আজ ছয়মাস ধরে এই করছে সে। শুরুর দিকে, টুকটাক কাজ, যেমন; বাজার করা,ঘরদোর পরিস্কার করা, সময়ে অসময়ে চা বানানো এসব করতো। এখন তো সে পুরদস্তুর 'আব্দুল' বনে গেছে। এক সময়, যে লেখা পড়া শিখে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল, তাও আজ ফিকে হওয়ার পথে! হাড় কাঁপানো শীতে কাঁপতে কাঁপতে, নাস্তা বানাতে বসে শক্তি নিজের ভবিষ্যত চিন্তা করে যেনো কুয়াশা ঘেরা অন্ধকার দেখে!
শক্তি ওর বাবার দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। প্রথম ঘরে কোন সন্তানাদি না হওয়ায়, শক্তির বুড়ো বাবা ওর গার্মেন্টস কর্মী মাকে বিয়ে করেছিল সন্তান লাভের আশায়! জন্মের পর শক্তি ওর মাকে কখনো চোখে দেখেনি। মায়ের বুকের দুগ্ধপান তো দূরের কথা, মাতৃ স্নেহ, মায়ের ভালবাসা কি; সে তা জানে না। বাবার স্নেহ ও কি পেয়েছে সে?? যবে থেকে একটু বুঝতে শিখেছে, দেখেছে ওর বাবাকে বিছানায় শয্যাশায়ী! কয়েকদিন পরপর যমে মানুষে টানাটানি চলে। সেবার ও এ রকম এক দিনে, অসুস্থ বাবাকে দেখতে আসা আত্মীয়দের কথপোকথনে বুঝতে পেরেছিল, "মায়ের সাথে বিয়েটা ছিল আসলে চুক্তির বিয়ে! সন্তান প্রাপ্তির আশায়! জন্মের পরপরই ওদের মা- ছেলেকে পরস্পরের থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ওর মাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা!"
চুলায় বসানো সব্জি নেড়ে দিয়ে, শক্তি মনোযোগ দেয় রুটি বানানোর কাজে। এক ফাঁকে উঁকি দিয়ে সময়টা ও দেখে নেয়। দেরি হলেই শুরু হবে মাধবীলতার কান ফাটানো চিৎকার আর অশ্রাব্য গালাগালি! বাবার একমাত্র বোনের মেয়ে এই মাধবীলতা। অর্থাভাবে যখন অভাবে অনাহারে স্বামী সন্তান নিয়ে দিনাতিপাত করছিল, একমাত্র মামা হিসেবে শক্তির বাবা,ভাগ্নিকে নিজের কাছে এনে রেখেছিলেন। একটাই শর্ত,, শক্তির দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হবে। মাধবীলতার নিজের সন্তান শক্তির চেয়ে কয়েক বছরের বড়।এহেন প্রস্তাবে মাধবীলতা যেন আকাশের চাঁদ পেলো হাতের মুঠোয়! ধীরে ধীরে শুরু হলো মাধবীলতার নীরব আগ্রাসন! আর শক্তির বাবাও যেন আগের চেয়ে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যেতে লাগলেন। অসুস্থতার ধুঁয়া তুলে মাধবীলতা একে একে ব্যাংক ব্যালেন্স থেকে জমিজমা, বাড়ি ও দোকানের দলিল, সব কিছুই নিজের নামে "পাওয়ার অফ এটর্নি" নিল।
বাবার মৃত্যুর পর, প্রথম আঘাত এলো শক্তির পড়া শোনায়! খরচের কথা বলে, ওকে নামী প্রাইভেট স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে ভর্তি করে দেওয়া হলো সাধারণ মানের এক স্কুলে। বাবার চিকিৎসায় অনেক টাকা ধারের অজুহাতে শক্তিদের বাড়ির পুরোটাই ভাড়া দিয়ে মাধবীলতা উঠে এলো তিন কামরার ভাড়া বাড়িতে। সেখানে, শক্তির নিজের ঘর বলতে, বসার ঘরের এক কোনায় পেতে রাখা একটা জল চৌকি!!
বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে, শক্তির অশিক্ষিত মা চেষ্টা করেছিল, তেরো বছরের শক্তির কাস্টডি নিজের কাছে নেয়ার! কিন্তু, পেটে যার এক ফোঁটা বিদ্যা নেই, কীভাবে লড়বেন শকুনের সাথে মাংসের ভাগ নিয়ে??? শক্তি নিজেও ওর মায়ের চোখে স্নেহের চেয়ে লোভ ই বেশি দেখেছে। তা না হলে যে মা, জন্মের পর কোনওদিন যোগাযোগ করার প্রয়োজন মনে করেননি, হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলেন আজ??
রুটি সেঁকার পাশাপাশি এসব গভীর ভাবে ভাবতে থাকে শক্তি। কাল অবশ্য বাজার করে ফেরার পথে, বড় রাস্তার মোড়ে, হঠাৎ করে ওর বাবার বন্ধু, উকিল মেসোর সাথে দেখা! উকিল মেসোর কথা শুনে, একটু হলেও যেন আশার আলো দেখতে পাচ্ছে সে। কানে বাজছে, উকিল মেসোর বলা কথা," শোন রে শক্তি, পড়াশোনাটা কর মনোযোগ দিয়ে। কষ্ট হলেও ছাড়িস না। তোর বাবার রেখে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী তুই! আমি কাগজপত্র সেভাবেই করেছি রে। তুই সাবালক হলেই সব ফিরে পাবি। তার আগে তুই একটু মানুষ হ। পায়ের নিচের মাটিটা শক্ত কর। মনে রাখিস, এই পৃথিবী হচ্ছে, শক্তের ভক্ত, নরমের যম! এখানে কাদা মাটির পুতুল হয়ে থাকলে, দুঃখই পেতে হয় বেশি। কোমলতার সাথে কঠিনেরে মিশিয়ে পাথরে ফুল ফোঁটাতে পারার মাঝেই জীবনের সার্থকতা মেলে!"
সমাপ্ত।।
Copyright©️ All rights reserved for Pallabi Barua

বাস্তব জীবনের চরম সত্যি কাহিনী👌👌👌
উত্তরমুছুনদারুণ!দারুণ! ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।👍👍👌👌❤❤💯💯💯
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ দাদা
মুছুনদারুণ লাগলো
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ
মুছুনভালো লাগলো
উত্তরমুছুনঅনেক অনেক ধন্যবাদ দিদি
মুছুন