির দিকে। রিয়ার ভিউ মিররে দেখা, মিলির অশ্রু সিক্ত সেই চোখ, কখন যে রাতুলের দু চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে,বুঝতেই পারেনা। শুধু সামনে, পিছনে বসা দুজন মানুষ সংগোপনে নিজেদের চোখের অশ্রু লুকোতে ব্যস্ত থাকে!!


বইয়ের মলাট খুলে, প্রথম পৃষ্ঠায়, গোটা গোটা মেয়েলি হরফের সেই লেখার দিকে তাকায় রাতুল!

"এই হাসি, এই কান্না, এই মেঘ আর রোদ্দুরের এক অপূর্ব ও বিস্ময়কর সংমিশ্রন!!" রাতুলকে এই বইটা দিয়েছিল মিলি। এমন অদ্ভুত কোটেশনের কারণ জানতে চাইলে, হেসে বলেছিল, " পুরো জীবন পড়ে রয়েছে তোমার সামনে। পারলে উদ্ধার করো!"


আমি জানি রে, তোর ঐ এক চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু আমার আরেক চোখে, শ্রাবনের ধারা হয়ে ঝরে! আজ, এতো বছর পরেও!


বইয়ের মলাটের উপরে হাত রেখে, রাতুল অশ্রুসজল নয়নে মনে মনে বলে,, "পাগলি তুই ফিরে আয়! আজো আছি তোর অপেক্ষায়! তোর মনের দরজা আর জানলাটা খুলে একটু উঁকি দিয়ে দেখ! আমি আছি! আজো নিরবে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে তুই ফেলে রেখে গিয়েছিলি আমায়! শুধু তোর জন্যই এ হৃদয় অষ্টপ্রদীপ জ্বেলে রেখেছে। তুই ফিরে  না এলে, অষ্টপ্রদীপ যে নিভে যাবে! আসবি কি তুই ফিরে?! 



||সমাপ্ত||

Copyright©️ All rights reserved for Pallabi Barua


৩টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...