হার মানা
হার পরাবো 🌸
তোমার গলে
১৫২৭ চিত্তড়ের রাজা ভোজ আকবরের সেনা দ্বারা নিহত হলেন। আমি চিত্তড়ের সেই মীরা বাঈ শার "ঠাকরজী" মন্দিরে দাঁড়িয়ে অনুভব করছি ভক্তিবাদী সাধনার সেই যুগকে। কোথায় যেন সেই প্লাবনে ভাসছি শুনছি বাঁশির মৃদু সুর...... নুপুরের ঝুনু ঝুনু নিক্কোন। সেই পরমাত্মার প্রতি আপ্লুত বিশ বছরের মীরা। অতিন্দ্রিয়বাদী সেই ভক্তি রসে ভাসছি আমি। শুনছি 🌸 মীরা কে প্রভু গিরিধারী নাগরো............
সাধক রবিদাস, ছিল সামান্য মানুষ। জাতিতে কুমোর। মীরার গুরু হল সেই মানুষ। কৃষ্ণ নামে যে সবার অপরম পার। আজকের সমাজে বসে আমরা এই অসম্ভব জাগরণকে হয়ত অনুভব করতে পারবো না। সেই ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দিশাহারা ভারত। একদিকে তার ভগ্নপ্রায় প্রাচীন ধর্মীয় আদর্শ , অন্যদিকে বারবার বীধর্মীয় বিদেশী শক্তির আক্রমনে বিদ্ধস্ত ভারতীয় রাজনৈতিক মহল। মানুষের সোনালী দিনগুলো গত প্রায়। পেটে খুধা বুকে অবিশ্বাস হতবুদ্ধি ভারতের সাধারণ মানুষ। এই সময় উঠে এসেছেন এই সব নীম্ন জাতির উচ্চমানের মানুষ সুরদাস কবীর নানক। সহজ কথায় যাঁরা জনসাধারণকে ঈশ্বরের সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধনে বেঁধেছেন। সে যে বন্ধনহীন বন্ধুত্ব। গান দোঁহা কবিতার স্রোতে ভেসে গেছে অবিশ্বাস, না পাওয়ার ব্যথা। রাঠোর কন্যা চিত্তোর কুলবধূ যদি তার কান্ডারী হয়। ডুবন্ত নৌকার মাঝি । সে যে প্রানের বন্ধন হয়ে দাঁড়ায়। বাঁশি বাজে মরুভূমির বুকে বৃন্দাবনের কোলে। ভারতের গ্রাম গলি মহল্লা জেনেছে রানা সঙ্ঘের বড়ো পুত্রবধূ সুন্দরী সুশীলা কোমল যুবতী পথে নেমেছে। সমাজকে তুড়ি মেরে কৃষ্ণ নামে বিলীন হয়ে ভুলেছে পতিশোক, ভুলেছে পরিবারের নোঙরা খেলা, ভুলেছে ইহকাল ,ভুলেছে রাজনৈতিক গোলক ধাঁধা ......... ....🌸 পায়ো রে ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো .... শত শত মানুষ সেদিন এই রস সাধনায় বিলীন হয়ে মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছে। ঈশ্বর মন্দিরে থাকা এক পুতুল নয়। রক্তমাংসের মানুষের মত ইন্দ্রিয়ের মাঝে তার বসত। তাকে ভালোবাসা যায়, ছোঁয়া যায়। বুকে জড়িয়ে কাঁদা যায়। ঈশ্বর প্রেম নিজের রঙে রাঙানো যায়। তাকে খাওয়াতে পরাতে চান করাতে মন্ত্র নয় ব্রাম্ভণ নয়। অন্তর্গত বন্ধু, বঁধুয়া যে সে।কেবল প্রেম চাই। বন্ধন যে জন্মান্তরের। বৃন্দাবনে কৃষ্ণ পাগল ললিতা যে মীরা। এমনই লোকের মুখে ঘোরে। সংসারের কুটিলতা জানে না যে নারী তার যে কেবল ঠাকরজী আছে। সব ছেড়ে পথকে বলে মীরা.... তুঁহী মম শ্যাম সমান।
চলে বিভোর মীরা । বৃন্দাবন যায়..... ঘোরে ভারতের পথে ঘাটে । ঈশ্বরের যে রূপ নেই , সে যে অরূপ রতন।তবে মন্দিরেও যে সে থাকে না। তাকে অন্তরে পেয়েছে। তেরশো মীরা ভজন ঘুরে বেড়ায় মানুষের মুখে মুখে। মীরা তবে কি কেবল এক সাধিকা? ঘর ছাড়া সন্ন্যাসিনী? 🌸আমি বলি মীরা এক সমর্পণের নাম। দেশের জন্য মীরার ত্যাগ কেউ হয়ত মনে রাখেনি। চিত্তড় আর মালবের শক্তির সামনে অসহায় পিতা ও ভ্রাতাকে সেদিন মীরার ত্যাগ যোধপুর রাজা রতন সিং কে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। বড়ো বোনের আত্মহত্যার পর মীরাকেই বধূ রূপে চিত্তড় যেতে হল। অন্যের জন্য আসা বরযাত্রী , তাকে নিয়ে ঘরে ফিরল। তের চোদ্দো বছরের শিশু সুলভ বুদ্ধি নিয়ে রাজ অন্তঃপুরে মীরা। নারী মীরা। সংসারী মীরা। পতি ভোজের প্রেয়সী মীরা। কিন্তু মীরা কি করে ভুলবে এই মানুষের স্বপ্ন কিছু দিন আগেও তার দিদিশার চোখে ছিল। কেমন করে সব ভুলে মীরা প্রেমে পড়ে! তার ওপর ঠাকুর জী তার জীবনে বিশাল যাগায় আছে। কিশোরী থেকে যুবতী হতে হতে ভোজের মন জয় করছিল সাধাসিধে ভগবান বিশ্বাসী এই মেয়েটি। তাই তো তার সহস্র ভুলেও পরম আদরে পর্দা দিয়েছে রানা ভোজ। মীরা তাই তার গানে রানাকে অস্বীকার করতে পারেনি।ভোজের সাথে মীরার বন্ধনহীন বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল। সংসারের কুটিলতা তাদের দুজনের মধ্যে বিশাল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মীরা সরে গেছে দূরে, হয়ত নারী মন অভিমানী হয়েছে। হয়ত আরও গাড় সম্পর্ক মন চাইতো। ভোজের সঙ্গে মীরার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক । ভোজের দেখাশোনা মন দিয়ে করেছে যতদিন তাকে কাছে পেয়েছে। মীরা রাজার কাছে সমর্পিত ছিল ।ভোজ কিংবা কৃষ্ণের প্রতি তার সমর্পণ...... এক বন্ধহীন বন্ধন।
মীরা ঐতিহাসিক চরিত্র। ঘটনা অক্ষুন্ন রেখে একটি ষোড়শ শতকের স্বভিমানী নারীকে ব্যাখ্যা করেছি। এক বহ্নিশিখা..... কুসংস্কারগ্ৰস্ত সমাজে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছে সেই নারী। শ্রেনী বৈষম্যের বীরোচিত সোচ্চার এক নারী। ভালবাসার মাঝে বিদ্রোহিনী বিরাঙ্গনা। প্রতিটি আবেগী নারীর সাথে মীরার বন্ধহীন বন্ধন।
©copyright reserved for Sharmistha Bhatt.
সোমনাথে তাকে শেষ দেখা যায়।
(১৪৯৮ - ১৫৪৬) মীরা র সময়কাল।

অসাধারণ লেখনী দিদি। অপূর্ব
উত্তরমুছুনদুর্দান্ত লেখনী
উত্তরমুছুনঅসাধারণ ।💐💐
উত্তরমুছুন