সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

# নাম- পঞ্চসতী। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর। 
 # বিষয় - আধ্যাত্মিক।
   # নাম- পঞ্চ সতীনারী।
   ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

          শাস্ত্র বলে নারীর গতির প্রথম স্বামী,দ্বিতীয় পুত্র,তৃতীয় আত্মীয়।
   বিশেষ করে পতির অনুগতা হবে স্ত্রী -
  "আত্তার্ত্তে মোদিতা হৃষ্টে প্রোষিতে মলিনা কৃশা।/ ত চ ম্রিয়তে পতৌ সা স্ত্রী জ্ঞেয়া পতিব্রতা।।" - যে নারী স্বামীর দুঃখে দুঃখিত,স্বামীর সুখে সুখিনী ...সেই নারী সতী। 
   সতীনারী হতে হলে জ্ঞানোদয়ের পর হতে সতীর আদর্শ হবে শিবপূজা করা। শিবপূজো থেকেই সতীনারী হওয়ার জ্ঞান লাভ হয়।
  সতীত্বের মাপকাঠি কন্যার রূপ। নারীর সঙ্কোচ,শঙ্কা,অঙ্গ সৌষ্ঠব,চলনভঙ্গী,বচনচাতুর্য প্রভৃতি নারীর সতীত্বের গুণাবলী।
   স্বামী ভিন্ন অন্য কাউকে মনে স্থান দেওয়া চলবে না। স্বামী ভিন্ন অন্য সকল পুরুষকে সন্তানতুল্য ভাববে। পরপরুষকে সন্তানতুল্য ভাবলে পরপুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক তথা পরপুরুষ সম্পর্কে কোনও কাম চিন্তা আসবে না। 
  আর সতীত্বের শেষ পাঠ তথা চরম গতি সহমরণ। সুস্থ দেহে প্রফুল্ল অন্তঃকরণে বধূবেশে সুসজ্জিতা হয়ে হাসতে হাসতে জলন্ত চিতায় নিবেদন করলে হয় সতী। এই সূত্রে মাদ্রী তো সতীনারী হবেন,পান্ডুর সঙ্গে সহমরণে গেলেন বলে। কিন্তু সেখানে কুন্তী পুত্র অনুগামহ হবেন বলে হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। কুন্তি হলেন সতী নারী। চরিত্র বিচারে পঞ্চ কন্যায় স্থান নেই মাদ্রীর।
  এই দৃষ্টিকোন থেকে শ্রেষ্ঠ সতীনারীর তালিকায় আছেন- সতী,সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী, অরুন্ধতী,তারা,অহল্যা, মন্দোদরী, কুন্তী,দ্রৌপদী। বেহুলা কী নন। আমি বলব অবশ্যই প্রথম সারিতে।
     সতীত্বের পূর্ণ প্রতিমূর্তি সতী। ব্রহ্মার মানসপুত্র প্রজাপতি দক্ষের কনিষ্ঠা কন্যা। শৈশব থেকে কঠোর তপশ্চর্যার দ্বারা শিবকে পতিরূপে পান। শিবকে পেতে প্রথমে মদনের সাহায্যে রূপজ মোহে শিবকে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শিব সতীকে প্রত্যাখ্যান করেন। আর মদনকে ভস্মীভূত করেন। তারপর সতী দীর্ঘ তপশ্চর্যা,ত্যাগ, তিতিক্ষা,দুঃখ কষ্ট ভোগ করে মহাদেবকে পান। আর সেই মহাদেব ভিখিরি,শ্মশানে মশানে থাকেন বলে,পিতার কাছে পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহত্যাগ করেন। ত্যাগের পূর্ণপ্রতিভূ সতী। পরম কল্যাণময়ী। সংসারে যত কুমারী কন্যা সতীর আদর্শে নিজেদের তৈরী করে,শিবের মত বর পেতে। 
    দ্বিতীয় নারী সাবিত্রী। দেবতার বরে জন্ম। পিতা অশ্বপতি। মদ্রদেশের রাজা। ক্রমে সাবিত্রী রূপবতী হয়ে ওঠেন। সঙ্গে অপরিসীম গুণবতী। কিন্তু বিবাহের পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না। তখন নিজেই পাত্রের সন্ধানে বেরিয়ে তপোবনবাসী সত্যবানকে পতি হিসেবে মনে মনে বরণ করেন। এই কথা নারদের জানতে পারেন সত্যবান স্বল্পায়ু। তখন অশ্বপতি মেয়েকে সিদ্ধান্ত বদলের কথা বললেন। অন্য পাত্র মনোনীত করতে বললেন। কিন্তু সাবিত্রী সত্যবানকে মনে মনে পতি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তাই  সিদ্ধান্ত বদলের কোনও কথাই আসে না।
  সত্যবানকে পতি হিসেবে বরণ করলেন সাবিত্রী। যথা নিয়মে সত্যবানের মৃত্যু হল। স্বয়ং যমরাজ হাজির। স্বামীর মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে আছেন সাবিত্রী। যমদূতেরা সাবিত্রীর সতীত্বের তেজে সাবিত্রীর কাছে পৌঁছতে পারছে না। তখন স্বয়ং যমরাজ এসে সাবিত্রীকে বললেন- "স্বামীকে ত্যাগ করে তুমি নিজ গৃহে গমন কর। মর্ত্যবাসী সকল জীবের অদৃষ্টে মৃত্যু ঘটে থাকে,তুমি আশা করি এজন্য দুঃখ করবে না।" এই শুনে সাবিত্রী স্বামীর মৃতদেহ ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে গেলেন। তখন যমরাজ সত্যবানের আত্মা নিয়ে চললেন। সাবিত্রীও চললেন যমরাজের পিছুপিছু। আর সাবিত্রীকে আসতে দেখে যমরাজ আবার বোঝাতে উদ্যত হলেন,তখন সাবিত্রী বলতে লাগলেন- "পিতঃ,আপনি বললেন 'মৃত্যুই বিধির বিধান',আবার সেই বিধানেই সতীর আত্মা পতির আত্মার সঙ্গে চির অবিচ্ছিন্ন। সুতরাং নারী স্বামীর অনুসরণ করতে বাধ্য। আপনি আমাকে কেন নিবারণ করছেন।" এই কথা শুনে বললেন- "আমি তোমার ধর্মজ্ঞাণ দেখে অত্যন্ত খুশি। স্বামীর প্রাণ ব্যতীত অন্য কোন বর চাও বল,তা দিতে পারি।" সেই মত  সাবিত্রী অন্ধ শ্বশুরের দৃষ্টি,শ্বশুরমশায়ের হৃতরাজ্য ফিরিয়ে দিতে বললেন,বললেন পিতা পুত্রের জন্মদাতা হউক। তাও পূরণ হল। তবু সাবিত্রী নাছোড়বান্দা। যমরাজ আবার বারণ করলেন সাবিত্রীকে। সাবিত্রী তখন বললেন "আমার আত্মা তো স্বামীর সঙ্গে বাঁধা। শুধুই দেহ যাচ্ছে। আপনার তাতে কি অসুবিধা।" সাবিত্রীর এই ধর্ম জ্ঞানের কাছে হার মেনে বললেন- "স্বামীর প্রাণ ছাড়া আর কি আছে চাও।" তখন সাবিত্রী চাইলেন সত্যবানের পুত্র হলে রাজা হবে। যমরাজ বললেন- "তথাস্ত।" সাবিত্রী চললেন যমরাজের পিছু পিছু। যমরাজ আবার বিরক্ত হয়ে বললেন "যা চাইলে সবই তো দিলাম। আবার পিছু নিচ্ছ কেন?" তখন সাবিত্রী বললেন "সত্যবান যদি মৃত হন, তাহলে তাঁর পুত্রের জন্ম ও রাজা হওয়া কেমন করে হবে?" যমরাজ নিজের ফাঁদে নিজেই আটকে গিয়ে মহা ফাঁপরে পড়লেন। সাবিত্রীকে সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। এই হলেন সতী নারী। পতি,পুত্র ও আত্মীয় অন্ত প্রাণের গতি নিয়ে অন্যতমা পবিত্র সতী নারী। 
  অরুন্ধতী আরেক সতী নারীর অন্যতমা। বশিষ্ঠ-পত্নী। যজ্ঞাগ্নি থেকে জন্ম। ব্রহ্মার মানসকন্যা সন্ধ্যার মর্ত্যে অরুন্ধতী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 
  যৌবনে অপরূপা,বিদ্যাবুদ্ধিতে অতুলনীয়া কন্যাকে দেখে মুগ্ধ বশিষ্ঠ। বিবাহ সম্পন্ন হয়। যথাসময়ে শত পুত্রের জননী হন। পুত্র পালনকালে কোনোদিন স্বামী সেবা ভুলে যাননি। পুত্রদের শিক্ষা দানে ব্রতী ছিলেন। স্বামী সেবা,পুত্র দের দেখভালে সতীনারীর শ্রেষ্ঠত্বে আসীন ছিলেন। একসময় বিশ্বামিত্রের সঙ্গে শত্রুতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বশিষ্ঠ। বিশ্বামিত্রকে ব্রহ্মশাপ দিতে উদ্যত হলে,অরুন্ধতী স্বামীকে মহাক্রোধের মহাপাপ থেকে নিরস্ত করেন। বশিষ্ঠদেব অরুন্ধতীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে কোনোদিন পাপে লিপ্ত হননি। অরুন্ধতী স্বামীকে পাপ থেকে সদা বিরত রাখতেন।
   আর দময়ন্তীও অপরূপ সুন্দরী। নলকে স্বামী হিসেবে পাওয়া ও স্বামী অন্ত প্রাণের জন্য তিনিও সতীনারী।
   সীতা আর্য কন্যা।  সীতার শিক্ষাগুরু যাজ্ঞবল্ক্য। গার্গীও গৃহশিক্ষিকা ছিলেন। ত্যাগের পূর্ণমহিমাণ্বিতা। উপনিষদ স্রষ্টা যাজ্ঞবল্ক্য সীতাকে যথার্থ ত্যাগের মহিমার শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। স্বামী অন্ত প্রাণ,বনবাস জীবন, তপোবন জীবন তাঁর চিত্তের শুদ্ধতা প্রমাণে বাল্মীকি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। রামায়ণ রামগাথা হলেও সীতাসর্বস্ব মহাকাব্য। সীতার জীবনভোর স্বামী অন্ত প্রাণের জন্য অন্যতমা সতীনারী। রূপে গুণে অনন্যা। 
    এই ধারায় বেহূলাও অন্যতমা।সাবিত্রীর মতো স্বামীর প্রাণ ফেরানো,দেউলিয়া শ্বশুরমশা চাঁদসওদাগরের সব কিছু ফিরিয়ে আনা,রূপে গুণে মহীয়সী হওয়া সত্ত্বেও সতী নারীর তালিকা থেকে কেন বাদ গেলেন বোঝা গেল না।
   অন্য মতে তারা,অহল্যা, মন্দোদরী, কুন্তী,দ্রৌপদী পঞ্চনারী পঞ্চসতী। রামায়ণ, মহাভারত ও মনুসংহিতার মতে। এই নারীরা পতি অনুগতা থেকেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রাধান্য সকলেই কোনও না কোনোভাবে নানা ঘটনার স্বীকার- স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে অনেক সংঘাত,অপ্রিয় ঘটনাবলী সাক্ষ্য হতে হয়েছে। তাই সতীত্বের আদর্শনিষ্ঠ বলতে সতী,সীতা,সাবিত্রী,দময়ন্তী,অরুন্ধতী (বেহুলা)  স্বামী অন্ত প্রাণের বিনিময়ে স্বামীরাও স্ত্রীর প্রতি কোনরূপ অবমাননা আচরণ করেননি। সেখানে অহল্যা,তারা,মন্দোদরী,কুন্তী,দ্রৌপদী - এই পঞ্চনারীর জীবন ছিল বড়ই সংঘাত মুখর। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দাবীতে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল এঁদের।
  শাস্ত্র নির্দিষ্ট  সতীত্বের শর্তাবলী অনুযায়ী পঞ্চসতী নিয়ে মতান্তরের দুটি ধারা -
  এক ধারায় - সতী,সীতা,সাবিত্রী,দময়ন্তী ও অরুন্ধতী। অন্য ধারায় - অহল্যা,তারা,মন্দোদরী,কুন্তী ও দ্রৌপদী।
   এই দুটি ধারার মতে অবশ্যই স্বকীয়তা স্বীকার্য।
            *******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...