✍- অঙ্কিতা
এয়ারপোর্টে বসে আছে ইশান। বহুদিন বাদে কলকাতা এসেছিল ও বাবার কাছে। কাগজের দোকান থেকে একটা ম্যাগাজিন কিনে পড়ছিল, হঠাৎ একটা ছোট্ট বাচ্চা টলমল পায়ে এগিয়ে এল। ছোট্ট দুটো চোখে জুলজুল করে চেয়ে রয়েছে ওর দিকে। ইশান আলতো করে গালটা টিপতেই ফিক্ করে হেসে দিল বাচ্চাটা। "কথা বলতে পারেনা এখনও" বলে উঠল একজন ভদ্রলোক।
-"Sorry দাদা। কোনভাবে অসুবিধা করেনি তো? আর বলবেন না, এত দুষ্টু না আমি আর আমার বোন কি চিন্তায় পড়ে গেছি!"
ইশান- না না ওইটুকু পুঁচকে কি জ্বালাতন করবে বলুন?ওরা জ্বালাতনের কি বোঝে?
- "হ্যাঁ তা যা বলেছেন" বলতে বলতে ভদ্রলোক বসলেন পাশের সিটটায়। হাতে একটা ট্রলি ব্যাগ আর খুশি বলে কাকে যেন ডাকলেন। এক মাঝবয়সি মহিলা তাদের দিকে আসলেন। ইশান বুঝল এটি বাচ্চাটির পিসি।
খুশি- (বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে)খুব সেয়ানা হয়েছো তুমি! খালি বদমাইশি!
(বাচ্চাটি অবলীলায় হাসতে লাগল)
ইশান- নাম কি ওর? কি মিষ্টি দেখতে!
খুশি- ইশানী
বাচ্চাটি এবার ইশানের দিকে যাওয়ার জন্য উশ-খুশ করতে লেগেছে।
ইশান- দিন দিন আমার কাছে দিন। ইশানী, ইশানকে চিনতে পেরেছে বোধহয়! তাই ওমন ভাবে উতলা হচ্ছে!
খুশি- নিন। আসলে খুব চালাক, জানেন না তো। নতুন কাউকে পছন্দ হলেই তার সাথে হুজ্জুতি করতে থাকে! দাদাকে পেলে দাদার সাথে মিলে মাতিয়ে দেয় বাড়ি।
ইশান- এইতো বয়স দুষ্টুমি করার... তা আপনারা যাবেন কোথায়?
ভদ্রলোক এবার বলে উঠলেন "ঐ তো দিল্লি। আসলে এখানে আসা আমার শ্বশুড়বাড়িতে। এই যে মহারানীকে দাদু দীদার কাছ থেকে কদিন ঘুরিয়ে নিয়ে গেলাম আর কি।"
ইশান---ওহ! আচ্ছা! আচ্ছা! আমারও তো দিল্লির ফ্লাইট। চাকরি সুত্রে থাকা আর কি।
- হ্যাঁ আমারও... যাই হোক, নমস্কার! আমার নাম রাঘব চ্যাটার্জী। আপনার নাম তো জেনেই গেলাম।
খুশি- দিন আপনি ওকে আমার কাছে দিন। অনেকক্ষন আপনার কোলে আছে, অসুবিধা হচ্ছে আপনার।
ইশান- না! না! I love babies...সমস্যা হচ্ছে না কোনো। আচ্ছা If you don't mind, তবে একটা প্রশ্ন করি?
রাঘব- হ্যাঁ! নিশ্চয়ই বলুন।
ইশান- আপনার স্ত্রী... না মানে এত ছোট্ট মিষ্টি বাচ্চা আর তার মা'কে দেখছি না, আপনি সামলাচ্ছেন...
রাঘব- She is no more... একটা ম্যাসিভ হার্ট-অ্যাটাকে মারা যায় এই পাঁচ মাস আগে।
ইশান- ইশ! I'm extremely sorry...
ইতি মধ্যে বিমানে ওঠার ঘোষনা হয়। আর ছোট্ট ইশানীকে কোলে নিয়ে, এক হাতে ট্রলি আর পিঠে ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে চলেন রাঘব। ইশান আর খুশিও তাদের লাগেজ নিয়ে উঠে আস্তে আস্তে রওনা হয়।
হঠাৎ বেকায়দাতেই রাঘবের হাত থেকে ওর মানিব্যাগটা পড়ে যায়।
ইশান- দাঁড়ান! দাঁড়ান! আমি তুলে দিচ্ছি।
মানিব্যাগটা তুলতে গিয়ে ইশানের নজর হয় তাতে থাকা ফোটোটায়।
রাঘব- She was my wife...ইশানীর মা, অদ্রীজা!
প্লেনের সামনের একটা রো'তে রাঘবদের সিট। ইশানের সিট টা শেষে কর্ণারে উইন্ডো সিট্।
বাইরে তাকিয়ে ইশানের এরকমই একটা দিন মনে পড়ে গেল, প্রায় দেড় বছর আগে যখন ইশানের প্রথম ট্রান্সফার অর্ডারটা আসে।
অদ্রীজা- তুই চলে যাবি? আজকে আট বছর ধরে আমাদের সম্পর্কটা। তুই এখনও আমাকে তোর স্ত্রী হিসাবে মর্যাদাটুকু দিসনি। এখন তো সেই সিদ্ধান্তটা নে।
ইশান- অদ্রীজা! ব্যাপারটা বোঝ, আমার চাকরির মোটে চার বছর। আর কটা দিন যেতে দে। আমি এখনই চাই না এসব। আর ওরকম ভাবে শুধু রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে নেওয়াটা পোষাবে না। বাবা-মায়ের, ফ্যামিলির, বাকি সবার ইচ্ছাটাও তো দেখবি।
অদ্রীজা- কিন্তু আমি যে তোর ফ্যামিলির চার্মকে নিজের ভেতরে বড় করছি সেটা? আমাকে যে সমাজ কুলটা বলবে সেটা? এগুলোর কোনো দাম নেই?
ইশান- আমি তোকে বলেছিলাম abort করিয়ে নিতে। আমি সেসব খরচাপাতি দিয়ে দিতাম। তুই, আমি কেউই এখনই এরকম দায়িত্বর জন্য প্রস্তুত না। আমি তো একদমই না। ওটা ভুল করে ঝোঁকের বশে হয়ে গেছিল।
অদ্রীজা- তোর, আমার ভুলের জন্য একজনকে মেরে ফেলতে আমি পারব না। আমার নাড়ীর টানটা এত সহজে নষ্ট করতে আমি পারব না।
সেদিন অদ্রীজার সাথে যদি ইশান থাকত, তাহলে আজকে ঐ ছোট্ট ইশানীকে অন্যের থেকে চেয়ে আদর করতে হত না। অদ্রীজা নেই তবে অদ্রীজার অংশটা ইশানের কাছে থেকেও নেই...!!
All right©rights reserved.