সোমবার, ১৯ জুলাই, ২০২১

#বিভাগ_গল্প #গল্প:চিলেকোঠার ঘরটা #কলমে:সবুজ দ্বীপের রাজা

 #বিভাগ_গল্প 


#গল্প:চিলেকোঠার ঘরটা

#কলমে:সবুজ দ্বীপের রাজা


ফেলে আসা দীর্ঘ ২০টা বছর অনিশা কে তার পরিচিত কলকাতাকে অনেকটা অচেনা করে তুলেছে। আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী অতীন কার্নেগী এই ২০ বছরে বার তিনেক ভারতে এলেও,অনিশাকে নিয়ে এই প্রথমবার। অনিশার ভারতে আসার মতো, তাকে খোঁজার মতো কেউ ছিলো না। বুড়োদাদু তার বিয়ের কয়েকদিন বাদে মারা যায় তখন সে অন্তঃস্বতা। তাই আর আসা হয়ে ওঠেনি। আর জেঠিমা মারা যাওয়ার খবর, সেটা জানতে পেরেছিল জেঠিমার মৃত্যুর প্রায় বছর পাঁচেক বাদে। রন্তু দাদার মেয়ে ইন্টারনেটে তার ঠাকুমার মৃত্যু দিবস দিয়েছিল সেই দেখে।

   গাড়ি চাপা পরে মৃত মায়ের দেহ আগলে বছর তিনেকের পথশিশু অনিশা যখন কাঁদছিলো, ওই বুড়ো কত্তা আর স্নেহময়ী জেঠিমার কোলে চেপে বাগবাজারের ওই সুউচ্চ জমিদার বাড়ির চিলেকোঠার ঘরটায় আশ্রয় নেয় অনিশা।

  হটাৎ ভাগ বসানো আশ্রিতার প্রতি বাড়ির বাকি সদস্যের ব্যাবহার যা হয়ে থাকে অনিশার ক্ষেত্রে তার থেকে আলাদা কিছু হলোনা। শুধু একান্নবর্তী পরিবারের কর্তা বুড়ো বাবুর এবং জেঠিমার স্নেহ দৃষ্টি কিছুটা হলে ঢাল হিসাবে রইলো।  যদিও আড়ালে আবডালে চলতে লাগলো প্রহসন। আর অনিশার সকলের ভালোবাসা আদায় করার মিথ্যা লড়াই। ছোট্ট চিলেকোঠার ঘরটা তার একমাত্র আপনজন হয়ে উঠেছিল। মানি প্ল্যান্টের ছোট্ট চারা বাগান থেকে তুলে এনে জানলার ধারে একটা টবে বসিয়েছিল।প্রতিদিন তাতে জল ঢালতে ঢালতে তার মনের কথা তাকে বলতো।সেও ওরই মতো বেড়ে উঠছিল।

  তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষার সময় দুপুরে বাড়ি ফেরার পথে মাথা ঘুড়ে রাস্তায় পড়ে যায়। সেদিন অতীন তাকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। সেদিন অচৈতন্য অনিশার মুখে অতীন বোধহয় তার ভবিষ্যৎ দেখেছিল। নাম গোত্রহীন অনিশাকে নিজের করতে অবাঙালী অতীনের বেগ পেতে হয়নি।

  আফসোস একটাই।  না পাওয়া দেশের রাজকন্যা অনিশা সব পাওয়ার দেশে এসেও আজো নির্বিকার। অতীনের শত অনুরোধে ও আজ অব্দী নিজের জন্য কিছু চায়নি। এবার প্রায় জোর করেই অতীন ওকে নিয়ে ভারতে এসেছে।

   ঠান্ডা গাড়ির বন্ধ কাঁচের ভিতরে অতিন যখন বললো, "অনি চলো তোমার বাড়ি দেখিয়ে আনি।" অনিশার চোখটা আনন্দে জ্বলে ওঠে।

    জরাজীর্ণ দশা সেদিনের সেই জমিদার বাড়ি। মূল ফটক ভেঙে পড়ে গেছে। বুড়ো কত্তার সাধের বাগান আজ জঙ্গলে ভরা। বন্ধ বাড়িটাকে আষ্টে পিষ্টে রেখেছে বটের শিকড়। অতীন মৃদু স্বরে বলে, "এখানে আজ আর কেউ থাকে না। ব্যাঙ্কের ঋণ পরিশোধ না করার কারণে বাড়িটা নীলামে উঠেছে।" অনিশার চোখের আনন্দ নিমিষে নিভে যায়। হতাশ দৃষ্টিতে চিলেকোঠার সেই ঘরটার দিকে তাকায়, মানিপ্লান্ট গাছটা জানালা দিয়ে বেরিয়ে পুরো ঘরটা ঢেকে ফেলেছে। অনিশাকে দেখে তার পাতাগুলো তির তির করে নড়ে ওঠে। হারানো প্রিয়জনকে পেয়ে সেও কাছে পেতে চায়।

   অনিশা অতীনকে বলে আমার ছেলেবেলা দেখবে? ওই চিলেকোঠার ঘরটায় একটু নিয়ে যাবে।

   অতীন গাড়ি থেকে নেমে গার্ডের সঙ্গে কি সব কথা বলে। তারা ওর হাতে একগোছা চাবি দেয়।

   চিলেকোঠার ঘরের ভিতরে ঝুল পড়লেও আজো যেনো আগের মতোই আছে। চৌকির নিচে সেই বাক্স অনিশা খোলে তার শৈশব ,কৈশোর সব মুক্ত হাওয়ায় বেরিয়ে এসে তাকে আলিঙ্গন করে।অনিশার চোখটা ভিজে উঠেছে স্মৃতির জলে। জানলার কাছে মানিপ্লান্ট গাছটায় হাত বোলায়, পাতায় জমা জল ওর মুখে পড়ে।দুই সাথী হারা একে অপরকে কাছে পেয়ে অশ্রুজলে যেনো ভাসতে থাকে।

  অনিশা অতীনের হাতটা চেপে ধরে,আমাকে এই বাড়িটা কিনে দেবে অতীন।

   অতীন পকেট থেকে রুমালটা বের করে অনিশার চোখটা মুছিয়ে দেয়। ব্রীফ কেস খুলে একটা কাগজ বের করে অনিশার হাতে দেয়। মৃদু স্বরে বলে এই বাড়ি আজ থেকে তোমার। এই উপহার তোমায় দেবো বলেই আমার আজকে আমেরিকা থেকে এখানে আসা।

   বাইরের দমকা হাওয়া মানিপ্লান্ট গাছটাকে দোলাতে থাকে,অনিশা নতুন করে অতীনকে আবিষ্কার করে।

   🙏🙏🙏🙏🙏

কপিরাইট রিজার্ভ@সৌগত@মুখোপাধ্যায়#২০২১

২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস কিছু অনুভূতি মনের গভীরে থাকাই শ্রেয়। সেটা হয়তো প্রকাশ করলে সমস্যা হতে পারে,তাই প্রকাশ না কর...