# বিষয় - বাংলা সাহিত্যে নোবেল।
# নাম- রবীন্দ্রনাথ ও নোবেল পুরস্কার।
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
রবীন্দ্রনাথ বিদেশ ভ্রমণ করে ফিরলেন ১৯১৩ সেপ্টেম্বরে। আর নোবেল জয়ের খবর এলো নভেম্বরে। সেই খবর নিয়ে পৌঁছলেন ২৮-নভেম্বর পিয়ার্সন ও এনড্রূজ। বিশ্বকবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পেছনে এই দুই বিদেশী ও রবীন্দ্র-ভক্তের অবদান যেন কোনোদিন ভুলে না যাই। কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সাথে এই দুই বিদেশীর নাম ওতোপ্রতো সম্পর্কিত কাহিনীর কথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর শান্তিনিকেতনের জন্য তাঁদের অবদান যেন কোনোদিন না ভুলে যাই। তাই কবির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ঘটনার সাথে এই দুই কবির একনিষ্ঠ সুহৃদের কথাও একনিষ্ঠ চিত্তে স্মরণ করব।
উইলিয়াম পিয়ার্সন( জন্ম-১৮৮১)-এর ডাকনাম উইলি। বাড়ি ম্যাঞ্চেস্টার শহরে। ক্রেমব্রিজ থেকে ন্যাচারাল সায়েন্স নিয়ে এম.এ. করার পর কলকাতার ভবানীপুরে এসে ওঠেন লন্ডন মিশন সোসাইটি কলেজে জীববিদ্যার অধ্যাপনা ও ধর্মযাজকের কাজে একজন নিবেদিত প্রাণরূপে। আর বন্ধু এন্ড্রুজ ছিলেন দিল্লির সেন্ট স্টিফেন কলেজের অধ্যাপক।
১৯০৭ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত পাঁচবছর পীয়ার্সন কলকাতায় ছিলেন। শেষে মিশনের কাজে বিতশ্রদ্ধ হয়ে কলকাতা ছাড়েন। ফিরে যান ম্যাঞ্চেস্টারে। বাড়িতে তাঁর কলকাতার জন্য খুব মন খারাপ করতো। কলকাতায় থাকার সময় রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভক্ত পাঠক ছিলেন। আর সেই রবীন্দ্রনাথ আসছেন লন্ডনে,শুনে মন বড়ই রোমাঞ্চিত!
১৯১২ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে কবি রবীন্দ্রনাথ লন্ডন রওনা দিলেন। সঙ্গে রথীন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রী প্রতিমাদেবী। উদ্দেশ্য পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখা। আর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ সুইডিস অ্যাকাডেমিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য পেশ করা।
এই 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতা লিখেছিলেন অসুস্থ অবস্থায় শিলাইদহে যাওয়ার পথে। আর কিছু কবিতা ইংল্যান্ডে যাওয়ার পথে।
লন্ডনে পৌঁছে চেরিং ক্রশ স্টেশন থেকে ধরবেন সে দেশের টিউব রেল। আর সেই জার্ণিতে এতো আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন যে অ্যাটাচকেসে 'গীতাঞ্জলি'র পান্ডুলিপি ছিল সেটি হাতছাড়া হলো। হোটেলে গিয়ে দেখলেন অ্যাটাচকেসের হদিস নেই। শেষে সেটি চেরিং ক্রশ স্টেশনে 'লেফট লাগেজ অফিস'-এ পাওয়া গিয়েছিল।
লন্ডনে পৌঁছেছিলেন জুনের মাঝামাঝি। সুকুমার রায় ঐ সময় লন্ডনে ছিলেন। ইতিপূর্বে সুকুমার রায় বিলেতে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে 'দ্য স্পিরিট অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর' প্রবন্ধটি রচনা করে কবি সম্পর্কে বিলেতি মহলে খুব আগ্রহ তৈরি করে ফেলেছেন। সেই কবি এবার আসছেন স্বদেহে। সবাই সাক্ষাৎ পাবেন বলে একটা বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিলেতে।
পিয়ার্সনের Hampstead Heath-এর বাড়িতে বসবে প্রবন্ধ পাঠের আসর। সেই আসরে সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটি স্বরচিত প্রবন্ধ পাঠ করবেন। সেই ঘটনা জানিয়ে সুকুমার রায় তাঁর বোন ঘটনার দু'দিন পরে চিঠি লিখেছিলেন এই কথা জানিয়ে -
"পরশু দিন Mr. Pearson... - তাঁর বাড়ীতে আমার Bengali Literature সম্বন্ধে একটা paper পড়বার নেমতন্ন। .... সেখানে গিয়ে দেখি Mr. & Mrs.Amold,Mr.&Mrs.Rothenstein, Dr.P. C. Roy, Mr. Sarbadhikary প্রভৃতি অনেক পরিচিত, তাছাড়া কয়েকজন অচেনা সাহেব মেম উপস্থিত। শুধু তাই নয়, ঘরে ঢুকে দেখি রবিবাবু বসে রয়েছেন। বুঝতেই পারছিস আমার কি অবস্থা। যা হো'ক চোখ কান বুজে পড়ে দিলাম। ....
তারপর Pearson-এর বাড়ির ছাদে গেলাম। সেখান থেকে Hampstead Heath - এর চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়।..." এই সাহিত্যের আসর বসেছিল ১৯ জুন ২০১২।
আর রবীন্দ্রনাথকে দেখে পীয়ার্সন আভূমিনত হয়ে প্রণাম করেছিলেন। এখানেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম এক বিদেশি পরম ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীর এতোদিন যা ছিল মনে মনে গভীর অনুরাগ,এবার হলেন মুখোমুখি। তাঁরই বাড়ীতে আবার রদেনস্টাইনের সঙ্গে করির সাক্ষাৎকার হয়। এই রদেনস্টাইন ছিলেন নোবেল কমিটির একজন অন্যতম সদস্য।
২৭জুন রোদেনস্টাইনের বাড়ীতে সান্ধ্যভোজের আমন্ত্রণে কবি আমন্ত্রিত। সভায় ছিলেন কবি W.B.Yeats । সেখানে কবি গীতাঞ্জলি থেকে কয়েকটি কবিতা পড়ে শোনান। আর তাই শুনে মুগ্ধ ইয়েটস 'Songs Offering'- এর introduction বা পরিচয় পত্র লিখে দেওয়ার কথা দেন। আর ঠিক হয় ৭-আগষ্ট রোদেনস্টাইনের বাড়ীতে কবিতা পাঠের আসর বসবে। সেই মতো কবিতা পাঠের আসরে উপস্থিত ছিলেন আর্নেস্ট রিজ,অ্যানিস মেনেল, হেনরি নেভিলসন,মে সিনক্লিয়ার, চার্লস ট্রেভেলিয়ন, ডব্লিউ. বি. ইয়েটস। এছাড়া পিয়ার্সন ও তার বন্ধু এন্ড্রুজ এবং ডাঃ দ্বিজেন্দ্রলাল মৈত্র। দ্বিজেন্দ্রলাল মৈত্রের সঙ্গে ইয়েটসের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মৈত্র ম'শায়ের কাছ থেকেই তো কবির সম্পর্কে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পেরেছিলেন ইয়েটস। তাই তো ইয়েটস পরিচয়পত্র লিখে দেওয়ার ভরসা পেয়েছিলেন।
পিয়ার্সনের সঙ্গে থেকে বন্ধু এন্ড্রুজ রবীন্দ্রনাথকে কাছ থেকে দেখে খুব মুগ্ধ হয়েছিলেন। ইতিপূর্বে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এন্ড্রুজ বন্ধু পিয়ার্সনের মুখে ভূয়োশী প্রশংসা শুনেছেন। সাক্ষাতে যা দেখলেন কবি কোনও অংশে কম নন। এই দুই বিদেশী কর্মসূত্রে ভারতকে খুব ভালোবাসতেন। এমনকি তাঁদের ভারতীয়দের প্রতি ইংরেজ শাসকদের শোষণের স্বরূপ ভালো লাগতো না। যে মিশন সোসাইটির কলেজে পড়াতে এসেছিলেন সেখানে অখ্রিষ্টান ছেলেদের বাধ্যতামূলক বাইবেল ক্লাসে যোগদানকে তিনি ভালো মনে নিতেন না। তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তিনি কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে সাধারণ বাহ্মসমাজ মন্দিরের পাশের গলিতে ধর্ম্মানুশীলন এবং সাহিত্য, বিজ্ঞান,দেশহিতৈষণা ও দানধর্ম্ম চর্চা করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত 'দেবালয়' সমিতিতে বক্তৃতা দিতে মাঝে মধ্যে আসতেন। বাংলা ভাষা শিখতেও শুরু করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় না হলেও কবির লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটে গেছে। এমনকি কবির 'পাবনা প্রাদেশিক সম্মীলনী উপলক্ষে সভাপতির বক্তৃতা'র ইংরেজি অনুবাদ যে পিয়ার্সন পড়েছিলেন তা জানা যায় ১৬ এলগিন রোড থেকে প্রকাশিত ১৯০৮,১৮ ফেব্রুয়ারী 'The Bengalee'তে তাঁর লিখিত একটি চিঠি থেকে। এই হলেন রবীন্দ্র ভক্ত পীয়ার্সন।
শান্তিনিকেতনের সান্নিধ্যে এসে শান্তিনিকেতনের দ্বারা এতো প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন,এন্ড্রুজ বলতেন "ভারতবর্ষে তাঁর দ্বিতীয় জন্ম"; আর উইলিয়াম পিয়ার্সন ১৯২৩এ মৃত্যুর দিন ইতালির হাসপাতালে চেতনা হারানোর পূর্বে হাসপাতালের অপরিচিত কর্মীদের নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন "ইন্ডিয়া ইজ মাই ফার্স্ট লাভ।"
শান্তিনিকেতনের গৌরবময় অধ্যায়ের পুরোধায় এই বিদেশি শিক্ষক বন্ধু আশ্রমে ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছিলেন খুব প্রাণের প্রিয় বন্ধু। পড়াতেন বিজ্ঞান ও ইংরেজি ভাষা। পিয়ার্সনের কাজে খুব নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা,আর গভীর বন্ধুবৎসল মনোভাব আশ্রমবাসীদের কি খুশীই না করতো! রবীন্দ্রনাথের টানে বন্ধু এন্ড্রুজের জোগাড় করে দেওয়া দিল্লির গৃহশিক্ষকতায় চারশ'টাকার বেতন ছেড়ে শান্তিনিকেতনে একশ' টাকার বেতনে যোগ দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে গান,অভিনয়, খেলাধুলায় কি সুন্দর অংশগ্রহণ করতেন। বিশেষ করে শান্তিনিকেতনে 'অচলায়তন' নাটকে শোনপ্রাংশুর চরিত্রে কি দারুন অভিনয় করেছিলেন। বাংলা উচ্চারণে প্রথম প্রথম অসুবিধায় সকলে কি মজাই পেতেন।
বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের আশেপাশে সাঁওতাল পল্লিতে শিক্ষা প্রসার ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা সকলকে অবাক করে দিয়েছিলেন।
কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়া সে আনন্দ কি আর বুঝিয়ে বলার। সেই খবর পৌঁছল নভেম্বরের শেষের দিকে। ১৯১৩, ২৮- নভেম্বর সেই খবর নিয়ে শান্তিনিকেতনে এসে হাজির হয়েছিলেন পিয়ার্সন ও বন্ধু এন্ড্রুজ। সেপ্টেম্বরে কবি সবে পাশ্চাত্য ভ্রমণ সেরে এসেছেন কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। এন্ড্রুজ ও পিয়ার্সন শান্তিনিকেতনে এসেছেন শুনেই কবি তড়িঘড়ি ছুটলেন শান্তিনিকেতনে। তাঁরা এসেছেন কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর নিয়ে।
বিশ্বকবির নোবেল প্রাপ্তি ও কবির বন্ধুবৎসল ও স্নেহভাজন হয়ে শান্তিনিকেতনের জন্য যে অবদান রেখেছিলেন, তাও ভুললে অকৃতজ্ঞ হতে হবে।
বিশ্বকবির নোবেল প্রাপ্তির সে অনেক কাহিনী। শ্রেষ্ঠ কীর্তির পেছনে খবর না থাকলে কীসের শ্রেষ্ঠ কীর্তি!
ধন্যবাদ। নমস্কার। ❤❤🙏🙏
@কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
সত্যি অসাধারণ লেখা দাদা...💐💝
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💫💫💥
উত্তরমুছুনঅসাধারণ
উত্তরমুছুনঅসাধারন 👏👏👌👌
উত্তরমুছুন