শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর।
# বিষয় - *আধ্যাত্মিক।*
# নাম-
*হইলোক ও পরলোক।*
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
*"ইহলোকের বাঁধন না কাটলে পরলোকের পথ খুলবে না।"* কথাটি খুব অনুভবের দ্বার খুলতে হয় নিজের অন্তরের চাবিগোছা দিয়ে। অনেকগুলো তালা। একে একে খুলে খুলে যেতে হয়। শেষে আছে মুক্তির মহা আনন্দের - *আনন্দদ্ধেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে।*- আনন্দের মুক্তির উল্লাস আছে।
গৃহাশ্রমেই যত মায়া মোহ। চিত্তের চাঞ্চল্য থেকে সুখ,দুঃখ,আনন্দ,বেদনা - তাই মর্ত্যের মায়া। যখন তা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে তার জন্য উচ্চতর সাধনায় ব্রতী হতে হয়।
আত্মার অনুসন্ধান,ব্রহ্মজ্ঞান লাভ থেকেই আসে ইহলোক ও পরলোকের সম্পর্কে ধারণা। এই ধারণা মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর বৃহদারণ্যক উপণিষদে খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে গেছেন।
ঋষিবর সংসারের মায়ায় বড়ই চিত্তে চাঞ্চল্য বোধ করছেন। তাই সাধনার জন্য সংসার ছেড়ে যাওয়ার মনস্থ করলেন। সেই সঙ্গে সমস্ত সম্পত্তি দুই স্ত্রীর মধ্যে সমান সমান ভাগ করে যাওয়ার মনস্থির করলেন। অর্ধেক সম্পত্তি পেয়ে স্ত্রী কাত্যায়নী তো খুব খুশী। দ্বিতীয় স্ত্রী মৈত্রেয়ীকে সম্পত্তি দিতে গিয়ে বাঁধল গোল। মৈত্রেয়ী বললেন-"যে সম্পত্তি দিচ্ছেন তা দিয়ে কি অমরত্ব লাভ হবে?"
মৈত্রেয়ীর প্রশ্নের উত্তরে ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য বললেন - "ধন সম্পদ, সম্পত্তিতে অমরতা লাভের বিদুমাত্র সম্ভাবনা নেই (অমৃতস্য তু নাশান্তি বিত্তেন ইতি)।"
তখন মৈত্রেয়ী বললেন - "যাতে অমৃতত্বের লেশমাত্র নেই তা নিয়ে আমি কী করব(যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুর্যাহং)?" তখন ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য ব্রহ্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হলেন। আর তাই নিয়ে তাঁর উপনিষদ হল ব্রহ্ম তত্ত্বের আকর গ্রন্থ।
আত্মার স্বরূপ বোঝাতে গিয়ে যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীকে তিনটি সূত্র দিলেন -
১। প্রাণ দ্বারা প্রাণিত যে হচ্ছে সেই 'আত্মা'। সকল কিছুরই সে অন্তর্বর্তী। তাকে চোখে দেখা যায় না।
২। পুত্রের চেয়ে প্রিয়,বিত্তের চেয়ে প্রিয়,অন্যসব কিছুরই অন্তরতর যা তাই আত্মা।
৩। পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীর অন্তরালে, পৃথিবী যার শরীর, যে পৃথিবীর অভ্যন্তরে থেকে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেই তোমার আত্মা - সেই হলো অন্তর্যামী ও অমৃত।
এই আত্মাই হলো ব্রহ্ম। ব্রহ্ম মানে বৃহৎ। এই আত্মা সর্বজীবে সর্বজড়ে বিদ্যমান। এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায় সর্বজীবে ও সর্বজড়ে যদি আত্মা বিরাজমান থাকে তাহলে মানুষে মানুষে,জড়ে জড়ে এত পার্থক্য কেন?
পার্থক্য এ কারণেই প্রত্যেকেই চৈত্য শক্তির (Psychic Being) জন্য আলাদা।
সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। যেমন বস্তুর সঙ্গে বস্তুর পার্থক্য - বিজ্ঞান বলে বস্তুর গঠনের মূল ভিত্তি প্রোটন,নিউট্রণ ও ইলেকট্রন নিয়ে অনু-পরমানু। আত্মাকে যেমন চোখে দেখা যায় না তেমনি প্রোটন নিউট্রন ও ইলেক্ট্রনকেও চোখে দেখা যায় না। বস্তুর মতো মানুষে মানুষে পার্থক্যের মূল ভিত্তি চৈত্য শক্তি। বস্তুতে প্রোটন নিউট্রন ও ইলেক্ট্রনের ভর সংখ্যার তারতম্যের জন্য বস্তু সব আলাদা আলাদা রূপে গন্য হয়। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই চৈত্য শক্তির গুণে আলাদা আলাদা। বিজ্ঞান যাকে পরমানুর নিউক্লিয়াস বলে, ধর্ম তাকে চৈত্য শক্তি বলে।
আত্মা যখন একা তখন তিনি ব্রহ্মাণ্ড। তিনি অনন্ত। অনন্ত কখনো একা থাকতে পারেনা বলেই নিজেকে সর্বজীবে ও সর্বজড়ে ছড়িয়ে দেন।
আত্মা এক ও অবিনশ্বর। সর্বজীবে ও সর্বজড়ে তিনি বিরাজমান। এই আত্মা সম্পর্কে জানার জ্ঞানই হল ব্রহ্ম জ্ঞান। ব্রহ্মজ্ঞানই ধর্মের ভাষ্যে আধ্যাত্মিক জ্ঞান। আর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মধ্যে চৈত্যস্বরূপের জ্ঞান হল মূল্যবোধ। অর্থাৎ আত্মারই চৈত্যশক্তি হল মূল্যবোধ।
আত্মা এক বলে,তা থেকে সৃষ্ট জীবের নিয়মও একটাই। একটি কোশ হয় বহুকোশীয়।একটি মানুষ ছড়িয়ে পড়ে বহু মানুষে।
বিজ্ঞানে 'ফিশন' ও 'ফিউশন'- এর প্রক্রিয়ার কথা একই। জীববিজ্ঞানে কোশ বিভাজন,আর পদার্থবিজ্ঞানে পরমানু বিভাজন একই। জড়ের এক থেকে বহুর প্রক্রিয়া আর জীবেও কোশ বিভাজন একই প্রক্রিয়া। যাক যাজ্ঞবল্ক্য এবার কী বলছেন দেখি।
যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন দু'টি সত্ত্বা। ব্যষ্টি ও সমষ্টি। ব্যষ্টি যখন সে তখন নিজের জন্য বাঁচে। আর সমষ্টি যখন সে তখন বাঁচে সমাজের জন্য, দেশের জন্য। ব্যক্তি সত্ত্বা সদাই সমষ্টি সত্ত্বার অভিমুখে গমন করবে। সমষ্টি সত্ত্বার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। এই সমষ্টি সত্ত্বাই হলো বিশ্বসত্ত্বা। বিশ্বসত্ত্বা অক্ষয় ও অমর। যে বিশ্বসত্ত্বার স্বরূপ না জেনে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় সে কৃপার পাত্র। আর যে এই বৃহৎ বিশ্বসত্ত্বার স্বরূপ ব্রহ্মাকে জেনেছে সেই অমর। অর্থাৎ সেই অমরত্ব লাভ করবে যে ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে পারবে। সেই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারবে। আত্মার বাইরে সব কিছুই আর্ত। এই আর্ত অর্থাৎ বাইরের শক্তি আনে বিচ্ছিন্নতা বোধ। সেই হয় খন্ডিত যে কেবল ব্যক্তি সত্ত্বার অধিকারী। তাহলে এই একক সত্ত্বা কি বৃথা! আদৌ নয়। বলা হয় এ ধরনের সত্ত্বা অসম্পূর্ণ - মৃত্যুতেও শান্তি পায় না।
আত্মা একা নয় - আত্মার সঙ্গে আত্মা মিলনে তৃপ্তি লাভ করে। আত্মার মৃত্যু নেই। মৃত্যু আছে নশ্বর দেহের। এই আত্মা যখন বিশ্বসত্ত্বার সঙ্গে মিলনের পথ পেয়ে যায় তখন মৃত্যু ভয় দূর হয়। আর মৃত্যু ভয় তাকেই গ্রাস করে যে ব্যক্তিসত্ত্বার বিলোপ ঘটাতে পারে না। তাকেই একপ্রকার পরাজয়ের গ্লানি ভর করে। আর যিনি বিশ্বসত্ত্বার সঙ্গে মিলিত হতে পারেন তিনিই তো বলতে পারেন মৃত্যুতে সব শেষ নয়। ব্রহ্মজ্ঞানী হলে এই বোধের উদয় হয়। ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু আছে - মনুষ্য শ্রেণী ও মনুষ্যত্বের লয় নেই। কোনো বিশেষ শ্রেণীর মানুষ না থাকতে পারে, মনুষ্য শ্রেণী থাকবেই। একেই রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি আমিকে বলেছেন 'ছোট আমি', - ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ। আর 'বড় আমি' যেখানে কবি স্রষ্টা। এই 'বড় আমি'ই তো কবিকে বিশ্ব সাথে যোগসাধনে সাহায্য করছে। যাজ্ঞবল্ক্যের এই ভাষ্যের প্রতিধ্বনি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পাই যখন কবি বলেছেন - "... বিশ্বভরা প্রাণ/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান।"
এইভাবে যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীকে অমরত্ব লাভের উপায় বললেন। আত্মার মধ্যে এই যে চৈত্যপুরুষের কথা বললেন,তার স্বরূপ কী?
আমাদের বিষয় কি? *ইহলোকের বাঁধন না কাটলে পরলোকের পথ খুলবে না।* উপরের কথাগুলো এই বক্তব্যের সমর্থনে হাজির করলাম।
*ইহলোক ও পরলোক* - ইহজগতে প্রাণিত কে? প্রাণিত হয় আত্মা। সেই জীবাত্মা। আর পরলোকের আত্মা পরমাত্মা। পরমাত্মাই আত্মাকে তার অংশীদারিত্ব দিয়ে ইহলোকে পাঠান। ইহলোকের মায়া না থাকলে ইহলোকের টান থাকবে না। জন্মে সেই টান যৌবন পর্যন্ত চরম আকার লাভ করে। তারপর ধীরে ধীরে কমতে কমতে বার্ধক্যে মায়াশূন্য হলে পরমাত্মায় মৃত্যুর মধ্য দিয়েই ফিরে যায়। আত্মার মায়াশূণ্য হওয়া মানে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করা। মায়া ত্যাগ না করলে আত্মার মৃত্যুতেও শান্তি নেই। সেই শান্তির জন্য আমরা যারা বংশধর পারলৌকিক ক্রিয়া কর্মাদি সম্পন্ন করি। আত্মা মানি বলে আত্মার মুক্তির কথা মানি। আত্মার বাঁধন কাটলে আত্মা কোথায় যায়? যায় যেখান থেকে আসে সেখানেই। পরমাত্মার দান পরমাত্মাই ফিরিয়ে নেন। তাই ইহলোকের বাঁধন কাটলে,পরলোকের পথে নামে সবাই। প্রাণ যাঁর দান তিনিই প্রাণকে ফিরিয়ে নেন। আবার নবীকরণ করে পাঠিয়ে দেন। আর না নবীকরণ চাইলে বুদ্ধ যা বলেছেন তাই করলে নাকি আর ইহলোকে আসতে হয় না।
কি হয়, আর হয় না সে সবই চলে বড়ই অন্তরালে। উপলব্ধি যার যেমন ফল লাভ তার তেমন। আমি সামান্য। মর্ত্যের বন্ধন ইহলোক। আর মর্ত্যের বন্ধন মুক্ত পরলোক এই সরলীকরণটা মাথায় আপাতত থাক।
ধন্যবাদ।
*****
অপূর্ব লেখা
উত্তরমুছুনঅপূর্ব। খুব ভালো লাগলো।🙏🙏🙏🙏💐💐💐💐
উত্তরমুছুনঅসাধারণ 👌👌👌👌
উত্তরমুছুনঅপূর্ব লেখনী
উত্তরমুছুনভীষণ ভালো লাগলো...👌👌👌
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুন