শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

#নাম- মাতৃভাষা ও বিতর্ক। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ বিতর্ক সভা। 
  # বিষয় - *বিতর্ক।*
 #নাম - *মাতৃভাষা।*
   ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

     ভাষা ভাবের বাহক। ভাব বিনিময়ের ভাষার একটা কথ্যভাষা। আরেকটি লেখ্যভাষা। সকল ভাষার এই দুটি রূপ লক্ষনীয়। আবার ভাষার লিখিত ও কথ্যের মধ্যে আবার কথ্যভাষাই ভাষার গতি নির্ণয় হয়েছে। যেমন বৈদিক লিখিত ভাষা থেকে কিন্তু পালি ও প্রাকৃত ভাষা আসেনি। এসেছে কথ্য সংস্কৃত থেকে। মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা।
  আমরা বাঙালি বাংলা ভাষা  বলি। ভাষাগত জাতির পরিচয়ে আমরা বাঙালি জাতি। তাই মাতৃভাষা বাংলা। এই মাতৃভাষা নিয়ে যত গন্ডগোল। কারণ আন্তর্জাতিক হতে হলে কমিউনিকেশন ভাষা ইংরেজি। মাতৃভাষার উপর তখন কোপ। সব দেশে এ এক কঠিন বিধিলিপি। আর ভারতবর্ষের মত বহুভাষী দেশের কপালে তো বেশী দুর্ভোগ। ইংরেজির গুরুত্ব কমাতে একসময় বিশ্বে ভোলাপুক,এসপারেন্ত নামক কৃত্রিম ভাষা এল। কিন্তু ইংরেজির কাছে ধোপে টিকল না। ব্যাকরণগত কাঠামোর দুর্বলতার জন্য। ইংরেজি বিশ্বের বলিষ্ঠ ভাষা আজও মর্য্যাদায় আসীন। কারণ বিশ্বব্যাপী ইংরেজি ভাষার সাম্রাজ্যবাদী দিগ্বিজয়ে ইংরেজির গঠনটাই বলিষ্ঠ রূপ পেয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শাসন গেছে কিন্তু ইংরেজি ভাষার সাম্রাজ্যবাদ বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি,বরং আরো বলিষ্ঠ হয়েছে। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ উপনিবেশের জন্য কি ইংরেজি পদে পদে গতিবিনা গুরুত্ব। তা কিন্তু নয়। যেমন জাপানে বা চীনে তো ব্রিটিশরা উপনিবেশ করতে যায়নি। তাহলে তারা ইংরেজির মহিমা স্বীকার করে ইংরেজি ভাষাকে ধ্যান জ্ঞান করেছিল কেন? জাপানে ইংরেজি শেখানো এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। শুধু কি চিন,জাপান এখন কোরিয়া,মালয়েশিয়া, তাইওয়ান,ফিলিপাইন- পূর্ব এশিয়ার তাবৎ দেশগুলো সরকারিভাবে স্থির করে ফেলেছে ইংরেজি বিনা গতি নেই। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর তো এমনই মনোভাব- 'ইংলিশ ইজ দ্য ল্যাঙ্গোয়েজ অব টুডে'জ ওয়ার্ল্ড,হোয়াই উই লাইক ইট অর নট।' এ সম্পূর্ণ এক ব্যবহারিক বুদ্ধির কাছে আত্মসমর্পণ।
   বৈদেশিক শাসন যখন যেমন এসেছে সেই শাসক তার ভাষাকে সরকারী কাজের ভাষা করেছে। যেমন- একসময় দমভোর আরবী ফার্সী ভাষা শিখতে হয়েছিল,সরকারী চাকরীর জন্য। আবার ইংরেজরা আসতে ইংরেজি ভাষা। আর তার হাত থেকে বাঁচার জন্য মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মত জোর প্রচার করেও হালে পানি না পাওয়ার ওষ্ঠাগত প্রাণ অবস্থা হয়েছিল। এই মাতৃভাষার ব্রাত্য হওয়ার জন্য একটি মধ্যপন্থা ব্যাখ্যা - শিশুর চারমাস বয়স পরে যদি মাতৃদুগ্ধের পাশে সেরেলাক শিশুর পুষ্টির সহায়ক হয়,তাহলে মাতৃভাষার পাশে ইংরেজি ভাষার একটা পুষ্টিকর অবস্থার আপত্তি কোথায়? সত্যিই করে বলতে কেনো ভাষা যদি ইংরেজি হয়,সিস্টেমের সেভাবেই চল হয়,তাহলে ইংরেজি না শিখে উপায়ন্তর আছে কি? নেই তো। 
  বাংলা অধূনা বাংলাদেশের মাতৃভাষা। বিশ্ব তাই জানে। ভারতের হিন্দী। সেখানে একটা প্রদেশের মাতৃভাষা বাংলা দিয়ে তো আর দেশের ভাষা হতে পারে না। যেখানে বহুভাষী দেশের নানা ভাষা,দেশের কমন কোনো ভাষা তো একটা চাই। ইংরেজি তার সহায় হল। 
  বিজ্ঞান চর্চার সমস্তটাই ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি,বায়োলজি,ম্যাথেমেটিক্সের কোনো টার্মের বাংলা পরিভাষা আছে কি? অক্সিজেন,হাইড্রোজেন, পটাসিয়াম,নাইট্রোজেন,পার অক্সাইড থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞান,পদার্থবিজ্ঞান সব তো ইংরেজির পরিভাষার ছড়াছড়ি। রেল দফতরের সব ইংরেজি শব্দ। ব্যাঙ্ক, বীমাকোম্পানীর সব ইংরেজি শব্দের কেবল ব্যবহার। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে সব ওষুধের নাম ইংরেজি,ওষুধ কোম্পানি সহ ওষুধের নাম ইংরেজি। ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে বললে  কেউকেটা। রবীন্দ্রনাথ 'গীতাঞ্জলি'র জন্য নোবেল পেলেন ইংরেজি অনুবাদ থেকে। শুতে,উঠতে, বসতে,খেতে ইংরেজি ভারতের বহুভাষী দেশের কমন কমিউনিকেশন ভাষা। সাংসদ অধিবেশন হবে,ভাষা হয় হিন্দী নয় ইংরেজি। বাংলাভাষা সংসদে বললে কেউ বুঝতে পারবে না। কেজো ইংরেজি ভাষা না শিখলে চাকরি জুটবে না। সবাই যতই বাংলা ও বাঙালি বলে গলার শিরা ফুলিয়ে গলা ফাটাক না কেন,বাংলা শিখলে চাকরীর বাংলার বাইরে কোনো গুরুত্ব নেই। এই যে বাংলাভাষায় ইঞ্জিনিয়ার বিভাগে পড়াশোনার চল আসতে চলেছে,সেই চাকুরী বলতে তো বিদেশে। বাংলার বাইরে। তখন ইংরেজি সম্বল। তাহলে মাতৃভাষার গুরুত্ব কোথায় রইল? 
    শাসক সম্প্রদায় বা যে দেশনেতা মাতৃভাষার জন্য খুব গলা ফাটান,তিনিই আবার নিজের সন্তানকে বিদেশে পড়াতে পাঠান ইংরেজিতে ভরসা করে।
  তবে হ্যাঁ,ইংরেজিকে মাতৃভাষা বলে গ্রহণ করতে খুব খুব মনোঃকষ্ট আছে,আবার এও ছাড়া এক পাও চলার উপায় নেই। তারচেয়ে বললে কেমন হয় ইংরেজি পিতৃভাষা। সে যাই হোক কি মাতৃ,কি পিতৃ কি যায় আসে,মাতৃভাষার আছে মাতৃভাষায়। আর কেনো ইংরেজি যতদিন কাজের হয়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকবে,সে মাতৃভাষার জন্য গলাফাটানো,আর ইংরেজির আদ্যশ্রাদ্ধ যতই করা হোক,ইংরেজি মাতৃভাষা বলতে যতই বিবেকের দংশন হোক,ইংরেজিকে মাতৃভাষার মতো রপ্ত না করলে পেটে ভাত জুটবে না।
 এখন যা আর্থ সামাজিক অবস্থা মাতৃভাষা ও বিদেশী ভাষা হাত ধরাধরি করে চলে,আর মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজি ভাষায় রপ্ত যত বেশী হবে,তত সমাজের একজন কেউকেটা বলে প্রমাণ করতে পারবে। তাই ইংরেজি ভাষা ধনীর অট্টালিকা থেকে গরীবের পর্ণকুটির ইংরেজির তরঙ্গ অহরহ ধেয়ে চলে।
            ******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার।

# নাম- সুদেষ্ণা ।✍ - শুভব্রত ভট্টাচার্য।

শুভ জন্মদিন সুদেষ্ণাদি। আপনি ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন করুণাময় আপনার মঙ্গল করুন। 

আপনার জন্মদিনে আমি পুরাণ এবং ইতিহাসের তিন বিখ্যাত সুদেষ্ণার আখ্যান লিখলাম। 

মহাভারতের প্রথম সুদেষ্ণা-

 আমাদের বঙ্গ দেশের উৎপত্তির সঙ্গে সুদেষ্ণা নামটি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে । আরণ্যক ব্রাহ্মনে বঙ্গ নামের জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায় ।
মহাভারত থেকে জানা যায় যে, দৈত্য রাজ প্রহ্লাদ পুত্র বলি রাজের স্ত্রী সুদেষ্ণা হতে অঙ্গ,বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুক্ষ ও পুণ্ড্র নামে পাঁচ পুত্রের জন্ম হয় । এরা সকলেই নিজের নামানুসারে নামীয় প্রদেশের রাজা হন । বঙ্গের নামানুসারে এর শাসিত রাজ্য বঙ্গ নামে অভিহিত হয় ।

মহাভারতের দ্বিতীয় সুদেষ্ণা-

মহাভারতের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা মৎসদেশের রাজা বিরাটের পত্নী তথা অভিমন্যুর পত্নী উত্তরার মাতা সুদেষ্ণার কথা তো আমরা সবাই জানি৷ রাজকুমার উত্তর, শ্বেত, এবং শঙ্খ নামে তিন পুত্র ও রাজকুমারী উত্তরা ছিল তাঁর চার সন্তান। কেকয়ের রাজা কেকয়া ও রাণী মালভীর কন্যা ছিলেন তিনি। 

ভাষাশহীদ সুদেষ্ণা-

পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দু’টি ভাষার জন্যই জনগণকে লড়াই করতে হয়েছে, বুকের রক্ত ঝরাতে হয়েছে – ভাষা দু‘টি হলো বাংলা এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার আন্দোলন পুরোপুরিভাবে জাতিগত অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত ছিল। বাংলার মতোই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদেরকে তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামে অনেক রক্ত ও প্রাণ ঝরেছে এবং সে সংগ্রাম ছিল বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেয়েও দীর্ঘতর। মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চরম পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে আত্মাহুতি দিয়েছিল সুদেষ্ণা সিংহ নামের এই বিদ্রোহী তরুণী।পৃথিবীর ইতিহাসে এ যাবত দু’জন নারী ভাষার লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছেন। কমলা ভট্টাচার্য আসামের বাংলাভাষা আন্দোলনে শহীদ হন এবং সুদেষ্ণা সিংহ শহীদ হয়েছেন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আন্দোলনের জন্য। এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন সুদেষ্ণা; পরিবারের সহায়-সম্বলহীন সামর্থ্যকেই চিরসঙ্গী করে নিয়ে তাঁর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। ১৯৯৬ সাল। একদিন আসামের ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী’ অধ্যুষিত এলাকায় ডাক আসে ‘ইমার ঠার' আন্দোলনের। বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় ইমার ঠারের অর্থ 'মায়ের ভাষা'। দলে দলে বিষ্ণুপ্রিয়াভাষী মানুষ জড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলনে। নিজ ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় রেল অবরোধ কর্মসূচীতে অংশ নিতে অন্য সবার মতো সুদেষ্ণাও মার্চের (বাংলা চৈত্র মাস) এক কাঠফাটা দিনে বিদায় নেন মায়ের কাছ থেকে। সেই বিদায়ের দিনটিই হলো সুদেষ্ণার চিরবিদায়ের দিন! ১৬ মার্চ ১৯৯৬ সাল দিনটি ছিল শনিবার, বাংলা ১৪০২ সনের ২রা চৈত্র। লোঙাই ঘাটের দক্ষিণ পাড়ে কচুবাড়ি গ্রাম। দলে দলে জয়োধ্বনি করতে করতে কচুবাড়িবাসীরা ‘ইমার ঠার’-এর আন্দোলনে যোগ দিতে লাগল। সুদেষ্ণাও ছিল কচুবাড়ি গ্রামের। সে ঘর থেকে বের হবার সময় মায়ের কাছে কিছু টাকার আবদার করেছিলো। কিন্তু দুঃখিনী মায়ের কাছে ছিল না কানাকড়িও।

সুদেষ্ণার সাথে ছিল তাঁর বান্ধবী প্রমোদিনী, বিলবাড়ি গ্রামের এক তরুণী। সুদেষ্ণা অবশেষে প্রমোদিনীর কাছেই দুটি টাকা ভিক্ষা চেয়ে নেয়। সকৌতুকে প্রমোদিনী তার বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করে, “কিসের জন্য এ দুটো টাকা? কলকলি ঘাটের এ পথে তো কোনো দোকানপাটও নেই!” সুদেষ্ণা নীরব। প্রমোদিনী দুটো টাকা বেঁধে দেয় সুদেষ্ণার আঁচলে। মিষ্টি হাসিতে সুদেষ্ণা তখন বলেছিল, “এ দুটো টাকা খেয়াপারের জন্য” (মৃত্যুর পর খেয়া পারাপারের মাধ্যমে অন্য জগতে পদার্পণ করতে হয় বলে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মণিপুরীদের বিশ্বাস)।

প্রাণপ্রিয় বান্ধবী প্রমোদিনীর কাছে সুদেষ্ণার দ্বিধাহীন শেষ কণ্ঠবাণী,

"মোর রকতলো অইলেউ মি আজি ইমার ঠারহান আনতৌগাগো চেইস" (দেখিস, আমার রক্ত দিয়ে হলেও আজকে আমি আমার মাতৃভাষাকে কেড়ে আনবো)।

সেদিন পুলিশের গুলিতে আহত হন শতাধিক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী। ঘটনাস্থলেই মারা যান বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বিপ্লবী নারী সুদেষ্ণা সিংহ। 

বিষ্ণুপ্রিয়ারা শহীদ সুদেষ্ণাকে সম্মান জানিয়ে বলে ‘ইমা সুদেষ্ণা’; ‘ইমা’ শব্দের অর্থ মা। নিজেদের ভাষাকেও তারা ‘ইমার ঠার’ অর্থাৎ 'মায়ের ভাষা' বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।  সুদেষ্ণাকেই আদিবাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভাষাশহীদ গণ্য করা হয়। 
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আসাম ও ত্রিপুরাজুড়ে গণআন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এসবের জেরে পরবর্তীতে সকল দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় আসাম সরকার। ২০০১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি আসামে বরাক উপত্যকার প্রায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (১৫২টি) বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় পাঠপঠনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ছয় বছর পর সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক স্বতন্ত্র মণিপুরী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা।
সুদেষ্ণা সিংহ নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে একটি ভাষাকে তার মৃত্যুদশা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। 

“ইমার ঠার পুঞ্চি পালক” (মাতৃভাষা অমর হোক)
রাষ্ট্রের বন্দুকের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে সুদেষ্ণা সিংহ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তাঁর মাতৃভাষার সম্মান।

বিষয় : *বিতর্ক সভা* ( মাতৃভাষা বাংলা বললে যদি রাগ হয়,হোক না মাতৃভাষা ইংরেজি) *©*শর্মিষ্ঠা ভট্ট*

 বিষয় : *বিতর্ক সভা*

( মাতৃভাষা বাংলা বললে যদি রাগ হয়,হোক না মাতৃভাষা ইংরেজি) 

*©*শর্মিষ্ঠা ভট্ট*


মনে রাখতে হবে শিশুর সর্বোপরি বিকাশ ৫ বছর বয়স পর্যন্ত সব চেয়ে বেশি। সেই মুকুলিত অবস্থায় মাতৃভাষার সাথে যদি  দ্বিতীয় ভাষাকে চালু করে দেওয়া যায়। এবং তার রেশ রেখে প্রাথমিকেও ইংরেজি চালু থাকে তাহলে প্যারালাল দুই ভাষা নিতে কখনও শিশুর অসুবিধা হয় না (অভিজ্ঞতা থেকে) ।

এখন প্রশ্ন বাঙলায় পড়াই কি যুক্তিযুক্ত? পশ্চিমবঙ্গই  আমাদের দেশ নয়। এই কথাটি শিশু বা শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবক ও শিক্ষানীতির সাথে জড়িত সকল মানুষের জানা ও বোঝা জরুরী।  শিক্ষাব্যবস্থা কন্ট্রোলারদের এটি মনে রাখতে হবে রাজ্য নয়, দেশের উপযোগী করতে হবে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের। ভারতীয় বিভিন্নতা ও কলোনীয়াল সংস্কৃতি অভ্যাস বশত ইংরেজি পুরো ভারতের এক কমন ভাষা। তাছাড়া বিজ্ঞানে এখনও অনেক শব্দ ইংরেজি অভিমুখীতা বহন করে। উচ্চশিক্ষার সহজ পথ ধাপে ধাপে দ্বিতীয় ভাষাকে আগে থেকেই গ্ৰহণ করে রাখলে প্রতিযোগীতামূলক   বিত্ত ও শিক্ষাবর্ষের লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকতে হবে না। বিশ্বায়নের যুগে কুঠরিতে বসে নিজ ভাষার তারিফের মুগ্ধতা নিয়ে বসে থাকলে কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকতেই হবে। তাই বাইরের দুনিয়ার বিকশিত হতে এই দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা চালিয়ে যেতে হবে। এত গেল বাঙলার আপামর বাঙলা মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের কথা। হয়ত এটা  রাজনৈতিক সিংহাসন বুঝে নিয়েছে, শিক্ষা কম জোর জনগণেরা হিসেব চাইতে আসবে না। 


অন্যদিকে একটা ক্লাসিফিকেশন। একটা ইংরেজি মিডিয়ামের অর্থনৈতিক রাজনীতির বিশাল বাজার। দুনিয়া দেশ সব দিকে ভাষাগত উপযুক্ত একটা গষ্ঠি তৈরী হয়েছে। হয়ত সুদূর ভবিষ্যতে একটা নতুন ক্লাস তৈরী হচ্ছে। এখানে কত চেষ্টা চরিত্র করে বাচ্চাদের ঢোকানো হচ্ছে। কারণ অভিভাবক জেনে গেছে মাতৃভাষা নামক আঁচলটি ধরে এই বিশাল কর্মজীবনের বৈতরণী পার হতে পারা যাবে না। ভার্সাটাইল যুগে যা একান্ত দরকার। ঠিক পথ নিয়েছে অভিভাবক, ক্ষমতা যাদের আছে। 


"তাই ইংরেজি মাতৃভাষা " এই খোঁচা হয়ত যারা দেন, তাদের ঘরের ছেলে মেয়েরাই ইংরেজি মিডিয়ামের। কারন বাস্তব একদিকে। সত্য মেনে নেওয়া আধুনিক ও উন্নয়নের পথে চলা। মা দিয়ে কি কেবল সমাজ চলে? মাসি পিসি কাকি কত "মা"ই তো জীবনের রসায়নে প্রান আনে। স্বাদ আনে পথ চলার। মা না হোক ইংরেজি অবশ্যই মাসি হবার যোগ্য। কারন মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের ভাষার ভিন্নতা। আর কথা বলা যোগাযোগের মাধ্যমে একক হলে। মানসিক বিকাশ ও ঐক্য সম্ভব। 


অনেক বড়ো হয়ে গেলো। বিষয়টি এমন রসালো। আলোচনার আবেদন রাখে। ধন্যবাদ দাদারা সুন্দর বিষয়ে বক্তব্য রাখতে পারলাম 🙏

শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

তৃষ্ণা (কলমে শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী)



সৌরেন নিজের লাম্বর্গিনি তে বসে ড্রাইভারকে অফিসের উদ্যেশ্যে গাড়ি চালাতে বললো। লেটেস্ট মডেলের আইফোন থেকে নিজের এইচ আর ম্যানেজারকে ফোন করলো। নতুন দশ জন আই আই টি পাস আউট এবং পি এইচ ডি হোল্ডার কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কে নিযুক্ত করতে হবে। ও এখন ভারতের সর্ববৃহৎ ঠাণ্ডা পানীয় "তৃষ্ণা" র মালিক। ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি গিয়ে দাঁড়ালো একটা ট্রাফিক সিগনালে। মুম্বাই শহরের গরমে, একটা ৮-৯ বছরের বাচ্চা ছেলে ৫ টাকার ঠাণ্ডা জলের প্যাকেট বিক্রি করছে। সৌরেনের নজর সেদিকে যেতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওর বাল্যকাল। আজ ও হাজার মাইল অতিক্রম করে পেছনে ফেলে চলে এসেছে সেই দিনগুলো। কিন্তু সেদিনকার সেই প্রথম পদক্ষেপ ওর মনে আজও তাজা হয়ে আছে।


অনেকদিন ধরে বাবা অসুস্থ থাকায় কাজে বেরোতে পারেননি। সদ্য জন্মানো ছোটো বোনকে নিয়ে অসুস্থ দুর্বল মাও বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না। ঘরে খাবারের কোনো জোগাড় ছিলো না। সেদিন সৌরেন ফেলেছিলো ওর প্রথম পদক্ষেপ, হাজার মাইল অতিক্রম করার উদ্যেশ্যে। 

চায়ের দোকান থেকে ঠাণ্ডা জলের বোতল কিনে বাস স্টপে দাড়ানো বাসে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে বিক্রি করার উদ্যেশ্যে।


সেই শুরু, সেখান থেকে আস্তে আস্তে নিজের তৈরি লেবু জল, আম পোড়া সরবত, আমের রস। এভাবে চলতে চলতে অনেক মাইল এগিয়ে বতোলিকৃত নিজের ঠাণ্ডা পানীয় বাজারে আনলো। নাম রাখলো তৃষ্ণা। আজ ও নিজের কোম্পানিতে পি এইচ ডি হোল্ডার নিযুক্ত করতে চলেছে। 

রাস্তার সেই ছেলেটাকে দেখছে আর মনে করছে ওর নিজের সেই ছোটো প্রথম পদক্ষেপ, হাজার মাইল অতিক্রম করার উদ্যেশ্যে।

ধন্যবাদ, সবাই ভালো থাকবেন।

©All rights are reserved for Subhrajit Chakravorty

পালঙ্ক (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)


নতুন ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটটা সাজাতে অভয় ঠিক করেছে অ্যান্টিক আসবাবপত্রের ব্যবহার করবে বলে । প্ল্যানমতো ও কলকাতার বিভিন্ন অকশান হাউজগুলোর সাথে যোগাযোগ করে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পেয়ে গেল একটা দুর্দান্ত মেহগনি কাঠের বিশালাকায় অ্যান্টিক পালঙ্ক । পালঙ্কটা ঠিক অভয়ের মনের মতো । বিশাল ষোলো বাই ষোলো বেডরুমের ঠিক মধ্যিখানে পালঙ্কটা রেখেছে ও । ঘরটায় ও একটা সেগুন কাঠের আয়নাবসানো আলমারী ও একটা হরিণের সিংয়ের ওপরে শালকাঠের তৈরী বেডসাইড টেবিল দিয়ে সাজিয়েছে মনের মতো করে । 


অভয়ের কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিলনা । স্ত্রী শ্রীপর্ণা আর ষোলো বছরের পুত্র প্রয়াগকে নিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বেশ । কঠোর পরিশ্রমে ধীরে ধীরে হাতে কিছু টাকা জমিয়ে, ভাড়া বাড়ি ছেড়ে এই নতুন ফ্ল্যাট কিনে, শহরের উপকণ্ঠে বেশ মনোরম নিরিবিলি জায়গায় একটা ঝাঁ চকচকে কমপ্লেক্সের মধ্যে ওরা শিফ্ট করে আসে । 


প্রথম প্রথম দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বেশ । গোল বাঁধলো অ্যান্টিক আসবাবে ঘর সাজানোর পর থেকে । সেদিন রাতে অভয়, শ্রীপর্ণা আর প্রয়াগ পালঙ্কে শুয়ে গভীর ঘুমে অচেতন । প্রয়াগ মা আর বাবার মধ্যিখানে শুয়েছে । ঘড়িতে তখন ঠিক রাত দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । ছটফট করে প্রয়াগের ঘুম ভেঙে গেল । যেন ওর মুখের ওপর কিছু একটা ভারী জিনিস চেপে বসেছে । দরদর করে ঘামছে ও । বিছানায় উঠে বসলো বুকে হাত চেপে ধরে । জল খেতে হবে একটু, বাথরুম যেতে হবে । বাবাকে ডিঙিয়ে ও নামলো নীচে । বেডসাইড টেবিল থেকে নিজের জলের বোতলটা তুলে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে খেলো কিছুটা জল । তারপরে বোতলটা নামিয়ে রেখে পেছন ঘুরতেই ওর চোখ পড়ল সামনে রাখা সেগুন কাঠের আলমারীর আয়নাটার ওপরে । ও দেখলো ওর বাবা আর মায়ের মাঝে বসে আছে একটা ওরই বয়সী ছেলে । চোখটা একবার রগড়ে নিলো ও । হয়তো ভুল দেখছে সেই ভেবে । না, চোখের ভুল নয়, ছেলেটা তো এখনো বসে আছে ওর বাবা আর মায়ের মাঝে । এবারে ছেলেটা ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো । ছেলেটার চোখে মণি নেই । কালো গর্ত হয়ে আছে সেই জায়গায় । দাঁত বের করে ওর দিকে চেয়ে হাসছে ছেলেটা । প্রয়াগ ভয়ে চিৎকার করে উঠলো প্রাণপণে ।


চিৎকারে ওর মা-বাবার ঘুম ভেঙে দেখে প্রয়াগ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মাটিতে । মাঝরাতে শোরগোল পড়ে গেল । সিকিউরিটির কাছে ফোন করে সেই কমপ্লেক্সের এক ডাক্তারের সন্ধান পেলো অভয় । ডাক্তারকে ফোন করতে উনি এসে প্রয়াগকে ভালো করে চেক করে বললেন, "মনে হয় মাঝরাতে কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছে । হার্টরেট খুব ফাস্ট চলছে ।" 


সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসার পরে প্রয়াগ চোখ মেলে তাকালো । ডাক্তারের নির্দেশমতো ওকে কেউ তখন কিছু জিজ্ঞাসা করলো না । ডাক্তার ওকে হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধ দিয়ে চলে গেলেন । 


পরেরদিন অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙল প্রয়াগের । খুব দুর্বল লাগছে । মাথাটা ভার হয়ে আছে আর ঘাড়ের দিকে প্রচন্ড চাপ ধরে আছে ওর । শরীরটা খুব ভার লাগছে । উঠে বাথরুম গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হলো ও । ওর বাবা ততক্ষণে অফিস চলে গেছে । ঘরে ওর মা আর ও । ছেলে ঘুম থেকে উঠেছে দেখে ওর মা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, "কাল মাঝরাতে অমন চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেছিলিস কেন রে বাবু? কি হয়েছিল?"


প্রয়াগ অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই মনে করতে পারছেনা যে কাল রাতে কি হয়েছিল! শুধু নিজের তারস্বরে চিৎকারটাই ওর কানে ভাসছে । 


মনে করতে পারছেনা দেখে ওর মা খানিক নিশ্চিন্ত হলেন । কি না কি ব্যাপারে ভয় পেয়েছিল, ওসব মনে না পড়াই ভালো । ছেলেকে ব্রেকফাস্টে টোস্ট, অমলেট আর একগ্লাস দুধ দিয়ে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন শ্রীপর্ণা । 


প্রয়াগের কিচ্ছু খেতে ভালো লাগছে না । শরীরটা এত ভারী কেন লাগছে! ঘাড়ে মাথায় এতো চাপ কেন ধরছে! ওহঃ, অসহ্য যন্ত্রণা । খাবার ফেলে রেখে ও উঠে আবার গিয়ে শুয়ে পড়লো পালঙ্কে । এই জায়গাতেই যেন পরম শান্তি । কি আরাম! আরামে আবার দুচোখ বুজে এলো প্রয়াগের । 


ছেলে ব্রেকফাস্ট করেনি । অনেক ডেকে ডেকে লাঞ্চের জন্যেও উঠলো না । সন্ধ্যেবেলা ঘুম থেকে একবার উঠে মা বলে ডাকলো । শ্রীপর্ণা ছেলের মাথার কাছেই বসেছিল । ততক্ষণে অভয়ও বাড়ি এসে গেছে । বড় ডাক্তারকে কল করা হয়েছে প্রয়াগকে দেখানোর জন্য । ডাক্তার এসে অনেক রকমের পরীক্ষা দিয়ে, ওষুধ আর ভিটামিন লিখে দিয়ে চলে গেলেন । 


সেদিন মাঝরাত । ঘড়িতে ঠিক দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । বাথরুম যাবার জন্য অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল প্রয়াগের । ঘুম থেকে উঠে প্রয়াগ যেন আর দাঁড়াতেই পারছে না । কাঁধে, ঘাড়ে, মাথায় অসহ্য চাপধরা যন্ত্রণা ওর । কোনোমতে শরীরটা টেনে টেনে নিয়ে গেল বাথরুমে । প্রস্রাবের পরে মুখে জল দেবার জন্য বেসিনের সামনে দাঁড়ালো ও । বেসিনের সামনে লাগানো বড় আয়না । তাতে নিজেকে দেখে ভয়ে আত্মা যেন শুকিয়ে এলো ওর । ওর দুটো কাঁধের থেকে ঝুলে আছে সাদা শুকনো দুটো পা । আর ওর মাথার পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে সেই চোখবিহীন ছেলেটার মুখ, যাকে দেখে প্রয়াগ ভয় পেয়েছিল গত রাতে । বিশ্রীভাবে ওর কাঁধের ওপর দিয়ে ওর ঘাড়ে চেপে আছে সেই ছেলে । হাসছে দাঁত বের করে ওর দিকে তাকিয়ে । একেই দুর্বল শরীর, তার ওপরে আয়নায় এই দৃশ্য দেখে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আবার জ্ঞান হারালো প্রয়াগ । 


হুড়মুড় শব্দে ঘুম ভেঙে অভয় আর শ্রীপর্ণা দেখে ছেলে পাশে নেই । তাড়াতাড়ি বাথরুমের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতে দিতেও খুলছেনা প্রয়াগ । সিকিউরিটি ডেকে দরজা ভেঙে বের করা হল ওর অচৈতন্য দেহটা । অ্যামবুলেন্সে করে সেই রাতেই হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল ওকে । হসপিটালে সেই রাতেই এমার্জেন্সিতে সমস্ত ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেও ডাক্তার বুঝে উঠতে পারলোনা কেন এমন হচ্ছে ওর । সব রিপোর্টই নর্মাল । 


শ্রীপর্ণার মনে সন্দেহ দেখা দিলো । ও অভয়কে বললো, সবই তো ঠিক চলছিল । যেদিন থেকে পুরোনো জিনিসে ঘর সাজালে সেদিন থেকেই ছেলের এমন হলো । কার না কার চোখের জলের জিনিস হয়তো । হয়তো কত বিপদে পড়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে । তুমি খোঁজ নিয়ে দেখো কোথা থেকে এই জিনিসগুলো এসেছে । 


যদিও অভয় এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেনা, তবুও সন্তানের ব্যাপারে পৃথিবীর সব বাবা-মা'ই দুর্বল । অভয় ঠিক করলো আজকেই খোঁজ লাগাবে আসবাবপত্রগুলোর সোর্স কি!


অনেক ফোন করে করে, অনেক চেষ্টা চরিত্রের পরে যে ভয়ানক সত্যের সন্ধান পেলো অভয়, তাতে ওর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো । ও জানতে পারলো, যে পালঙ্কটা ও কিনেছে, সেটা বহু বছর পুরোনো এক জমিদার রায়বাহাদুর অমরীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সম্পত্তি । তাঁর মৃত্যুর পরে, সম্পত্তির লোভে তাঁর উত্তরাধিকারী একমাত্র পুত্র জগদীন্দ্রনাথকে হত্যা করে জমিদারের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, অর্থাৎ, ছেলেটির সৎ মা । মাঝরাতে, বাড়ির চাকরের সাহায্যে ওই পালঙ্কের ওপরে ঘুমন্ত ষোলো বছরের জগদীন্দ্রনাথকে মুখের ওপর বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয় । অনেক ধস্তাধস্তির পরে, নিরীহ ছেলেটার যখন প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়, ঘড়িতে ঠিক তখন রাত দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । 


সমস্ত কিছু জানতে পেরে অভয় আর শ্রীপর্ণা বুঝতে পারলো যে, খুন হবার পরে ওই পালঙ্কের মধ্যেই রয়ে গেছে সেই ছেলের অতৃপ্ত আত্মা । সেই আত্মার মুক্তিই একমাত্র পথ প্রয়াগকে সুস্থ করে তোলার । 


কালবিলম্ব না করে অভয় সেই রাতেই ট্রেনে করে চলে গেল গয়ায় পিণ্ডদানের উদ্দেশ্যে । একবার প্রেতশিলায় পিণ্ডদানের পরে আত্মার মুক্তিলাভ অবশ্যম্ভাবী । ভোররাতে পূজারী ব্রাহ্মণকে সাথে নিয়ে প্রেতশিলায় পিণ্ডদানের সময় অভয় যেন টের পেলো কোনো দুটো অস্থির হাত এসে ওর হাত থেকে পিন্ড ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল । অভয় বুঝতে পারলো যে জগদীন্দ্রনাথের আত্মার এখন মুক্তিলাভ ঘটলো । নিরীহ ছেলেটির দুঃখে চোখ জলে ভিজে এল আরেক পিতার ।


আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক তার পরেই সুস্থ হয়ে চোখ মেলে তাকালো প্রয়াগ । কাঁধে, ঘাড়ে আর কোনো চাপ নেই । অভয় গয়া থেকে ফিরে ছেলেকে সুস্থ দেখে আনন্দে আত্মহারা । পরেরদিন সকালেই প্রয়াগকে হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করে দিলো ডাক্তার । 


পালঙ্কটা থেকে চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছে বিদেহী আত্মা । অভয়ের ফ্ল্যাটে সেটা এখনো শোভা বাড়ায় ওদের বিশাল বেডরুমের ঠিক মধ্যিখানে ।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

হাজার মাইল যাত্রা শুর হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে। ( কলমে--- পারমিতা মন্ডল।)

বিষয়---হাজার মাইল যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে।
কলমে--- পারমিতা মন্ডল।

প্রিয়তম, 

         জানি তুমি ভুলে গেছো আমায় । কম দিন তো হলোনা। ভুলে যাওয়ারই কথা ।  ভাবছো আমি কেন ভুলিনি তোমাকে ? আমি যে তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম। এক রঙিন স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমাকে নিয়ে। যেমন ষোড়শী বয়সে দেখে । রঙিন কাঁচের আড়াল দিয়ে পৃথিবী দেখেছিলাম। সেই পৃথিবীতে তুমি ছিল আমার দেবদাস। আমি তোমার পার্বতী না হলেও তুমি ছিলে আমার কাছে সেই প্রেমিক পুরুষ।জীবনের প্রথম ভালোবাসা নাকি ভোলা যায় না কখনোই। আমিও তোমাকে ভুলতে পারিনি। হয়তো পারবো না কোনদিন। 

 কিন্তু তোমার আমার হাজার বছর একসাথে পথ চলা হলোনা। আমি যে  তোমার কাছে "নাটোরের বনলতা সেন "হয়ে উঠতে পারলাম না কোনদিন। প্রেমিকা  যখন ঘরনী হয় , তখন সে আর স্বপ্নের নায়িকা "বনলতা সেন" থাকে না। নিত্য কাজের মাঝে হয়তো বড় একঘেয়ে হয়ে যায়। তাই আমার ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে আমি এই পদক্ষেপ নিলাম। তোমার থেকে দূরে চলে গেলাম।  তোমাকে ভালোবাসি বলে । কোন তিক্ততা বা ভুল বোঝাবুঝিতে ভালোবাসা শেষ হওয়ার আগেই আমি সরে গেলাম।  জানি হয়তো ভুল হলো । কিন্তু আমাদের ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখবে এই দূরত্ব। এভাবেই সমান্তরাল রেখার মত আমরা হাজার বছর এগিয়ে যাবো। পৃথিবীর সব বিখ্যাত প্রেমিক- প্রেমিকার জীবন তো এই সমান্তরাল রেখার মত। তাই তো তারা আজও হাজার বছরপরেও বেঁচে আছে মানুষের মনে।

তুমি হয়তো ভাবছো আমি আমাদের ভালোবাসার অমরত্ব চাই।  নাম চাই, খ‍্যাতি চাই । তা নয় গো । আমি শুধু আমাদের ভালোবাসাকে  বাঁচিয়ে রাখতে চাই । চার দেওয়ালের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে দিতে চাই না। তুমি রাগ করোনা। দেখো এই ছোট্ট একটি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকবে আমাদের ভালোবাসা। যা শেষ হয়ে যেত চার দেওয়ালের মধ্যে বন্ধী জীবনে। আজ দূরে থেকে নিত্যদিনের বিরহ সুখে নতুন করে  ভালোবাসবো তোমায়। 

আমি হাজার আলোকবর্ষ দূরে থেকেও শুধু তোমার থাকবো। আর জানি তুমিও হাজার বছর পথ হেঁটে আসবে নাটোরে। জীবনন্দের বনলতা সেনকে নয় আমাকেই খুঁজতে। সেদিনের এই ছোট্ট পদক্ষেপ তোমায় ,আমায়  হাজার মাইল হাঁটতে শিখিয়ে ।দূরে সরে গিয়ে ভালোবাসা হয়েছে আরো নীবিড়। এভাবে  দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে চাই হাজার বছর। বীলিন হতে চাই তোমার ভালোবাসায়।  দেখো  আজ আমাদের  হাজার মাইল পথ হাঁটতেও কোন ক্লান্তি নেই। দুজন দুজনকে খুঁজে ফিরছি হাজার মাইল পেরিয়ে। যেমন খুঁজেছিল নাটোরের বনলতা সেনকে।

       অপেক্ষায় থাকবো-----
                                        
                                     ্্ইতি
                                     তোমার প্রিয়তমা ।
                                     
                                         

                                

#নাম- পথের সাধক। ✍ - শুভব্রত ভট্টাচার্য।

আজকের বিষয়, *“হাজার মাইলের যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে”*।
✍️ শুভব্রত ভট্টাচার্য

আজ আপনাদের শোনাবো এক অনন্ত মহাজীবনের কথা। এক সামান্য মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে তিনি কিভাবে হয়ে উঠলেন ভারতের এক প্রভাবশালী ধর্মগুরু এবং সারা বিশ্বের হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের প্রধান মুখ। সারাবিশ্বে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্ব কে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁর তৈরি সংগঠন আজ সারা পৃথিবীতে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের মাধুর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বলছি ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজের কথা। 
১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি গৌড়ীয় মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অনন্তলোকের যাত্রী হয়ে গেলে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় অভিভাবক হীন হয়ে যায়। যদিও সরস্বতী ঠাকুরের কয়েকজন মুখ্য শিষ্য ছিলেন যাঁরা অত্যন্ত জ্ঞানী ও পন্ডিত। তাঁরা প্রত্যেকেই সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত যোগ্য ছিলেন। তখন গৌড়ীয় মঠের ৬৪টি শাখা ও ১ টি প্রচার কেন্দ্র ছিল সমগ্র ভারতে। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মৃত্যুর পর এক বিতর্ক শুরু হয় এবং মূল গৌড়ীয় মঠ মিশনটি দুটি প্রশাসনিক সংস্থাতে বিভক্ত হয়।যারা আজকের দিন পর্যন্ত নিজেদের প্রচার করে চলেছে। এক বন্দোবস্তে তারা ৬৪ টি গৌড়ীয় মঠ কেন্দ্রকে দুটি ভাগে ভাগ করে। শ্রী চৈতন্য মঠ শাখা শ্রীল ভক্তি বিলাস তীর্থ মহারাজের নেতৃত্বে ছিল। গৌড়ীয় মিশন ছিল অনন্ত বাসুদেব প্রভুর নেতৃত্বে ।যিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর শ্রী ভক্তি প্রসাদ পুরি মহারাজ হিসাবে পরিচিত হন ।

ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের অন্যান্য যোগ্য শিষ্যরা এই বিভাজনের সাথে একমত হন নি। তাঁরা কেবল তাদের গুরুর মিশন সম্প্রসারিত করার জন্য অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাই তাঁরা নিজেদের পৃথক মিশন শুরু করেছিলেন। এই স্বায়ত্তশাসিত মিশনের অনেকগুলি এখনও বিভিন্ন গৌড়ীয় মঠ নামে পরিচিত। এইসব অত্যন্ত জ্ঞানী ও বিচক্ষণ শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ। ১৯২০ সালের স্কটিশ চার্চ কলেজের স্নাতক অভয়চরণ দে ১৯২২ সালে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৩ সালে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আনুষ্ঠানিক ভাবে মঠে যোগদান করেন ও সরস্বতী ঠাকুরের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। সরস্বতী ঠাকুর অপ্রকট হবার কিছু দিন আগে স্বামী মহারাজকে বিদেশে হরিনাম সংকীর্তন প্রচারের আদেশ দিয়েছিলেন। তাই যখন সরস্বতী ঠাকুরের শিষ্যরা মঠ ভাগাভাগি করে নিলেন বা নিজেদের আলাদা আলাদা করে সংগঠন তৈরি করলেন, স্বামী মহারাজ তখন এসবের মধ্যে গেলেন না। বিভিন্ন বৈষ্ণব গ্রন্হ প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করলেন তিনি। আর নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন বিদেশে ধর্ম প্রচারের জন্য। ১৯৪৭ সালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ তাঁর পান্ডিত্যের জন্য  তাঁকে ভক্তিবেদান্ত উপাধি দিয়ে সম্মানিত করলেন। এরপর তিনি বৃন্দাবনে থাকতে শুরু করেন, বিখ্যাত রাধা দামোদর মন্দিরে। এখানেই বসে তিনি রচনা করেন ভাগবত পুরাণের টীকা। তিন খন্ডে ভাগবত পুরাণের টীকা বৈষ্ণব সাহিত্যের এক অদ্ভুত গ্রন্হ। ১৯৫৯ সালে এলাহাবাদ গৌড়ীয় মঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিম গুরুভাই কেশব মহারাজের সন্ন্যাসব্রত গ্রহন করলেন। 
এরপর তাঁর মধ্যে বিদেশে কৃষ্ণনাম প্রচার করতে যাবার ইচ্ছে আরো প্রবল হল। কোন রকমে এক ভক্তের সহায়তায় জলদূত নামে এক জাহাজে একটি জায়গা পেলেন। একটি ছাতা, সামান্য কিছু শুকনো খাবার, কয়েকখানি বই ও আট টাকা সম্বল করে আমেরিকা যাত্রা করলেন। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হিসাবে আমেরিকায় তিনি তার আধ্যাত্মিক মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন। ১৯৬৬ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমীর পরের দিন তিনি পাশ্চাত্যে প্রথম দীক্ষা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন ও ১১ জনকে দীক্ষা দেন। প্রতিষ্ঠা করলেন ইসকন  (ISKCON) আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের। এর মাধ্যমে বৈষ্ণব ভাবধারাকে পাশ্চাত্য দুনিয়ার কাছে উন্মুক্ত করে দিলেন তিনি। শুরু হলো আন্তর্জাতিক হরেকৃষ্ণ আন্দোলন। 
১৯৬৭ সালের ৯ জুলাই সানফ্রান্সিসকো শহরের রাজপথে তিনিই পাশ্চাত্যে প্রথম রথযাত্রা পরিচালনা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত ও অন্যান্য জায়গায় ভ্রমণ করে তিনি অসংখ্য শিষ্যসংগ্রহে সফল হন। সংকীর্তন বই বিতরণ ও জনসভার মাধ্যমে হরেকৃষ্ণ আন্দোলনকে পাশ্চাত্যে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলতে থাকেন। যত সময় এগোতে থাকে দিকে দিকে ইসকনের শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে। হরেকৃষ্ণ আন্দোলন প্রচারের জন্য চোদ্দবার তিনি বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং ছটি মহাদেশে পদার্পণ হয়েছিল তাঁর। বিদেশের মাটিতে বৈষ্ণববাদ এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবধারাকে প্রচার করে ১৯৭১ সালে দেশে ফিরে আসেন। মায়াপুর ইসকন মন্দির তৈরি হলো।  মায়াপুর ছাড়াও বৃন্দাবন, দিল্লি সহ ভারতবর্ষের অন্যান্য সমস্ত বড় বড় শহর এবং তীর্থক্ষেত্রে ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হলো। ধীরে ধীরে বিদেশের মাটি ছাড়াও দেশের মাটিতে ইসকনের প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ভাবধারা ছড়িয়ে পড়লো তাঁর হাত ধরে। অসীম সাংগঠনিক শক্তি এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর।  তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান‌। জীবনে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন গীতা, চৈতন্য চরিতামৃত, শ্রীমদ্ ভাগবত গ্রন্থ গুলি সহ ষাটটিরও বেশি গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন তিনি। এছাড়াও তার অসংখ্য লেখা গ্রন্থ আছে বৈষ্ণব ধর্মের ওপর যেগুলি বর্তমানে আশিটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। 
এক বিশাল সংস্থা তৈরি করে গেছেন তাঁর জীবদ্দশায়। ইসকনের বিশাল কর্মকাণ্ড, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোককে প্রতিদিন দুইবেলা করে খাওয়ানো হয়।  যেখানে বন্যা খরা প্রাকৃতিক বিপর্যয় সেখানেই ইসকনের উপস্থিতি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে অসংখ্য মন্দির অতিথিশালা এবং নরনারায়ন সেবার ব্যবস্থা এক অলৌকিক কাজকারবার। 
প্রভুপাদের অন্য শিষ্যদের মতো তিনি নিজের ভাগে একেকটা মঠ নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাননি।  প্রভুপাদের আদেশ বিদেশে গিয়ে হরিনাম প্রচার করো, এ কথা সারা জীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে। তাই সাহস করে তিনি আমেরিকা যাবার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন একরকম কপর্দকহীন অবস্থায়।  যার জন্য আজ এত বড় অরগানাইজেশন উনি তৈরি করে যেতে পেরেছেন।১৯৭৭ সালের ১৪ ই নভেম্বর তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেন। তাঁর নির্দেশিত পথেই ইসকন আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আধ্যাত্বিক চেতনায় পথ দেখাচ্ছে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ নরনারী কে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

একটা সিদ্ধান্ত (চন্দনা লাহা নাগ)


*একটা সিদ্ধান্ত*:


  অনিমেষ জীবনে বহু বছর অবিবাহিত থাকার পর আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব দের হাজার কথায় এবার বিয়েটা করেই ফেলল। বিশেষ করে শেষ বয়সের বিধবা মায়ের কথা রাখার জন্য। নিজে দেখতে একজন সুপুরুষ হওয়া সত্ত্বেও জীবনে একটাই ভয় ছিল নিজের পায়ে ঠিকঠাক মতো দাঁড়াতে পারেনি তাই সংসার কে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বোধহয় তার নেই। সামান্য একটা পানের দোকান থেকে যা ইনকাম হয় তাতে কোন মেয়েকে সচ্ছল রাখা বোধহয় তার পক্ষে সম্ভব নয়। এরকম হাজার ভাবনার ভিড় তাকে গ্রাস করে বসতো । তাই বলে কি মানুষ সংসার পাতে না? হাজার দরিদ্রতার মধ্যেও তো মানুষ সুখ খুঁজে বেড়ায়। তবে ওর দোষ কোথায় সংসার বাঁধতে? আর ও যা ইনকাম করে মোটামুটিভাবে একটা সংসার চলে যেতেই পারে।  মেঘে মেঘে বেলা বেশ ভালই ঘনিয়ে এসেছিল অর্থাৎ দেখতে দেখতে অনিমেষের বয়স প্রায় 38 বছরে যখন ঠেকেছে তখন এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়। অনিমেষের বয়স অত খানি হলেও চেহারার জন্য বয়স বোঝা দায়। মেয়েটিও অবশ্য জানতে পেরেছিল বিয়ের পর যে তাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান প্রায় কুড়ি বছর। স্ত্রীর ওই কম বয়সী মনের আবেগ গুলোকে ভালোলাগাকে আর শখ পূরণ করতে গিয়ে অনিমেশ আজ সর্বস্বান্ত হতে বসেছে। মাঝে মাঝে স্ত্রীর দামি গয়নাদামি দামি আসবাব পত্রের অভাব মেটাতে না পেরে নিজে এক প্রকার হীনমন্যতায় ভোগে। এরইমধ্যে দুইটি সন্তান ও জন্মগ্রহণ করেছে। তাদের ওষুধপাতি চিকিৎসা, পড়াশুনো, ভালো মন্দ খাওয়ানো, শ্বশুরবাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে চলা এই সবকিছু করতে করতে অনিমেষ যেন আজ ক্লান্ত। এই নিয়ে ঘরের মধ্যে নিত্য অশান্তি আজ তাকে পেয়ে বসেছে। তাই কারনে অকারনে দাম্পত্য টা যেন একেবারে বিষময় হয়ে উঠছে। ওদিকে স্ত্রীরও

যেন কেমন আনরোমান্টিক মনে হয় তার স্বামীকে। মনে হয় এটা যেন তার জীবনের একটা ভুল সিদ্ধান্ত। স্ত্রী দাম্পত্য সম্পর্কে সুখি নয় বলে নিজেকে অনেক বেশি সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে। নিজেকে একপ্রকার সহজলভ্য পণ্য মনে করেছে।উঠতি বয়সে কত ছেলেদের কাছ থেকে লাইক কমেন্ট এ আজ তার জীবন যেন এক রঙ্গিন মোড়কে মোড়া। এরই মধ্যে কয়েকজন হোয়াটসঅ্যাপে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সংসার তার কাছে বিতৃষ্ণা। অনিমেষের মায়ের দীর্ঘদিনের চিকিৎসার ঔষধ জোগাড় করতে করতে আজ সে দিশেহারা।

অনিমেষের মনে হল একমাত্র নেশায় তাকে পারে সব দুঃখ থেকে মুক্তি দিতে যা কিনা তার কখনো ভাবনার মধ্যেই ছিল না। তাই একটু একটু করতে করতে আজ সে প্রায় মাতালের পর্যায়। ফেসবুকে সেও অনেকটা সময় কাটায়। বিষাদ ময় জীবনের যত উক্তি ফুটিয়ে তুলে ফেসবুকে রঙিন পাতাগুলোতে। এমন এই উক্তির মোহে পড়ে আসক্ত হয় তনুশ্রী নামের এক বিবাহিত নারী। তনুশ্রী ও যেন নিজের না পাওয়া জিনিসগুলো অনিমেষের লেখার মধ্যে খুঁজে পায়। তাই প্রতিটা পোস্ট লাইক কমেন্ট থেকে কখনো বিরত হয়না। এভাবে কখন যে সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে গেল অনিমেষ তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। অথচ এই অনিমেষকে ই যৌবন বয়সে যখন কোন মেয়ে কাছে পেতে চাই তো তখন নিজেকে গুটিয়ে নিত।

             অনিমেষএর মা নিজেকে আজ যেন কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছেন না। কেবলই মনে হচ্ছে খোকার জীবনে ওই একটা সিদ্ধান্ত যদি আমি নিতে বাধ্য না করতাম তাহলে বোধহয় এমনটা হতো না। আমার ওই জীবনের একটা সিদ্ধান্ত ই যে আজ তাকে হাজার মাইল পথ হাঁটতে শিখিয়ে দেবে তা আমি বুঝতে পারিনি। মানুষের জীবনের এই হাজার পথ চলার মধ্যে সুখ-দুঃখ সবকিছুই মিলেমিশে থাকে তবুও জীবনের একটা অন্য মানে খোঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আমার অনিমেষ যে একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন আমি কি করি?  হে ঈশ্বর আমি তো এমনটা চাইনি। আমি কেন পৃথিবীর কোন মায়েই তো এমনটা চায় না। তুমি আমার অনিমেষের চলার পথ মসৃণ করে দাও আবার সবকিছু ঠিকঠাক করে দাও প্রভু। মা হয়ে ছেলের সংসার  এই ভাবে ভেসে যেতে যে দেখতে পারিনা বড় কষ্ট হয়।

বাক্য আলোচনা।। (বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পরেই আমাদের শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়। তাই আমাদের *ব্যক্তিগত অনুভব*) ©শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 বাক্য আলোচনা।। 

(বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পরেই আমাদের শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়।

 তাই আমাদের *ব্যক্তিগত অনুভব*) 



©শর্মিষ্ঠা ভট্ট


রমলাদিকে জামাইবাবু তুলোয়  মুড়ে রাখতেন। আমরা বলতাম। রমলাদি ব্যাঙ্ক কি জানে না। কার্ড আছে, কয়েকটি নম্বর মুখস্থ করিয়ে দিয়েছে,  শপিং করে। সিনেমা মল যায়। তাও জামাইবাবু ছাড়া খুব একটা নয়। কিন্তু রমলাদি মডেল হাঁদাভোঁদা নন। আমাদের যত জ্ঞান তার কাছে থেকে নেওয়া। মস্ত মলা তিনি। জগৎকে চিনেছে ছায়ায় বসে। ছেলেরা বড়ো হয়ে বিদেশে। কম বয়সে বিয়ে সহজে সব নিপটে  গেছে। এখন ঝাড়া হাত পা কেবল পার্টি থ্রো করেন আর ডাকাডাকি করেন। আমোদ উল্লাসে কাটে দিন। আমরা বলি রমলাদি ছেলেরা এমন কিছু বড়ো নয়। সবে পড়ছে। একটু বুঝে চলো। মুখ গোমড়া করে বলবে কেন রে বেশ তো আছি। 


দুনিয়া কি অনুভূতি হল সেদিন, যেদিন হঠাৎ নোটিশ না দিয়ে জামাইবাবু চলে গেলেন। এত বড়ো সম্পত্তির কোথায় কি কিছু জানে না রমলাদি। ছেলেরাও নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। এক তো ছাতা উড়ে যাবার খালিপন, অন্যদিকে আর্থিক চিন্তা। রমলা ছয় মাসে যেন বেশ কিছু বুড়ি হয়ে গেল। অনেক বেশি প্রিজার্ভ। মানুষের সাথে মেপে মেলামেশা লিখে গেছেন ব্যক্তিগত অনুভব থেকে। সহজ বিশ্বাসের পথে একটা ছোট চেক পোস্ট বসিয়েছেন। ছেলেদের বিষয়ে সতর্ক ও অনেক কড়া। 

প্রথম  মাস চুপ হয়ে গিয়েছিল কমলাদি । কারো সাথে কথা বললেই হাউমাউ করে কাঁদত। এমন করে তো চলে না! রাত রাত জেগে অনুভব করেছেন। দায়িত্ব দিয়ে গেছেন জামাইবাবু। তাঁর কাজগুলো যে শেষ করতে হবে। খাতাপত্র  বাড়ীতে এনে দেখতে শুরু করলেন পাশে চেনা চেটার এ্যাকাউন্টারকে বসিয়ে। বিশাল অর্থনৈতিক ঘাবলা । ডুবে যেত আর কয়েক ধাপ পরে। মহিলা পার্টির মুখ্য ভূমিকায় থাকত যে মহিলা, তার স্বামী এই ঘাবলাবাজির কারন। রমলাদি ছয় মাস পরে বাইরে বের হলেন। আমরা দেখলাম ব্যক্তিগত অনুভব তাকে শক্তপোক্ত সাহসী করে তুলেছে। সাথে নিয়ে গেছে লাতুপুতু চেহারা বোকা মিষ্টি হাসিটা। 

🙏💐

# নাম- বাস্তব ও আবেগ। ✍ - মৌসুমী চন্দ্র।

বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পর আপনার শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়-----
*যেমন কোন নারী যদি শারীরিক মানসিক ভাবে নিগৃহীত হয় মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড ঠিক মত কাজ করে না, সে ধীরে ধীরে মানসিক জোর হারিয়ে ফেলে।
*যে মানুষটি " আজকে যে মুখে মারে বিশ্ব,চুপচাপ হয়ে যাবে কাল সে,কাল সে"বাস্তব কোন অপ্রীতিকর ঘটনা তার কল্পনা, স্বপ্নের জগতের উপর
প্রভাব ফেলে তার স্নায়ুকে দুর্বল করে দেয়।
*  ছেলে, বৌমা বিদেশে থাকে সেন দম্পতি
বড় অসুখী হয়ে পড়েন, বাস্তব পরিস্থিতিতে বড়
একাকীত্বে ভুগতে ভুগতে ডিপ্রেশনের রুগী হয়ে
পড়েন।
*হঠাৎ কোন ছেলে বা মেয়ে  অতিরিক্ত প্রতিযোগিতায় বাস্তব অবস্থার সম্মুখীন হয়ে
ঘরকুনো হয়ে গিয়ে,দেহে ফ্যাটের আধিক্যহেতু ব্লাড সুগার বেড়ে যায়।
*একজন মেধাবী ছাত্রীকে কোন গুরুস্থানীয় মানুষের অসভ্য আচরণের ফলে তার শরীরে হঠাৎ উত্তেজনার ফলে যৌন নির্যাতনের ফলে যৌন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
*খুব ভালো মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রী বিশেষ বাস্তব কারণে খারাপ রেজাল্ট করলে তার চিন্তা নিম্নমুখী
হয়,এমনকি নিজের সম্বন্ধে খারাপ ধারনা তাকে আত্মহননের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
*হঠাৎ বাস্তব আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন অন্তঃসত্ত্বা
নারীর গর্ভপাত ঘটলে, তার বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হতে পারে। 
*অতি আধুনিক সমাজে স্ট্যাটাস,পার্টি মেইন্টেন করে মদ্যপান অধিক পরিমাণে করলে, লিভার ক্যান্সার মৃত্যুর কারণ হতে পারে
*বর্তমানে এই করোনাপরিস্থিতিতে চূড়ান্ত বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সব ছাত্রছাত্রীদের অধিক মোবাইল ব্যবহারের ফলে, চোখের ও কানের রোগে
ভুগছে, শারীরিকভাবে অলস হয়ে পড়ছে।

অঙ্কণে ও লিখনে মৌসুমী চন্দ্র

# নাম- জীবন যেরকম। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

বাক্য আলোচনা-বাসর। 
  #বিষয় - *বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পরেই আমাদের শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়। তাই আমাদের ব্যক্তিগত অনুভব।*
  # নাম- *জীবন যেরকম।*
    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

         জীবন প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনকে করে গতিশীল,প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রত্যেকেই অধীন। আর প্রকৃতির সঙ্গে অস্তিত্বের জন্য লড়াই( struggle for existence)। এই লড়াইটাই অহরহ জন্ম দেয় বাস্তবতা।
  বাস্তবতার জন্ম হয় বস্তুপ্রকৃতি থেকে। আর হৃদয়ে যখন সে প্রতিবিম্বিত হয়,তখন হৃদয়ে একপ্রকার প্রতিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তারই নাম প্রকাশ। প্রকাশ ব্যতীত জীবন হয় না। প্রকাশ  জীবনকে দেয় গতিশীলতা,হৃদয়ে প্রকাশ হল একপ্রকার গতিশীল অবস্থা। এই প্রকাশ মনের অধীন। মন যেভাবে গ্রহণ করবে সেভাবেই মন প্রকাশের ক্ষমতা ধারণ করবে। 
  এই মন শরীরের গঠনের উপর নির্ভর করে। শরীরে বিভিন্ন হরমোনাল গ্রন্থি আছে। তারাই প্রকাশের দুটি ধারা জন্ম দেয় - একটি বাস্তব ও অপরটি আবেগ। 
    আবেগ ছাড়া জীবন হয়না বলেই আবেগের কিছু ক্ষতিকর দিক আছে,কিছু উপকারী দিক আছে। এজন্য আমরা বলি জীবন মানেই ঠিক ও ভুলের অঙ্গ। জীবন মাত্রেরই ভুল থাকে। জীবন মানেই ঠিক থাকবে। এই ভুল ও ঠিকের ব্যালান্সই হল জীবনের অস্তিত্বের মূল। ভুল মরণকাঠি। ঠিক জিয়নকাঠি। যাকে বলে জীববিজ্ঞানের ভাষায় অভিযোজন। 
   জীবন প্রকৃতিজাত বলেই জীবনকে অভিযোজন করতে হয় ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, ব্যক্তির সাথে বস্তুর। বস্তু থেকে ভাবের আমদানিকে বলে বাস্তব। তা থেকেই বাস্তব ঘটনার জন্ম হয়। যেমন বাস্তব নিয়ম পথে নামলে বামদিক দিয়ে যেতে হয়। গাড়ি ঘোড়ার যাতায়াতের মধ্যে নিশ্চয় ব্যক্তি চলবে না। ট্রেনে,প্লেনে,জাহাজে ওঠা নামার একটা সিস্টেমটাই বাস্তব,কেননা তখন ব্যক্তি বস্তুর অধীন। বিন্দুমাত্র নিয়ম  ভঙ্গ হলেই মৃত্যু নিশ্চিত। সমুদ্রের ঢেউ ধরার মধ্যে আনন্দ আবেগ থেকে জন্ম নেয়,কিন্তু আবেগের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে মৃত্যু আসে,তাই বস্তুর কাছে নিজের নিয়ম মেনে চলাটাই বাস্তব। এতো গেল বস্তুর সঙ্গে ব্যক্তির আবেগ ও বাস্তবের সম্পর্ক। সুখ, আনন্দ আবেগ থেকে উপলব্ধি,আর ব্যক্তির পরাজয় থেকে মৃত্যু বাস্তবের  অনুভূতি। এবার আসি ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির আবেগ ও বাস্তবের সম্পর্কের কথায়।
   আবেগ ছাড়া পারিবারিক বন্ধন হয় না,মানুষের তথা দেশের সেবা হয় না। ভালবাসা,দান,দয়া,সংযম,নির্ভিকতা,মুক্ত জীবনের উল্লাস ছাড়া জীবনের উপভোগ্য হয় না। আর এর মধ্যে জীবনের চরম সত্যগুলি জীবনের অস্তিত্বকে চরম মূল্যবান করে,আবেগের থেকেও বড় তখন বাস্তব। লোভ মানুষকে আবেগতাড়িত করে ক্ষতি করে বেশি,বাস্তবে শিক্ষা হয় তত। যেমন সারদা ও রোজভ্যালিতে টাকা জমালে কম সময়ে দ্বিগুণ ফিরে আসবে। এই লোভে পা দেওয়ার পর,নির্দিষ্ট সময়ে ডবল ফেরত হবে কি, যে টাকাটা জমিয়েছিল,সেটাই ফেরত এলো না,তারপর উপলব্ধিটা কেমন হয়। সকল কার্যই ফল দেয়। আর এই ফল হল সাফল্য হলে ভাল ফল ও ব্যর্থ হলে মন্দ ফলের  উপলব্ধির হয়। 
    জীবন মানেই যেকোনো কর্ম। কর্ম মানেই ফল। ফল মানেই ভাল ও মন্দের উপলব্ধি। 
    ক্ষমতা লোভ,আইনের শাসন,শাসনের আইন, পরিশ্রমের ফল,স্বার্থপরতা, অ্যাথেলেটিক্সে কম্পিটিশন করে  সোনার পদক গলায় ঝুললে অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে আসবে। লড়াইটা বাস্তব, তার ফলটা আবেগ দিয়ে উপভোগ। পরীক্ষার হলটা বাস্তব,ফলটা আবেগ দিয়ে উপভোগ্য। প্রত্যেক ক্রিয়ারই বিপরীত প্রতিক্রিয়া,আপেক্ষিকতাবাদ,বস্তুমূলক বাস্তবতা ও জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগ যেখানে যত বাস্তবতা তত শিক্ষা হচ্ছে তার ফল। আর ফলভোগটা ব্যক্তিবিশেষের কাছে আবেগের উপভোগ্য। আবেগ ছাড়া উপভোগ্য হয় না। শুধু বাস্তব, শুধুই আবেগ জীবনকে পূর্ণতা দেয় না। তবে এটা সত্য বাস্তব কখনো ঠকায় না। আবেগ ছাড়া চলার উপায় নেই,সে আবার ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হয়। বাস্তবের সঙ্গে আবেগের ব্যালান্সই জীবনকে খুব মূল্যবান করে। 
                  ******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বুধবার, ২৮ জুলাই, ২০২১

সংস্কার ও কুসংস্কার। (কলমে -- পারমিতা মন্ডল।)

সংস্কার  কুসংস্কার ।
                     কলমে--- পারমিতা মন্ডল।

1)  বিজ্ঞানের  শিক্ষিকা  দেবারতি দি বাড়ি থেকে অনেক দূরে একটি স্কুলে চাকরি করেন। আজ স্কুলে পরীক্ষা শুরু হবে। ওনাকে তাড়াতাড়ি যেতেই  হবে। তাই নাকে মুখে দুটো গুঁজে দৌড় লাগালেন। ট্রেনটা ধরতেই হবে। কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে একি বিপদ ? সামনে এসে বসলো এক শালিক  । এক শালিক  দেখলে যে যাত্রা ভালো না । বিজ্ঞানের শিক্ষিকা যিনি সব সময় ছেলে মেয়েদের খেশান কুসংস্কার কি, কিভাবে মানুষের জন্ম হয় শুক্রানু- ডিম্বানুর মিশ্রণে, কিভাবে সূর্য ওঠে ও অস্ত যায় ।এই সব কিছুর পিছনে বিজ্ঞান আছে। । আজ তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুই শালিক খুঁজে চলছেন।  এখন তিনি কোথায় পান আর এক শালিক ? এদিকে ট্রেনটা যে ছেড়ে গেল । না হয় একটা কলা গাছ পেলেও হতো। কলা গাছকে নমস্কার করলে দোষ কেটে যায়। উনি এখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে  কলাগাছ খুঁজে চলেছেন দুই হাতে তাবিজ-কবজ ও নীলা-চুনী পরিহিত বিজ্ঞানের দিদিমনি। এদিকে ট্রেনটা ছেড়ে গেল।

2) ওদিকে  রায়বাবু একটি ব‍্যবস‍্যায়ের  গুরুত্বপূর্ণ কাজে  আজ সিংগাপুর যাবেন। দশটার সময় ফ্লাইট। ঠিক সময় মতো বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন । কিন্তু বিপদ হলো রাস্তায় এসে। হঠাৎ করে গাড়িতে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়লো ড্রাইভার।  সামনে দিয়ে একটি কালো বিড়াল রাস্তা পার হয়ে গেল। শুভকাজে যাচ্ছিলেন, বাঁধা পড়লো। আর তো গাড়ি সামনে এগোনো যাবে না। দাঁড়াতে হবে কিছুক্ষন। কালো বিড়াল যে অশুভ। ওদিকে ফ্লাইট তো ছেড়ে যাবে। তিনি এখন কি করেন ?

3) ট্রেনের মধ্যে দুই মহিলার মধ‍্যে  তুমুল ঝগড়া শুরু হয়েছে। একটু কান পেতে শুনি  একজন আর একজনকে বলছে---- "সকাল বেলাতেই তুই আমাকে এক চোখ দেখালি কেন ,? জানিস আজ আমার দিনটা কতটা খারাপ যাবে ? তুই এটা ইচ্ছা করে করেছিস। এখনি দু'চোখ দেখা।" ওদিকে সে যতোই দু'চোখ দেখায় ওর কিছুতেই মন ওঠে না। আজ কোন না কোন বিপদ হবেই। সকাল সকাল এক চোখ দেখেছে।

4) অণুপমার খুব শিক্ষিত পরিবারে বিয়ে হয়েছে। শাশুড়িও কলেজে পড়ায়। সেখানে ও কিছু করেনা বলে মন খারাপ লাগে মাঝে মাঝে। তার এই শিক্ষিত শাশুড়িমা সেদিন  গর্ভবতী নিরুপমাকে বললেন --" একটু পরে গ্রহণ লাগবে । তুমি কিন্তু বাইরে বেরিও না।  আর এই সময় জানো তো কোন কিছু কাটতে নেই । তাহলে সন্তানেরও কোন না কোন অঙ্গে কাটা  বা খুদ বেরোয়।  কিছু খেতেও নেই ,যতোক্ষণ গ্রহণ চলবে তুমি কিন্তু না খেয়ে থাকবে। জলও  খাবে না । অবাক হয়ে সেদিন শাশুড়িমার কথা শুনেছিল নিরুপমা। যে নিজেকে কম শিক্ষিত বলে মনে মনে আপরাধী ভাবতো।

5)অনেক বয়স হয়ে গেছে। মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে না। তাই বাবা মা দুজনে মিলে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন জোতিষীর কাছে।  তিনি বহুমূল্য ব‍্যয় করে আনেক গুলো পাথর ধারন করতে বললেন। এবং বেশ কিছু তাবিজ কবজ ও দিলেন। সাথে দিলেন বিভিন্ন রকমের কৃচ্ছসাধন। কিন্তু মেয়েটা  উচ্চ শিক্ষিত হতে চেয়েছিল। আরো পড়াশোনা করতে চেয়েছিল ।বাবা মা পড়ানোর পিছনে টাকা খরচের বদলে" পাথর "কিনতে সেই টাকা খরচ করলেন। আর মেয়ের সুপাত্রের আশায় সুখনিদ্রায় মগ্ন হয়ে রইলেন ।

আমরা এখনো অনেকেই এরকম কুসংস্কারকে মেনে চলি। যতোই লেখা পড়া শিখিনা কেন ?। একটু ভেবে দেখি না  এগুলোর পিছনে  সত্যিই কোন   কারণ বা যুক্তি আছে কিনা ? নাকি  সংস্কার বলে বংশ পরম্পরায় মেনে চলি। একটি শালিক  বা কালো বিড়াল আমার যাত্রা পথে কিভাবে অমঙ্গল ঘটাতে পারে ? গ্রহণ কেন হয় তা আমরা সবাই জানি।  তাই কোন কিছু কাটার সাথে গ্রহণের কোন সম্পর্ক নেই। আর আমার মনে হয়না জোতিষী কারো ভাগ্য ফেরাতে পারে।

(নিজস্ব মত। আমার মতের সাথে সবার নাও মিলতে পারে। কেউ আঘাত পেলে আমি দুঃখিত।🙏🙏🙏,)

All rights are reserve by paramita  mandal.


অভিযোজন ও অভিব্যক্তি(কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)



এই বাক্যটির বহুমুখী আলোচনা করা সম্ভব। যেমন- বিজ্ঞানভিত্তিক, দার্শনিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক। আমি এই বাক্যটির বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।


বাক্যটি থেকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যে অর্থ দাঁড়ায় তাকে বলা হয় অভিযোজন বা Adaptation এবং এই অভিযোজনের হাত ধরেই অতি ধীরে আসে অভিব্যক্তি বা Evolution. 


অভিযোজন:- পারিপার্শ্বিক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার নামই অভিযোজন। অভিযোজনের ফলে জীবের গঠনগত, কার্যগত ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। পরিবেশের সাথে মানিয়ে না চলতে পারলে সেই জীব অবলুপ্ত হয়ে যেতে পারে কালের নিয়মে। পরিবেশ ও প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে বংশানুক্রমিকভাবে অতি ধীরগতিতে জীবদেহে যে পরিবর্তনগুলো(জেনেটিক মিউটেশন) আসে তাকেই অভিব্যক্তি বলা হয়। কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে বলি:-


●আমরা অর্থাৎ আধুনিক মানুষ আগে কাঁচা মাংস খেতো, সেই কাঁচা মাংস পরিপাকের জন্য আমাদের বৃহদান্ত্রে "সিকাম" নামক অংশ ছিল, যা কালের নিয়মে আজ লুপ্তপ্রায় অঙ্গ "এপেন্ডিক্স" হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু, গিনিপিগ নামক প্রাণী যার সাথে মানুষের অন্তর্গঠনের প্রচুর মিল পাওয়া যায়, তাদের শরীরে এখনো সিকাম রয়ে গেছে, কেননা তারা কাঁচা মাংস খায়। আমরা নিজেদেরকে অভিযোজিত ও বিবর্তিত করেছি তাই সিকাম আজ মানবদেহে এপেন্ডিক্স।


●হাইরাকোথেরিয়াম অর্থাৎ ইওসিন যুগের ঘোড়ার থেকে কালের নিয়মে ইকুয়াস বা নব্য যুগের ঘোড়া অতি ধীরগতির বিবর্তিত হয়েছে। প্রাচীন ঘোড়া উচ্চতা ও শারীরিক দিক দিয়ে অনেক দুর্বল ছিল। তাই সহজেই তারা খাদকের হাতে মারা পড়তো অথবা খাদ্য গ্রহণের জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রমের দরকার তা করতে পারতো না। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে আসে বিবর্তন। উচ্চতা বেড়ে যায় ও দৈহিক আকার-ক্ষমতা বেড়ে যায়। তাই আড়াই ফুটের হাইরাকোথেরিয়াম আজ প্রায় দুই মিটারের ইকুয়াস।


●জিরাফের ছোট গলা থেকে লম্বা গলার উদ্ভব হয়েছে পারিপার্শ্বিক পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যগ্রহণের প্রয়োজনে।


●জলে সাঁতার কাটার সুবিধার্থে হাঁসের পায়ের আঙুলগুলো চামড়া দিয়ে জোড়া(লিপ্তপদ)।


●মরুভূমিতে যেহেতু জলের খুব অভাব, তাই বাষ্পমোচন আটকাতে ক্যাকটাসের পাতাগুলো কাঁটায় পরিণত হয়েছে।


●খেচর বা যারা আকাশে উড়তে পারে, তাদের সামনের পা ডানায় পরিণত হয়েছে।তাদের শরীরের ভেতরে বায়ুথলি থেকে ও হাড়গুলো ফাঁপা হয়। 


এরকম কত হাজার হাজার উদাহরণ আছে যা আমাদের শারীরিক পরিবর্তন ঘটায়। পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুভব ও অবলোকন করে আমরা নিজেদেরকে সেই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের রক্ষা করে চলেছি।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

# নাম- লোকশিক্ষা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

সান্ধ্যকালীন আলোচনা-বাসর। 
  # বিষয় - *লোকশিক্ষার ভিত্তি কিপ্রকারে নির্ধারিত হয়! এর ভিত্তিই বা কি!*
   # নাম- *লোকশিক্ষা।*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

         শিক্ষা একটি নিরন্তর প্রসেস। এই শিক্ষার দুটি ধারা - ব্যবহারিক শিক্ষা ও পুঁথিগত শিক্ষা। 
 ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে মানুষ আগুনের আবিষ্কার, চাকার আবিষ্কার দিয়ে সভ্যতার জয়যাত্রা শুরু হল। কথাকে লিখিত রূপ দিতে এল লিপিমালা। তা থেকে লিখিত পুঁথিগত শিক্ষা এল। কত কথাই মানুষ বলে। তারই  নির্বাচিত কথাকে লিখিত হিসাবে গন্য করে লিখে রাখার মাধ্যমে পুঁথিগত শিক্ষার প্রচলন হল। 
   ব্যবহারিক জীবনের শিক্ষায় লোকসাধারণ শিক্ষিত যারা তারাই আবার যত্নসহকারে পুঁথিপাঠ করে শুনে শিক্ষা লাভ করতে থাকলেন। বেদ শুনে শুনে মনে রাখতে হত বলে বেদের আরেক নাম শ্রুতি। যিনি বেদ শিক্ষা দেন তিনি গুরু,যে শেখে সে হল শিষ্য। শিক্ষার কার্যক্রম চলে গুরু শিষ্যের জ্ঞান চর্চা থেকে। আর অন্যধারে লোকসাধারণ তাঁদের ব্যবহারিক জীবন থেকে অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান যা লাভ করেন তাই আরেক ধরনের লোকশিক্ষা। বুদ্ধদেব  সমগ্র ভারতবর্ষকে যে বৌদ্ধধর্ম শিখিয়েছিলেন লোকসাধারণ কি সকলেই পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন? তা তো নয়। তাহলে তাঁরা বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জানলেন,বুঝলেন কী করে?  সেই কূটতত্ত্বময়,নির্বাণবাদী,অহিংসাত্মা,দুর্বোধ্য ধর্মাচারণকে অনুসরণ করলেন কী করে? লোকসাধারণ অনুসরণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন গার্হস্থ্য,পারিবারিক জীবনের কথা নিয়ে বুদ্ধ শিক্ষা দিয়েছিলেন বলে। তাই লোকশিক্ষা তথা লোকসাধারণের মত করে শিক্ষা দান বুদ্ধদেব করেছিলেন। সেখানে লোকসাধারণ বলতে গৃহস্থ,ব্রাহ্মণ,পন্ডিত, মূর্খ,বিষয়ী,উদাসীন,শূদ্র সকলেই ছিলেন। আমাদের ঘরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তো নিরক্ষর অথচ লোকশিক্ষাই ছিল তাঁর অবতারত্বের ভিত্তি।  
   বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয়কে নস্যাৎ করে হিন্দুত্বের পুনঃরুজ্জীবিত করেছিলেন শঙ্করাচার্য। গুরুগিরির পথে কত আপামর লোকসাধারণ তো তাঁর পথে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের কথায়- "যে লাঙ্গল চষে,যে তুলা পেঁজে,যে কুটনা কাটে,যে ভাত পায় না সেও শিখত। কি শিখত - আত্ম অন্বেষণ,পরের জন্য জীবন,পাপ-পুণ্য আছে, পাপের দন্ড আছে, পুণ্যের পুরস্কার আছে,যে জন্ম আপনার জন্য নহে,পরের জন্য, যে অহিংস পরমধর্ম্ম,যে লোকহিত পরম কার্য...." তাই তো লোকশিক্ষার অন্যতম পাথেয়। শ্রীচৈতন্য লোকশিক্ষা দিয়ে গেলেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের। আমাদের কবিয়াল সমাজ ইংরেজদের সময় পুঁথিগত ইংরেজী শিক্ষার সমান্তরাল লোকশিক্ষা দানে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। 
       এই কবিগানের উদ্ভব কিন্তু হঠাৎ করে হয়নি। কবিগানের সূচনা কাল আঠারো শতকের মধ্যভাগে,আর বিকাশ উনিশ শতকজুড়ে। প্রায় দু'শ' বছর আবির্ভাব ও বিকাশ নিয়ে কবিগান বাংলার শহর থেকে মফঃসল পর্যন্ত আকাশ বাতাস মুখরিত করেছিল, ইতিহাস তাই বলে।
 এই দু'শ বছরের আবির্ভাব ও বিকাশের মধ্যে কবিগান কিন্তু আটকে নেই। অনেক আগে থেকেই এর প্রস্তুতি ছিল। 
ধর্মীয় বাতাবরণ ও পুরাণ শাস্ত্রালোচনার আড়ালেই ছিল তার এই প্রস্তুতি। 
  সে চর্যাগীতির সময় থেকে। কেননা আদিরসেও চর্যাপদ সমান পুষ্ট। বৌদ্ধধর্মের বিষয় নিয়ে বাঙালির ধর্মপথগামীর আচরণগত শিক্ষায় জোর তদবিরের মাঝে সাধারণ মানুষ কামনা বাসনা,অবৈধ সম্পর্কের আবেদন তলে তলে বেশ ভালই পোষন করত। যেমন দিনের বেলা কাক দেখে, যে ঘরের বউ ভয় পেত সেই কিন্তু অন্ধকার নামলে পা টিপে টিপে পরপুরুষের বাড়ি যেত('... রাতি ভইলে কামরু জাঅ')। চুরি ছিনতাই থেকে সকল প্রকার কৌম জীবনের কথা পাই চর্যার সমাজ ও বাস্তব জীবনে।
এর পরে আসি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নাটগীতির কথায়। নাট্যকাব্যটি কবি একেবারে লোকায়ত করে পরিবেশন করেছেন। মূলে আদিরস। এই নাটগীতির শ্রোতা,দর্শক একেবারে সাধারণ শ্রেণীর মানুষ। কবি বড়ুর শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও কাব্যের ক্ষেত্রে আদিরস যত আলগা করেছেন সাধারণ মানুষ তত এই নাটগীতি উপভোগ করেছেন। কবির এই নাট্যকাব্যটির পরীক্ষা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে। ভালোই সাফল্য কবি পেয়েছিলেন। এই নাট্যকাব্যে আবার ভক্তিরসও কেউ পেতে চাইলে বঞ্চিত হতেন না। 
    তবে পদাবলী সাহিত্য প্রেম-ভক্তি-দিব্যভাব, রামায়ণের বাঙালিয়ানায় করুন ও ভক্তিগীতি বা মহাভারতের যুদ্ধ যুদ্ধ কাহিনীর মধ্যে বীরত্বের বাঙালিয়ানায় আকর্ষণ থাকলেও সাধারণ মানুষ খুঁজেছে তার দৈনন্দিতার সহজ সুরের গান। আর তারই রসদ লাভে মঙ্গলকাব্যগুলির দিকে ভালই ঝোঁক থাকত। ওখানে আদিরসের সরবরাহ করার সুযোগ সুবিধা কবিগণ সহজেই নিতেন। 
পৌরাণিক দেবদেবীর পাশে লৌকিক দেবদেবী নিয়ে মঙ্গলকাব্যের জনপ্রিয়তা সে বলার অপেক্ষা রাখে না। কেন চন্ডীমঙ্গল কাব্যের নায়ক ব্যাধ পুত্র কালকেতু ও নায়িকা ব্যাধ কন্যা ফুল্লরাকে করার মূলে লোকায়ত জীবনের কাছে কবি তাঁর কাব্যের জনপ্রিয়তা খুঁজেছিলেন। ব্যাধ কালকেতুকে অধিপতিও করলেন। আসলে লোকায়ত জীবন,লোকমুখের ভাষা সবসময় সাহিত্যের নতুন নতুন পথ রচনা করে এসেছে।
     আর রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র মঙ্গলকাব্যের লৌকিক ধারার ও আদিরসের শেষ কবি। তিনিও ছিলেন দ্ব্যর্থবোধক ভাব সৃষ্টির অসাধারণ প্রতিভাবান কবি। তাঁর এই ভাবধারা কবিগানে পরিপূর্ণ প্রভাব পড়ল। 
  সাধারণ মানুষ কাব্যের পালাগান শুনতে শুনতে কেউ কেউ পালা রচনায় পারদর্শিতা অর্জন করলেন। যত লঘু বিনোদন ততই তার দর,কারণ সাধারণ মানুষের কাব্য চর্চায় তারাও কম নন বলে স্বতঃপ্রমাণিত হলো। পান্ডিত্য অপেক্ষা লোকায়ত কথা তাদের মধ্যে প্রিয় আস্বাদন হয়ে উঠল। 
  সর্বোপরি সংস্কৃত, আরবি,ফারসি ভাষার প্রভাবকে পেছনে ফেলতে ইংরেজি ভাষা উঠে পড়ে লেগেছে। পাশ্চাত্য শিক্ষার ঢেউ লেগে গেছে। মাতৃভাষায় গদ্যচালও পুরোদমে হাজির, কিন্তু সাহেবি ইংরেজি তার উপর চড়াও - কলকাত্তাই ককনির বেশ ভালই দর। এই আবহের মাঝে এই পাঁচালী ও কবিগান চটুল আদিরসাত্মক হয়ে সাধারণ মানুষের মনের খোরাক জোগানোয় একদম সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠল। কবিগানে দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় ভক্তির কথা জানতে চাইলে পাওয়া যেত,আবার আদি রস উপভোগ করতে চাইলে বিমুখ হতে হত না। আর লোকসাধারণ মানুষের মধ্য থেকে যখন এক একজন কবিওয়ালা উঠে আসছেন, তাই নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজনার ঢেউ ছিল প্রবল। আগ্রহ তুঙ্গে। সেই ঢেউয়ের রেস এতো তীব্র ছিল যে দেড়শ' পেরিয়ে প্রায় দু'শ ছুঁয়ে গিয়েছিল,ঐ আরকি যেমন দৌড়বীর প্রান্ত ছুঁয়েও আরো কিছুটা দৌড়ে নিজেকে ঠিক করে নেন,এও ঠিক সেই রকম।
সুতরাং পাঁচালি,কবিগান - পাঁচালিকার ও কবিওয়ালা এক বিশেষ যুগচেতনার চাহিদা পূরণের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল। 
        ঊনবিংশ শতাব্দীর মাটি লোকোসাধারণের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাঁচালি ও কবিগানে ছিল এক অনন্য প্রস্তুতি। সেই হিসেবে এই লোকসংস্কৃতি আজ যতই লুপ্তপ্রায় বলি না কেন, এই ধারায় আমরা আমাদের ঐতিহ্যের স্বাদ বহন করে আত্মবিমোহিত হই।
     লোকশিক্ষা এক আর ইংরেজদের প্রবর্তিত প্রশাসনিক শিক্ষা পুঁথিপাঠ, সরকারী কাজের জন্য কতকগুলি পাশ লোকশিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। মাতৃভাষার সঙ্গে ইংরেজী ভাষা,বিজ্ঞান শিক্ষা জ্ঞানের সাম্রাজ্য চষে বেড়ানো। একজন এম এস সি (ম্যাথ.ও ফিজিক্স)পাশ বেকার যুবককে যদি আলুদোকান দিয়ে পেট চালাতে হয়,তাতে ক্যালকুলাস (ইন্ট্রিগাল ও ডিফারেনসিয়াল), আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব বা নিউটনের গতিসূত্রের জ্ঞান ডাস্টবিনে পড়ে থাকবে। সাধারণ যোগবিয়োগ ও লাভ লোকসানের হিসেব লোকশিক্ষা তার প্রধান সহায়ক হয় তখন। ব্যবহারিক শিক্ষা ও লোকশিক্ষা একাকার। যে লোকশিক্ষা -  লোকসাধারণের  ব্যবহারিক জীবনের যথাযথ মূল্যই হল লোকশিক্ষা। 
            *****
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

লোকশিক্ষা (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)

লোকশিক্ষা: জনসাধারণের শিক্ষা বা mass education হল একটি দেশের জনশিক্ষা বা লোকশিক্ষার জন্য সেই দেশের মানুষকে দেশ ও দশের মঙ্গলের চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করার শিক্ষা দেওয়া। 


বঙ্কিমচন্দ্রের মতে লোকশিক্ষার অন্যতম উপায় হল '


কথকতা'। 


সত্যিই একজন আদর্শ কথক তার জ্ঞান-বাচ্য-বাক্য-ভঙ্গিমা-ভক্তির মাধ্যমে যে আদর্শ লোকশিক্ষা দিতে পারেন, তা আর অন্য কিছুতে মেলে না। একজন ভালো বক্তা তার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে কর্ণ হতে মর্মে প্রবিষ্ট হতে পারে। সেই সুশিক্ষার আলোকে দূরীভূত হয় অজ্ঞানের অন্ধকার।  উদাহরণ:- শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও যে মানুষকে শিক্ষিত করা যায় তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ তিনি। তাঁর প্রতিটি কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝলে অবাক হয়ে যেতে হয়। যেমন- "টাকা মাটি, মাটি টাকা"- এই বাক্যটি যে যেমনভাবে নেবেন তাতেই তাঁর জ্ঞানলাভ হবে। এই বাক্যের মানে কারোর কাছে টাকা মাটির ন্যায়। অতি সস্তা। যেন কোনো মূল্যই নেই টাকার। আবার অনেকের কাছে এর মানে, মাটিতেই টাকা, সে তুমি ভূমি কর্ষণ করো বা জমি কিনে রাখো। 


আরেকটি বাক্য:- "পাঁকে থাকো পাঁকাল মাছ হয়ে"- এর অর্থ যত খারাপ কদর্য পারিপার্শ্বিক অবস্থা হোক না কেন, তোমার নৈতিক চরিত্রে যেন দাগ না লাগে।


আরেকটি বাক্য যেটা আমার মতে রামকৃষ্ণদেবের শ্রেষ্ঠ বাক্য:- "যত মত, তত পথ"- এর মানে কোনো কিছুর শেষে পৌঁছতে হলে ভিন্ন ভিন্ন মানুষ বেছে নেয় ভিন্ন ভিন্ন পথ। কেউ চালাকির দ্বারা, কেউ সাধনার দ্বারা, কেউবা অসৎ উপায়ে আবার কেউ কঠোর পরিশ্রমে। গন্তব্যস্থল একটাই। যেমন- কোনো একটা পরীক্ষায় ভালো ফলের আশায় কেউ কঠোর পরিশ্রম করে আবার কেউ ভালো নম্বর পেতে অসৎ পথে হাঁটে। শেষে হয়তো দুজনেই একই নম্বর পায়। কিন্তু, যেপথ সত্য ও সৎ, তাতে চলার আনন্দই আলাদা। যত মত, তত পথ। 


লোকশিক্ষা দেবার মত শিক্ষকের আজকালকার দুনিয়ায় বড় অভাব। অডিও-ভিজুয়াল লেকচারে বিভিন্ন ধর্মগুরুর(সৎ বা অসৎ) সৎসঙ্গ অনুষ্ঠান দেখে কতটা লোকশিক্ষা অর্জন করা যায় আমার জানা নেই। 


তবে আধুনিককালে মিডিয়া, অডিও ভিজুয়াল বই, রেডিও, টিভি, মোবাইল ও ইন্টারনেটের কল্যানে আমাদের অজান্তেই দেশের অনেক শিশু বা কিশোর(মুষ্টিমেয়) সুশিক্ষার পথে যেতে সক্ষম হয় উঠছে। আশা করা যায় আগামীতেও আসবে সোনার দিন।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

বিষয় : ফ্যাশন। লেখায় : ©শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 বিষয় : ফ্যাশন। 

লেখায় : ©শর্মিষ্ঠা ভট্ট



ঠাকুর বাড়ী, মানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ীর ফ্যাশন এখন বাঙলার স্টাইল। কেমন সেটা? আমাদের বাঙালী সমাজে আটপৌরে শাড়ী পরার রেয়াজ ছিল। অন্তর বাস ছাড়াই। বড়ো জোর বক্ষবন্ধনী বা চোলী ছিল। ঠাকুর বাড়ীর মহিলা প্রথম ব্লাউজ নিয়ে আসে। তার আগে পেটিকোট  বা সেমিজের ব্যাবহার তারা করতো। সেমিজ ব্লাউজ ও সায়ার মিলনে তৈরী। বলতে গেলে বাবু সমাজের সব থেকে উৎকৃষ্ট ফসল নতুন ফ্যাশানে মেতে ওঠা বাঙালী সমাজ। তখন ব্রাম্ভ সমাজের মেয়েরা যেহেতু স্বাধীন চেতা ছিলেন, তার ফলে পরিধানের মধ্যে নতুনত্ব ও আধুনিকতা নিয়ে এসেছিল বলতে গেলে তাই বাঙালী সমাজের  স্টাইল হয়ে গেছে। তখনকার মহিলা দের পামসু আজও সমান জনপ্রিয়। এবার সেই সময়ের ফ্যাশনের দিশা দেখানো এক মহিলার নাম বলি, বাঙলার ফ্যাশন জগতে আজও তার অবদান অনস্বীকার্য। 



রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের  মেজ বৌঠান ও সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী  জ্ঞানদানন্দিনী দেবী প্রথম আমাদের এখানে শুরু করেন 'বম্বে স্টাইল'-এ  শাড়ি পরা। স্বামীর সঙ্গে অনেকটা সময় তিনি বম্বেতে (বর্তমানে মুম্বই) কাটিয়েছিলেন। সেখানকার শাড়ি পরার স্টাইল এবং গুজরাটি,পার্সি মহিলাদের শাড়ি পরার ধরনে তিনি আকৃষ্ট হন। কুচি দিয়ে পরা শাড়ি এবং বাঁদিকে  আঁচল তিনিই  প্রথম ঠাকুর বাড়িতে আমদানি করেন। এই স্টাইল খুব তাড়াতাড়ি ঠাকুর বাড়ির মহিলা সহ  শিক্ষিত, উন্নত, রুচিশীল  ব্রাহ্মসমাজের  মহিলাদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পাশাপাশি সাধারণ বাঙালি সমাজের মধ্যেও এই ভাবে শাড়ি পরার প্রচলন শুরু হয়। এবং আজও সেই স্টাইলই  ‘ফ্যাশন ইন’। অন্য কোনও শাড়ি পরার ধরন আজও টেক্কা দিতে পারেনি রবীন্দ্রনাথের মেজ বৌঠানকে।


এমন ভাবে বললে টোপরের বাঙালী স্টাইল। যা গোটা দুনিয়ার কাছে বিশেষ মাত্রা পায়, সেই স্টাইল ,মানে তখনকার হাল পরিধান শিল্প কে পথ দেখিয়ে ছিলেন ভগবান শিব। যোগী শিব বিয়ে করতে যাবেন। কিন্তু ভারতীয় নিয়ম অনুযায়ী শিরস্ত্রাণ চাই। তিনি রেশমি কাপড়ের পাগড়ীর বদলে হল্কা কাঠের মাথার ঢাকা পরতে চাইলেন। বিশ্বকর্মার মাথায় হাত। লোহা লক্করের কাজ করে, এই হল্কা কাজ কেমন করে হবে। অগত্যা মালাকর নামে এক ব্যক্তি জলজ হালকা শর জাতীয় গাছের মধ্যের নরম অংশ দিয়ে গড়ে দিলেন মুকুটের মতো হাল্কা শিরস্ত্রাণ। ওদিকে পার্বতী ও সাদা কিছু পবিত্র মুকুট পরতে চাইলেন। শুরু হল নতুন স্টাইল টোপর আর মুকুট। ভারতের বিভিন্ন যায়গায় বিবাহের সময় এমন কিউ মাথা ঢাকা ব্যবহার হয় সংস্কৃতি হিসেবে। ঠিক তেমনি বাঙলায় ও। কিন্তু কেউ ভাবে না এটি শিব পার্বতী র স্টাইলের ফলে সৃষ্ট একটা চলমান পোশাকের ধারা। 


এমনভাবে জীবনের স্টাইল কোন বিশেষ মুহুর্তে বিশেষ রূপ নেয়। বহুচর্চিত হতে হতে তাই সংস্কৃতি বা স্টাইল অফ ইন্ডিয়া / বেঙ্গল হয়ে যায়। 


শুধু পোশাক নয় নানা বিষয়ে নতুনভাবে কিছু ট্রেন্ড আসে। যেমন এই মুহূর্তে ফ্যাশন বাঙালী সমাজে ঝোলা ব্যাগ কোলাপুরি চপ্পল হাতে সিগারেটের বদলে স্যাক ব্যাগ স্পোর্টস শু । হাতে.... না থাক ওটা নাই বা বললাম। তবে আগের নেশার ফ্যাশন ও এখান পাল্টে ছে । আসলে জীবন বিবর্তন মেনে এসেছে ফ্যাশন । তাই.  .হেতা হুয়া নদী মে হাত ধোলো । (বয়া জলে হাত ধুয়ে নেওয়া) ধন্যবাদ🙏💕

ফ্যাশন (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)


আক্ষরিক অর্থে ফ্যাশনের বাংলা হল হালফিলের রীতি- রেওয়াজ, প্রচলিত ধারা, আদবকায়দা, সাজপোশাকীয় কেতা ইত্যাদি। ফ্যাশন যেমন প্রয়োজন তেমনই অতিরিক্ত ফ্যাশনের কারণে অনেক প্রাণ হারিয়ে যায় অন্ধকার পথের বাঁকে।

************************



অভিষেক ফার্স্ট ইয়ার কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্টুডেন্ট। প্রচুর টাকা খরচ করে ম্যানেজমেন্ট কোটায় ভর্তি হয়েছে কলকাতার টপ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। ধনী বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ার দরুণ প্রাচুর্যের মধ্যে মানুষ। কেতার লালিত্য ঝরে পড়ছে অভিষেকের শরীরে, ওর ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিসে। ওকে দেখে ক্লাসের অনেক ছেলেই ঈর্ষান্বিত। অনেকেই ওর সাথে বন্ধুত্ব করে ওর মতো হতে চায়। 


মেধার ভিত্তিতে চান্স পাওয়া অনীক অভিষেককে একটুও পছন্দ করেনা। ছেলেমেয়েরা ওকে নিয়ে অকারণ হ্যাংলামি করলে অনীকের গা জ্বলে। এভাবেই কেটে যায় দিনগুলো। 


অনীকের পছন্দ সায়নীকে। কি অপূর্ব রূপ মেয়েটার। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সায়নীর মুখটা ভেসে ওঠে অনীকের সাদা খাতার পাতায়। কিন্তু, ও যে অভিষেকের থেকে চোখ ঘোরাতেই নারাজ। অনীকের দিকে ও তো একটিবারের জন্যও ফিরে তাকায় না। অভিষেকে নিমজ্জিত হয়ে আছে। অনীক ঠিক করলো সাহস করে ওকে নিজের মনের কথাটা বলবে। টিফিন ব্রেকে সায়নী যখন ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছে, অনীক ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সায়নী অবাক হয়ে বললো, "কি ব্যাপার? কিছু বলবি?"


অনীক: রাখ ঢাক করে কথা আমার আসেনা, তাই সরাসরি বলছি শোন, আমি তোকে পছন্দ করি, ভালোবেসে ফেলেছি তোকে। 


সায়নী: হোয়াট! হ্যাভ ইউ গন ক্রেজি? নিজের দিকে একবার আয়নায় দেখ। তেলতেলে চুল, ঝোলা ব্যাগ, না আছে গ্ল্যামার, না আছে ফ্যাশনের সেন্স। তুই আর আমি! জাস্ট গো টু হেল, আদারওয়াইজ তোর নামে কমপ্লেন করবো প্রিন্সিপালের কাছে।

কথাগুলো বলে গটগট করে চলে গেল সায়নী।


অনীকের সোজা মনে গিয়ে ধাক্কা মারলো ওর কথাগুলো। সত্যিই তো, বাকি ছেলেদের তুলনায় কি বেমানান ও এই কলেজে, কি বিশ্রী ড্রেসিং সেন্স ওর, ফ্যাশনের বিন্দুবিসর্গ ওর জানা নেই। এই নিয়ে কোনো মেয়ে দেখবে ওর দিকে ফিরে! পড়াশুনো জলাঞ্জলি দিয়ে শুরু হল অনীকের কেতচর্চা। 


জিম, ডায়েট থেকে শুরু করে চুলের তেল বদলে এলো হেয়ার জেল, ফর্মাল প্যান্টের জায়গা নিলো হাল ফ্যাশনের কার্গো, জিন্স। ফর্মাল শার্টের জায়গায় গায়ে উঠলো স্কিন ফিট টি-শার্ট, ট্রান্সপারেন্ট পার্টিওয়্যার শার্ট। 


ছাপোষা বাবা-মায়ের পক্ষে নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। নিত্যদিন শুরু হল অশান্তি। শেষে অনীকের বাবা সাফ জানিয়ে দিলেন যে, পড়াশুনোর খরচ চালিয়ে তার ওপরে এসব এক্সট্রা খরচ করা ওনার পক্ষে অসম্ভব। রেগে উঠলো অনীক। সমাজের চোখে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য চাই টাকা। অনেক টাকা। 


একদিন বিকেলে হতাশ হয়ে বসে আছে কলেজের পাশের ফাঁকা মাঠটায়। একটা বেশ হ্যান্ডসাম চেহারার ছেলে ওর পাশে এসে বসলো, "কি ব্রাদার, আপসেট মনে হচ্ছে।"


অনীক: তোমাকে ঠিক চিনলাম না ভাই!


ছেলেটা: কি প্রবলেম তোমার!  গার্লফ্রেন্ড ছেড়ে গেছে নাকি বাড়িতে অশান্তি! নাকি অন্য কিছু!


অনীক চাইছিল কারোর সাথে নিজের মনের ভাবগুলো শেয়ার করতে। অনেকসময় আমরা চেনা মানুষের থেকে অচেনা মানুষের কাছে মন খুলে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ছেলেটা জিজ্ঞাসা করাতে অনীক সমস্ত কথা ওকে খুলে বললো। 


সব শুনে ছেলেটা বললো, "বেসিকালি টাকার প্রবলেম তাইতো! ডোন্ট ওয়ারি। আমাকে যদি বিশ্বাস করতে পারো তবে, আমার সাথে চলো একটা জায়গায়। টাকার প্রবলেম আর থাকবে না।"


অনীকের তখন খড়কুটো আঁকড়ে ধরার অবস্থা। ছেলেটা ওকে নিয়ে গেল একটা বার কাম হোটেলে। সেখানে ওর চেনা একজন মহিলার সাথে ফিসফিস করে কিছু বললো। মধ্যবয়স্ক সেই মহিলা আপাদমস্তক দেখলো অনীকের দিকে। তারপরে "ডান" বলে চলে গেল।


ছেলেটা: একটা পার্সোনাল কোয়েশ্চেন করছি, তুমি কখনো কারোর সাথে দৈহিকভাবে মিলিত হয়েছ?


অনীক: না, কোনোদিন না।


ছেলেটা: আজকে হবে প্রথমবার, আর মজার কথা হল তার জন্য পাবে নগদ পাঁচ হাজার টাকা। শুধু আজকেই নয়, যতবার কাজ করবে, ততবার পাবে। এটাকে নিজের পার্ট টাইম প্রফেশনে হিসেবে বেছে নাও। জীবনে টাকার অভাবে ভুগতে হবে না।


অনীক চমকে উঠল। কাজটা করতে ওর মন ওকে সায় না দিলেও টাকার অঙ্কটা শুনে কচি বয়সে লোভে পড়ে গেল ও।


অর্থের লোভের কাছে পরাজয় স্বীকার করলো মেধাবী অনীক। নিজেকে বিলিয়ে দিতে রইলো দিনের পর দিন এক বিছানা থেকে আরেক বিছানায়। গ্ল্যামার, ফিজিক, লুক সব পারফেক্ট এখন অনীকের। শুধু পারফেক্ট রইলনা যা ছিল ওর অমূল্য সম্পদ, ওর চরিত্র।


কত তারা হারিয়ে যায় কৃত্রিম রোশনাইয়ের মাঝে,

কত কলি ঝরে যায় বিলাসিতার সাজে,

কত তারা নিভে যায় অত্যাকর্ষণ তরে,

ফ্যাশনের দুনিয়ায় সকল নক্ষত্রই ঝরে পড়ে।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১

ফোনে আড়িপাতা (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)




ফোনে আড়িপাতা বা ফোন ট্যাপ করার পেছনে বর্তমানে কাজ করছে একাধিক দুষ্ট চক্র । তারা আমাদের ফোন ট্যাপ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করে স্বার্বস্বান্ত করে ছাড়ছে বহু মানুষকে ।

কিভাবে বুঝবো আমার ফোন ট্যাপ করা হয়েছে কিনা?
- সবসময় বোঝা না গেলেও অনেকক্ষেত্রে বোঝা যায় । যেমন - 
● যদি ফোনের ব্যাটারি খুব দ্রুত ডিসচার্জ হয় অথচ তা সম্পূর্ণ নতুন এবং পূর্ণমাত্রায় কর্মক্ষম ।
●যদি কলিংএর সময় ওপাশ থেকে কোনো সন্দেহজনক শব্দ শোনা যায় । 
●যদি ফোনে এমন কোনো ফাইল থাকে যা বারংবার ডিলিট করা স্বত্তেও আবার ফিরে আসছে ।
●যদি এপ্স গুলো নিজে থেকেই অকারণ খুলে বা বন্ধ হয়ে যায় । 
●যদি কলিং এর সময় ছাড়াও ফোনে অকারণ বিপ বা ক্লিকের আওয়াজ আসে ।
●যদি ফোন অকারণে খুব গরম হয়ে থাকে ।
●অকারণ যদি ফোনের ডেটা ব্যালেন্স দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে ।
●অজানা ভাষা বা সাইন ল্যাংগুয়েজে মেসেজ আসতে থাকে ফোনে। 

দেশের সুরক্ষায় গভর্নমেন্ট থেকে যাদের ফোনে আড়িপাতা হয় তা অবশ্যই সরকার মনে করেন বলে সেই ব্যবস্থা করেন । এতে অনেক সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে দেশকে বাঁচানো সম্ভব হয় । কিন্তু, যারা হ্যাকার, তারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ফোনে আড়ি পেতে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নথি গুলোর অপব্যবহার করে আমাদের সমূহ বিপদ ডেকে আনতে পারে ।

ফোনে কি কি করা উচিত নয়:-
●মেসেজে আসা কোনো লিঙ্ক ক্লিক করা উচিত নয় । 
●হোয়াটস এপ বা ফেসবুকে অযাচিত লোকেদের থেকে আসা মেসেজ রিকোয়েস্ট দেখলে প্রথমেই তাকে ব্লক করা উচিত ।
●কোনো এপ ইন্সটল করার সময় যদি ফটো, মিডিয়া, কলিং, ক্যামেরা, মাইক্রোফোনের একসেস চায় তবে খুব ভরসাযোগ্য এপ ছাড়া এগুলোর একসেস দেওয়া কখনোই উচিত নয় ।
●ব্যাংক বা আঁধার কার্ড এর সাথে লিঙ্ক করা ফোন নম্বর শুধুই নিজের জন্য থাক, এই নম্বর কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দেওয়া উচিত নয় ।
●কোনো অচেনা ব্যক্তি বিপদে পড়ে রিকোয়েস্ট করছে, "একটা ফোন করতে দেবেন প্লিজ?"- এতে গলে যাওয়া সমীচীন নয় । হতে পারে সেই ব্যক্তি সত্যিই বিপদে পড়েছেন । কিন্তু, তা যদি না হয়ে থাকে, তবে ফোন তার হাতে দিলে সমূহ বিপদ ।
●আমাদের দেশের আই.এস.ডি কোডের বাইরে অন্য দেশের কোড থেকে ফোন এলে ধরা থেকে বিরত থাকা ও সেই নম্বরকে ব্লক করা দরকার ।
●কোনো অচেনা নম্বর থেকে রং কল এলে কলটা দ্রুত কেটে দিয়ে নম্বরটা ব্ল্যাকলিস্ট করা দরকার ।
●কোনো কোনো সময় মোবাইলে লিঙ্ক আসে, "অমুক জায়গা থেকে এই প্রাইজ জিতেছেন, উপহার পেতে এই নম্বরে মেসেজ/ফোন করে আপনার ডিটেইলস দিন"- নৈব নৈব চ । সোজা ব্লক এন্ড রিপোর্ট করে দিতে হবে ।

এত কিছু সাবধানতা অবলম্বন করেও হাজার হাজার লোক লুণ্ঠিত হচ্ছে প্রতিদিন। কিভাবে তাদের কষ্টার্জিত সম্পদ যে চলে যাচ্ছে হ্যাকারদের হাতে তা কেউ বলতে পারেনা । তবুও আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে যাতে আমাদের অবস্থা ওই মানুষগুলোর মতো না হয় । হ্যাকাররা প্রচুর হয়তো উপার্জন করছে, কিন্তু উৎপাতের মাল সবসময় চিৎপাতেই যায় । কাউকে ঠকিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করা এই মানুষরূপী জানোয়ার গুলোর নরকদর্শন অবশ্যম্ভাবী ।
Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

#নাম- অপেক্ষা। ✍ - চন্দনা লাহা নাগ।

*নদী*:    কি চাও বলো আমার কাছে?

*রবি*:    কিছু চাইনি তো আমি।

*নদী*:    তবে অমন সকাল-বিকেল আমায় ছুঁয়ে ডাক দিয়ে যাও কেন?

*রবি*:   ভালো লাগে।

*নদী*:   শুধু ভাল লাগা? আর কিছু নয়?

*রবি*:   ভালোবাসি।

*নদী*:   ভালোবাসো?

*রবি*: কেন তুমি বাসো না আমায়?

*নদী*: ভেবে দেখিনি তো

*রবি*:      সত্যিই কি তাই? কোন পুরুষ যখন প্রতিদিন কোন নারীর সঙ্গে দু'দণ্ড বসে গল্প করে তাকে আরো কাছে পেতে চায় তখন কি তা সত্যিই ভাবনার বাইরের জিনিস?

*নদী*:  আমিও একবার পুরুষ হয়ে তোমাকে নারী রূপে দেখতে চাই।

*রবি*:  না ও কথা আর কখনো বলোনা।

*নদী*:   কেন রবি?

*রবি*:    নারী যখন পুরুষ হয়ে ওঠে তখন তার মধ্যে মায়া মমতা কিছু থেকে গেলেও চোখের ভাষা বদলে যায়।

*নদী*:  ভারী অদ্ভুত ভাবনা তো তোমার। শুনলে হাসি পায়।

*রবি*: হাসি পায়।  তা পাক। তবুও তুমি পুরুষ হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করবে না কখনো। তুমি চাইলে ক্ষণিকের জন্য বীরাঙ্গণা হও। তবুও পুরুষ হতে চেওনা। আমি দেখতে চাই না ওই বেশে তোমায়।

*নদী*:   কেন রবি! এত ভয় কেন?

*রবি*:     কারণ আমি তোমার শান্ত কোমল স্নেহময়ী রুপের কাছে আমার সকল সুখ খুজে পাই, তোমার নরম কোলে আমার শান্তি, তোমার নিষ্পলক চোখের গভীরে আমার ভালোবাসা খুঁজে পাই।

*নদী*:    আমিও তো তোমার বীরপুরুষের মতো তেজো দীপ্তিতে মোহিত হই। 

*রবি*:  সত্যি বল দাবদাহের গ্রীষ্মে আমার প্রখরতা তোমার ভালো লাগে? নাকি শীতের সকালে যখন হালকা মেজাজে থাকি তখন ভালো লাগে!

*নদী*:   যাও তোমার সাথে কথায় পারবো না।

*রবি*: মৃদু হাসি।

*নদী*:   তবে আমি কিন্তু দেখেছি ওই মানুষের মধ্যে মোটা চেহারার পিতৃ মাতৃহীন জীবনসংগ্রামের তাগিদে নারীটিকে ধীরে ধীরে কাজকর্মে পুরুষ হয়ে উঠতে।

*রবি*:   তুমি ওকে ঘর বাঁধতে দেখেছো?

*নদী*:   না তো। তবে ওর মধ্যে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলাম একবার। কিন্তু কেউ ওকে সাহায্য করেনি। সমাজ ওকে মরদ আখ্যা দিয়েছে। কোন পুরুষ কাছে এসে ওর মনে নারীত্বকে জাগিয়ে তুলতে চাইনি।

*রবি*:  তবে যে!

*নদী*:   তবে কি? সব নারী পুরুষের মত কাজ করলে কি পুরুষ হয়ে যায়?

*রবি*:    না তা হয় না। তবে বহু সংসারী মানবী নারীকে সময় আর পরিস্থিতি পুরুষ করে তোলে। তখন সে হারিয়ে ফেলে তার নিজস্ব সত্তা। তাই আমারও ভয় হয়।

*নদী*:   হ্যাঁ তা ঠিক। আমিও দেখেছি এমন।

*রবি*:   ছাড় ওসব। দেখো সবুজ বনানী দূরের ঐ সারস এর দল কেমন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এবার আমার বিদায়ের পালা। আবার কাল এসে শীতের চাদরের মতো জড়িয়ে ধরব আরেকবার। ততক্ষণ বিদায়।

*নদী*:   বেশ তবে যাও হে রবি। তোমার আমার  না দেখার সময় টুকুর নাম দিই ক্ষনিকের নির্বাসন।

*রবি*:  না নির্বাসন নয়। বল অপেক্ষা!
                 ********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর চন্দনা লাহা নাগ।

সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

মায়ের শোভা (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)

 


যেথা বাউলের একতারাটা

তোলে মেঠো সুর, 

সবুজে সবুজে ভরা মাঠ,

চোখ যায় যতদূর ।


যেথা রাঙা মাটির পথের পরে,

আনন্দবারিধারা ঝরে,

মনকেমনের মিষ্টি হাওয়ায়,

করুণ সুরের ছন্দ জাগায় ।


যেথা বর্ষণের মাতাল হাওয়ায়,

সোঁদা মাটির ঘ্রাণ,

সিক্ত মাটির পথে পথে,

ভরায় মন প্রাণ ।


যেথা শস্য শ্যামলা ধরণী,

আকাশ নির্মল,

যেথা শাখে শাখে মিষ্টি সুরে,

ডাকে পাখির দল ।


গ্রামবাংলার ছায়াভরা, 

শান্ত নদীর কুল,

গাছে গাছে দোলে সেথা,

হরেক রকম ফুল ।


যেথা সতেজ, সজীব, লাবণ্যময়,

প্রকৃতির রূপের ছটা,

কাটাতে চাই আমিও সেথা,

নির্মল দিন কটা ।

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

# নাম- পঞ্চসতী। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর। 
 # বিষয় - আধ্যাত্মিক।
   # নাম- পঞ্চ সতীনারী।
   ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

          শাস্ত্র বলে নারীর গতির প্রথম স্বামী,দ্বিতীয় পুত্র,তৃতীয় আত্মীয়।
   বিশেষ করে পতির অনুগতা হবে স্ত্রী -
  "আত্তার্ত্তে মোদিতা হৃষ্টে প্রোষিতে মলিনা কৃশা।/ ত চ ম্রিয়তে পতৌ সা স্ত্রী জ্ঞেয়া পতিব্রতা।।" - যে নারী স্বামীর দুঃখে দুঃখিত,স্বামীর সুখে সুখিনী ...সেই নারী সতী। 
   সতীনারী হতে হলে জ্ঞানোদয়ের পর হতে সতীর আদর্শ হবে শিবপূজা করা। শিবপূজো থেকেই সতীনারী হওয়ার জ্ঞান লাভ হয়।
  সতীত্বের মাপকাঠি কন্যার রূপ। নারীর সঙ্কোচ,শঙ্কা,অঙ্গ সৌষ্ঠব,চলনভঙ্গী,বচনচাতুর্য প্রভৃতি নারীর সতীত্বের গুণাবলী।
   স্বামী ভিন্ন অন্য কাউকে মনে স্থান দেওয়া চলবে না। স্বামী ভিন্ন অন্য সকল পুরুষকে সন্তানতুল্য ভাববে। পরপরুষকে সন্তানতুল্য ভাবলে পরপুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক তথা পরপুরুষ সম্পর্কে কোনও কাম চিন্তা আসবে না। 
  আর সতীত্বের শেষ পাঠ তথা চরম গতি সহমরণ। সুস্থ দেহে প্রফুল্ল অন্তঃকরণে বধূবেশে সুসজ্জিতা হয়ে হাসতে হাসতে জলন্ত চিতায় নিবেদন করলে হয় সতী। এই সূত্রে মাদ্রী তো সতীনারী হবেন,পান্ডুর সঙ্গে সহমরণে গেলেন বলে। কিন্তু সেখানে কুন্তী পুত্র অনুগামহ হবেন বলে হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। কুন্তি হলেন সতী নারী। চরিত্র বিচারে পঞ্চ কন্যায় স্থান নেই মাদ্রীর।
  এই দৃষ্টিকোন থেকে শ্রেষ্ঠ সতীনারীর তালিকায় আছেন- সতী,সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী, অরুন্ধতী,তারা,অহল্যা, মন্দোদরী, কুন্তী,দ্রৌপদী। বেহুলা কী নন। আমি বলব অবশ্যই প্রথম সারিতে।
     সতীত্বের পূর্ণ প্রতিমূর্তি সতী। ব্রহ্মার মানসপুত্র প্রজাপতি দক্ষের কনিষ্ঠা কন্যা। শৈশব থেকে কঠোর তপশ্চর্যার দ্বারা শিবকে পতিরূপে পান। শিবকে পেতে প্রথমে মদনের সাহায্যে রূপজ মোহে শিবকে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শিব সতীকে প্রত্যাখ্যান করেন। আর মদনকে ভস্মীভূত করেন। তারপর সতী দীর্ঘ তপশ্চর্যা,ত্যাগ, তিতিক্ষা,দুঃখ কষ্ট ভোগ করে মহাদেবকে পান। আর সেই মহাদেব ভিখিরি,শ্মশানে মশানে থাকেন বলে,পিতার কাছে পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহত্যাগ করেন। ত্যাগের পূর্ণপ্রতিভূ সতী। পরম কল্যাণময়ী। সংসারে যত কুমারী কন্যা সতীর আদর্শে নিজেদের তৈরী করে,শিবের মত বর পেতে। 
    দ্বিতীয় নারী সাবিত্রী। দেবতার বরে জন্ম। পিতা অশ্বপতি। মদ্রদেশের রাজা। ক্রমে সাবিত্রী রূপবতী হয়ে ওঠেন। সঙ্গে অপরিসীম গুণবতী। কিন্তু বিবাহের পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না। তখন নিজেই পাত্রের সন্ধানে বেরিয়ে তপোবনবাসী সত্যবানকে পতি হিসেবে মনে মনে বরণ করেন। এই কথা নারদের জানতে পারেন সত্যবান স্বল্পায়ু। তখন অশ্বপতি মেয়েকে সিদ্ধান্ত বদলের কথা বললেন। অন্য পাত্র মনোনীত করতে বললেন। কিন্তু সাবিত্রী সত্যবানকে মনে মনে পতি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তাই  সিদ্ধান্ত বদলের কোনও কথাই আসে না।
  সত্যবানকে পতি হিসেবে বরণ করলেন সাবিত্রী। যথা নিয়মে সত্যবানের মৃত্যু হল। স্বয়ং যমরাজ হাজির। স্বামীর মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে আছেন সাবিত্রী। যমদূতেরা সাবিত্রীর সতীত্বের তেজে সাবিত্রীর কাছে পৌঁছতে পারছে না। তখন স্বয়ং যমরাজ এসে সাবিত্রীকে বললেন- "স্বামীকে ত্যাগ করে তুমি নিজ গৃহে গমন কর। মর্ত্যবাসী সকল জীবের অদৃষ্টে মৃত্যু ঘটে থাকে,তুমি আশা করি এজন্য দুঃখ করবে না।" এই শুনে সাবিত্রী স্বামীর মৃতদেহ ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে গেলেন। তখন যমরাজ সত্যবানের আত্মা নিয়ে চললেন। সাবিত্রীও চললেন যমরাজের পিছুপিছু। আর সাবিত্রীকে আসতে দেখে যমরাজ আবার বোঝাতে উদ্যত হলেন,তখন সাবিত্রী বলতে লাগলেন- "পিতঃ,আপনি বললেন 'মৃত্যুই বিধির বিধান',আবার সেই বিধানেই সতীর আত্মা পতির আত্মার সঙ্গে চির অবিচ্ছিন্ন। সুতরাং নারী স্বামীর অনুসরণ করতে বাধ্য। আপনি আমাকে কেন নিবারণ করছেন।" এই কথা শুনে বললেন- "আমি তোমার ধর্মজ্ঞাণ দেখে অত্যন্ত খুশি। স্বামীর প্রাণ ব্যতীত অন্য কোন বর চাও বল,তা দিতে পারি।" সেই মত  সাবিত্রী অন্ধ শ্বশুরের দৃষ্টি,শ্বশুরমশায়ের হৃতরাজ্য ফিরিয়ে দিতে বললেন,বললেন পিতা পুত্রের জন্মদাতা হউক। তাও পূরণ হল। তবু সাবিত্রী নাছোড়বান্দা। যমরাজ আবার বারণ করলেন সাবিত্রীকে। সাবিত্রী তখন বললেন "আমার আত্মা তো স্বামীর সঙ্গে বাঁধা। শুধুই দেহ যাচ্ছে। আপনার তাতে কি অসুবিধা।" সাবিত্রীর এই ধর্ম জ্ঞানের কাছে হার মেনে বললেন- "স্বামীর প্রাণ ছাড়া আর কি আছে চাও।" তখন সাবিত্রী চাইলেন সত্যবানের পুত্র হলে রাজা হবে। যমরাজ বললেন- "তথাস্ত।" সাবিত্রী চললেন যমরাজের পিছু পিছু। যমরাজ আবার বিরক্ত হয়ে বললেন "যা চাইলে সবই তো দিলাম। আবার পিছু নিচ্ছ কেন?" তখন সাবিত্রী বললেন "সত্যবান যদি মৃত হন, তাহলে তাঁর পুত্রের জন্ম ও রাজা হওয়া কেমন করে হবে?" যমরাজ নিজের ফাঁদে নিজেই আটকে গিয়ে মহা ফাঁপরে পড়লেন। সাবিত্রীকে সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। এই হলেন সতী নারী। পতি,পুত্র ও আত্মীয় অন্ত প্রাণের গতি নিয়ে অন্যতমা পবিত্র সতী নারী। 
  অরুন্ধতী আরেক সতী নারীর অন্যতমা। বশিষ্ঠ-পত্নী। যজ্ঞাগ্নি থেকে জন্ম। ব্রহ্মার মানসকন্যা সন্ধ্যার মর্ত্যে অরুন্ধতী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 
  যৌবনে অপরূপা,বিদ্যাবুদ্ধিতে অতুলনীয়া কন্যাকে দেখে মুগ্ধ বশিষ্ঠ। বিবাহ সম্পন্ন হয়। যথাসময়ে শত পুত্রের জননী হন। পুত্র পালনকালে কোনোদিন স্বামী সেবা ভুলে যাননি। পুত্রদের শিক্ষা দানে ব্রতী ছিলেন। স্বামী সেবা,পুত্র দের দেখভালে সতীনারীর শ্রেষ্ঠত্বে আসীন ছিলেন। একসময় বিশ্বামিত্রের সঙ্গে শত্রুতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বশিষ্ঠ। বিশ্বামিত্রকে ব্রহ্মশাপ দিতে উদ্যত হলে,অরুন্ধতী স্বামীকে মহাক্রোধের মহাপাপ থেকে নিরস্ত করেন। বশিষ্ঠদেব অরুন্ধতীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে কোনোদিন পাপে লিপ্ত হননি। অরুন্ধতী স্বামীকে পাপ থেকে সদা বিরত রাখতেন।
   আর দময়ন্তীও অপরূপ সুন্দরী। নলকে স্বামী হিসেবে পাওয়া ও স্বামী অন্ত প্রাণের জন্য তিনিও সতীনারী।
   সীতা আর্য কন্যা।  সীতার শিক্ষাগুরু যাজ্ঞবল্ক্য। গার্গীও গৃহশিক্ষিকা ছিলেন। ত্যাগের পূর্ণমহিমাণ্বিতা। উপনিষদ স্রষ্টা যাজ্ঞবল্ক্য সীতাকে যথার্থ ত্যাগের মহিমার শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। স্বামী অন্ত প্রাণ,বনবাস জীবন, তপোবন জীবন তাঁর চিত্তের শুদ্ধতা প্রমাণে বাল্মীকি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। রামায়ণ রামগাথা হলেও সীতাসর্বস্ব মহাকাব্য। সীতার জীবনভোর স্বামী অন্ত প্রাণের জন্য অন্যতমা সতীনারী। রূপে গুণে অনন্যা। 
    এই ধারায় বেহূলাও অন্যতমা।সাবিত্রীর মতো স্বামীর প্রাণ ফেরানো,দেউলিয়া শ্বশুরমশা চাঁদসওদাগরের সব কিছু ফিরিয়ে আনা,রূপে গুণে মহীয়সী হওয়া সত্ত্বেও সতী নারীর তালিকা থেকে কেন বাদ গেলেন বোঝা গেল না।
   অন্য মতে তারা,অহল্যা, মন্দোদরী, কুন্তী,দ্রৌপদী পঞ্চনারী পঞ্চসতী। রামায়ণ, মহাভারত ও মনুসংহিতার মতে। এই নারীরা পতি অনুগতা থেকেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রাধান্য সকলেই কোনও না কোনোভাবে নানা ঘটনার স্বীকার- স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে অনেক সংঘাত,অপ্রিয় ঘটনাবলী সাক্ষ্য হতে হয়েছে। তাই সতীত্বের আদর্শনিষ্ঠ বলতে সতী,সীতা,সাবিত্রী,দময়ন্তী,অরুন্ধতী (বেহুলা)  স্বামী অন্ত প্রাণের বিনিময়ে স্বামীরাও স্ত্রীর প্রতি কোনরূপ অবমাননা আচরণ করেননি। সেখানে অহল্যা,তারা,মন্দোদরী,কুন্তী,দ্রৌপদী - এই পঞ্চনারীর জীবন ছিল বড়ই সংঘাত মুখর। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দাবীতে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল এঁদের।
  শাস্ত্র নির্দিষ্ট  সতীত্বের শর্তাবলী অনুযায়ী পঞ্চসতী নিয়ে মতান্তরের দুটি ধারা -
  এক ধারায় - সতী,সীতা,সাবিত্রী,দময়ন্তী ও অরুন্ধতী। অন্য ধারায় - অহল্যা,তারা,মন্দোদরী,কুন্তী ও দ্রৌপদী।
   এই দুটি ধারার মতে অবশ্যই স্বকীয়তা স্বীকার্য।
            *******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

রবিবার, ২৫ জুলাই, ২০২১

সেই মেয়েটা (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)


স্কুল ছুটির ঘন্টা পড়তেই ভয়ে কুঁকড়ে যায় স্কুলের বেশ কিছু মেয়ে। স্যার যে ওদেরকে খুব বেশী ভালোবাসে, এত ভালোবাসা সহ্য করতে পারেনা ওরা। এক্সট্রা ক্লাসের নাম করে স্কুলে আটকে রেখে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে এমন ভালোবাসার জন্য বেশ কিছু মেয়েকে বেছে নিয়েছে অঙ্কের কড়া টিচার। কেউ সোমবার, কেউ মঙ্গল, কেউবা বুধ...


যেদিন স্কুলে ক্লাস এইটে এডমিশন নিলো আর্য্যা, ওর টলটলে মুখটা সেদিন স্যার লক্ষ্য করতেই ওনার ভালোবাসার একজন বেড়ে গেল গুনতিতে। আর্য্যাকে যেদিন প্রথম এক্সট্রা ক্লাস দেওয়া হয়, ও প্রথমে আন্দাজ করতে পারেনি। কিন্তু, বাথরুম যেতে বলাতেই বুদ্ধিদীপ্ত আর্য্যার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। ও নিজেকে প্রস্তুত করে রাখে।


বাথরুমে অশ্লীলতা শুরু হতেই ও আঙুলের ফাঁকে রাখা পেন্সিল শার্প করার জন্য কেনা নতুন ব্লেডটা নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে চালিয়ে দেয় বিকৃতকামী স্যারের উত্থিত পুরুষাঙ্গ লক্ষ্য করে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে শুয়ে পড়ে স্যার। বাথরুমের সাদা টাইলস ভেসে যায় রক্তে। মরার আগে মানুষরূপী দানবের কানে বাজে আর্য্যার বলা শেষ কথাগুলো, "কৈ মাছের জান মেয়েদের, তাদের ফেল করার ভয় দেখিয়ে, বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের সাথে পাশবিক অত্যাচার করলেও তারা মুখ বন্ধ রাখে। কিন্তু, তোর জান যে কৈ মাছটার মধ্যে ছিল, সেটা আমি কেটে দিলাম। আমার নাম আর্য্যা। মা দূর্গার নামে নামকরণ আমার তোদের মতো অসুর নিধনের জন্যই।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

পৌরাণিক পঞ্চকন্যা. ✍🏽সৌগত মুখোপাধ্যায়

 *পৌরাণিক পঞ্চকন্যা*

*✍🏽সৌগত মুখোপাধ্যায়*

পৌরাণিক পঞ্চ কন্যা বলতে *অহল্যা* *তারা* *সীতা*  

*মন্দদোরি* এবং *দ্রৌপদী* র উল্লেখ পাওয়া যায়।এদের কে সতী বলা হয়।এই সতী প্রশ্নে আমার কিনচিৎ আপত্তি আছে।এদের মধ্যে সবাই সতী নয়।

  আলোচনার শুরুতে দেখা নেওয়া যাক এরা কারা।

*অহল্যা* ব্রম্ভা দ্বারা সৃষ্টি অপ্সরা গৌতম মুনির স্ত্রী যিনি ইন্দ্র দ্বারা ধর্ষিত এবং শাপগ্রস্থ পরবর্তী সময় রামের দ্বারা শাপ মুক্তি।কিন্তু এখানেও উল্লেখ ইন্দ্র দ্বারা উনি ধর্ষিতা নয়।বয়জেস্ট স্বামী গৌতম মুনির স্ত্রী ইন্দ্রর ছল চিনতে পারলেও সহবাসে লিপ্ত হন। এখানে সতী শব্দ কি ভাবে প্রযোজ্য?

*তারা* বালির স্ত্রী এবং একাধারে কূটনীতিক ,বালীর মৃত্যুর পর রাজ্যের সব ভার নিজের হস্তগত করতে বিবাহিত সুগ্রীব কে বিবাহ করতে দুবার ভাবেন নি।এনাকেও সতীর আখ্যা দেওয়া হয়।

*কুন্তী* মহাভারতের এক বহু চর্চিত চরিত্র।বোধকরি ইতিহাসের প্রথম কুমারী মা এবং সন্তান অস্বীকারের প্রথম নিদর্শন।সূর্যের ঔরসে গর্ভবতী হন পরবর্তী তে পাণ্ডু কে বিয়ে পঞ্চ পুত্রের জন্ম দেন।ইনিও সতীর তালিকায় ,কারণ উহ্য।

*দ্রৌপদী* এনার সম্মন্ধে বিশেষ। কিছু বলার নেই সবাই জানেন,পঞ্চ স্বামী গ্রহণের পরেও অর্জুন ছাড়া কর্ণের প্রতি দুর্বল ছিলেন ।ইনিও সতী র তালিকায়।

   এরা ছাড়া যে দুজন পরে আছেন *সীতা* এবং *মন্দদোরী* এই দুজনের প্রথম জন জনক রাজার কন্যা এবং দ্বিতীয় জন ময় দানবের কন্যা।এনার মহীয়সী নারী,এনার শুধুমাত্র সংস্কৃতি নয় সমস্ত বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন।এনার কোনোদিন বহুগামী হননি।এনার সৎ পরামর্শ সততার পথে চলার প্ররোচনা দিয়েছেন।সীতা হরনের কালে রাবনের অন্যায়ের প্রতিবাদ যদি কেউ একজন করে থাকেন তবে তিনি 

মন্দাদোরী,এতো স্বত্বেও সতীর সংজ্ঞা তিনিও শেষ অব্দী পালন করতে পারেন নি।যুদ্ধ উত্তোর পর্বে ইনি ও বিভীষণের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন।পরে রইলেন সীতা সত্যিই যদি সতী হিসাবে দেখা যায় তাহলে *সীতা* হচ্ছেন মাত্র একটি কন্যা যিনি ত্যাগের প্রতীক ,নারী ধর্মের প্রতীক আদর্শ সতী।

   🙏🙏🙏🙏🙏

কপিরাইট রিজার্ভ @সৌগত@মুখোপাধ্যায়#২০২১

পৌরাণিক পঞ্চকন্যা(কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)


"অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা।

পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহাপাতক নাশনম্‌।।"


অর্থ :- অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা ও মন্দোদরী পঞ্চকন্যাকে বা পঞ্চসতীকে দিনান্তে একটিবারের জন্য স্মরণ করলে কৃত মহাপাপগুলোর মোচন হয়। 


রামায়ণ মহাকাব্য থেকে গৃহীত পঞ্চকন্যার মধ্যে তিনজন হলেন অহল্যা, তারা ও মন্দোদরী । ও মহাভারত থেকে দুজন হলেন দ্রৌপদী ও কুন্তী ।


অহল্যা🙏 

আহিল্যা নামে পরিচিতা মহর্ষি গৌতমের ভার্যা, অসামান্য সুন্দরী সতীশ্রেষ্ঠা দেবী তিনি । তাঁর রূপের মোহে আবিষ্ট হয়ে ছলপূর্বক গৌতম মুনির অনুপস্থিতিতে, তাঁর ছদ্মবেশ ধারণ করে, তাঁকে ভোগ করেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র । পাপ করেন ইন্দ্র, কিন্তু শাস্তিস্বরূপ ইন্দ্রের সাথে সাথে দেবী অহল্যাকেও মহর্ষি গৌতমের কোপে পড়তে হয় যে, কেন তিনি তাঁর স্বামীর হুবহুকে চিনতে পারেননি । ঋষি গৌতমের অভিশাপে দেবী অহল্যা প্রস্তরীভূত হন । ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের চরণের ছোঁয়ায় তাঁর শাপমুক্তি ঘটে । তিনি পঞ্চকন্যার অন্যতম সতী নারী । চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম । অহল্যা কেন স্বামীকে চিনতে না পেরে স্বামীর রূপধারী ব্যক্তির সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিলেন তা অনেকের মনে ওনার প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করতে পারে । সেক্ষেত্রে একই ভুল ঋষি গৌতমও করলেন । তিনিও তাঁর স্ত্রীর মন বুঝলেন না, বুঝলেন না যে তাঁর স্ত্রী শুধুমাত্র তাঁকেই মন-মন্দিরের দেবতা মেনে আসছেন । অন্য কোনো পুরুষের সাথে তো তিনি লিপ্ত হননি । তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নিজের ছলকারীকে চিনতে পারা যদি দোষের হয় তবে, ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে স্ত্রীর ভালোবাসার প্রতি সন্দেহ করাও দোষের ।


তারা🙏

কিষ্কিন্ধ্যাধিপতী বানররাজ বালীর সহধর্মিনী এবং বানরবৈদ্য সুষেণের কন্যা ছিলেন তারা । দৈত্যের সাথে যুদ্ধে বালীকে মৃত ভ্রমে ভাই সুগ্রীব রাজা হন এবং তারাকে দখল করেন।কিন্তু, বালী ফিরে আসেন ও তারাকে নিজের অধিকারভুক্ত করেন পুনর্বার । সুগ্রীব পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচান। সুগ্রীবের ওপরে বালী বিশ্বাসঘাতক তকমা লাগিয়ে দেন । কিন্তু, তারা ছিলেন বুদ্ধিসম্পন্না, নির্ভীক এবং স্বামী বালীর একনিষ্ঠ ভক্ত । যিনি দুই ভাইয়ের যুদ্ধের মাঝে পড়েও তাঁর স্বামী বালির প্রতি ভালোবাসা ছিল অটুট । কত মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে জীবদ্দশায় । তবুও তিনি ছিলেন অবিচল । প্রণাম জানাই দেবী তারার শ্রীচরণে ।


মন্দোদরী🙏

লঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণের রাণী ও অসুরাজের মায়াসুর ও অপ্সরা হেমার কন্যা তিনি ছিলেন মন্দোদরী। মহাকাব্য রামায়ণে তিনি পরমা সুন্দরী, ধার্মিক ও ভগবভক্তরূপে বর্ণিত । স্বামী রাবণের শত পাপ থাকা সত্ত্বেও মন্দোদরী রাবণকে ভালোবাসতেন এবং ধর্মের পথ অনুসরণে সর্বদা পরামর্শ দিতেন। স্বামীর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্যবোধ রামায়ণে বর্ণিত । রাবণের মৃত্যুর পর, রামের উপদেশানুসারে রাবণের ভ্রাতা বিভীষণ মন্দোদরীকে বিবাহ করতে বাধ্য হন । রাবণ ছিলেন মাতৃতন্ত্রের প্রতিনিধি ছিলেন। তাই তার মৃত্যুর পর শাসনক্ষমতা পাওয়ার জন্য বিভীষণ রাজরাণীকেই বিবাহ করতে বাধ্য হন। মন্দোদরী ও বিভীষণের বিবাহ "রাজনৈতিক কূটবুদ্ধিপ্রসূত"। এই বিবাহ কোনোভাবেই "পারস্পরিক দৈহিক আকর্ষণে"র ভিত্তিতে হয়নি। রাক্ষসকন্যা এবং রাক্ষসরাজ রাবণের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও দেবী মন্দোদরী সর্বদা ধর্মের পথে চলেছেন । স্বামীকেই একমাত্র পুরুষ হিসেবে ভালোবেসেছেন আজীবন । ওনার চরণে শতকোটি প্রণাম জানাই ।


কুন্তী🙏

রাজা শূরসেনের কন্যা, হস্তিনাপুরের রাজা পাণ্ডুর রাণী ও তিন জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব অর্থাৎ, যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনের জননী ছিলেন কুন্তী । যেহেতু পাণ্ডু অভিশপ্ত ছিলেন যে, "স্ত্রী-সঙ্গমে মৃত্যু অনিবার্য" । বংশকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঋষি দুর্বাশার থেকে প্রাপ্ত মন্ত্রবলে তিনি তিন পাণ্ডবের জন্ম দেন । যুবতী বয়সে রাজা পাণ্ডুর অক্ষমতা সত্ত্বেও তিনি সর্বদা পান্ডুকেই ভালোবেসেছেন । অন্য কারোর প্রতি কোনোদিন আকৃষ্ট হননি । এমনকি যুবতী বয়সে বৈধব্যলাভ করা সত্ত্বেও কারোর সাথে পুনর্বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি । শতকষ্ট সয়েও তিনি শেষপর্যন্ত পাণ্ডুর স্ত্রীর মর্যাদা মাথায় নিয়ে স্বার্গলাভ করেছেন । অনেকে বলবেন, কর্ণকে পৃথিবীতে আনা কর্ণের প্রতি অবিচার হয়েছে । কিন্তু, ভুল তো মানুষ মাত্রই হয় । সেটা ছিল তাঁর কিশোরী বয়সের একটা ভুল । এরকারণে এঁর সতীত্ব কোনো অংশে ক্ষুণ্ণ হয়নি । শতকোটি প্রণাম জানাই তাঁর শ্রীচরণে ।



দ্রৌপদী🙏

ইনি পঞ্চকন্যার দ্বিতীয়, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা, অসামান্য সুন্দরী । পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ চেয়েছিলেন দ্রৌপদীর সাথে অর্জুনের বিবাহ দিতে । সেই কারণে তিনি দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরসভার আয়োজন করেছিলেন । মহাবীর কর্ণ অগ্রাধিকার পেয়েছিলেন সেই মাছের চোখ বিদ্ধ করার । তিনি ধনুক ওঠাবার সাথে সাথে দ্রৌপদী প্রতিবাদ করেন যে তিনি সুতপুত্রকে বিবাহ করতে নারাজ । সেই স্বয়ম্বরসভায় মাছের চোখকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে অর্জুন দ্রৌপদীকে বিবাহের অধিকার লাভ করেন । আমরা জানি, পঞ্চপাণ্ডবের মাতৃআদেশ পালনে কোনোদিন অন্যথায় হয়নি । মাতা কুন্তী যখন কর্মব্যস্ত ছিলেন, অর্জুন এসে কুন্তীকে বলেন, "দেখো মা, আমি কি নিয়ে এসেছি ।" কুন্তী সেদিকে না দেখেই নির্দেশ দেন, "যা এনেছ, পাঁচ ভাই মিলে ভাগ করে নাও ।" এভাবেই মাতৃ আদেশের বলি হতে হল দ্রৌপদীকে । তিনি ভালোবেসেছিলেন শুধুমাত্র অর্জুনকে । ওনার চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম ।

ছবি : গুগুল

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...