বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

।।নববর্ষ বরণ।।


বিশে বিশ কালো ছায়া আজ অতীত,


জীবনকে শিখিয়ে যায় কর্মের উচিত-অনুচিত।


বিশ্ব ভরা ভালোবাসায়,


বর্তমানকে করি মোরা আলিঙ্গন,


নব আশার বালিকণায় দেখি ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপন। 


হানা-হানি ভেদাভেদ ভুলি
সমস্ত জ্বালা যন্ত্রনা,দুঃখ-বেদনা


যাক জগত থেকে মুছে,


উদাসী হাওয়ায় রঙিন সুখের ভেলায় ভেসে,


মধুর অনুভূতি ভরা নব পথের পথিক


চলি আনন্দে উচ্ছাসে।
নব সম্ভাবনার নব সাঁজে


সুন্দর হোক সম্পর্কের অটুট বন্ধন,


উদার হৃদয়ে করি মোরা নববর্ষের বরণ।


(সমাপ্ত)


কলমে মাম্পি চৌধুরী চ‍্যাটার্জী

বিষয় : আলোচনা (অনুগল্প)# নাম : মনটা বড়ো লোভী # লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 মনটা বড়ো লোভী। 


এই বয়সেও দুধের সরটা ছেলেদের আদরটা নাতি নাতনীর খেয়াল চাটতে চায়। এখনও আশি পেরিয়ে হরিবালার মন চোরের মত ছোঁকপক করে। মনে হয় ভাগে যা পায় সব কম। সংসারটা তো তার তৈরী। 

বড়ো বৌমা ওসব অগ্রাহ্য করে না, সবার সামনে অবশ্য আদর্শ নারী, ঘরের লক্ষ্মী। কিন্তু চোরা মন বলে " ঘাটের মড়া গেলেই বাঁচি, এমনি কেবল বারান্দা ভরে আছে, ঘরে ঢুকেই অসুস্থ ব্যক্তি কার ভালো লাগে! দুখানা গাছ হলে মন্দ হত না। " এমন করেই সবার মনে চোরা এক মন বসে আছে। একটু সুযোগের কি যে লোলুপতা। কেউ জানে না ছোট দেওর, জিম করা রাহুল মনে মনে চুরে করে নতুনদার বৌ অনামিকার আতাস লাগা রূপ। তিন্নি চায় একটু চুরি করে ইউটিউবে বড়ো দের ফ্লিম দেখতে। আরও সব কেউ কর্তারা উসখুশ করে কমলীর ঘর মোছা দেখতে। সরে যাওয়া কাপড়ে তস্কর নজর ঘোরে। মন বড়ো শয়তান। সামনে সরল দেখতে মানুষের মনে যে কালো অন্ধকার, সেখানে ওর বাস। 

আজ আর না বছরের শেষে মন খারাপের গল্প নয়,এদের যে সদস্য সাহিত্য করে তার বড়ো ইচ্ছা একটু লুকিয়ে একদিন স্বর্গে ঢুকে পড়বে। রম্ভা ঠিক কেমন দেখতে বড়ো ইচ্ছা করে জানতে। কিংবা একটা বঙ্কিম পুরস্কার। চোরা টান আছে, একটু যশের লালসা। ভিখারী সে

©copyright reserved for Sharmistha Bhatt.... 


দর্পচূর্ণ

স্নিগ্ধা‌, বাবা মায়ের একমাত্র কন্যা। রূপে তার জোড়া মেলা ভার। স্নিগ্ধার‌ পিতা জমিদার সৌরদ্বীপ‌ রায় অত্যন্ত দয়ালু কিন্তু তার মেয়ের যেমন রূপ তার থেকে বেশি তার অহংকার। স্নিগ্ধার‌ মা পুষ্পাদেবী‌ অনেক বছর আগে ইহলোকের‌ মায়া ত্যাগ করেছেন। তাই সৌরদ্বীপ‌ তার একমাত্র কন্যাকে খুব আদরের সাথে বড় করেছেন। সকল আবদার সব সময় পূরণ করেছেন। আর এত আদর আর রূপের অহংকারে স্নিগ্ধার‌ যেন মাটিতে পা পড়ে না।

কিন্তু সৌন্দর্য আর কতদিনের। অহংকার সব সময় পতনের মূল হয়। যেমন গোলাপ, প্রেমিক‌ মাত্র‌ই আকর্ষন করে। অহংকার তার সারা অঙ্গ জুড়ে। কিন্তু তার সৌন্দর্য আর কতদিনের। আস্তে আস্তে তার সব পাপড়ি ঝরে মাটিতে পড়ে যায়।

সৌরদ্বীপ‌ অত্যন্ত সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। দরিদ্রদের থেকে খাজনা আদায় করতে পারতেন না। তাই সঠিক খাজনা আদায় করতে না পেরে আস্তে আস্তে তার জমিদারি নিঃশেষ হতে হতে নিলামে উঠে যায়। সৌরদ্বীপ‌ পথে এসে যায়। কিন্তু তার দয়াশীল মনোভাবের জন্য অনেকেই তাকে খুব ভালবাসত। তাদের মধ্যে এক ঘর চাষীও ছিল। তার নাম হরিনাথ। সৌরদ্বীপ‌ তার বহু খাজনা ম‌ওকূপ করেছেন।আর শুধু তাই নয় তার ছেলেকে কলকাতার বড় কলেজে পড়াশোনা করার অনেক খরচ বহন করেছেন। যার ফলে চাষীর ছেলে চাকরি করে তাদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। সৌরদ্বীপের‌ এই অবস্থায় হরিনাথ তাকে ও তার মেয়েকে স্থান দেন। রূপে অহংকারী স্নিগ্ধার‌ প্রথম থেকেই বাবার উপর রাগ ছিল। চাষীর বাড়িতে স্থান নেয়ার জন্য তার রাগ উত্তরোত্তর বেড়ে যায়। এখানে না আছে চাকর-বাকর ,না আছে জমিদারি হালে থাকার ব্যবস্থা। অন্যদিকে চাষীর দুই ছেলে মেয়ে। মেয়ে মালতি আর ছেলে সোমেন‌। সোমেন কিছু দিন কলকাতায় চাকরি করে গ্ৰামে চলে আসে। সে কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করেছে। তাই তার ইচ্ছা ছিল গ্ৰামে এসে গ্ৰামের মানুষদের চাষাবাদের সঠিক কৌশল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জমির‌ উর্বরতা বৃদ্ধি জ্ঞান দিয়ে কৃষি ব্যবস্থার উন্নতি করা। তাই সে কলকাতা ছেড়ে গ্ৰামে আসে। কিন্তু গ্ৰামে এসে জমিদারের অবস্থা দেখে তার কষ্ট হয়। অন্যদিকে স্নিগ্ধা রূপে এত সুন্দর যে সোমেন তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। সোমেন ছোট থেকেই স্নিগ্ধাকে‌ ভালোবাসতো। অনেক দিন পর তাকে দেখে বাল্যকালের ভালবাসা জেগে উঠে। কিন্তু স্নিগ্ধার‌ গরিবদের প্রতি ঘৃণা আর অহংকারী মনোভাব সোমেনকে‌ আহত করে। জমিদারি হারালেও স্নিগ্ধা নিজেকে এখনও জমিদারের মেয়ে বলে মনে করে। তাই তার হুকুম সবার উপর বহাল থাকে। এদিকে সৌরদ্বীপ‌ সোমেনের‌ মনের কথা বুঝতে পেরে সোমেনের‌ সাথে স্নিগ্ধার‌ বিবাহ দেন এবং কিছুদিন পর মারা যান। এদিকে স্নিগ্ধা চাষী পরিবারকে ঘৃণা করে। তাই সোমেনকে‌ স্বামীর স্থান দিতে নারাজ। মাঝে মাঝে অনেক কটুক্তিও করে। সোমেন স্নিগ্ধাকে‌ বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। একদিন সোমেন নিজ জমিতে কাজ করছিল। মালতি স্নিগ্ধাকে‌ নিয়ে সোমেনের‌ খাবার দিতে যাচ্ছিল। খাবার স্নিগ্ধা দেয়না। তবে গ্ৰামটা ঘুরে দেখার জন্য মালতির‌ সাথে আসে। হঠাৎ এক চাষী মাথায় ধানের বোঝা নিয়ে যাবার সময় অসতর্কতা বশত স্নিগ্ধার‌ সাথে ধাক্কা লাগে। স্নিগ্ধা গরিবদের অত্যাধিক ঘৃণা করত। তাই সে চাষীর গালে সজোরে থাপ্পড় দিয়ে বলে -"ছোটলোক দেখে চলতে পারিস‌ না।"

চাষী ভয়ে তটস্থ হয়ে বলে -"ক্ষমা করবেন মা। মাথায় ধানের বোঝা থাকায় দেখতে পায়নি।"

"দেখতে পারিস নি নাকি সুন্দরী দেখলে চোখ ঠিক থাকে না।"
স্নিগ্ধার‌ চড়া গলায় অনেক লোক জমায়েত হয়। চাষী লজ্জায় মাথা নিচু করে কাঁদছে। মালতি স্নিগ্ধাকে‌ বোঝানোর চেষ্টা করেও না পেরে শেষে দৌড়ে সোমেনকে‌ ডেকে নিয়ে আসে। সোমেন ঘটনাস্থলে গিয়ে স্নিগ্ধার‌ এরূপ আচরণের জন্য যত রাগ ছিল সব রাগ দিয়ে স্নিগ্ধার‌ গালে থাপ্পড় মারে। তারপর হাত ধরে বাড়ি নিয়ে এসে ঘরে বন্ধ করে রেখে দেয় দুদিন। অনেক চেষ্টা করেও এই দুই দিনে মালতি বা সোমেনের‌ বাবা মা স্নিগ্ধাকে‌ বের করতে পারে না। তৃতীয় দিন সোমেনের‌ রাগ কমে যায়। সে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে দেখে দুদিন অনাহারে থেকে স্নিগ্ধা অজ্ঞান হয়ে গেছে। সোমেন তাকে কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তার পর দুদিন আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করে স্নিগ্ধার‌ সেবা করে তাকে সুস্থ করে তোলে। কিন্তু অহংকারী স্নিগ্ধা জ্ঞান ফিরে সোমেনকে‌ দেখে তার সব মনে পরে যায় । সে সোমেনকে‌ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। সোমেন তাকে আটকায় না কারণ দুদিনে তার শরীর‌ও ভেঙে গেছে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্নিগ্ধা কোথায় যাবে ঠিক করতে না পেরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে যায়। ক্লান্ত স্নিগ্ধা এক গাছের নিচে আশ্রয় নেয়। হঠাৎ কিছু লোক তার দিকে অগ্রসর হয়। তাদের দৃষ্টি খুবই খারাপ। তারা স্নিগ্ধাকে‌ নিয়ে ঠাট্টা করতে থাকে এমন সময় সোমেন স্নিগ্ধাকে‌ রক্ষা করে। স্নিগ্ধা রাগে ক্ষোভে সোমেনকে‌ বলে -"কেন এসেছ তুমি চলে যাও।"
সোমেন উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে -"চলে যাব। তবে তোমার বাবা কিছু টাকা রেখে গেছিল তোমার জন্য তাই দিতে এলাম।"
এই বলে একটা থলে তার মুখের উপর ছুড়ে সোমেন চলে যায়। স্নিগ্ধা দুঃখে সেখানে বসে অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদে তার পর আস্তে আস্তে থলে উঠিয়ে চলে যায়। হাঁটতে হাঁটতে অন্য গ্ৰামে চলে যায়। সেখানে এক জমিদারের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। স্নিগ্ধা ভেবেছিল হয়ত তার রূপে মুগ্ধ হয়ে জমিদার তাকে রাজরাণী‌ করে রাখবে। কিন্তু দীর্ঘ পথ অতিক্রমে ক্লান্ত আর অনাহার শরীর যেমন তার সৌন্দর্যে মলিনতা‌ সৃষ্টি করেছে তেমনি তার ধূলোমাখা বস্ত্র দেখে কেউ তাকে চাকরাণী‌ ছাড়া অন্য কিছু মনে করবে না‌। তাই জমিদার তাকে আশ্রয় দিলেও চাকরাণীর‌ মতোই তাকে দিয়ে কাজ করায়। কাপড় ধোয়া,বাসন মাজা সব কাজ তাকে করতে হয়। এমনকি দুবেলা খাবার জন্য তাকে খোটা শুনতে হয়। কিন্তু স্নিগ্ধা মুখ বুজে সব সহ্য করে। শশুর বাড়ির আদরের কথা মনে পড়ে। জমিদারি হারানোর সত্ত্বেও মেয়ের মতো যেরূপ‌ ভালবাসা তারা দিয়েছে তা স্নিগ্ধা মনে পরে কষ্ট পায়। এক দুপুরে সবাই ঘুমিয়ে থাকলে সে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে এবং সোমেনের‌ বাড়ি চলে যায়। সে প্রায় পাঁচ দিন বাড়িতে নেই অথচ তাকে দেখে কেউ অবাক হয়না। কোন কথা পর্যন্ত বলে না। একবার তার দিকে তাকিয়ে শাশুড়ি নিজের কাজে মন দেয়। মনে হয় যেন কিছুই হয়নি। তার শশুর তাকে খুব ভালবাসত তাই তার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে -"এতদিন কোথায় ছিলে মা। মালতির‌ বিবাহের দিন এলে না। সোমেন বলল তুমি নাকি কোন মামার বাড়ি গিয়েছিলে। তোমার এই অবস্থা কেন মা। অনেক রোগা হয়ে গেছ।"

স্নিগ্ধা কোন উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকলো। লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাওয়া দাওয়া করে বিছানার এককোণে মূর্তির মত বসে থাকল। রাতে সোমেন ঘরে ফিরে স্নিগ্ধাকে‌ দেখেও কোন কথা বলল না। বিয়ের পর থেকে স্নিগ্ধা বিছানায় শুতো‌ আর সোমেন মেঝেতে। তাই সোমেন মেঝেতে মাদুর পাতার সময় স্নিগ্ধা বললো -"আজ তুমি উপরে শোও।"

সোমেন এবার স্নিগ্ধাকে‌ ভালো করে দেখল। স্নিগ্ধা সেই আগের স্নিগ্ধা নয়। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগের মত লাবন্য নেই।কথার মধ্যে অহংকার বা চড়া ভাব নেই। সোমেন বলল -"না স্নিগ্ধা আমি নিচেই শোব।"

"ক‌ই তুমি তো জিজ্ঞেস করলে না আমি এতদিন কোথায় আর কিভাবে ছিলাম।"-অভিমানের‌ সুর করে বলল স্নিগ্ধা।

"দেখতেই তো পাচ্ছি ভালো আছ হয়তো ভালো কোথাও ছিলে।"

এবার অভিমান কান্নায় পরিণত হলো। সোমেন কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থেকে তারপর স্নিগ্ধার‌ কাছে গিয়ে তার হাত দুটো জোর করে নিজের হাতের মধ্যে রেখে বলল -"আমি তো আনতেই চেয়েছিলাম তুমিই তো ফিরিয়ে দিয়েছ।"

"তুমি জোর করে কেন নিয়ে আসনি।"

"সে জোর কি আমার ছিল।"

"অবশ্যই তুমি আমার স্বামী হ‌ও‌ সে জোর তোমার ছিল।"

এবার স্নিগ্ধা সোমেনের‌ পায়ে মাথা গুঁজে কাঁদতে শুরু করল সোমেন জোর করে তাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।


বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০

#বিষয় :: শব্দ আলোচনা (মীরাবাঈ)নাম::হার মানা হার পরাবো তোমার গলে # লেখায় :: শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 হার মানা


হার পরাবো 🌸

তোমার গলে


১৫২৭ চিত্তড়ের রাজা ভোজ আকবরের সেনা দ্বারা নিহত হলেন। আমি চিত্তড়ের সেই মীরা বাঈ শার "ঠাকরজী" মন্দিরে দাঁড়িয়ে অনুভব করছি ভক্তিবাদী সাধনার সেই যুগকে। কোথায় যেন সেই প্লাবনে ভাসছি শুনছি বাঁশির মৃদু সুর...... নুপুরের ঝুনু ঝুনু নিক্কোন। সেই পরমাত্মার প্রতি আপ্লুত বিশ বছরের মীরা। অতিন্দ্রিয়বাদী সেই ভক্তি রসে ভাসছি আমি। শুনছি  🌸 মীরা কে প্রভু গিরিধারী নাগরো............ 


সাধক রবিদাস, ছিল সামান্য মানুষ। জাতিতে কুমোর। মীরার গুরু হল সেই মানুষ। কৃষ্ণ নামে যে সবার অপরম পার। আজকের সমাজে বসে আমরা এই অসম্ভব জাগরণকে হয়ত অনুভব করতে পারবো না। সেই ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দিশাহারা ভারত। একদিকে তার ভগ্নপ্রায় প্রাচীন ধর্মীয় আদর্শ , অন্যদিকে বারবার বীধর্মীয় বিদেশী শক্তির আক্রমনে বিদ্ধস্ত ভারতীয় রাজনৈতিক মহল। মানুষের সোনালী দিনগুলো গত প্রায়। পেটে খুধা বুকে অবিশ্বাস হতবুদ্ধি  ভারতের সাধারণ মানুষ। এই সময় উঠে এসেছেন এই সব নীম্ন জাতির উচ্চমানের মানুষ সুরদাস কবীর নানক। সহজ কথায় যাঁরা জনসাধারণকে ঈশ্বরের সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধনে বেঁধেছেন। সে যে বন্ধনহীন বন্ধুত্ব। গান দোঁহা কবিতার স্রোতে ভেসে গেছে  অবিশ্বাস, না পাওয়ার ব্যথা। রাঠোর কন্যা চিত্তোর কুলবধূ যদি তার কান্ডারী হয়। ডুবন্ত নৌকার মাঝি । সে যে প্রানের বন্ধন হয়ে দাঁড়ায়। বাঁশি বাজে মরুভূমির বুকে বৃন্দাবনের কোলে। ভারতের গ্রাম গলি মহল্লা জেনেছে রানা সঙ্ঘের বড়ো পুত্রবধূ সুন্দরী সুশীলা কোমল যুবতী পথে নেমেছে। সমাজকে তুড়ি মেরে কৃষ্ণ নামে বিলীন হয়ে ভুলেছে পতিশোক, ভুলেছে পরিবারের নোঙরা খেলা, ভুলেছে ইহকাল ,ভুলেছে রাজনৈতিক গোলক ধাঁধা ......... ....🌸 পায়ো রে ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো .... শত শত মানুষ সেদিন এই রস সাধনায় বিলীন হয়ে মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছে। ঈশ্বর মন্দিরে থাকা এক পুতুল নয়। রক্তমাংসের মানুষের মত  ইন্দ্রিয়ের মাঝে তার বসত। তাকে ভালোবাসা যায়, ছোঁয়া যায়। বুকে জড়িয়ে কাঁদা যায়। ঈশ্বর প্রেম নিজের রঙে রাঙানো যায়। তাকে খাওয়াতে পরাতে চান করাতে মন্ত্র নয় ব্রাম্ভণ নয়। অন্তর্গত বন্ধু, বঁধুয়া যে সে।কেবল প্রেম চাই। বন্ধন যে জন্মান্তরের। বৃন্দাবনে  কৃষ্ণ পাগল ললিতা যে মীরা। এমনই লোকের মুখে ঘোরে। সংসারের কুটিলতা জানে না যে নারী তার যে কেবল ঠাকরজী আছে। সব ছেড়ে পথকে বলে মীরা.... তুঁহী মম শ্যাম সমান। 


চলে বিভোর মীরা । বৃন্দাবন যায়..... ঘোরে ভারতের পথে ঘাটে । ঈশ্বরের যে রূপ নেই , সে যে অরূপ রতন।তবে মন্দিরেও যে সে থাকে না। তাকে অন্তরে পেয়েছে। তেরশো  মীরা ভজন ঘুরে বেড়ায় মানুষের মুখে মুখে। মীরা তবে কি কেবল  এক সাধিকা? ঘর ছাড়া সন্ন্যাসিনী? 🌸আমি বলি মীরা এক সমর্পণের নাম। দেশের জন্য মীরার ত্যাগ কেউ হয়ত মনে রাখেনি। চিত্তড় আর মালবের শক্তির সামনে অসহায় পিতা ও ভ্রাতাকে সেদিন মীরার ত্যাগ যোধপুর রাজা রতন সিং কে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। বড়ো বোনের আত্মহত্যার পর মীরাকেই বধূ রূপে চিত্তড় যেতে হল।  অন্যের জন্য আসা বরযাত্রী , তাকে নিয়ে ঘরে ফিরল। তের চোদ্দো বছরের শিশু সুলভ বুদ্ধি নিয়ে রাজ অন্তঃপুরে মীরা। নারী মীরা। সংসারী মীরা। পতি ভোজের প্রেয়সী মীরা। কিন্তু মীরা কি করে ভুলবে এই মানুষের স্বপ্ন কিছু দিন আগেও তার দিদিশার চোখে ছিল। কেমন করে সব ভুলে মীরা প্রেমে পড়ে! তার ওপর ঠাকুর জী তার জীবনে বিশাল যাগায় আছে। কিশোরী থেকে যুবতী হতে হতে ভোজের মন জয় করছিল সাধাসিধে ভগবান বিশ্বাসী এই মেয়েটি। তাই তো তার সহস্র ভুলেও পরম আদরে পর্দা দিয়েছে রানা ভোজ। মীরা তাই তার গানে রানাকে অস্বীকার করতে পারেনি।ভোজের সাথে মীরার বন্ধনহীন বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল। সংসারের কুটিলতা তাদের দুজনের মধ্যে বিশাল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মীরা সরে গেছে দূরে, হয়ত নারী মন অভিমানী হয়েছে। হয়ত আরও গাড় সম্পর্ক মন চাইতো। ভোজের সঙ্গে মীরার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক । ভোজের দেখাশোনা মন দিয়ে করেছে যতদিন তাকে কাছে পেয়েছে। মীরা রাজার কাছে সমর্পিত ছিল ।ভোজ কিংবা কৃষ্ণের প্রতি তার সমর্পণ...... এক বন্ধহীন বন্ধন। 


মীরা ঐতিহাসিক চরিত্র। ঘটনা অক্ষুন্ন রেখে একটি ষোড়শ শতকের স্বভিমানী নারীকে ব্যাখ্যা করেছি। এক বহ্নিশিখা..... কুসংস্কারগ্ৰস্ত সমাজে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছে সেই নারী। শ্রেনী বৈষম্যের বীরোচিত সোচ্চার এক নারী।  ভালবাসার মাঝে বিদ্রোহিনী বিরাঙ্গনা। প্রতিটি আবেগী নারীর সাথে মীরার বন্ধহীন বন্ধন।

©copyright reserved for Sharmistha Bhatt. 

সোমনাথে তাকে শেষ দেখা যায়। 


(১৪৯৮ - ১৫৪৬) মীরা র সময়কাল।

মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

💕ঈশানী💕

 ✍- অঙ্কিতা

এয়ারপোর্টে বসে আছে ইশান। বহুদিন বাদে কলকাতা এসেছিল ও বাবার কাছে। কাগজের  দোকান থেকে একটা ম্যাগাজিন কিনে পড়ছিল, হঠাৎ একটা ছোট্ট বাচ্চা টলমল পায়ে এগিয়ে এল। ছোট্ট দুটো চোখে জুলজুল করে চেয়ে রয়েছে ওর দিকে। ইশান আলতো করে গালটা টিপতেই ফিক্ করে হেসে দিল বাচ্চাটা। "কথা বলতে পারেনা এখনও" বলে উঠল একজন ভদ্রলোক।


 -"Sorry  দাদা। কোনভাবে অসুবিধা করেনি তো? আর বলবেন না, এত দুষ্টু না আমি আর আমার বোন কি চিন্তায় পড়ে গেছি!"


ইশান- না না ওইটুকু পুঁচকে কি জ্বালাতন করবে বলুন?ওরা জ্বালাতনের কি বোঝে?


- "হ্যাঁ তা যা বলেছেন" বলতে বলতে ভদ্রলোক বসলেন পাশের সিটটায়। হাতে একটা ট্রলি ব্যাগ আর খুশি বলে কাকে যেন ডাকলেন। এক মাঝবয়সি মহিলা তাদের দিকে  আসলেন। ইশান বুঝল এটি বাচ্চাটির পিসি।

 

খুশি- (বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে)খুব সেয়ানা হয়েছো তুমি! খালি বদমাইশি!

(বাচ্চাটি অবলীলায় হাসতে লাগল)


ইশান- নাম কি ওর? কি মিষ্টি দেখতে!


খুশি- ইশানী


বাচ্চাটি এবার ইশানের দিকে যাওয়ার জন্য  উশ-খুশ করতে লেগেছে।


ইশান- দিন দিন আমার কাছে দিন। ইশানী, ইশানকে চিনতে পেরেছে বোধহয়! তাই ওমন ভাবে  উতলা হচ্ছে!


খুশি- নিন। আসলে খুব চালাক, জানেন না তো। নতুন কাউকে পছন্দ হলেই তার সাথে হুজ্জুতি করতে থাকে! দাদাকে পেলে দাদার সাথে মিলে মাতিয়ে দেয় বাড়ি।


ইশান- এইতো বয়স দুষ্টুমি করার... তা আপনারা যাবেন কোথায়?


ভদ্রলোক এবার বলে উঠলেন "ঐ তো দিল্লি। আসলে এখানে আসা আমার শ্বশুড়বাড়িতে। এই যে মহারানীকে দাদু দীদার কাছ থেকে কদিন ঘুরিয়ে নিয়ে গেলাম আর কি।"


ইশান---ওহ! আচ্ছা! আচ্ছা! আমারও তো দিল্লির ফ্লাইট। চাকরি সুত্রে থাকা আর কি।


- হ্যাঁ  আমারও... যাই হোক, নমস্কার! আমার নাম রাঘব চ্যাটার্জী। আপনার নাম তো জেনেই গেলাম।


খুশি- দিন আপনি ওকে আমার কাছে দিন। অনেকক্ষন আপনার কোলে আছে, অসুবিধা হচ্ছে আপনার।


ইশান- না! না! I love babies...সমস্যা হচ্ছে না কোনো। আচ্ছা If you don't mind, তবে একটা প্রশ্ন করি?

 

রাঘব- হ্যাঁ! নিশ্চয়ই বলুন।

 

ইশান- আপনার স্ত্রী... না মানে এত ছোট্ট মিষ্টি বাচ্চা আর তার মা'কে দেখছি না, আপনি সামলাচ্ছেন...


রাঘব- She is no more... একটা ম্যাসিভ হার্ট-অ্যাটাকে মারা যায় এই পাঁচ মাস আগে।


ইশান- ইশ! I'm extremely sorry...


ইতি মধ্যে বিমানে ওঠার ঘোষনা হয়। আর ছোট্ট ইশানীকে কোলে নিয়ে, এক হাতে ট্রলি আর পিঠে ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে চলেন রাঘব। ইশান আর খুশিও তাদের লাগেজ নিয়ে উঠে আস্তে আস্তে রওনা হয়।

হঠাৎ বেকায়দাতেই রাঘবের হাত থেকে ওর  মানিব্যাগটা পড়ে যায়।


ইশান- দাঁড়ান! দাঁড়ান! আমি তুলে দিচ্ছি।

মানিব্যাগটা তুলতে গিয়ে ইশানের নজর হয় তাতে থাকা  ফোটোটায়।


রাঘব- She was my wife...ইশানীর মা, অদ্রীজা!


 

প্লেনের সামনের একটা রো'তে রাঘবদের সিট। ইশানের সিট টা শেষে কর্ণারে উইন্ডো সিট্।


বাইরে তাকিয়ে ইশানের এরকমই একটা দিন মনে পড়ে গেল, প্রায় দেড় বছর আগে যখন ইশানের প্রথম ট্রান্সফার অর্ডারটা আসে।


অদ্রীজা- তুই চলে যাবি? আজকে আট বছর ধরে আমাদের সম্পর্কটা। তুই এখনও আমাকে তোর স্ত্রী হিসাবে মর্যাদাটুকু দিসনি। এখন তো সেই সিদ্ধান্তটা নে। 


ইশান- অদ্রীজা! ব্যাপারটা বোঝ, আমার চাকরির মোটে চার বছর। আর কটা দিন যেতে দে। আমি এখনই চাই না এসব। আর ওরকম ভাবে শুধু রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে নেওয়াটা পোষাবে না। বাবা-মায়ের, ফ্যামিলির, বাকি সবার ইচ্ছাটাও তো দেখবি।


অদ্রীজা- কিন্তু আমি যে তোর ফ্যামিলির চার্মকে নিজের ভেতরে বড় করছি সেটা? আমাকে যে সমাজ কুলটা বলবে সেটা? এগুলোর কোনো দাম নেই?


ইশান- আমি তোকে বলেছিলাম abort করিয়ে নিতে। আমি সেসব খরচাপাতি দিয়ে দিতাম। তুই, আমি কেউই এখনই এরকম দায়িত্বর জন্য প্রস্তুত না। আমি তো একদমই না। ওটা ভুল করে ঝোঁকের বশে হয়ে গেছিল।


অদ্রীজা- তোর, আমার ভুলের জন্য একজনকে মেরে ফেলতে আমি পারব না। আমার নাড়ীর টানটা এত সহজে নষ্ট করতে আমি পারব না।


সেদিন অদ্রীজার সাথে যদি ইশান থাকত, তাহলে আজকে ঐ ছোট্ট ইশানীকে অন্যের থেকে চেয়ে আদর করতে হত না। অদ্রীজা নেই তবে অদ্রীজার অংশটা ইশানের কাছে থেকেও নেই...!!

All right©rights reserved.

# বিষয় - সান্ধ্য আলোচনা (অনুগল্প) নাম - ম্যানেজমেন্ট#লেখায় - শর্মিষ্ঠা ভট্ট

নাম - ম্যানেজমেন্ট


বড়ো ঘুম বড়ো ঘুম। বেলা নটার আগে চোখ খুলতে চায় না আয়নার। অফিসের কাজ ঘরে হলে যা হয়। তার ওপর রাত ভোর পড়া। সামনের ইউ পি এস সি কমপ্লিট করতে চায়। এই সময় তো নিজেকে নিকড়ে দেবার।ক্লাস টেন দেবার আগে কার কাছে যেন শুনেছিল, আগে যারা ছোটে শেষে বসে খায়।তাই যদি হয়, তাই রাত দুটো আড়াইটা হয়ে যায়। সকালে ওঠা অন্তত দশটা ধরে রেখেছে। ওর বন্ধুরা তো দুপুর বারোটাও করে ফেলে। তবে আয়নার যোগা আছে একটু আগে ওঠার চেষ্টা করে। লেট নাইট নিয়ে বড়োদের কাছে প্রায় লেকচার শুনতে হয়। কিন্তু ওদের কে বোঝাবে সময় পাল্টে যাচ্ছে। আগে আইটি সেক্টর ছিল? ছিল এত কম্পিটিশন কিংবা সময়ের দাম। লেটরাইজার কুঁড়ে বা অলস নয় সব সময়।শরীরের আট ঘন্টা ঘুম তো চাই। একে সময় ম্যানেজমেন্ট  বললে মন্দ হয় না। কে কি বলল কি এসে যায় ! কুল থাকাটা দরকারী। আর ওরা এখনের জেনারেশন বলে " চাপ নিও না" । 


আয়নার মা মৃদু হেসে মেয়েকে তুলে দেয়, ওদের এই "বিন দাশ " ভাবটা ওনার পছন্দ। আয়না কাজের বিষয়ে কিন্তু অনেক এক্টিভ ও স্ট্রঙ্গ। সে যে যা বলুক মা মাথা খায়, কি এসে যায়। এদেরও পরিশ্রম অনুসারে বিশ্রাম চাই। আগে শুনেছে ঠাকুমার সময় চারটেতে উঠত, আর সন্ধ্যা হতে না হতে ঘুম। তারপর লাইট টিভি পড়াশোনা কর্মজীবনের চাকায় ঘড়িও বদলাচ্ছে, আরও বদলে গেলে ক্ষতি কি! কর্মব্যস্ত জীবন হবে আরও। 

©কপিরাইট অধিকারী শর্মিষ্ঠা ভট্ট।

চ্যালেঞ্জ(অন্তিম পর্ব)

 


কলেজে হওয়া চ্যালেঞ্জ রক্ষা করতে সুমিত গণেশের পলাশবাড়ী সার্কিট হাউসে আসা,আসা থেকেই নানা অলৌকিক ঘটনার সামনে করে ওরা।পল্লবীর ডায়েরি পড়ে জানতে পারে ওর মায়ের নিখোঁজ আর বাবার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর যেটা আদৌ স্বাভাবিক নয় পল্লবীর লেখা অনুযায়ী।কিন্তু পল্লবীর কি হলো সুমিত লনে ঘুরতে ঘুরতে তিরপল ঢাকা দেওয়া গাড়িটার তিরপল ওটায়।তারপর------

     তিরপল সরাতেই আমি একটা ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সামনে করলাম।একটা তীব্র বিশ্ৰী গন্ধে আমার শরীর ঝিম ঝিম করে উঠলো।গাড়ির সামনের কাঁচটা কেউ যেনো জোড়ে আঘাত করে ভেঙে দিয়েছে।ড্রাইভারের সিটে স্টিয়ারিং ধরে বসে আছে একটা নর কঙ্কাল তার গায়ের প্রায় সমস্ত মাংস গলে পচে পরে গেছে কিছুটা বোধহয় লেগে আছে যার জন্য সেখানে কিলবিল করছে সাদা সাদা পোকায়।কঙ্কালটার ঘাড় টা কেউ যেনো মটকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।ওটা পুরুষ না মহিলা বোঝা যাচ্ছে না।তবে একটা টি শার্টের কিছু কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে,নিচের পর্শনে জিন্স টাইপের কিছু পরা।আমি আর সে দৃশ্যের সামনে করতে পারিনা,তাড়াতাড়ি ওটা চাপা দিয়ে দিই।তাহলে কি এটা পল্লবী,শেষ মুহূর্তে বাঁচার আশায় গাড়ী নিয়ে পালাতে গিয়েছিল।কিন্তু কঙ্কাল তো একটা রজতের কি হলো।মনের ভয় তখন জেদে পরিণত হয়েছে, এ রহস্য আমায় খুঁজে বের করতেই হবে।আর আমার মন বলছে সব রহস্যের সমাধান ওই দোতলায় আছে।আমি দৌড়ে ঘরে ঢুকে চাবি নিয়ে সিঁড়ির পথ ধরি।বাইরে তখন আবার ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে।আমি সব উপেক্ষা করে ওপর তন্ন তন্ন করে খুঁজি মরচে পড়া তালা ঝুলছে প্রায় প্রতিটি ঘরে।সেরকম সন্দেহ জনক কিছু চোখে পড়ে না।আমি এবার ছাদের দিকে যাই।অবিরাম জলে ছাদের শ্যাওলা গুলো জেগে উঠেছে, আমি চারদিক ঘুরে দেখি হটাৎ ছাদের কোনায় একটা ঘর যার দরজাটা আধা খোলা ।আমি সেদিকে এগোতে থাকি।দরজার ওই টুকু ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতরে জমাট অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।একে দিনের শেষে মেঘলা আকাশের ফলে আলো তখন অনেক কম।আমি নিচে থেকে মোমবাতি আনি।ঘরের দরজার ভিতরে ঢুকতেই সেই বিশ্ৰী পচা গন্ধ,যেনো আমি কোনো পরিত্যাক্ত মর্গে ঢুকেছি। দেশলাই দিয়ে মোমবাতি জ্বালাতেই এক ভয়াবহ দৃশ্যের সামনে আমি করলাম।ঘরের কোনের দিকে একটা কঙ্কাল উবু হয়ে পরে আছে যার গায়ের জামা কাপড় তখনো অবিকৃত তার হাতে ধরা একটা কঙ্কালের খুলি।বাম দিকে ফিরতেই আমার রক্ত হিম হয়ে গেলো,একটা সিন্দুকের মতো বাক্সের ঢাকা সামান্য একটু খোলা তার ভিতরে গণেশ মাথা ঢুকিয়ে কি যেনো খুঁজছে।কিন্তু গণেশ তো আমায় চাবি দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, আমি সেই চাবি দিয়ে দরজা খুলে এখানে এসেছি।আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে।ভয়চকিত কণ্ঠে আমি গনেশকে ডাকতে লাগলাম, গনেশ নিশ্চল হয়ে রয়েছে।আমি গনেশকে ডাকার জন্য যেই না ওর গায়ে হাত দিয়ে নাড়িয়েছি বাক্সের খোলা অংশটা দরাম করে বন্ধ হয়ে গেলো আর আমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লো গণেশের মুণ্ডুহীন দেহ।আমি ভয়ের চোটে হাতের মোমবাতি ফেলে সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে দরজার দিকে দৌড়লাম।পাগলের মতো নিচের দিকে নামতে লাগলাম আমার পিছনে তখন অনেক পায়ের শব্দ আর বিকট অট্টহাসি,আমি আর একমুহূর্ত এখানে থাকতে চাইনা।পাগলের মতো লন পেরিয়ে বাইরের দরজার দিকে ছুটি দরজা খুলতেই দেখি আমার সামনে দাঁড়িয়ে গনেশ মৃদু হেঁসে বলে সুমিত তুই চ্যালেঞ্জ হেড়ে গেলি ভুতের ভয়ে পালাচ্ছিস,কিন্তু পালাতে তো আমরা শিখিনি,ঘরে চ আমরা এখানেই থাকবো।

       *      *      *    *   *

@copyright reserved by sougata

     অনেক চেষ্টা করে আমি জানলার ফাঁক দিয়ে। গনেশকে টেনে বেরকরলাম সাড়া গায়ে জল কাদা পানা লেগে একাকার। রাস্তা পার করে দেখি রজত আর পল্লবী গাড়ী নিয়ে আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে।ওরা আমাদের দিকে দেখে খুব হাঁসতে লাগলো রজত তো বলেই বসলো কি রে সুমিত ভুতের চ্যালেঞ্জ একসেপ্ট করার কথাতেই কাপড় চোপর নোংরা করে ফেলেছিস।গনেশ হাত তুলে বিরক্ত হয়ে বলে একটা অজ জায়গায় থাকিস আবার বরো বরো কথা।আগে বাড়ি নিয়ে চ ফ্রেশ হয়ে বলবো ভুতের ভয়ে না কি জন্য জামাকাপড় নষ্ট হয়েছে।

 পল্লবী হেঁসে বলে ঠিক আছে ঠিক আছে চ আগে সার্কিট হাউসে চ।বাবা মাও এসেছেন তোদের নিতে গাড়িতে বসে আছেন। আমরা গাড়ির দিকে এগিয়ে যাই আমাদের সামনে একটা কিম্ভুত কিবাকার জন্তু,খানিকটা কুকুরের মতো কিন্তু কুকুর নয় থাবায় মানুষের মতো আঙ্গুল তবে চারটে।আমি পল্লবীকে জিজ্ঞাসা করি ওটা কি রে ? পল্লবী রহস্যময়ী হাঁসি হেঁসে বলে ওই তো সার্কিট হাউসে রক্ষক,ওরা নাম আলবার্ট ডিসুজা।

    গাড়িটা ওঁদের নিয়ে কুয়াশার ভিতর হারিয়ে যেতে থাকে।ততক্ষণে পুলিশ ,দমকল,লাশ তোলার গাড়ি সবাই পলাশ বাড়ি বাস স্টপেজের একটু আগে মরা দীঘির খাল ঘিরে ফেলেছে।এখন শুধু ক্রেনের অপেক্ষা যাত্রী বোঝাই বাসটা কালি দীঘি গ্রাস করেছে যে ভাবে পাঁকে গেঁথে গেছে যাত্রীদের আর বাঁচার আশা নেই।

           ------- সমাপ্ত-----

   

    


প্রতীক্ষা (* পারমিতা মন্ডল।,)

বিষয় ---অণু গল্প। (বাইশ বছরপর।)
নাম-- প্রতীক্ষা ।
কলমে-- পারমিতা মন্ডল।

আজ আবার তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল দীর্ঘ বাইশ বছর পর । ঠিক যে জায়গায় তোমার  জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম আমি। আজ আবার সেখানেই দেখা হয়ে গেল । দেখ ভাগ্যের কি পরিহাস। তোমার আমার সম্পর্কটা ওরা মেনে নিল না কিছুতেই । আলাদা করে দিল আমাদের। কিন্তু সত্যিই কি আলাদা করতে পেরেছে ? 

 একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে পায়েলের বুক চিরে। এতোদিন বাদে যে তার আবার মৈনাকের সাথে দেখা হবে ভাবতে পারেনি পায়েল । দীর্ঘ বাইশ বছর পর। কি হয়েছিল তাদের ? কেন তারা আলাদা হয়ে গেল ? আর আজ কিভাবেই বা তাদের দেখা হলো ? চলুন ফিরে যাই বাইশ বছর আগে।

    আজ থেকে বাইশ বছর আগে সমাজের চিত্রটা আজকের মতো ছিল না । তখনো বাবা  মায়ের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো সাহস সব মেয়ে যোগাড় করে উঠতে পারেনি । সেই সময় মন দেওয়া নেওয়া হয় পায়েল আর মৈনাকের । পায়েল সম্ভ্রান্ত  ব্র্যাক্ষ্মন পরিবারের সন্তান ছিল । বাবা  মায়ের একমাত্র মেয়ে । ওদিকে মৈনাক ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান। টাকা পয়সার কোন অভাব ছিল না । কিন্তু ব্রাক্ষ্মন ছিল না । এখানেই ছিল পায়েলের বাবা  মায়ের জোর আপত্তি । কিন্তু ওরা ভেবে ছিল মৈনাক ভালো চাকরি পেয়ে গেলে এই বাঁধা আর বাঁধা থাকবে না । হয়তো পায়েলের বাবা মা মেনে নেবে। কিন্তু না , ওরা মেনে নেয় নি । মৈনাক খুব ভালো পোস্টে চাকরি পায় । তবুও তার জন্ম পরিচয় তাদের কাছে বাঁধা হয়েই থাকে ।কিন্তু ওরা দুজন  দুজনকে এতোটাই ভালো বাসতো যে তারা কেউ কাউকে ছাড়তে চায়নি। তাই পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভেবেছিল কিছু দিন কেটে গেলে বাবা মা সব মেনে নেবে । 


সেদিন ছিল ২৪ শে ডিসেম্বর। বড় দিনের আগের দিন । দু'জন বন্ধুর সাথে প্ল্যান করে পায়েলকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় মৈনাক । সেই মতো নৈহাটির কাছে এই ছোট্ট পার্কটিতে অপেক্ষা করতে থাকে মৈনাক । এখান থেকে কালি মন্দির বেশী দূরে নয় । ওখানেই ওদের বিয়ে হবে মাকে সাক্ষী রেখে ।  দুরু দুরু বুকে এক রাশ স্বপ্ন নিয়ে মৈনাক অপেক্ষা করছে তার স্বপ্ন সুন্দরীর জন্য । চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছে লাল চেলী পরে , চন্দনের সাজে পায়েল এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে । কি অপরূপ লাগছে পায়েলকে ।যেন স্বপ্ন সুন্দরী ।চোখ খুললেই যেন স্বপ্নটা ভেঙে যাবে।কিন্তু স্বপ্নটা  ভেঙেই গেল । প্রতীক্ষা করতে করতে রাত ভোর হয়ে গেল।  পায়েল এলো না । কি হলো ব‍্যাপারটা ? কেন এলো না সে ?  এমন তো হওয়ার কথা ছিল না । তাহলে কি কোন সমস্যা হলো ?

সারারাত বসে থেকে ভোর বেলায় এক বুক হতাশা নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে মৈনাক। তখন মুঠোফোনের এতো প্রচলন ছিল না । তাই একটু সকাল হতেই বন্ধুর বাড়িতে ছোটে পায়েলের খোঁজ নিতে। জানতে পারে ওদেরই একটি বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করে পায়েলের বাবা মাকে সব ঘটনা জানিয়ে দেয় । তাই পায়েলকে কিছু বুঝতে না দিয়ে রাতারাতি তারা বাড়ি ছেড়ে কোথায় যেন চলে  গেছে। পায়েলকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। প্রচণ্ড ভেঙে পড়ে মৈনাক। সে সত্যিই পায়েলকে ভালো বেসেছিল। কি অপরাধ ছিল তার ? শুধু তথাকথিত উঁচু জাত ছিলো না বলে ?

তারপর থেকে আজ বাইশ বছর ধরে প্রত‍্যেক বছর এই দিনটিতে মৈনাক এসে বসে পার্কের সেই নির্দিষ্ট জায়গায়। যেখানে সে বাইশ বছর আগে পায়েলের জন্য অপেক্ষা করেছিল। তার বিশ্বাস ছিল একদিন না একদিন পায়েল ঠিক আসবে । সে অন্য কাউকে ভালো বাসতে পারে না । তাকে আসতেই হবে ।  তাদের ভালোবাসা  জন্ম জন্মান্তরের । কেউ তাদের আলাদা করতে পারবে না । আর আজ এতো বছর পর তার দেখা পেল। 

বাইশ বছর বাদে পায়েলও এলো এদেশে । ওকে সেই রাতে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল মাসির বাড়ি । সেখান থেকে লন্ডন। আর কোন ভাবেই সে মৈনাকের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেনি । দিনের পর দিন  অসহ্য যন্ত্রণায় ভাঙচুর হয়েছে। কাটা ছাগলের মতো ছটফট করেছে । গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে দৌড়ে পালাতে গিয়েও পারেনি। সে যে কিছুই চেনে না এই শহরের। তারপর আস্তে আস্তে একদিন স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। দীর্ঘ বাইশ বছর কেটে গেছে তারপর। কিন্তু মৈনাককে সে একদিনের জন্য ও ভুলতে পারেনি। আবীরকে বিয়ে করতে বাধ‍্য হয়েছে। কিন্তু মন পড়ে আছে মৈনাকের কাছে। ওরা জোর করে মৈনাককে কেড়ে নিয়েছে । ওদের মিলন ঘটাতে দেয়নি । কিন্তু মন থেকে কখনোই কেড়ে নিতে পারেনি।  আজও এতো বছর পরেও পায়েলের একমাত্র ধ‍্যান জ্ঞান মৈনাক।

মাঝে মাঝে মনে হয়েছে সে আবীরকে ঠকাচ্ছে। কিন্তু আবীরের কোন ইচ্ছা সে অপূর্ণ রাখেনি । তবে মনের মধ্যে যাকে একবার স্থান দিয়েছে ,কোনদিন  সেই জায়গায় আর কাউকে বসাতে পারেনি পায়েল । তাই মৈনাককে ভুলে যাওয়া তার পক্ষে কোন দিন সম্ভব হয়নি।  এদেশে আসার পরই পায়েলের প্রথম মনে পড়েছিল সেই পার্কটার কথা । যেখানে সারারাত শীতের মধ্যে মৈনাক তার  জন্য অপেক্ষা করেছিল । তবে সে ভাবতে পারেনি আজও মৈনাক একই ভাবে  একই জায়গায় তার জন্য অপেক্ষা করবে। বাইশ বছর পরেও  তাদের ভালো বাসায় একটুও কম হয়নি।

পায়েলকে চোখের সামনে দেখে মৈনাক প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি যে, সত্যিই সে এসেছে ? তার এতদিনের প্রতীক্ষা কি আজ তবে শেষ ? এবার কি সে পায়েলকে নিয়ে সুখী হবে ? গড়তে পারবে ছোট্ট সুখনীড়? না, তা যে আর হয়না । পায়েল আজ অন্য কারো ।দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে কথা হারিয়ে যায় । দু'চোখ বেয়ে শুধু জল পড়ে। কেন এমন হলো ? কিছু মানুষের ভুলে তাদের দুটি জীবন নষ্ট হয়ে গেল । পরিনতি পেল না  তাদের ভালো বাসার। 

"বিয়ে করেছো মৈনাক ?"- হঠাৎ বলে ওঠে পায়েল । "হ‍্যাঁ, করেছি তো । আজ থেকে বাইশ বছর আগে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। লাল চেঁলী পরে, কপালে চন্দনের রেখা এঁকে সে আমার ঘরে কখনো আসেনি কিন্তু মনে তার নিত্য আশা যাওয়া । সে আমার সুখ দুঃখের সাথী । আজ বাইশ বছর ধরে আমি তার সাথে ঘর করছি।"

পায়েল ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে । এতো ভালো বাসে সে তাকে আজো ?  কিন্তু আজ আর পায়েলের কোন অধিকার নেই তার কাছে যাওয়ার । তাকে ছুঁয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার । পায়েল তাকিয়ে দেখে মৈনাকের অনামিকায় আজও তার দেওয়া সেই রূপোর আংটি আর সস্তা দামের সেই ঘড়িটা । আজও একই ভাবে টিক টিক করে বয়ে চলছে।

  আবীর এসে ডাক দেয় পায়েলকে । চলে যেতেই হবে । থাকা হবে না আর মৈনাকের কাছে । তবে আর বেশী দিন নয় । পায়েল ফিরবে মৈনাকের কাছে ।  সে দিনের আর বেশী দেরী নেই ।" যেদিন ওদের দেখা হবে  আকাশ পথে ।  যেতে যেতে পায়েল বলে যায় "--- অপেক্ষা কর মৈনাক, আমি আসছি----- তোমার আমার আবার দেখা হবে আকাশ পথে ।"


সমাপ্ত।
(দেরী হওয়ার জন্য দুঃখিত ।)
copyright s are reserved for paramita mandal.






সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২০

#বিষয়- আধ্যাত্মিক পর্ব- ১৭ মৃদুল কুমার দাস।

#নাম-

আমি ঘর বেঁধেছি'।
         (আধ্যাত্মিক)
            পর্ব- ১৭
    স্কুলের চিত্র শিল্পী শিক্ষিকা এবেনিজার কুকের প্রস্তাবে ( লেডি ইসাবেল মার্গসনের বাড়িতে ভারতীয় সন্যাসী আসছেন) লেডি ইসাবেলের বাড়িতে যাওয়া নিয়ে মন থেকে খুব একটা সায় মার্গারেটের ছিল না। তবে ভারতীয় সন্যাসী শুনে যেন এক চিলতে আশা জাগল। সেই ছোট্টবেলার ভারতবর্ষের প্রতি একটা অন্তর্লীন টান থেকে এই আশা। গেলেই হয়। বহু ধর্মীয় নেতা তো দেখলেন, না হয় আর একজনকে দেখাই যাক। ইতিমধ্যে অবশ্য এমার্সন ও থরোর রচনা থেকে হিন্দুদর্শন সম্পর্কে তিনি প্রাথমিক ধারণা লাভ করেছেন। উইম্বলডনে এসে জর্জ হটিনের কাছ থেকে নিয়ে পড়েছিলেন 'লাইট অব এশিয়া'। বুদ্ধ ও তাঁর বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে মার্গারেটের যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে। খ্রিস্টের পূর্বসুরি হিসেবে বুদ্ধের প্রতি একটা আলাদা জায়গা গড়ে উঠেছিল মনে র মধ্যে। তাই তিনি তাঁর স্কুলে ছাত্র ছাত্রী ও অভিভাবকদের ধর্মীয় গোঁড়ামিকে উপেক্ষা করে স্কুলের স্টুডিওতে ম্যান্টলপিসের উপর বুদ্ধের একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করেছিলেন।
তাই ভারতীয় সন্যাসীর প্রতি একেবারে উন্নাসিক থাকাও অসম্ভব ছিল। তার উপর সিসেম ক্লাবের কয়েকজন সদস্য, বিশেষ করে ই টি স্টার্ডি ও হেনরিয়েটা মূলার সবিস্তারে বর্ণনা করলেন ভারতীয় সন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের অলৌকিক ক্ষমতার কথা।
মার্গারেট মনোস্থির করলেন যাবেন। আর মর্টিমার রেজিন্যাল্ড মার্গসনের স্ত্রী লেডি ইসাবেলও তাঁর বিশেষ পরিচিত। সমবয়সী, উদারপন্থী, নারীবাদী ও ফ্রয়েবেলীয় শিক্ষা পদ্ধতির সযর্থক। একদম নিজস্ব ঘরোয়া পরিবেশ। তাই সভায় যোগ দিতে মন মোটামুটি সায় দিল। সেদিন রবিবার। এমনিতেই ব্যক্তিগত কাজের ব্যস্ততা থাকে। ও দিন যাবেন বলে সব কাজ আগে থেকে সেরে রাখলেন।
   ১৮৯৫ এর ১০ নভেম্বরে রবিবার অপরাহ্নে কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে মার্গারেট পায়ে পায়ে সভাকক্ষে যাচ্ছিলেন, সেদিন কোনো বাড়তি উদ্দীপনা বা আবেগ ছিল না। চেলসির অদূরে বেলগ্রাভিয়ার সেন্ট জর্জেস রোডে  মার্গসনদের ৬৩ নং  বাড়িতে হাজির মার্গারেট। পনেরজন অভ্যাগত। সবার শেষে এসেছেন মার্গারেট। তাই একটু কুন্ঠা মনের মধ্যে। একেবারে পেছনে নির্লিপ্ত মনে বসলেন। সন্ন্যাসীর সৌম মূর্তিতে প্রথম দর্শনেই মন ভরে গেল। সব কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। এতটাই মনোযোগ সহকারে শুনেছেন যে প্রশ্ন অনেক ভেসে উঠল। সব প্রশ্নের উত্তর একে একে মীমাংসা নিয়ে খুব খুব সন্তুষ্ট। তারপর!
  পরের পর্বে।
      ( চলবে)
   @কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 


চ্যালেঞ্জ(পঞ্চম পর্ব)

 কলেজ ক্যান্টিনে পল্লবীর ভুতের বিশ্বাস দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে গণেশ আর সুমিত পলাশবাড়ী সার্কিট হাউসে এসে ওঠে।প্রথমরাতেই বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনার সামনে ওরা করে।পরদিন আলমারি থেকে পল্লবীর ডায়েরি পরে জানতে পারে এই ঘটনার সামনে পল্লবী করেছিল।একদিন রাতে ওর বাবা অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে ।তারপর------

    দরজায় পিঠ চেপে দাঁড়িয়ে আমি আর মা রীতিমতো হাঁফাতে আরম্ভ করেছি।বাবার ওকি ভয়ানক চেহারা,আজ অব্দী আমি বা মা বাবাকে ওই ভাবে দেখিনি।বাইরে কোনো শব্দ নেই,তবে কেনো যেনো মনে হচ্ছিল আমাদের দরজার ঠিক বাইরে কোনো এক জানোয়ারের ঘন ঘন নিশ্বাস নেওয়ার শব্দ হচ্ছে।কতক্ষণ এরকম ছিলাম জানিনা হটাৎ মায়ের ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দে আমার হুঁশ ফেরে ।মা তখন বাবার চিন্তায় কাঁদতে শুরু করেছেন।আমি কি করবো বুঝতে পারি না ,ঠিক তখনই বাইরে লনে রাখা গাড়ির দরজা বন্ধ করার শব্দ পাই।তারপরই কিছু একটা টেনে হিঁচড়ে আনার শব্দ শুনতে পাই।আমি কান খাড়া করে কিসের শব্দ বোঝার চেষ্টা করি।একটা অস্ফুট গোঁঙানি ,কোনো মেয়ে,হ্যাঁ একটা মেয়ের গোঙানীর শব্দ।শব্দটা লন পেরিয়ে আমাদের বারান্দার কাছে।আমি দরজাটা খুলে দেখার চেষ্টা করি।সে দরজা বাইরে থেকে কে যেনো বন্ধ করে দিয়েছে।বাইরে তখন একটা হুটপাটি শব্দ এবার গোঁঙানি কণ্ঠ আর্তনাদে রূপান্তরিত হয়েছে, পরিষ্কার একটি তরুণীর প্রচন্ড আর্তনাদ।আমি মা দুজনেই জানলার দিকে দৌড়ে যাই যদি চিৎকার করে কারো সাহায্য পাওয়া যায়।জানলার পাল্লা খুলতেই দেখতে পাই জানলা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বীভৎস মহিলা যার চোখের কোলে কালি পড়া তার ভিতরে ধক ধক করে জ্বলছে দুটো সাদা মনি।এলথেলো চুলের ভিতর এক অশরীরী হাঁসি।আমার প্রচন্ড ভয়ে তখন মুখের ভাষা চলে গেছে।মা ওই দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারিয়েছেন।শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে জানলার পাল্লাটা বন্ধ করি।অচৈতন্য মা কে কোনোক্রমে বিছানায় টেনে তুলি।আমি কি করবো এখন,দরজা ধাককে বাবাকে ডাকতে যাবো বলে যেই দরজার দিকে যাবো বলে ঠিক করেছি দেখি দরজা আগলে দাঁড়িয়ে সেই বিভিৎস জানোয়ারটা ,আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো।ওটা এখানে কখন ঢুকলো???জন্তুটা স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

      সকালের রোদ্দুর চোখে পড়তেই আমি হুড়মুড় করে উঠে বসলাম।চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম,মা আমার পাশে নেই।মা মা করে ডাকতেই মা ঘরে এসে জিজ্ঞাসা করলেন কেনো ডাকছিলাম।মায়ের দিকে কৌতুহলী হয়ে কালকের ঘটনার কথা উল্লেখ করায় মা তাড়াতাড়ি আমার কপালে হাত দিয়ে দেখতে লাগলেন আমি ঠিক আছি কিনা।বাবার কথা জিজ্ঞাসা করতেই জানলাম বাবা নাকি নিয়মমত কাজে বেরিয়েছে।আরো অবাক হলাম কাল নাকি বাবাকে ছাদ থেকে ডেকে আমি খেয়ে শুয়ে পরি।রাতে একবার ঘুম থেকে উঠে বাইরে পায়চারী করে আবার কখন বিছানায় এসে ঘুমিয়ে পরি।তারমানে এইসব ঘটনার কিছুই হয়নি,সব আমার কল্পনা।

    এগুলো যে আমার শুধুমাত্র কল্পনা নয় সেটা বুঝলাম রান্নার মাসির একটা কথা শুনে।ওঁদের গ্রামের একটা ১৬ বছরের মেয়ে কাল সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ,গ্রামের লোক তল্লাশি চালাচ্ছে।

     এখানে ফোনের টাওয়ার একদম পাওয়া যায় না।আজ বহু কষ্টে রজতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি।ও আজ কালের মধ্যে আসছে।কিন্তু আমি কালকে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো মেলাতে লাগলাম।আমাকে এটা খুঁজে দেখতে হবে।

   চাবি নিয়ে দোতলায় উঠলাম,সেই ঘরের দরজাটা এখনো আধা খোলা।দরজাটা ঠেলে খুলতেই আমি চমকে উঠি ঘরের ধুলোর আস্তারণ কিছুটা এলোমেলো কেউ যেনো সেটার উপর ধস্তা ধস্তি করেছে।ঘরের এক কোনে পরে মহিলার অন্তর্বাস,ছেড়া শাড়ির টুকরা যেটা কখনোই পুরোনো নয়।হটাৎ পায়ের কাছে লক্ষ্য করলাম ফোঁটা ফোঁটা শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ যেটা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেছে।আমি সেই রক্তের দাগ অনুসরণ করে ছাদে পৌঁছে যাই।আর অবাক বিস্ময়ে দেখি সেই দাগ ওই ভাঙা দরজার কাছে থেমে গেছে ।আমি খুব ভয় পেয়ে যাই দৌড়ে নীচে নেমে আসি।মাকে কিছু বলিনা জানি মা বিশ্বাস করবে না।আমি সেদিন রাতের অপেক্ষায় থাকি।

    বাবা সন্ধ্যে বেলায় যখন ফিরলো তার মুখটা কেমন থম থমে, কারো সঙ্গে কথা না বলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।আজ দুপুর থেকে মায়ের শরীর খারাপ বিছানায় শুয়ে আছেন।বাবাকে খাবার দেওয়ার কথা বলতে বললেন তার খিদে নেই।আমি আজ দোতলা যাবার চাবিটা বাবার ঘর থেকে লুকিয়ে নিজের কাছে রেখেছি।সন্ধ্যে হবার সঙ্গে সঙ্গে লনের গ্রীলে চাবি দিয়ে রেখেছি।

    এখন রাত দশটা হবে এখন অব্দী সেরকম কিছু শুনিনি।দু একবার বাইরে বাবার চঞ্চল পায়ের শব্দ পেয়েছি,দু একবার গ্রীল ধরে ঝাঁকানোর শব্দ পেয়েছি কিন্তু বাবা আমাদের ঘরের দরজা ধাক্কা দেননি বা কিছু জিজ্ঞাসা করেন নি।সেই বদ গন্ধ টা আবার বেরোতে শুরু করেছে।মা বাবাকে খাবার দিয়ে আসতে উঠছিলো কিন্তু আমি মাকে থামিয়ে নিজেই যাবো বলে ঠিক করি।জানিনা আমার মধ্যে আজ এতো সাহস কোথা থেকে এসেছে।বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, দরজা খুলে দেখি বাইরের লাইটটা জ্বলছে না,বোধহয় কেটে গেছে।এদিক ওদিক চেয়ে দেখলাম না ভয়ের কিছু দেখতে পেলাম না।খাবারের থালা হাতে বাবার দরজার দিকে এগোতে গিয়ে মনে হলো কি একটা চট চটে বস্তুতে আমার পা টা আটকে যাচ্ছে।আর তার সঙ্গে সেই বিশ্ৰী গন্ধ।বাবার ঘরের সামনে এসে বাবাকে ডাকতেই ভিতর থেকে বাবা বললেন দরজা খোলা ভিতরে এসো।দরজা খুলতেই দেখি ভিতরে একটা ডিম লাইট জ্বলছে আধো অন্ধকারে বাবা কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই।একটা ফ্যাস ফেসে গলায় বলে আমি এইখানে।আমি চমকে তাকিয়ে দেখি বাবা কখন আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।আমি বাবাকে দেখে ভরসা পাই,খাবারটা টেবিলে রেখে বাবাকে আলো জ্বালাতে বলি।কিন্তু বাবা আলো না জ্বালিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসে,আমি ভয় পেয়ে যাই কালকের ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়।বাবা আমার কাঁধ দুটো চেপে ধরে আমার দিকে ঝোঁকে।আমি চমকে উঠি এ কে এতো আমার বাবা নয়।বীভৎস একটা মুখ,চোয়াল ঝুলে পরেছে, চোখ দুটো লাল টকটকে,বিশ্রী সে চাহুনি,জিভটা সাপের মতো সে তার ঠোঁটে বোলাচ্চে, আমি ভয়ার্ত ভাবে দরজার দিকে ছুটে যাই,আমার ওড়না তখন সেই পিশাচের হাতে।কিছুতেই দরজা খুলতে পারিনা,পিশাচটা তখন চার হাতে ভর করে জন্তুর মতো লক লকে জিভ বার করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।আমি ভয়ে প্রচন্ড জোরে মা মা বলে চিৎকার করতে থাকি।পিশাচটা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পরে।হটাৎ একটা ভয়ঙ্কর শব্দে দরজাটা ভেঙে পড়ে।পিশাচটা থমকে দাঁড়ায়,আমি দেখি দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আমার মা তার সমস্ত চুল এলো,হাতে একটা দা কিংবা কাটারী জাতীয় বস্তু,ঠোঁটের চারপাশ লাল,মুখটা ভীষণ সাদা চোখে র কোলে কালি,মনি গুলো ধক ধক করছে।মা তার লম্বা হাত দিয়ে আমাকে টেনে বাইরে ছুড়ে দেয়।তারপরই একটা আর্ত চিৎকার আর পিশাচের মুন্ডুটা আমার পায়ের কাছে এসে পরে।আমি তারপর জ্ঞান হারাই।​


​      চারদিন বাদে আমার জ্ঞান এলো,তারপর এলো সেই দুঃসংবাদ আমি যেদিন জ্ঞান হারিয়েছিলাম সেদিন ফেরার পথে বাবা একদল পাচার কারীর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে মারা যায়।বি এস এফ জওয়ান সারা রাত তল্লাশির পর বাবার মুণ্ডুহীন দেহ উদ্ধার করে।সার্কিট হাউসে আমাদের খবর দিতে এসে দেখে কারা যেনো আমাদের বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকে ,মাকে ওরা খুঁজে পায়না আমার সংজ্ঞা হীন দেহ নিয়ে ওরা হাসপাতালে ভর্তি করে।আমার ডায়েরি খুঁজে ওরা রজতের নম্বর পেয়ে ওকে ডেকে আনে।মায়ের খোঁজ ওরা চালাচ্ছে।আমি ওদের আসল কথা বলতে যাবো হটাৎ দেখি আমার কেবিনের বাইরে সেই অদ্ভুত প্রাণীটা আমার দিকে চেয়ে আছে।আমি কিছু বলতে যাবো হটাৎ দেখি আমার ঠোঁটে একটা আঙ্গুল দিয়ে আমাকে বিশ্রাম নিতে বলছে রজত,ওর মুখে মৃদু হাঁসি।আমি ওর হাত ধরে কাঁদতে থাকি,আমার সব কথা বলতে চেষ্টা করি।ও আমায় অভয় দেয় বাড়ি ফিরে আমার সব কথা ও শুনবে।ওর হাতটা খুব ঠান্ডা,আমি কিছুতেই ওই সার্কিট হাউসে ফিরতে চাইনা।বি এস এফ অফিসার বলে কোনো ভয় নেই ওরা ওখানে দুটো গার্ড নিযুক্ত করেছে।আর দুদিন দেখবে যদি মায়ের কোনো সন্ধান করতে পারে ভালো না হলে আমায় বহরমপুর ফেরার ব্যাবস্থা করে দেবে।সেদিন সমস্ত ফর্মালিটি চেক আপ করে আমায় হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেয়।সার্কিট হাউস পৌঁছতে পৌঁছতে আমাদের সন্ধ্যা হয় যায়।মেন দরজা দিয়ে ঢোকার সময় আমার চোখ হটাৎ ছাদের দিকে চলে যায়।সেই আধো আলো অন্ধকারে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই ছাদের রেলিং ধরে আমাদের পথের দিকে চেয়ে আছে রজত।কিন্তু এ কি করে হয় আমার পাশে তখন রজত বসে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় মৃদু হাঁসি হাসছে।আমি আবার ছাদের দিকে তাকাই না সেখানে আর রজত নেই সেই ভয়ঙ্কর জন্তুটা রয়েছে, আমি রজতকে চিৎকার করে সেটা দেখাই, কিন্তু রজত বোকার মত সেদিকে তাকিয়ে বলে কিছুই সে দেখতে পাচ্ছেনা।

​     আজ রাতের পর আমি কিছুতেই এখানে থাকবো না।কাল ভোরেই আমি ফিরে যাবো এই অভিশপ্ত বাড়ী থেকে।

​এরপর ডাইরির পাতা ফাঁকা আর কিছু লেখা নেই।আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকি যদি এরপরে কোথাও পাওয়া যায় পল্লবীর কি হলো।না কিছুই লেখা নেই,বিফল মনে ঘড়ির দিকে তাকাই প্রায় আরাইটে মেঘলা আকাশ থাকায় সময়ের খেয়াল করতে পারিনি।দুপুরের খাবার অনেকক্ষন দিয়ে গেছে।কিন্তু গণেশের কান্ড জ্ঞান নেই এখনো ফেরেনি।টাওয়ারের যে অবস্থা ফোন করা বৃথা।

​   খাওয়া সেরে বাইরে টা দেখার খুব ইচ্ছা হলো।লনে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকালাম,বৃষ্টির জলে ধোয়া পাইন গাছের পাতা গুলো সবুজ হয়ে আছে।সারা জায়গা নিস্তব্ধ তারই ফাঁকে কোনো এক অজানা পাখি ডেকে উঠছে,পাশের জলের ধারে ব্যাঙের একটানা ডাক সঙ্গে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক পরিবেশটা গম্ভীর করে তুলেছে।হটাৎ চোখটা আটকে যায় ত্রিপল ঢাকা গাড়িটার দিকে।একটা অজানা শক্তি আমায় গাড়ির দিকে নিয়ে গিয়ে ফেলে।আমি গাড়িটার সামনে পিছন ঘুরে কি মনে হতে ত্রিপল টা উঠিয়ে দেখতে যাই।ত্রিপল তোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা বীভৎস দৃশ্যের সামনে করি।

​@copyright act applicable.


            -------চলবে-----



রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

#বিষয়- আধ্যাত্মিক পর্ব - ১৬ মৃদুল কুমার দাস।

   #নাম- '

যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি'
            ( আধ্যাত্মিক)
               পর্ব - ১৬
উইম্বলডন শহরেই শুরু হলো মার্গারেটের নিজস্ব স্কুল। নাম 'দ্য কিংসলে স্কুল',বা লিজেল রেমঁ অনুসারে 'রাস্কিন স্কুল'।
  দশ বছর বয়সি ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই স্কুল। ৩-৪ বছর বয়স যাদের তারা কিন্ডারগার্টেন। ৪-৬ বছর যারা তারা ট্রানজিশন বিভাগে। ৬-১০ বছর বয়সিরা প্রিপারেটরি। এই তিনটি শ্রেণি নিয়ে ১৮৯৫ থেকে মার্গারেট তাঁর নতুন স্কুল শুরু করলেন। ভর্তির বিজ্ঞাপন দেওয়া হল 'উইম্বলডন নিউজ'পত্রিকার,২- নভেম্বর ১৮৯৫ সংখ্যায়। সেই সঙ্গে মার্গারেট বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছেন সব শিশুকে ভর্তি নেবেন না। বিশেষ যোগ্যতা যাচাই করে তবে ভর্তি নেওয়া হবে - 'An introduction and references required before admission to the school.'
  আগ্রহী অভিভাবকের সংখ্যা বেশি হবে জেনেই নিয়ম করেছিলেন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতে তারাই পারবে যারা আগাম 'introduction and references' এ যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ছাত্র ছাত্রী ভর্তিতে তিনি খতিয়ে দেখার পক্ষপাতী ছিলেন।
মার্গারেট সহযোগী হিসেবে পেলেন বিশিষ্ট 'ব্রাশ' চিত্রশিল্পী এবেনিজার কুককে। তিনি রং ও তুলির সাহায্যে ফ্রয়েবেল নীতির প্রয়োগ করতেন। তাঁর মতে শিশুর জগৎকে মুক্ত করতে গেলে, লেখাপড়া শেখানোর আগে তাকে রং ও রেখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। শিক্ষা প্রণালীতে মার্গারেটের সাথে কুকের অসাধারন বোঝাপড়া ছিল। দু'জনের কর্মক্ষেত্রের বাইরে বন্ধুত্বের সম্পর্কও ছিল অকৃত্রিম।
স্কুলের খ্যাতি অচিরেই প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু হ্যালিফাক্স স্কুলে সেই যে মিস কলিন্সের কাছে ঈশ্বরের সন্ধান চলতে শুরু করেছিল তার রেস উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। ব্যক্তিগত দুঃখ নিরসনে তিনি দিনকে দিন আরো ঈশ্বরকে আঁকড়ে ধরছেন। পরমপুরুষের ধারণা মনে ক্রমেই ধোঁয়াশা ঘনীভূত হচ্ছে। আটাশ বছর বয়সের জীবনে তিনি ভেতর থেকে একটা প্রবল আধ্যাত্মিক এষনার প্রবল সাড়া পাচ্ছেন, কিন্তু থিতু হওয়ার মতো সম্বল যত খুঁজে পাচ্ছেন না,ততই রোখ বেড়ে যাচ্ছে। তাই একটি বিশেষ মতকে নিজের মতো করে ধরে নিয়ে চলার চেষ্টা করছেন, কিছুদিন পরে সেই মত আর পোষাচ্ছে না। এমনকি ক্যাথলিক চার্চের থেকে সরে এসে 'চার্চ অফ ইংল্যান্ড'-এর 'ফ্রি থি়ংকার' দলে যোগ দিলেন। কিছু দিন বেশ ভালোই লাগল। এই সম্প্রদায়ের মুখপাত্র ক্যানন স্কট হল্যান্ডের সংস্পর্শ মন্দ লাগছিল না, কিন্তু তাতে থিতু হতে পারলেন না। কারণ এঁদের মধ্যেও সেই গোঁড়ামি তাঁর না পসন্দ।
  মার্গারেটের এই দিশেহারা মনের অবস্থার কথা সহকর্মী ও হরিহর আত্মা প্রিয় বন্ধু কুক জানতে পারলেন। একদিন স্কুলে ছবি আঁকার ক্লাস নিতে এসে তিনি মার্গারেটকে বললেন -
  "লেডি ইসাবেল মার্গসন তাঁর বাড়িতে বন্ধুস্থানীয় কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এক ভারতীয় সন্ন্যাসী ওখানে ঘরোয়া ভাষণ দেবেন। তুমি যাবে?"
আবার ধর্মীয় নেতা! মনে প্রবল সংশয়। কি করবেন মার্গট! আসব পরের আলোচনায়।
         ( চলবে)
    
    @ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 


বিষয় : গল্প# নাম : মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব ৫ লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব


মালদার রবিকা বিশ্বাসকে কড়কড়ে তিনশো দিতে হল কাঁথির "শক্তিশেল"কে সুন্দর একটা প্রবন্ধের জন্য। মনটা খচখচ করে। ভাবতে থাকে এতই কি ফেলনা লেখে! রবিকা ঘরোয়া মহিলা, কেমন করে এক সম্মেলনে দেখা হয়েছিল ইব্রাহীম রজ্জাক মোল্লা  নামে স্কুল টিচারের সাথে। তার থ্রু এই "শক্তিশেল"....  অনেক খেটে এই ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লিখেছিল। লেখক পয়সা পায় চিরকাল শুনেছে। পয়সা দিতে হতে নিজেকে কেমন যেন অসহায় লাগছে। কেউ শুনলে পাক্কা বলবে - পয়সা দিয়ে লেখা ছাপায়। কখনও কি সে প্রমাণ করতে পারবে, ওই প্রবন্ধটা কখনও সাধারণ ছিল না। কোন কি পথ আছে রবিকাদের নিজেকে প্রমাণ করার। এই মফস্বল থেকে কখনও প্রমাণিত হবে সে? কি ভাবে! পথ খোঁজে রবিকা।

তরুণ বড়ো এক কোম্পানিতে আছে। শখ ও কিছুটা আসক্তির কারণে এই সাহিত্যের জগতে পড়ে থাকা। প্রায় চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। বিয়ে হয়নি। বাড়ীতে তেমন তাড়া দেবার কেউ নেই হয়ত। সাহিত্যের জগতে একটু দু কলম লিখলে জানতে চায় বয়স? তারপর প্রশ্ন বাড়ী? লোকেশন সিলেক্ট হয়ে গেলে বিত্ত বা স্ট্যাটাস। কটা গাড়ী , ঠিক কটা বৌ, কটা বান্ধবী ইত্যাদি। মহিলা হলে উল্টো ।কার সাথে আছে? বরই তো। বর ছেড়ে দিয়েছে? কেন? এই বয়সে এ্যাফেয়ার? হাজার প্রশ্ন কাটিয়ে এক সময় হয়ত হাঁপিয়ে গেলে জানতে চায়, কতগুলো লেখা? সেরা কোনটা? লেখার ধরন কেমন? তা সেই ওকাকুরার অনুষ্ঠান করানো তরুণ ঘোষও ডায়মন্ডহারবার সাহিত্য মেলায় আমন্ত্রিত। রতন ঋতুপর্ণাকে জুটি বেঁধে ঘুরতে দেখেছে অনেক সময়। হোটেলের ঘরে রতন ঋতুপর্ণাকে "উল্লাস " বলে গ্লাস ওপরে করতে দেখেছে। সেই মহিলা স্টেজে উঠে বলে, " আসলে মূল্যবোধ পাল্টে যাচ্ছে, আগে সিগারেট বড়োদের সামনে চলত না, আমাদের আগের জেনারেশনের সাহিত্যিকরা সিনিয়দের সামনে মেনে নিতেন তারা সব কাজে ছোট, যেহেতু তারা বয়সে ছোট। অনেক সময় ভুল ধরিয়ে দিতেও অনেক আড়ষ্টতা ছিল কিংবা ভুল ধরাতোই না। সময়ে আমরা দাদা বলে ভুল ধরিয়েদি। সিনিয়ররা আর গুরুগম্ভীর মাস্টার মশাই নেই। অনেক সহজ এক সম্বন্ধ। মূল্যবোধ অন্যখাতে বয়ে চলেছে, সহজ করে বাঁচাই আসল মোটো। " এত গভীর কথাও বলতে পারে মেয়েটা! আসে পাশে তো দিতি অরুন ধিতি  বিশ্বজয়  মিলির গ্র্যামি হয়ে ঘোরে। ধরন আলাদা। উগ্ৰ একটা ভয়হীন ভাব এদের লেখায় এবং স্বভাবে। অনেকে এই দলটা এড়িয়ে চলে। তরুণ অনেক বার শুনেছে ঋতুপর্ণা সঙ্গী মরশুমে বদলায়। এখন রতন! কিন্তু ও এখন এই সন্ধ্যায় একা কেন জেটিতে! রতন ওর ছায়া সঙ্গী কোথায়? এই সময় মফস্বল ফাঁকা , জেটি তো আরও। ও পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় - এখানে একা কেন? বসবো?
- বসুন । আমি তো একাই। আপনি এই নিঃসঙ্গ দ্বীপে রতনের মতো বেলাকে খুঁজতে এলেন নাকি?
সামান্য নেশায় আছে। কেমন যেন মায়া হল । হাত বাড়িয়ে বলল - এখানটা ভালো নয় পর্না । যদি হটেলে গিয়ে কথা বলি তোমার আপত্তি আছে?
কি বুঝল ঋতুপর্ণা চুপচাপ বাচ্ছা মেয়ের মতো উঠে চলে এলো।

রতনের বুকে আগুন ছিল ঋতুর জন্য বোঝেনি তো। লোকে বলে এখন ওর মাল। বললেই হলো। তমা জুতিয়ে ইলিশ ফ্রাই করে দেবে। বেল্লা বরকে খাওয়ায়, ছেলে মানুষ করে, সর্বোপরি মাতাল রতনের সাহিত্যের মহল তৈরি করে, সাধন সঙ্গীনি। তাকে ফাঁকি দিয়ে ঋতু! না বাবা যত আগুন থাকুক নিভিয়ে দাও। তমা হারানো চলবে না। সাজানো বাগান শুকিয়ে যাবে। নিড কমফোর্ট। রতন মালের নেশায় হোটেলের এক ঘরে নিজের সাথে বকে। শেষ কবিতা শুনেই আজ ঋতুপর্ণাকে একা ছেড়ে ঘরে এসে ঢুকেছে। বলতে গেলে পালিয়েছে সে। ঋতুকে বড়ো আপন করে সাথে নিয়ে নদীর বুকে ভাসতে ইচ্ছা করছিল। বলেও ছিল মজার ছলে। কুকুরকে লাথি মারার মতো ঋতুপর্ণা মক্ষম ঝাড় দিয়েছে। "ঋতুপর্ণা সাহিত্য করতে এসেছে রতন স্যার, রাখেল হতে নয় "। তারপর বুকের জ্বালা বেড়েছে। আরও বাড়লো, এই মুহূর্তে বাড়লো যখন দেখল ঋতুপর্ণা আর তরুণ একটা টেবিলে বসেছে কফি নিয়ে। বলার কিছু নেই। সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক। নিজের ইচ্ছার মালিক। কিন্তু ঋতুপর্ণা কি ওর আবেগের সাথে খেলেনি! মনে হতেই হতাশা চেপে ধরে। কিন্তু ঋতুপর্ণাকে সন্ধ্যায় কেন যে এমন অফার দিল। সব গেল। ঋতুপর্ণা বর খোয়ানো মেয়ে, বেচারা সেজে থাকে। তাতেই সব ফাঁসে। বড়লোকের বকা মেয়ে। আর কিছু মনে এল না, ঋতুপর্ণার বিরুদ্ধে মনে মনে এটুকু বিষোদগার করে নিজের ঘরে ফিরে গেল রতন।

ঠিক তার একমাস পরে ব্রাম্ভ মতে উপনিষদের মন্ত্র পড়ে অনাড়ম্বর বিয়ে হল তরুণ ঋতুপর্ণার। রতন সস্ত্রীক উপস্থিত ছিল। ঋতুপর্ণার সেদিনের কবিতা এমন ছিল :
আজ একটু বৃষ্টি চাই,
ভিজতে চাই প্রিয়তম।
আজ একটু কুয়াশা চাই
ভুলতে চাই সব পুরাতনো।
আজ দিশা চাই
দুহাতে ভরতে চাই সোনালী চূর্ণী যত।
একটু চুম্বন দিতে পারো!
ভুলবো  শত হতাহত।
অজস্র ক্ষত গোলাপি পাপড়ি
ঢেকে দিক আজ সুগন্ধি আঘ্রাণ।
©copyright reserved for Sharmistha Bhatt.

ক্রমশঃ

শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

বিষয় : আধ্যাত্মিক আলোচনা #নাম : সুপ্রভাত #লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 সুপ্রভাত।।


 তুই ডাক দিয়েছিস কারে? মন মনে আমার।। তাই তো মনের ডাক যে বড়ো ডাক। কিন্তু কে সে? 

ঈশ্বর কি? ঈশ্বরের উপস্থিতি আদৌ সত্য? এসব প্রশ্ন মিলে ঈশ্বর চিন্তা।আগে প্রশ্ন ,আছেন কি! তার সমাধান। তারপর কোথায় আছেন তার উত্তর। সব শেষ রূপ রঙ অবয়ব। তাতেও প্রশ্ন সাকার না নিরাকার। 


আমি দর্শন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করবো না। যা বুঝি তাই আমার জীবন দর্শন তাই বলি। হে সুধী শ্রোতা, যারা এমন সুন্দর প্রশ্ন উত্থাপন করে তাদের হৃদয়ে অবশ্যই তিনি বিরাজমান। তিনি কে? তিনি আমাদের চালনা কর্তা ব্রম্ম কিংবা আমাদের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। লাইটিং অফ মাইন্ড। তিনি সেই যার চিন্তায় সুখ ও পবিত্রতা অনুভব করি। তিনি সেই যার কাছে অভিযোগ, আশা নিরাশা সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। বাইরে যাচ্ছি " দূর্গা" নাম করি। কেন সুরক্ষার পুটলি বেঁধেদি সেই অসীম তেজস্বিনী কোন অচিন শক্তির আঁচলে। তাই আমি মনে করি তিনির অস্তিত্ব মানুষ স্বিকৃতি দেয় নিজের মানসিক ভারসাম্য রক্ষার কারনে। তিনি ই ঈশ্বর। 

থাকে কোথায়? সকল সুন্দর সকল সৃষ্টি সকল অনন্ত অসীম চিন্তার মাঝে। সেই জায়গাই হয়ত স্বর্গ। মানুষের মন রাজ্যেই স্বর্গ নরক। মানুষ ই সুরা সুর। 

মানে মানুষের মনের অতীন্দ্রিয় রাজ্যে যে হালচাল, সেখানে এই সত্তার বাসস্থান। 

তবে সে তো সাকার নয়? সে তো মনের মধ্যে থাকা এক চিন্তন এক মননের বহিঃপ্রকাশ! নিরাকার তিনি। মুসলিম খ্রীষ্ট ও জৈন ব্রাম্ভ সমাজ তাই বলে। রবীন্দ্রনাথ তার প্রার্থনা সঙ্গীতে এই নিরাকারকেই আরাধনা করেছেন। ঈশ্বর নিরাকার? তবে এই এত মূর্তি! এদের কি হবে! এরা কি ঈশ্বরের প্রতিভূ নয়! 

একবার বিবেকানন্দ এক রাজার কাছে বসেছেন ধর্মালোচনায়। তিনি বললেন গুরুর মূর্তির কি প্রয়োজন এই দেবদেবীর মূর্তিতে কি ঈশ্বর আছে? বিবেকানন্দ রাজার কাজের লোককে বললেন - ওটা কি?-  রাজার ছবি। - পেড়ে আনো। - এবার ওটিতে থুতু ফেলো। চাকরটি ভয়ে ভক্তিতে কুঁকড়ে গেল। বিবেকানন্দ রাজাকে বললেন - আপনি ফেলুন। রাজা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দ্বিধা নিয়ে তাকিয়ে রইল। বিবেকানন্দ বললেন - এই বিশ্বাস এই প্রতীকীতে বিরাজিত। তুমি যাকে মনে বসিয়েছো। তার প্রতিকৃতির অবমাননা কেমন করে করবে? 

অর্থাৎ এই মনের ক্রিয়াই সাকার ও নিরাকারে বিশ্বাস করায়। তোমার মনের রঙেই তাঁকে রাঙাও তুমি। শিব বুদ্ধ যীশু রহিম সব মনের প্রতিফলন। লিঙ্গে শিবের অবয়ব খুঁজেনি। পদ্মে বুদ্ধ। কাবায় খুঁজি আল্লাহ। নিরাকার বললেও একটা আকার তো খুঁজিই ।মন আঁকড়াতে চায় এমন এক রূপ সহস্র বছর ধরে আমরা মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরী করি।

" তুমি আছো আমার মনেতে সকল কাজে সকল খেলাতে। "

ধন্যবাদ।। জমসে ভুল বোকলাম। 😇

# বিষয় - আধ্যাত্মিক (পর্ব - ১৫ ) - মৃদুল কুমার দাস।

   # নাম- 'যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি'
                    ( আধ্যাত্মিক)
                        পর্ব- ১৫

      ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 


    আধ্যাত্মিক পরিবারে তিনি জন্মেছিলেন। গড়পড়তা সাধারণ জীবনের থেকে একেবারে আলাদা ছিলেন। দিব্যি নিরুপদ্রবে সময় কাটতো সাহিত্যচর্চা, আন্তরিক শিক্ষকতা ও আত্মলীল আধ্যাত্মিক অণ্বেষায়।
কিন্তু সেই ভিৎ নড়ে গেল উইলম্বডনে শিক্ষকতা করতে এসে। ইংল্যান্ড তখন ভয়াবহ আর্থিক অনটনের কবলে। বেকারত্বের জ্বালা আষ্টেপৃষ্ঠে। এই ক্রাইসিসের পেছনে যথার্থ কারন নিয়ে 'উইলম্বডন নিউজ'-এ রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখে জনমত গঠনে নেমে পড়লেন। 'ফ্রি আয়ারল্যান্ড' নামক বিপ্লবী দলে যোগ দিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে নামজাদা সব নেতৃত্ব তাঁকে আকৃষ্ট করতেন।
  বিপ্লব শিয়রে। বিপ্লব বলে কয়ে আসেনা। সমাজের দাবিতে বিপ্লবের জন্ম স্বতঃস্ফূর্ত। বহ্মচারিনী মার্গারেট জীবনের চাহিদা পূরণের হঠাৎ মোড় নিলেন। ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখলেন স্বপ্নের মানুষকে নিয়ে।
   তিনি ওয়েলসবাসী। ইন্জিনিয়ার। সৌম্য কান্তি। রেক্সামের অফিস পাড়ায় যোগাযোগ। আলাপ। তারপর ঘণিষ্ঠতা। স্কুল ছুটির পর রোজ দেখা হতো। কাজের একঘেয়েমিতা কাটাতে ছুটির দিন গ্রামের নিরিবিলি পথে ঘুরে বেড়াতেন। মনের মতো প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। সাহিত্য চর্চায় দু'জনের সমান আগ্রহ। ভদ্রলোকের মায়ের খুব পছন্দ মার্গারেটকে। পরিনয় থেকে বাগদানের সময় যখন উপস্থিত আকস্মিক দুঃসংবাদ এল ভদ্রলোকের থেকে। ভদ্রলোক  ফুসফুসের মারাত্মক যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। মৃত্যু শিয়রে। যে মারণ রোগে মার্গারেট তাঁর বাবাকে হারিয়ে ছিলেন অকালে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরে আসতে বাধ্য হলেন। এই ঘটনায় মার্গারেট মুচড়ে পড়লেন। রেক্সাম থেকে দ্রুত বদলি নিলেন।
   চলে এলেন উইলম্বডনে। এখানে দ্বিতীয় প্রেম। ভদ্রলোক ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার। নাম ম্যাকডোনাল্ড। সালটা ১৮৯৪। নিজের স্কুল নিয়ে খুব ব্যস্ত। তাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন ম্যাকডোনাল্ড। দেড় বছরের প্রণয় পর্ব। টিকল না আর। হঠাৎ একদিন জানতে পারলেন তিনি প্রণয়ের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বির মুখে পড়েছেন। ম্যাকডোনাল্ডের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান এলো। অগত্যা নিজেকে সরিয়ে নিলেন। মানসিক ভাবে খুব বিপর্যস্ত। কিন্তু তখন তাঁর কর্মজীবনের স্বর্ণকাল চলছে। তাই এসব মায়ায় নিজেকে আবদ্ধ না রাখার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নিতে খুব কষ্ট হয়েছিল। কেননা এতো একপ্রকার পরাজয়। সব কাজ ফেলে ছুটি নিয়ে মার্গারেট ছুটলেন হ্যালিফাক্সে। বাল্যের শিক্ষিকা কলিনজের  (ফ্রেন্ড,ফিলোজফার,গাইড..) বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদলেন। অনেক অভিযোগ করে বুকের জ্বালা মেটালেন। কলিনজ আবার সেই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। মার্গারেটের সব ক্ষত নিমেষে নিরাময় করে দিলেন। এক সপ্তাহ পর আবার উইলম্বডনে ফিরলেন মার্গারেট। তখন তিনি একেবারে বদলে গেছেন। স্থিতধী, অনেক পরিণত,ঘর বাঁধার স্বপ্ন থেকে বহু যোজন দূরে। তারপর একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্বামীজী এলেন জীবনে। একেবারে সটান ভারতবর্ষে পাড়ি।
ভারতীয় দুর্বলতা,অশক্ত মানসিকতার পাশে এসে দাঁড়ালেন এক সিংহিনী নারীর বেশে। আমাদের জন্য নিজেকে নিবেদন করে হলেন লোকমাতা।
                    (চলবে)

@কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 


বিষয় : সমলোচনা (গল্প) # নাম : আর্সি# লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 আর্সি।। (গল্প) 



'আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স।' মানে বাঙলায় যাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলে ১৯৪০ থেকেই চেষ্টা চলছে মানুষের বুদ্ধির অনুরূপ মেশিন করে দেখানোর। এফ বি তে যে ভাষা রূপান্তরিত হয় এই পদ্ধতি প্রয়োগেই। বলতে গেলে গুগল থেকে নিয়ে সব সফট ওয়ারের কাজই তাই। মানুষের বুদ্ধির অনুকরণ বা অতিক্রমন। আমি শখের লেখিকা , তাই বিজ্ঞানের খিটপিট ছেড়ে গল্পে চলে যাই। সাহিত্য আমার বিচরণ ক্ষেত্র, আমি কমফোর্ট ফিল করি। 


২০১৫ তখন , পৃথিবী ব্যাপি নেট ও কম্পিউটার এক্সপ্লোরাররা নতুন পথের দিশা দিচ্ছে। আমার সায়েন্স কলেজের বন্ধু অবনীশ বলল - শর্মিষ্ঠা, কলকাতা আয় আমার ঘর রাজার হাটে, নতুন ডিজাইন করেছি নিজে। অবনীশ মানেই নতুন। সে বছর গরমের ছুটিতে চলে গেলাম ওর বাড়ি। ভাই রে কি বলবো। দরজা খুলতেই মাইক কম্পিউটার ও সি সি টিভি ক্যামেরার সে কি কামাল। বাড়ীতে দামী দারোয়ান রাখলেও হার মানাতো । খাবার নিয়ে রবট টাইপের এক টেবিল, ডাকছে। মানে তাতে খাবার রেখে টাইম ফিক্স করে দিলে সে ডাকবে। " আমি বললাম এ তো কিছু ই না" কি আর 'আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স।' ও বলল - ওকে চল ওপরে। বাথরুমে ম্যাসেজ পার্লার। তবু মন ভরেনি । শেষে হার মেনে নিজের এক বছরের বাচ্ছা ছেলের সাথে আমায় খেলতে বসিয়ে গেল। বাচ্ছাটা খুবই কিউট। খেলতে ভালো লাগছে। কাঁদে না। কিন্তু বেটা গেল কোথায়! বৌ এ সব পাগলামীর জন্য ডিভোর্স নিয়েছে। কাজের কেউ নেই। এই অল্প শিক্ষিত রবট গুলো সামলায় । ক্যারে পড়লাম। বাড়ী ফিরতে হবে। আমি কি ভাই তোর ঘরে আয়াগিরি করতে এসেছি? মনে মনে চটে লালা। আমার ওপরে ডিম ফাটিয়ে দিলে পোঁচ হয়ে বেরিয়ে আসবে। 


অগত্যা দু ঘন্টা পর ফিরে বলল - কিরে কেমন এন জয় করলি আমার 'আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স।'

অবাক আমার মুখ বন্ধ করে, মিচেল হেসে দেখলাম বাচ্চাটাকে শুইয়ে পটাপট ওকে ল্যাপটপের রূপ আনলো ডাইপারের কাছে। চোখ দুটো সামনের দেওয়ালে ছবি ফেলল এ্যাজ আ প্রজেক্টর। ওমা যত কিছু করেছি ,বিচ্চু ছবি তুলে রেখেছে। এমন কি অবনীশকে দেওয়া গালাগালি গুলো বিভিন্ন ভাষায় ট্রান্সলেশন করছে। একটু লজ্জা পেলাম, সামান্য অবাক। ধরতে পারলাম না। এতক্ষণ নাড়াচাড়া করে ওটা ওর ছেলে নয় মনে হল না একবারও। তবু বলি -  আর একটু উন্নত কিছু। এ বছর ডেকে ছিল। মিঃ19 জন্য কোলকাতা যাচ্ছি না। নয়ত 'আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ' বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দেখিয়ে ছাড় তো। মনে মনে ভাবি নিজের বুদ্ধিমত্তা ধাঁ ধাঁ খাবার থেকে যাক বেঁচে গেলাম। 


মোবাইল টেনে লিখতে গিয়ে দেখলাম.. এই মেশিন তো সব চেয়ে বড়ো নিদর্শন। প্রতি দিন ক্যালকুলেটর থেকে এফ বি গুগল হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদিতে আমার সাথে বুদ্ধিমত্তার টক্কর দিয়ে জিতে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যন্ত্রের নাম দিয়েছি " আর্সি "। 

©copyright reserved for Sharmistha Bhatt.

মন পলাশের পদাবলী(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


মন পলাশের পদাবলী

©সুদেষ্ণা দত্ত

        পলাশ ভট্টাচার্য একজন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী।বর্তমানে মেয়ে মহুয়ার সঙ্গে মুম্বাইয়ের বাসিন্দা।তাঁর আদি বাড়ী ছিল চট্টগ্রামের কালুরঘাট। মেয়ে মহুয়া ও জামাই বিভাস দুজনেই আই.সি.আই.সি.আই. ব্যাঙ্কে কর্মরত।আর আছে তিন বছরের নাতি সাগ্নিক ও সর্বক্ষণের একটি কাজের মেয়ে মিনতি।স্ত্রী মহুল অনেক কাল আগেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অন্যপারে বাসা বেধেছেন।মুম্বাইয়ের জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারিতে প্রায়ই পলাশ বাবুর ছবির সোলো প্রদর্শনী হয়।কিন্তু পলাশবাবুর ছবিতে আগুন রঙা পলাশের উজ্বলতা থাকে না বললেই চলে।তার অধিকাংশই থাকে যুদ্ধের ছবি,মানুষের পদদলিত হওয়ার ছবি,পুঁটলি নিয়ে চোখের জলে নিঃসঙ্গ মায়ের ছবি,রক্তাক্ত শিশুর ছবি।মানুষ নিজের জীবনে হতাশা দেখতে না চাইলেও,শিল্পবোদ্ধা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হতাশা,দারিদ্র্যের ছবি,চলচিত্র বেশ উপভোগ করে।তাই মুম্বাইয়ের বহুতল বিলাসবহুল স্যান্ডেলিয়ার শোভিত ফ্ল্যাটে স্পটলাইটের ঝলকানি থাকে পলাশ বাবুর ছবির উপর।বহুমূল্যে বিক্রি হয় সেসব ছবি।তবে পলাশ বাবু নিজে স্পটলাইটের ঝলকানি থেকে চিরকাল দূরে থাকতেই পছন্দ করেন।শিল্পচর্চা আর নিজের সঙ্গে কথা বলেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন তিনি।তাছাড়া মেয়েই বা নাতিকে দেখাশোনার জন্য বিনা বেতনের এমন বিশ্বস্ত চাকর কোথায় পেত!যতই থাক স্ব-বেতনের কাজের লোক!তাই তো তাঁর মুম্বাইয়ে আসা।তাদের তো কথা বলারও ফুরসৎ মেলে না।

          আজ আনন্দী বলে একটি মেয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নেবে।আগেই বলেছি,তিনি এসব বিষয় এড়িয়ে চলেন।কিন্তু মেয়েটির জোরাজুরিতে আর তাকে উপেক্ষা করতে পারেন নি।তবে মেয়েটি তার অফিসে সাক্ষাৎকারের বন্দোবস্ত করেছে,এটা ঠিক মনঃপুত হয়নি পলাশ বাবুর।অবশ্য একজন বহিরাগতকে বাড়ীতে ঢোকালে তাঁর মত পরিযায়ীর অবস্থাও খুব সহজেই অনুমেয়।সেই কারণেই আরও রাজি হয়েছেন।

            আনন্দীর ঘরে ঢুকে দেখেন উজ্জ্বল হলুদ বাংলাদেশি ঢাকাই শাড়ী পরিহিতা বছর আঠাশের এক প্রজাপতি যেন।তবে মেয়েটির ঘরের ইন্টিরিওরটা পলাশ বাবুর তেমন পছন্দ হয়নি।কেমন জানি অদ্ভুতুড়ে ছবি টাঙানো,নীল রঙের পর্দা,লালচে আলো।যাইহোক মেয়েটির আন্তরিক ব্যবহারে জমে ওঠে গল্প,যাকে আর সাক্ষাৎকার বলা যায় না।মেয়েটির শাড়ী যে তার মনে বহু বছরের জমে থাকা কথায় বোনা আঁচলকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

             তিনি আনন্দীকে বলতে থাকেন,১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তি যুদ্ধ শুরু হয়—পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম-পাকিস্তানের,যার মাধ্যমে বাংলাদেশ  মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে--তখন তিনি বছর ১০-এর এক বালক।তাঁর বাবা ডাক্তার অরবিন্দ ভট্টাচার্য মুক্তিবাহিনীর ডাক্তার ছিলেন।কি ভয়ানক সে যুদ্ধ!চারদিকে ধ্বনিত হত সন্তানহারা মায়ের হৃদয়বিদারক কান্না,বিধবা নারীর গুমরে মরা,ধর্ষিতা নারীর যুদ্ধ-সন্তানের প্রথম চিৎকার।রক্তে রাঙা হয়ে  ওঠে তাঁর দেশের মাটি।তারপর একদিন তাঁদের জীবনেও ঘনিয়ে আসে কালবৈশাখীর কালো মেঘ।আল-বদর ও আল-শামস পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্দেশে প্রায় ৩০০ বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে—সেদিনই পিতৃহারা হয় দশ বছরের বালক।তাঁর বিধবা মা সন্ধ্যা মনকে মুষলধারায় সিক্ত করে কান্নাকে সরিয়ে রেখে পলাশকে বুকে আঁকড়ে জন্তু—জানোয়ারের গাদার মত ভারতে পালিয়ে আসেন।যাঁর জীবনে সন্ধ্যা আসার আগেই নামে রাত্রির ঘন আঁধার।ভাসতে ভাসতে এসে প্রথমে পৌঁছান বাঁশবেড়িয়ার পুনর্বাসন কেন্দ্রে।সেখান থেকে  কলকাতার  বিজয়গর এলাকার কলোনিতে ঠাঁই হয়।একটু থেমে আবারও বলতে থাকেন,মায়ে—পোয়ে মিলে তৈরী করলাম গরাণের খুঁটি,হোগলা পাতার চাটাই দিয়ে বেড়া আর ছাউনির ঘর।মেঝে ছিল মাটির।সম্পন্ন অবস্থা থেকে ভাগ্যের ফেরে কোথায় এসে পড়লাম!ছলছল করে ওঠে প্রৌঢ়ের চোখ দুটো।সারা জীবন ধরে ভাঙা নৌকার হাল ধরে শুধুই ভেসে চলা।

            পলাশ বাবুর মা প্রায়ই বলতেন,”অহনও রাত্রে স্বপ্ন দ্যাহি দ্যাশের বাড়ীর।দ্যাশের চার বিঘা জমিতে চাইরটা ঘর,চাইর পাড় বান্ধানো দুইটা পুকুর ছিল।কারও বিয়া-শাদি হইলে সেই পুকুর থিক্যা মাছ নিয়া যাইত।আর অন্য পুকুরটা নদীর সঙ্গে জোড়া ছিল,সেখানে কত্ত মাছ”!পলাশ বাবু বলেন,আমরা নদীকে গাঙ বলতাম।গাঙে স্নান করতে যেতাম।তবে মা খুব স্বভিমানী ছিলেন,তাই কোনদিন কারোর কাছে কোন সাহায্য নেননি।লোকের বাড়ী মুড়ি ভেজে আর কিছু গয়না যেটুকু আনতে পেরেছিলেন বিক্রি করে তাই দিয়েই চলছিল আমার পড়াশোনা।কিন্তু আই.এ পাশের পর মাও অপুষ্টি ও যক্ষ্মা রোগে ভুগে মারা যান।

                 সেবার লক্ষ্মী পুজোর দিন বাইরে থেকে আসা কিছু মুসলমান সব কলাগাছ কেটে দিল,যাতে আমরা পুজোকরতে না পারি।রামদা হাতে কি লড়াইটাই না করেছিলাম তাদের সাথে।জান এখনও তাই ওরা আমার পিছু নেয়।আমায় খুন করতে আসে।সেই ভয়েই তো আমি বাড়ী থেকে খুব কম বেরোই।আনন্দী বুঝতে পারে প্রৌঢ় ডানা মেলেছেন কল্পনার।

          আনন্দী জিজ্ঞেস করে,আপনার মায়ের মৃত্যুর পর আপনার কি হল?যেন অনেকটা পথ পেড়িয়ে বাস্তবে ফিরে এলেন পলাশ।তারপর বি.এসসি.পাশ করলাম।ভাল চাকরীতেও ঢুকলাম।কিন্তু টিকতে পারলাম কই!ছোটবেলা থেকে আকাশের মত নকশিকাঁথায় রামধনু রঙ ছড়িয়ে ছবি আঁকতে ভালোবাসতাম।সেটাই কখন নেশা থেকে পেশা হয়ে গেল।তবে ছবিতে উজ্জ্বল রঙ একেবারে সহ্য করতে পারিনা—বলে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলেন মাথার রগ দুটো।ঠিক আছে আজ তবে এই থাক,আনন্দী বলে ওঠে।মহুয়ার পাঠান গাড়ীতে বাড়ী ফেরেন প্রৌঢ়।

           এরপর কেটে গেছে মাস পাঁচেক।প্রৌঢ় পলাশবাবু  খুন করতে আসা লোকগুলোর হাত থেকে করেছেন আত্মগোপন,বার বার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা।ছবি আঁকা এখন প্রায় বন্ধ।আজ মহুয়াদের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনন্দী বাসুর চিকিৎসাকেন্দ্রের গাড়ী।এবার বেশ কিছুদিনের জন্য আবার তল্পিতল্পা গুছিয়ে যাওয়া।

         মাসখানেক পর মহুয়া নিতে আসে বাবাকে।আনন্দী তাকে জানায়,সিজোফ্রেনিয়ার মত জটিল মানসিক ব্যধিতে সাহচর্য,সহানুভূতি খুব দরকার মহুয়া।আর একটা কথা এরিপাইপ্রাজল ওষুধটা কিন্তু কোন ভাবেই বন্ধ করা যাবে না।বংশগতি,প্রচন্ড মানসিক আঘাতের পাশাপাশি অনেক কারণ থাকে এই রোগের।আমার মনে হয় বারবার পরিযায়ীর মত ঘুরতে ঘুরতে আপনার বাবা এই রোগের শিকার।যা গভীর ভাবে রেখাপাত করেছে ওঁর মস্তিষ্কে।সব পাখীই বাসা খোঁজে মহুয়া।আপনার বাবাকে নির্ভরতার ডানায় জড়ানো বাসায় রাখুন,যাতে আর উড়ে যেতে না হয় জীবনের শেষ শান্তির বাসায় পৌঁছান পর্যন্ত।বাড়ী ফেরার আগে পলাশবাবু একটি ছোট্ট চিরকুট দিয়ে যান কন্যাসমা আনন্দীর হাতে।ওঁরা চলে গেলে আনন্দী খুলে দেখে তাতে লেখা--

      মনের খোলা রুদ্ধদ্বারে

     কেই বা কখন কড়া নাড়ে!

       একলা আমার বিজন ঘরে--

      যে জন এসে হাতটি ধরে

      দখল যে নেয় মনের কোণ,

     সেই তো আমার আপনজন।

 

ছবি সৌজন্য:গুগুল

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত

 

              

          

বিষয় : অনু কবিতা # নাম : প্রিয়তমেষু# লেখায়: শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 প্রিয়তমেষু



ডাক দিয়েছো আলোর দিশায়

প্রদীপ হাতে নেমেছি পথে, 

বাতাসটাকে থামিয়ে রাখো

পথ চলার এই দারুণ দিনে। 

ঝড়ের রাতে হাতটি দিও

আড়াল হতে প্রিয়তমে।

©কপিরাইট সর্বাধিকারী শর্মিষ্ঠা ভট্ট।

শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০

# বিষয় - আধ্যাত্মিক পর্ব-১৪ মৃদুল কুমার দাস।

# নাম  - 'যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি'
                 (আধ্যাত্মিক)
                   পর্ব- ১৪

  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 
হ্যালিফ্যাক্সে 'ক্রশলি হিথ' আবাসিক স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা কলিনজ তাঁর ঈশ্বরকে জানার জন্য ভাব বিনিময়ের প্রধান আশ্রয়। এখন মার্গারেট অনেক সমঝদার। কলিনজও সোহাগ দিয়ে মার্গারেটের ভেতরপানে তাকাতেন। কলিনজ এতো আন্তরিক হয়ে পড়াতেন, প্রতিনিয়ত ঈশ্বর সম্পর্কে প্রশ্নের পর প্রশ্নের শেষ হতো না। ঈশ্বর সম্পর্কে জিজ্ঞাসার আকন্ঠ্য তৃষ্ণা যেন তাঁকে স্থির থাকতে দিত না। ইত্যবসরে স্কুলের শেষ পরীক্ষা আসন্ন। ১৮৮৪ সাল। পরীক্ষায় সসম্মানে পাশও করলেন। স্কুলের বাঁধাধরা গন্ডি কেটে নিজেকে উন্মুক্ত আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়ার মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন, কিন্তু মিস কলিনজের সঙ্গে ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য মন কেমন করতো -- কি একটা বেদনা মার্গারেটকে ঘিরে ধরতো! সময়ে ভোলার ব্যপারও যে ছিলনা। তিনি যদি ভুলে যেতেন তাহলে খ্রীষ্টান ধর্মের গভীরে যাওয়া আর হয়ে উঠতো না। খ্রিষ্টান ধর্মের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যসব ধর্মের তুলনা করার জায়গা গড়ে উঠতে লাগলো। সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার বৌদ্ধধর্মকে তাঁর খুব ভালো লাগতো। বুদ্ধ সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। যা খ্রীষ্টধর্ম দিতে পারতো না, বৌদ্ধধর্মের মধ্যে অনেক মিমাংসা পেতেন। কিন্তু মনে অনেক মিমাংসা যে বাকি!
  পাহাড় প্রমাণ সংশয়ের  মধ্যে তিনি আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে গেলেন না। আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো নয়। মায়ের পাশে সাহায্যের হাত বাড়াতে ছাত্রী থাকাকালীন মনে মনে একপ্রকার সিদ্ধান্তই নিয়ে রেখেছিলেন শিক্ষিকা পেশার পথেই হাঁটবেন, কেননা তাঁকে যে মিস কলিনজের সার্থক উত্তরসুরী হতেই হবে। কলিনজকে শ্রদ্ধা জানানোর তাই হবে সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। শিক্ষিকা হিসেবে তাঁকে যে কলিনজের আদর্শ বয়ে নিয়ে চলতেই হবে,এ যে কর্তব্যের বড় বালাই।
  'চার্জ নিউজ' পত্রিকা দপ্তরে একগোছা দরখাস্ত পাঠিয়েই,পছন্দের স্কুলে যাওয়ার জন্য ব্যাগ অ্যান্ড বেগেজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন,ভাব এমনি স্কুল কর্তৃপক্ষ যে তাঁকেই পছন্দ করবেন সে ব্যপারে গভীর আত্মবিশ্বাস কাজ করেছিল।
চিরকাঠের আখরোট-রঙা বাক্সে ভরলেন রোজকার পরার মতো উঁচু কলারওলা পোশাক, মিহি সুতোর বুটি তোলা ঘণ কুচি দেওয়া কালো সার্জ,দামি স্কচ, সিল্কের জামা,তাতে লতানো কলার,আর ফোলা হাতায় লেসের ঝালর।
    ১৮৮৪ সালের তখন গ্রীষ্মকাল। ডাক পেলেন ইংল্যান্ডে পাহাড় আর হ্রদের মনোরম পরিবেশে কেসউইকের এক নামজাদা প্রাইভেট স্কুলে গভর্নরস হিসেবে যোগ দিতে। শিক্ষিকা হিসেবে তাঁর কর্ম জীবন কোন খাতে বইতে লাগলো আসবো পরের পর্ব নিয়ে....
             (চলবে)
   @কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।


# বিষয় - 'বাংলা সাহিত্যে নোবেল।'মৃদুল কুমার দাস।

 # বিষয় - বাংলা সাহিত্যে নোবেল।
  # নাম- রবীন্দ্রনাথ ও নোবেল পুরস্কার।
      ✍ - মৃদুল কুমার দাস।
                
     রবীন্দ্রনাথ বিদেশ ভ্রমণ করে ফিরলেন ১৯১৩ সেপ্টেম্বরে। আর নোবেল জয়ের খবর এলো নভেম্বরে। সেই খবর নিয়ে পৌঁছলেন ২৮-নভেম্বর পিয়ার্সন ও এনড্রূজ। বিশ্বকবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পেছনে এই দুই বিদেশী ও রবীন্দ্র-ভক্তের অবদান যেন কোনোদিন ভুলে না যাই। কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সাথে এই দুই বিদেশীর নাম ওতোপ্রতো সম্পর্কিত কাহিনীর কথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর শান্তিনিকেতনের জন্য তাঁদের অবদান যেন কোনোদিন না ভুলে যাই। তাই কবির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ঘটনার সাথে এই দুই কবির একনিষ্ঠ সুহৃদের কথাও একনিষ্ঠ চিত্তে স্মরণ করব।
    উইলিয়াম পিয়ার্সন( জন্ম-১৮৮১)-এর ডাকনাম উইলি। বাড়ি ম্যাঞ্চেস্টার শহরে। ক্রেমব্রিজ থেকে ন্যাচারাল সায়েন্স নিয়ে এম.এ. করার পর কলকাতার ভবানীপুরে এসে ওঠেন লন্ডন মিশন সোসাইটি কলেজে জীববিদ্যার অধ্যাপনা ও ধর্মযাজকের কাজে একজন নিবেদিত প্রাণরূপে। আর বন্ধু এন্ড্রুজ ছিলেন দিল্লির সেন্ট স্টিফেন কলেজের অধ্যাপক।
   ১৯০৭ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত পাঁচবছর পীয়ার্সন কলকাতায় ছিলেন। শেষে মিশনের কাজে বিতশ্রদ্ধ হয়ে কলকাতা ছাড়েন। ফিরে যান ম্যাঞ্চেস্টারে। বাড়িতে তাঁর কলকাতার জন্য খুব মন খারাপ করতো। কলকাতায় থাকার সময় রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভক্ত পাঠক ছিলেন। আর সেই রবীন্দ্রনাথ আসছেন লন্ডনে,শুনে মন বড়ই রোমাঞ্চিত! 
১৯১২ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে কবি রবীন্দ্রনাথ লন্ডন রওনা দিলেন। সঙ্গে রথীন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রী প্রতিমাদেবী। উদ্দেশ্য পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখা। আর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ সুইডিস অ্যাকাডেমিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য পেশ করা। 
  এই 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতা লিখেছিলেন অসুস্থ অবস্থায় শিলাইদহে যাওয়ার পথে। আর কিছু কবিতা ইংল্যান্ডে যাওয়ার পথে। 
লন্ডনে পৌঁছে চেরিং ক্রশ স্টেশন থেকে ধরবেন সে দেশের টিউব রেল। আর সেই জার্ণিতে এতো আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন যে অ্যাটাচকেসে 'গীতাঞ্জলি'র পান্ডুলিপি ছিল সেটি হাতছাড়া হলো। হোটেলে গিয়ে দেখলেন অ্যাটাচকেসের হদিস নেই। শেষে সেটি চেরিং ক্রশ স্টেশনে 'লেফট লাগেজ অফিস'-এ পাওয়া গিয়েছিল।
  লন্ডনে পৌঁছেছিলেন জুনের মাঝামাঝি। সুকুমার রায় ঐ সময় লন্ডনে ছিলেন। ইতিপূর্বে সুকুমার রায় বিলেতে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে 'দ্য স্পিরিট অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর' প্রবন্ধটি রচনা করে কবি সম্পর্কে বিলেতি মহলে খুব আগ্রহ তৈরি করে ফেলেছেন। সেই কবি এবার আসছেন স্বদেহে। সবাই সাক্ষাৎ পাবেন বলে একটা বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিলেতে।
  পিয়ার্সনের Hampstead Heath-এর বাড়িতে বসবে প্রবন্ধ পাঠের আসর। সেই আসরে সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটি স্বরচিত প্রবন্ধ পাঠ করবেন। সেই ঘটনা জানিয়ে সুকুমার রায় তাঁর বোন ঘটনার দু'দিন পরে চিঠি লিখেছিলেন এই কথা জানিয়ে - 
      "পরশু দিন Mr. Pearson... - তাঁর বাড়ীতে আমার Bengali Literature সম্বন্ধে একটা paper পড়বার নেমতন্ন। .... সেখানে গিয়ে দেখি Mr. & Mrs.Amold,Mr.&Mrs.Rothenstein, Dr.P. C. Roy, Mr. Sarbadhikary প্রভৃতি অনেক পরিচিত, তাছাড়া কয়েকজন অচেনা সাহেব মেম উপস্থিত। শুধু তাই নয়, ঘরে ঢুকে দেখি রবিবাবু বসে রয়েছেন। বুঝতেই পারছিস আমার কি অবস্থা। যা হো'ক চোখ কান বুজে পড়ে দিলাম। ....
   তারপর Pearson-এর বাড়ির ছাদে গেলাম। সেখান থেকে Hampstead Heath - এর চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়।..." এই সাহিত্যের আসর বসেছিল ১৯ জুন ২০১২।
আর রবীন্দ্রনাথকে দেখে পীয়ার্সন আভূমিনত হয়ে প্রণাম করেছিলেন। এখানেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম এক বিদেশি পরম ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীর এতোদিন যা ছিল মনে মনে গভীর অনুরাগ,এবার হলেন মুখোমুখি। তাঁরই বাড়ীতে আবার রদেনস্টাইনের সঙ্গে করির সাক্ষাৎকার হয়। এই রদেনস্টাইন ছিলেন নোবেল কমিটির একজন অন্যতম সদস্য। 
২৭জুন রোদেনস্টাইনের বাড়ীতে সান্ধ্যভোজের আমন্ত্রণে কবি আমন্ত্রিত। সভায় ছিলেন কবি W.B.Yeats । সেখানে কবি গীতাঞ্জলি থেকে কয়েকটি কবিতা পড়ে শোনান। আর তাই শুনে মুগ্ধ ইয়েটস 'Songs Offering'- এর introduction বা পরিচয় পত্র লিখে দেওয়ার কথা দেন। আর ঠিক হয় ৭-আগষ্ট রোদেনস্টাইনের বাড়ীতে কবিতা পাঠের আসর বসবে। সেই মতো কবিতা পাঠের আসরে উপস্থিত  ছিলেন আর্নেস্ট রিজ,অ্যানিস মেনেল, হেনরি নেভিলসন,মে সিনক্লিয়ার, চার্লস ট্রেভেলিয়ন, ডব্লিউ. বি. ইয়েটস। এছাড়া  পিয়ার্সন ও তার বন্ধু এন্ড্রুজ এবং ডাঃ দ্বিজেন্দ্রলাল মৈত্র। দ্বিজেন্দ্রলাল মৈত্রের সঙ্গে ইয়েটসের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মৈত্র ম'শায়ের কাছ থেকেই তো কবির সম্পর্কে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পেরেছিলেন ইয়েটস। তাই তো ইয়েটস পরিচয়পত্র লিখে দেওয়ার ভরসা পেয়েছিলেন।
  পিয়ার্সনের সঙ্গে থেকে বন্ধু এন্ড্রুজ রবীন্দ্রনাথকে কাছ থেকে দেখে খুব মুগ্ধ হয়েছিলেন। ইতিপূর্বে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এন্ড্রুজ  বন্ধু পিয়ার্সনের মুখে ভূয়োশী প্রশংসা শুনেছেন। সাক্ষাতে যা দেখলেন কবি কোনও অংশে কম নন। এই দুই বিদেশী কর্মসূত্রে ভারতকে খুব ভালোবাসতেন। এমনকি তাঁদের ভারতীয়দের প্রতি ইংরেজ শাসকদের শোষণের স্বরূপ ভালো লাগতো না। যে মিশন সোসাইটির কলেজে পড়াতে এসেছিলেন সেখানে অখ্রিষ্টান ছেলেদের বাধ্যতামূলক বাইবেল ক্লাসে যোগদানকে তিনি ভালো মনে নিতেন না। তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তিনি কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে সাধারণ বাহ্মসমাজ মন্দিরের পাশের গলিতে ধর্ম্মানুশীলন এবং সাহিত্য, বিজ্ঞান,দেশহিতৈষণা ও দানধর্ম্ম চর্চা করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত 'দেবালয়' সমিতিতে বক্তৃতা দিতে মাঝে মধ্যে আসতেন। বাংলা ভাষা শিখতেও শুরু করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় না হলেও কবির লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটে গেছে। এমনকি কবির 'পাবনা প্রাদেশিক সম্মীলনী উপলক্ষে সভাপতির বক্তৃতা'র ইংরেজি অনুবাদ  যে পিয়ার্সন পড়েছিলেন তা জানা যায় ১৬ এলগিন রোড থেকে প্রকাশিত ১৯০৮,১৮ ফেব্রুয়ারী 'The Bengalee'তে তাঁর লিখিত একটি চিঠি থেকে। এই হলেন রবীন্দ্র ভক্ত পীয়ার্সন।
    শান্তিনিকেতনের সান্নিধ্যে এসে শান্তিনিকেতনের দ্বারা এতো প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন,এন্ড্রুজ বলতেন "ভারতবর্ষে তাঁর দ্বিতীয় জন্ম"; আর উইলিয়াম পিয়ার্সন ১৯২৩এ মৃত্যুর দিন ইতালির হাসপাতালে চেতনা হারানোর পূর্বে হাসপাতালের অপরিচিত কর্মীদের নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন "ইন্ডিয়া ইজ মাই ফার্স্ট লাভ।" 
শান্তিনিকেতনের গৌরবময় অধ্যায়ের পুরোধায় এই বিদেশি শিক্ষক বন্ধু আশ্রমে ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছিলেন খুব প্রাণের প্রিয় বন্ধু। পড়াতেন বিজ্ঞান ও ইংরেজি ভাষা। পিয়ার্সনের কাজে খুব নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা,আর গভীর বন্ধুবৎসল মনোভাব আশ্রমবাসীদের কি খুশীই না করতো! রবীন্দ্রনাথের টানে বন্ধু এন্ড্রুজের জোগাড় করে দেওয়া দিল্লির গৃহশিক্ষকতায় চারশ'টাকার বেতন ছেড়ে শান্তিনিকেতনে একশ' টাকার বেতনে যোগ দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে গান,অভিনয়, খেলাধুলায় কি সুন্দর অংশগ্রহণ করতেন। বিশেষ করে শান্তিনিকেতনে 'অচলায়তন' নাটকে শোনপ্রাংশুর চরিত্রে কি দারুন অভিনয় করেছিলেন। বাংলা উচ্চারণে প্রথম প্রথম অসুবিধায় সকলে কি মজাই পেতেন।
বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের আশেপাশে সাঁওতাল পল্লিতে শিক্ষা প্রসার ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা সকলকে অবাক করে দিয়েছিলেন।
কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়া সে আনন্দ কি আর বুঝিয়ে বলার। সেই খবর পৌঁছল নভেম্বরের শেষের দিকে। ১৯১৩, ২৮- নভেম্বর সেই খবর নিয়ে শান্তিনিকেতনে এসে হাজির হয়েছিলেন পিয়ার্সন ও বন্ধু এন্ড্রুজ। সেপ্টেম্বরে কবি সবে পাশ্চাত্য ভ্রমণ সেরে এসেছেন কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। এন্ড্রুজ ও পিয়ার্সন শান্তিনিকেতনে এসেছেন শুনেই কবি তড়িঘড়ি ছুটলেন শান্তিনিকেতনে। তাঁরা এসেছেন কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর নিয়ে।
 বিশ্বকবির নোবেল প্রাপ্তি ও কবির বন্ধুবৎসল ও স্নেহভাজন হয়ে শান্তিনিকেতনের জন্য যে অবদান রেখেছিলেন, তাও ভুললে অকৃতজ্ঞ হতে হবে।
  বিশ্বকবির নোবেল প্রাপ্তির সে অনেক কাহিনী। শ্রেষ্ঠ কীর্তির পেছনে খবর না থাকলে কীসের শ্রেষ্ঠ কীর্তি!
 ধন্যবাদ।  নমস্কার। ❤❤🙏🙏
@কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 


 

বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০

দ্বেষী (কবিতা) ✍️নন্দিনী তিথি

 


ভিক্ষা চাহিবার পানে যে অঘোর অনিচ্ছা,

রাত পোহালে চোখ মেলিয়া দেখি শূন্য হাড়ি, শূন্য মুখ

আর অশ্রুর বারিধারা।

ভিক্ষার ঝুলি হাতে বহিয়া তব পা ফেলি গ্রামের 

পথে পথে।

দুপুর গড়িয়ে এল -

তবু ঝুলিতে কিছু না পড়িল! 

মুখ ভরা শূন্য হাসি নিয়ে-

বাড়ি ফিরিতেছিলাম মাথা নত করে,

রৌদ্রের প্রখরতার তালে তালে। 

কিছুক্ষণ চলিতে চলিতে, 

ক্লান্তের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়িতেছিলাম, 

তবক্ষণে ধরিয়া ফেলিল এক বালক,

মাথা তুলিয়া -

বেশভূষায় না পড়িল দৃষ্টির পলক! 

বুকে টানিয়া নিয়া -

সুধাল, মোর গৃহে চল হে সখা,

দিবে একটুখানি চরণধুলা।

মাথা নত করে -

বলিলাম, হে গুনী লহ শত প্রণাম।

কেন এ অভাগারে দিলে তোমার বুকে স্থান।।


Copy©all rights reserved for

Nandini Tithi



#বিষয় - আলোচনা (প্রবন্ধ)# নাম : স্মৃতির ২৫ # লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট।

বিষয় - *বাঙালিয়ানার মধ্যে বড়দিন কাটানোর বিগত অভিজ্ঞতা দাও সবাই। 


✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝✝


আজ খুব ভালো লাগবে লিখে। কারন এই ২৫শে ঘরে নিজেকে বন্দী করেছি। বন্দী কথাটা এই প্যান্ডামিকে একদিনও বলিনি। আজ বলছি। কারণ আজ সেদিন যেদিন বাঙালী, মূলত কোলকাতা ও তার আশেপাশের মানুষ আনন্দে মাতে। ছোট থেকে এমন দেখেই বড়ো হয়েছি। প্রাকৃতিক হিমেল আবহাওয়ার জন্য হোক বা ছুটি ছুটি ভাবের জন্য হোক, এই দিনটি খুশির দিন। 🍊কমলালেবু কেক চকলেট পিকনিকের দিন। আমরা মফস্বলে বড়ো হয়েছিলাম তবুও তখন এই আগ্রহ প্রবল ছিল। আগের দিন কোলকাতা বা ওখানের বড়ো দোকানে অডার দেওয়া থাকত। ওই সময় এ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হত, পিসির ছেলে মেয়েরা আসতো। সে এক হৈ হৈ ব্যাপার। তারপর পিকনিক, নদীর ধারে, সুন্দরবন বকখালি ফ্রেজার গঞ্জ, কিছু না পেলে নিজেদের বিশাল বাগান।আলিপুর চিড়িয়াখানা, সর্কাস।এ সব

মজা 😃 আনন্দ আজও ছুঁয়ে যায়, লিখতে বসে সেই চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছি। সেই ব্যস্ততা, সেই বাচ্ছা আমাদের হুটপাটি। কাকা কাকিমাদের অনাবিল হাসির আওয়াজ। বাঙালির বড়ো দিন এমন হাসির মহল না হলে হয় না। বাঁধনহারা একটা দিন। ফ্রাইরাস ফিসফ্রাই ভেজিটেবল চপ চিকেনের প্রিপারেশন আর খাবার ও মিষ্টি। নলেনগুড়ের সন্দেশ মোয়া একটা করে হাতে যদি দিয়ে যায়। খেলবো এক্কাদোক্কা সারা দুপুর জুড়ে। ব্যাডমিন্টন ভাইবোনদের সাথে, মা কাকিমা পিসিরা। এমন দিন অনেক পেয়েছি ,অন্ততঃ কলেজ যাওয়া পর্যন্ত। কখনও মাসি মামাদেরর দলের সাথে চন্দননগর, বেথুয়াডহরি, নীমপিঠ। বিশাল ট্রাকে গান চালিয়ে বেরিয়ে পড়া ত্রিশ জনের দল, আহা!! মনে হয় স্বর্গে আছি। 

একটু বড়ো হলাম বন্ধুবান্ধব, বড়ো দিন পার্ক স্ট্রিট, হোটেলগুলো, কিন্তু এসব সকালে, রাতে এলাউ ছিল না। তাই সন্ধ্যায় ফিস্টে পরিবারের সাথে আমি।  সখের বাজার সাহেবের মাঠে বাজি পোড়ানো দেখা, সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের চন্ডিরমেলা দেখা।আমার বিয়ে হওয়া পর্যন্ত। তারপর অন্য ইনিংস, অন্য কোন দিন। এরমধ্যে নৌকায় পিকনিক করেছিলাম সারাদিন, ফলতা থেকে ডায়মন্ডহারবার। সারাদিন নৌকা ভাড়া করে হৈচৈ। আমার এমন হতো পরিবার আর বন্ধুরা এক হয়েও মজা হয়েছে।সত্যি এখন ভাবি এখনকার বাচ্ছারা এই সব দিন দেখছে, ভয় সাবধানতা, সেই অনাবিল সোনালী দিন গুলোতে তাদের হাত ধরে নিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। এখন ধর্মীয় গোঁড়ামির অসহিষ্ণু মুহুর্তে মনে হয় চিৎকার করে বলি খ্রিষ্টমাস 🍰আমার তোমার ছিল না। সব বাঙালীর বড়ো দিন ছিল। খুব ছোট যখন জানতাম না আমি খ্রীষ্টান নোই। মার হাত ধরে চার্চে গেছি বাবা উৎসাহ দিয়েছে ঘর সাজাতে। দাদু কিছু না হলে বলত- বড়ো দিন ছোট কেন?  করুনাময় ঈশ্বরের কাছে বলবো আনন্দে ভরে থাক বাঙালী , কিছু না ভেবে। 

# বিষয়- আধ্যাত্মিক- পর্ব -১৩ মৃদুল কুমার দাস।

   # নাম- '

যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি'
            (আধ্যাত্মিক)
              পর্ব- ১৩

    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

  ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্ম মার্গটের জন্য ভগবান ভাগ্যলিপি কিরকম আঁকলেন,যার মধ্যে ছোট্ট মার্গটের জীবন কোন অপেক্ষায় রইল?
অল্প বয়সে বাবার মৃত্যুতে সংসারের অভাব আরো তীব্র। অভাবী কন্যা মেরীর সংসারের হাল ধরতে এগিয়ে এলেন পিতা হ্যামিল্টন। তিনি দুই বোন মার্গারেট ও মে'কে ১৮৭৮-৭৯ শিক্ষাবর্ষে পাঠালেন ইয়র্কশায়ারের 'ক্রশলি হিথ' আবাসিক স্কুলে।
   কংগ্রিগেশনালিস্ট চার্চের অধীন এই বিদ্যালয়ে মূলত ধর্মযাজক পরিবারের মেয়েরা পড়াশোনা করে। এখানকার নিয়ম শৃঙ্খলা বড়ই কঠোর। সকলের প্রতি প্রধান শিক্ষিকা মিস ল্যারেটের কড়া নজর। এখানকার পরিবেশ ছোট্ট মার্গারেটের মানসিকতার সঙ্গে খুব মিলেছে। খুব খুশি। এখানে শিক্ষার প্রথম সোপান আত্মত্যাগ ও দীনতার শিক্ষা। রুটিন বাঁধা দিনের শেষে, তিনি সকল ছাত্রীদের নিয়ে বসতেন, প্রত্যেকের ভুল ত্রুটি কোথায় ধরিয়ে দিতেন।
  এই স্কুলে এসে মার্গটের লাভ হল, আরো আপন করে পেলেন বাইবেল চর্চাকে। আর সংযমী আত্মশাসন, সাথে সাথে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেলেন। কঠোর শৃঙ্খলার মরুভূমিতে পেলেন নিজস্ব আনন্দময় জগতকে। আবাসিকরাও মার্গটে খুব ভালবাসা উজাড় করে দিত। মার্গট সকলের মধ্যমণি হয়ে উঠতেন। সকলে সমবেত হলে ভূতের গল্প চলত, বাইবেলের গল্পে আসর খুব জমত।
  জুলাই মাসে ও বড়দিনের ছুটিতে দুই বোনকে এক শিক্ষিকা ফ্লিটউড স্টেশনে এসে ট্রেনে তুলে দিতেন। ট্রেন থেকে নেমে জাহাজে চেপে আয়ারল্যান্ড পাড়ি দিতেন। দাদু হ্যামিল্টন বেলফাস্ট বন্দরে নামিয়ে নিতেন। ওত ছোট বোনকে নিয়ে এভাবে যাতায়াতে কোথাও ভয় তাঁকে গ্রাস করতো না,বরং খুব উপভোগ করতেন। মনে উৎসাহ টগবগ করত। দাদুর কোলে আদর খাওয়ার আনন্দ ভেবে।
দাদুর কাছে ছোট্ট ভাইটিকেও পেয়ে যেতেন। মা মেরি বাবার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। দাদুর কাছে এসে প্রাপ্তির ভাঁড়ার উপচে পড়ত। দাদু হোমরুল আন্দোলনের নেতা। নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে সভা সমিতিতে যেতেন। দাদুর কাছেই তাঁর ধর্মবোধ ও স্বদেশপ্রেমের দুই ভাব হৃদয়ে যুগলবন্দী ঘটত। তারপর ছুটি শেষ হয়ে যেত। আবার স্কুলে যাওয়া। সঙ্গে বাক্স বোঝাই করে বইপত্তর নিয়ে নিতেন। ক্লাসের সিলেবাসের চেয়ে বাইরের পড়ার জগতই তাঁকে বেশি করে টানত। বইগুলোর মধ্যে থাকত যেমন শেক্সপিয়ার, মিলটন, আয়ারল্যান্ড মুক্তি আন্দোলনের শহীদ এলসমারের জীবনী, বিপ্লবীদের স্মৃতিকথা। এসবই ছিল তাঁর রবিবারের ভোজ।
      ইতিমধ্যে পেলেন নতুন প্রধান শিক্ষিকা মিস অ্যাঞ্জেলা লুইসা কলিনজ। তিনি সবার থেকে অনেক আলাদা তা মার্গারেট অচিরেই বুঝতে পারলেন। মার্গারেট একদিন তো কলিনজের কাছে বলেই বসলেন - "ভগবান আছেন মানলাম, তাঁকে আমি জানতে চাই, বুঝতে চাই।" তারপর কি হল আসবো পরের পর্বে...
                      (চলবে)

@কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 


তিন বছর বয়সের একাকীত্ব(চন্দনা লাহা)


 হ্যাঁ  সেদিন ছিল রবিবারেই।  আমার স্পষ্ট মনে আছে সকালবেলায় সেই হৃদয় ভাঙ্গা কান্না আর খোল করতালের সঙ্গে  পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা বল হরি হরিবোল শব্দ টা তীব্র হতে হতে ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল। এই হরি বোল কোন বয়সে মৃত্যু বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার ছিল না। এই মরদেহ ছিল তিন বছর বয়সের মান্তুর মায়ের মরদেহ। সেদিনই শুরু হয়েছিল তার জীবনে একা কাটানো রবিবার।

         

         বডিটা হসপিটাল এবং পুলিশ দুজনেই সকাল সাত টাতে ছেড়ে দিয়েছে। গরীব ভুবনের স্ত্রীর শবদেহ আনতে আনতে প্রায় দশটা বেজে গিয়েছিল। পাড়ায় হঠাৎ একটা গাড়ি থামতে দেখে সবাই ছুটে গিয়েছিল দেখতে। ভেবেছিল ভুবনের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। হসপিটাল থেকে ছুটি নিয়ে ফিরছে। কিন্তু না। সামনে আসতেই সবার মুখের চিত্রটা বদলে গেল। আঁতকে উঠল সব কটা মুখ। অবস্থা দেখে মান্তুর এক পরিচিত তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়ে পাশের ঘরে রেখে এলো। তার মা ফিরে আসবে এই প্রতিশ্রুতিতে সে এখনো শান্ত এবং স্থির। তারপর মান্তু বিন্দুমাত্র কোন কিছু টের পেল না। মরদেহ  নামিয়ে মাঝ বাহিরে একটা খাটের উপর রাখা হলো তার দেহটাকে। দেখলে মনে হয় দেহে এখনো প্রাণ আছে। দিব্যি ঘুমোচ্ছে। ভুবন ব্যাস্ত হয়ে পরলো কাঠ পালা লোকজন জোগাড় করতে। ঘরে আছে বলতে ওই বছর সত্তরের মান্তুর বিধবা ঠাকুমা। একে একে সবাই এসে দেখে ফিরে  গেল। মান্তুর মা যেন একাকী অপেক্ষা করতে থাকলো তার সন্তান কখন এসে একবার শেষবারের মতো তার সঙ্গে দেখা করে  যাবে।  কিন্তু মান্তু কে আর  কেউ আসতে দিল না। কত এয়োতি এসে সৌভাগ্য লাভ করে গেল। তাদের ধারণা এয়োতি নারীর মৃত্যু দেখা নাকি খুবই সৌভাগ্যের। তাই অনেকেই আলতা সিঁদুর পরিয়ে তাকে রাঙ্গিয়ে তুলল। তারপর তার মা  এসে পৌঁছল । বাস গোলযোগে এত দেরি। অনেক দুর্ভাগ্য নাহলে এমন দৃশ্য মায়েরা দেখেনা। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জড়িয়ে ধরল মেয়েকে। মায়ের বাঁধভাঙ্গা কান্নায় যেন গোটা আকাশ বাতাস কেঁপে উঠছে। এতক্ষন অবধি নিথর দেহটা বড় অসহায় ভাবে পড়েছিল। এক ফোটা চোখের জল ফেলারও কেউ ছিলনা।

           ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটে বাজে। এমন সময় দুজন ডোম এসে হাজির হলো। তারা বলল ওই বউয়ের পেট কেটে বাচ্চাটাকে বের করে দেব কিন্তু তার জন্য মদের দাম দিতে হবে। একশ দুশো নয় একেবারে পাঁচশো টাকা। ভুবন দিতে অক্ষমতা জানালেও তারা দু একজন সহ বাবা মা টাকাটা দিয়ে দিল।

          তারপর সব শেষে যখন মরার খাট তোলা হলো কাঁধে তখন প্রায় সন্ধ্যা হব হব অবস্থা। কেউ বলল মান্তু কে  আনার দরকার নেই। আবার কেউ বলল একবার শেষবারের মতো মায়ের মুখটা দেখতে দাও। তারপর মান্তুর দিদা  কাঁদতে কাঁদতে মান্তু কে নিয়ে এলো তার মায়ের কাছে। আর বলল মাকে প্রণাম কর। মা যে চলে যাচ্ছে। মান্তু জিজ্ঞেস করল মা কোথায় যাচ্ছে? আমিও যাব মায়ের সঙ্গে। কথাটা শুনে সকলের বুকে কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। পাড়ার সকলের চোখে জল এসে গেল।

          তারপর মায়ের মুখ দেখার পর মান্তুর কান্না আর ঢোল করতাল এর বাজনা মিলেমিশে এক একাকীত্ব বয়ে নিয়ে এলো গোটা পরিবেশে। 

         


অণু কবিতাঃ বিষাদের শরৎ # কলমে ~ পল্লবী

 


 

 
 
সেদিনও ছিলো এমনই এক
স্নিগ্ধ শরতের বিকেল,
মাথার উপরে আকাশটা ছিলো
গোলাপী আর লাল রঙে রঙীন।।
 
 
নীল শাড়িতে তোমাকে লাগছিলো?!
কি বলবো, কি বলি বলতো?!
আমার এই দু'চোখ, সেতো কবে থেকে
হয়ে গেছে জন্মান্ধ! তাইতো সেখানে আজ
নীলের পরিবর্তে দেখি শুধুই হলুদ!!
 
 
আনমনে, একাকী, উড়িয়ে বাতাসে 
নীল শাড়ির আঁচল আর
গায়ে মেখে সাদা কাশ ফুল,
তুমি যাচ্ছ চলে এক সমৃদ্ধ সুদূরে
কোন পিছুটান নেই, নেই কোন দায়ভার!
তাই তো আজ নীল আর হলুদে মিশে একাকার।।
 
 
শরৎ ছিলো প্রিয় ঋতু, তোমারও হয়তোবা
নীল রঙের সাথে আজ দিয়েছি বিদায়
প্রিয় শিউলী আর কাশ ফুলকেও!!
 
 
হে অতীত!খুব ভালো থেকো,
ঝরে পড়া শিউলীর সুগন্ধিযুক্ত হয়ে
শরতের এই ভরা সন্ধ্যায়।।

||সমাপ্ত||

Copyright©️ All rights reserved for Pallabi Barua

ঘোষ বুড়ী(সুদেষ্ণা দত্ত)


 ঘোষ বুড়ী

©সুদেষ্ণা দত্ত

 

   গ্রামের নাম সুন্দরগ্রাম--বাংলা মায়ের কোল ঘেঁষা সুজলা,সুফলা,শান্তির নীড় ঘেরা এক গ্রাম।গ্রামের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী।সেই গ্রামে বিঘে খানেক জায়গা নিয়ে ঘোষ বুড়ী বলে এক বুড়ী থাকত।সবাই তাকে ঘোষ বুড়ী বলেই জানত,নাম কেউ জানলেও বলত না-কারণ কালে কালে সে ঘোষ বুড়ী থেকে ‘ফোঁস বুড়ী’তে পরিণত হয়েছিল।বুড়ীর বাগানে আম—জাম--নারকেল থেকে হেন ফলের গাছ নেই যা ছিল না।এত ফলের গাছ থাকায় বুড়ীর টিনের চালে প্রায়ই নানা শব্দতরঙ্গ বাজত।সজাগ বুড়ী-সাদা থান, শন নুড়ির মত চুল আর হাতে লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ত।সদাই তার মুখে বুলি ছিল—”পাড় পাড় বাজ পড়ে মড়বি”।

        গ্রামের ছোট ছোট ধানি লঙ্কাগুলো বুড়ীকে নিয়ে ছড়া বেঁধেছিল—

“ঘোষ বুড়ী না ফোঁস বুড়ী

দেখি আগে তুই মরিস

 না আমরা মরি!”

এ কথা শুনলে বুড়ী তেলে বেগুনে জ্বলত আর গোটা গ্রাম মাথায় তুলে চেঁচাত।প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই চলত।তাই গ্রামের মানুষও এ নিয়ে বেশি মাথা ঘামাত না।সকলেই মজা পেত।কখনো ছেলেদের খারাপ কথা বলার জন্য রাগও করত মায়েরা।তারা মনে মনে ভাবত একা থাকে বুড়ী,কত খাবে!ছেলেগুলোকে কিছু দিলে কি কম পড়বে!কিন্তু বুড়ীকে মুখের ওপর সে কথা বলার কারোর সাহস ছিল না।

          গ্রামের কোন লেখাপড়া জানা নাতনী স্থানীয় বউরা বুড়ীকে কত বোঝাত—'আমরা রান্না করার সময় দেখেছ তো ঠাকমা আমরা খেয়ে দেখি।কেন বলত!যাতে পরিবারের লোকের পাতে ভাল খাবার তুলে দিতে পারি।নুন-মিষ্টি কম হলে সেগুলো মিশিয়ে দি।তেমন কথার তীরেও বড় ধার হয় গো।এমনি তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও কথার তীর কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না।বড় জ্বালা ধরায় বুকে,ঘটি ঘটি জল ঢাললেও সেই জ্বালা জুড়োয় না,রেখে যায় ক্ষত।তারপর তুমি ছেলেগুলোকে এত অভিশাপ দাও কোনদিন বিপদ ঘটলে তার মা-বাপে তোমায় ছাড়বে!তিনকাল গিয়ে তো এককালে ঠেকেছে, একটু সংযত হও ঠাকমা।বুড়ী রেগে বলে—'তা বাছারা ইস্কুলের মেস্টর হলিই তো পারতে, হাঁড়িতে মুখ গুঁজে পড়ি আছ কেন?

            এমনই এক কালবৈশাখীর রাত।মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে,পাল্লা দিয়ে চলছে ঝড়ের তান্ডব,সঙ্গে অশনি সংকেত।ছেলেরা ঘরে ছটফট করলেও তাদের ওপর আজ কড়া পাহারা।বুড়ীর চালেও বৃষ্টির ফোঁটা বুনে চলেছে নানা শব্দজাল।এক হাতে লাঠি,অন্য হাতে লণ্ঠন নিয়ে বুড়ীও বেরিয়েছে বাগান পাহারা দিতে।হঠাৎ কাছেই কান ফাটানো বাজ পড়ার আওয়াজে ছেলেরাও মুখ লুকিয়েছে মায়ের কোলে।

       স্বাভাবিকভাবেই কিছু সময় তান্ডব চালিয়ে প্রকৃতিও হয়েছে শান্ত।ছেলেরা সকাল বেলায় আশায় আশায় যাচ্ছে বুড়ীর বাড়ীর দিকে আর ভাবছে ফোঁস বুড়ী কি আর তাদের জন্য কিছু ফেলে রেখেছে,সবই ঘরে তুলেছে!কিন্তু বুড়ীর বাগানে গিয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় ঝাল কমে যায় ধানি লঙ্কাগুলোরই।দেখে বুড়ীর বাগানের একটা নারকেল গাছ বাজ পড়ে জ্বলে গিয়েছে,তার নীচে বুড়ী পড়ে আছে মরে কাঠ।বুড়ীর কথাই বুড়ীর কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।আর বুড়ীকে নিয়ে গিয়েছে সব হিসাব—নিকাশের বাইরে।


ছবি সৌজন্য:গুগুল

© কপিরাইট রিজার্ভ ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

 

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...