বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০

মোবাইল (পিয়ালী চক্রবর্তী)


 

কয়েকবছর আগে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনাকে গল্পের রুপ দেবার জন্য আজ এই লেখা |

ISE (class twelve) ফাইনাল- এর রেজাল্ট বেরিয়েছে | ঘোষবাড়িতে আজ খুশির ঢেউ | তাদের একমাত্র ছেলে ঋদ্বিক পরীক্ষায় অষ্টম স্থান অধিকার করেছে | শুভেচ্ছাবার্তা আর ফুলের বোকে - তে সারা ঘর ভরে গেছে | ঋদ্বিকের বাবা রণজয়বাবু আর মা বন্দনাদেবী আজ ছেলের গর্বে উচ্ছ্বসিত |

ছেলেও যথারীতি নামকরা কলেজে তার প্রিয় বিষয় Mathematics - এ Honours নিয়ে ভর্তি হলো | ছেলে এখন কলেজে পড়ে | ওর সব বন্ধুরা দামী দামী মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে | কিন্তু ও এখনো সেই একটা পুরোনো যুগের Button phone - ই ব্যবহার করে | বন্ধুরা ওর সাথে ওর ফোন নিয়ে খুব ঠাট্টা - তামাশা করে |

একদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে ঋদ্বিক গুম মেরে বসে রয়েছে দেখে ওর মা জিজ্ঞেস করলো ,

- ' কি হয়েছে বাবু !!! তোর শরীর ভালো আছে তো!!! জ্বর - টর আসেনি তো!!! '

ঋদ্বিক : না মা , শরীর ভালো আছে , মন টা খুব খারাপ |

ঋদ্বিকের মা : কেন বাবু , কি হয়েছে ? কেউ কিছু বলেছে ? কারুর সাথে ঝগড়া করেছিস?

ঋদ্বিক: না মা , ঝগড়া ঝাটি নয় , তবে আজকে বন্ধুরা আমার সাথে খুব মস্করা করছিলো | আমার পুরোনো ফোনটা আর ব্যবহার করতে ইচ্ছে করছেনা মা |

ঋদ্বিকের মা : তুই মন খারাপ করিসনা বাবু | আমি তোর বাবাকে বলবো , তোকে একটা এখনকার দিনের ফোন কিনে দিতে |

ঋদ্বিক আনন্দে ওর মা কে জড়িয়ে ধরে বলে , ' সত্যি মা !! সত্যি বলছো !! আমাকে নতুন একটা Touch screen মোবাইল কিনে দেবে !!!

- ' হ্যাঁ বাবু , তোর বাবাকে বলবো , আজকে অফিস থেকে ফিরে তোকে নিয়ে গিয়ে তোর পছন্দের একটা মোবাইল কিনে দিতে ' - ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো মা |

যেমন কথা তেমন কাজ | ছেলের নতুন , দামী ব্রান্ডের মোবাইল কেনা হলো | ফোন হাতে বাড়ি ফিরে ছেলের সে কি উচ্ছাস | আনন্দ যেন আর ধরেনা | সারারাত মোবাইল নিয়ে নিজের ঘরে বিনিদ্র রাত জাগলো ঋদ্বিক | বিভিন্ন Apps গুলো ইনস্টল করে সেগুলোতে সড়গড় হচ্ছিলো | ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়লো | কিন্তু সকালেই আবার কলেজ যেতে হবে | ওর নতুন ফোন বন্ধুদেরকে দেখাবে আজ | মনে মনে বেশ একটা চাপা গর্ববোধ করছিলো সে |

কলেজ যাবার সময় বাস এ করেই যায় ঋদ্বিক | বাড়ি থেকে মাত্র 4 টে স্টপ দূরেই ওর কলেজ | ছেলে বেরোনোর কিছুক্ষন পর ওর মা রোজ ফোন করে জিজ্ঞেস করে যে ও ঠিকমতো কলেজে পৌঁছে গেছে কিনা | এইভাবেই কেটে গেছে বেশ কয়েকদিন |

ঋদ্বিক এখন মোবাইলের প্রতি ভীষণভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে | এমনকি বাথরুম গেলেও সাথে মোবাইল নিয়েই যায় | সবসময় তার হাতের তালুতে লেপ্টে থাকে ওই মোবাইল | তবে অবশ্য তার পড়াশুনোর ওপর সেভাবে কোনো প্রভাব পড়েনা , বরং সাথে ভালো ফোন আর নেট কানেকশন থাকায় গুগল থেকে পড়াশুনোর ব্যাপার সে তার ফোনটিকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করছে |

দিন যায় .... দিন যায় .... সেদিনটা ছিল বুধবার | ঋদ্বিকের আজ থেকেই ফার্স্ট সেমিস্টার এর পরীক্ষা শুরু | ও সকালে খেয়ে - দেয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায় | কিছুক্ষন পরেই ওর মা ছেলে কলেজে পৌঁছলো কিনা জানার জন্য ফোন করে |

ঋদ্বিক তখন বাস থেকে নামছিলো | একেই মাথায় পরীক্ষার টেনশন , তার ওপর  হটাৎ ফোন টা বেজে উঠতেই ও কেমন চমকে উঠলো | ভুল স্টেপ ফেললো বাস- এর পা-দানিতে | তার পরেই পড়ে গেলো রাস্তায় |

কিন্তু হায়রে , বাস ততক্ষনে চলতে শুরু করে দিয়েছে | ওর মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেলো বাস- এর পেছনের দুটো চাকা | মাথার ঘিলু ছিটকে কিছুটা ফুটপাথে , কিছুটা বাস - এর চাকায় | খানিক্ষন কাটা পাঁঠার মতো ছটফট | তারপরেই সব শেষ |

ঋদ্বিকের আইডেন্টিটি কার্ড দেখে ওর বাবাকে ফোন করে জানায় পুলিশ | তারপর .........কেটে গেছে অনেকগুলো বছর | একমাত্র ছেলের অকালমৃত্যুশোক সহ্য করতে না পেরে বন্দনাদেবী বিষ খেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন |

আর ঋদ্বিকের বাবা রণজয়বাবুর স্থান হয় একটি মানসিক হাসপাতালে |

উত্তর কলকাতায় হয়ে যাওয়া একটি সত্যি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গল্পটি লেখা | এর থেকে আমরা একাধিক বার্তা পাই :

১ ) মোবাইল ফোন আছে বলেই যেকোনো সময় কল করা উচিত নয় | যে ব্যক্তিটিকে ফোন করা হচ্ছে সে কি পরিস্থিতিতে আছে সেটা আমরা জানিনা | হঠাৎ কল করে তাকে বিপদের মধ্যে বা জটিল অবস্থার মধ্যে ফেলা উচিত নয় |

২ ) পকেটের ফোন বেজে চলে তো বেজে চলুক , যতক্ষণ পর্যন্ত ফোন ধরার মতো অনুকূল পরিস্থিতি না আসে , ফোন ধরা উচিত নয় |

৩ ) মোবাইল ফোন আবিষ্কারের আগেও ছেলেমেয়েরা স্কুল - কলেজ যেত বা যারা দৈনন্দিন কাজে যায় তারাও বেরোতো | তাই পথে - ঘাটে শুধুমাত্র নিজের দরকার ছাড়া ফোন ব্যবহার করা উচিত নয় |

জানি আমার সাথে আপনারা অনেকে হয়তো একমত হবেন বা অনেকে একমত হবেন না | কিন্তু তবুও এই লেখাটা আজ লিখতে বাধ্য হলাম , শুধুই জনস্বার্থে |
©️All rights reserved 

   Piyali Chakravorty

ছবি সৌজন্যে : গুগুল



৩টি মন্তব্য:

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস কিছু অনুভূতি মনের গভীরে থাকাই শ্রেয়। সেটা হয়তো প্রকাশ করলে সমস্যা হতে পারে,তাই প্রকাশ না কর...