মডেল
পারমিতা মন্ডল ।
আজও সেদিনের কথা মনে পড়ে সুজাতার ।কতো কষ্ট করে সে সংসারটাকে দাঁড় করিয়েছিল । সুজাতারা ছিল দুই বোন আর এক ভাই । বাবা ছোট খাট একটা ব্যাবসা করতো ।তাই দিয়ে মোটামুটি তাদের সংসার চলছিল ।সুজাতা ছিল সবার বড়। তিন ভাইবোন ই লেখা পড়া করছিল ।কিন্তু বিপদটা ঘটলো সুজাতা যখন 3rd year এ পড়ে তখন । একটা গাড়ি আ্যকসিডেন্ট এ সুজাতার বাবা যখন মারা যায় । মাথার উপর যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে । কি করবে সে এখন ? সংসার ই বা চলবে কিকরে ? সংসারে একমাত্র বাবাই রোজগার করতেন।
সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল সুজাতার উপর ।কারণ সে সবার চেয়ে বড়।বাবার ব্যাবসার হাল ধরে সুজাতা ।বাবার ছোট খাট একটা জামা কাপড়ের দোকান ছিল । সেখানেই বসতে শুরু করলো সে ।সংসারটা তো চালাতে হবে ।মাঝে মাঝে কলেজে যেত । এই ভাবে তৃতীয় বর্ষের এর পরীক্ষা টা দেয় সুজাতা। কিন্তু দোকানে যা রোজগার হয় তা দিয়ে সংসার চালানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে । তাই অন্য কাজের , যেমন ছোট খাট চাকরির খোঁজ করছিল সুজাতা ।
সুজাতার এক বন্ধু ছিল সৈকত। ও আর্ট কলেজ পড়তো । সৈকতই একদিন সুজাতাকে একটা কাজের কথা বলে ।আর্ট কলেজে মডেলিং এর কাজ । তবে এটা অন্য মডেলিং এর মতো নয় । জীবন্ত মডেল হয়ে শিল্পীর সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা পোজ দিয়ে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু সুজাতা তো এবিষয়ে কিছুই জানে না । তাই একটু ইতস্ততঃ করে ।তবে সংসারে বড় অভাব ।তাই কাজ তো তাকে করতেই হবে। মনে মনে ভাবলো "দেখাই যাক না কি হয়। আগে তো দেখা করে আসি ।" যেই ভাবা সেই কাজ । সৈকতের সাথে গেল কলেজে দেখা করতে ।
কাজ টা হয়ে গেল সুজাতার । একটা যেন বড় সমস্যার সমাধান হলো । যাইহোক, কিছু তো টাকা পাওয়া যাবে ।যা দিয়ে সংসারের অভাব অনোটন কিছুটা হলেও দূর করা যাবে । কাজ টা হলো যেসব ছাত্ররা আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করছে ,তাদের শুধু ছবি দেখে আঁকলেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না । যতক্ষণ না তারা জীবন্ত মডেল নিয়ে কাজ করে, ততক্ষণ তারা ঠিক ভাবে শিখতে পারে না ।তাই তাদের মডেল নিয়ে কাজ করতেই হয় । বিভিন্ন রকমের ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো মডেলদের ছবি আ়ঁকেন এরা ।আর এই সব মডেলরা ঘন্টার পর ঘন্টা একই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকেন । কখনো বা তাঁদের স্বল্প বসন পরে পুরুষ শিল্পীর সামনে দাঁড়াতে হয় । অনেক সময় শরীরের অনেক টা অংশ বেয়াব্রূ থাকে ।এটা ছবি আঁকার জন্য করতে হয় । তাই এখনো অনেকেই এই কাজটাকে ভালো চোখে দেখে না । অনেক মেয়েরাই এই কাজ করতে রাজি হয় না । কিন্তু সুজাতার কিছু করার নেই ।সংসারের অভাব , দুটো ভাই বোনের লেখা পড়ার খরচ সবই তো তাকেই বহন করতে হয় ।তারপর মাও অসুস্থ ।তাকে এখন এতো কিছু ভাবলে চলবে না ।তাছাড়া সে তো কোন অন্যায় করছে না । তবে সে কি কাজ করে একথা কাউকে না জানালেই হবে । ঠিক হলো পার সিটিং সুজাতাকে পাঁচশো টাকা করে দেবে। সুজাতা রাজি হয়ে যায় ।
বাড়িতে এসে মাকে বলে "মা আমি একটা কাজ পেয়েছি কলেজে ।" বোন ছুটে এলো "তাই দিদি ! এবার তাহলে আমাদের অভাব দূর হবে । কিন্তু দিদি তুমি কোন্ কলেজে কাজ পেয়েছো ? আর কাজ টা কি।?" এবার কি উত্তর দেবে সুজাতা। সত্যি কথা তো বলা যাবে না । কারণ আমাদের সমাজ এখনো এই কাজটাকে সন্মানের চোখে দেখে না ।বোনকে বললে মা জেনে যাবে । তারপর পাড়া প্রতিবেশী ও যদি জেনে যায় ,তাহলে এক এক জন এক এক রকম মন্তব্য করবে ।বেঁকা তেরা কথা বলবে । তাই বোনের কথা এড়িয়ে গিয়ে বলল" রবীন্দ্র ভারতীতে । ছোট খাটো একটা কাজ পেয়েছি ।"
আজ সুজাতার কাজের প্রথম দিন । এর আগে সুজাতাকে কয়েকটা ওর্য়াকসপ করতে হয়েছে ।কিভাবে পোঁজ দিয়ে দাঁড়াতে হবে , কিভাবে তাকাতে হবে, কেমন পোশাক পরতে হবে এই সব বিষয়ে শিখতে হয়েছে । ওর মতো আরো অনেকেই আছে । সবার সাথে এখানে এসে আলাপ হলো ।এবার ওর সংকোচ অনেকটাই কেটে গেল । প্রথম দিনেই তার কাজের খুব প্রশংসা হলো । আসলে সুজাতা যে খুব সুন্দরী তা নয় ।তবুও চেহারার মধ্যে একটা আলগা শ্রী আছে । যার জন্য প্রত্যেকটা পোট্রেট খুব সুন্দর হয় । শিল্পীর মনের মতো ছবি হয়। এছাড়া কাজের প্রতি সুজাতা খুব পাংচুয়াল । তার কখনো দেরী নেই ।বা কাজে কোন বিরক্তিও নেই ।তাই অনেক শিল্পীই সুজাতাকে চায়। তাই তার কাজের কোনো অভাব হয়নি । এখন সংসারে সচ্ছলতা এসেছে ।
অবশ্য প্রথম প্রথম স্বল্প পোশাক পরে , শরীরের অনেক টা অংশ অনাবৃত রেখে পুরুষ শিল্পীর সামনে দাঁড়াতে অস্বস্তি হতো ।কিন্তু যখনই মনে পড়তো সংসারের অভাবের কথা , তখন ঐসব কথা ভুলে যেত । তাকে পারতেই হবে ।তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অনেক গুলো মানুষ ।তাদের মুখে অন্ন যোগাতে গেলে তাকে এই কাজ করতেই হবে । তাছাড়া সে না করলে অন্য কেউ করবে ।লোকের তো আর অভাব নেই।তাই এতো কিছু ভাবলে চলবে না । তবে কখনো যে খারাপ পরিস্থিতির সন্মুখীন হয়নি তা নয় , । নিজেকে সামলে নিয়েছে সে ।কোন কিছুর সাথে আপস না করে শিরদাঁড়া সোজা করে কাজ করে গেছে সুজাতা ।
এইভাবে কাজ করতে করতে কেটে গেল আরো পাঁচ বছর ।সুজাতার জীবনে একজন নতুন মানুষ এসেছে। অভিক রায় ।ট্রেনে যাতায়াতের পথেই অভিকের সাথে আলাপ হয়। একটি কোম্পানির ম্যানেজার পোস্টে চাকরি করে অভিক ।বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। সুজাতাকে দেখে খুব ভালো লেগে যায় ।তাই একদিন প্রেমের প্রস্তাব দেয় ।কিন্তু প্রথম দিকে সুজাতা রাজি হয় না । কারণ সে জানে তার কাজের কথা শুনলে হয়তো অভিক বিয়ে করতে রাজী হবেনা। তাছাড়া ওর ভাই বোন ও তখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে নি ।তাই কিভাবে সে বিয়ে করবে ? কিন্তু অভিক নাছোড় বান্দা। সে সুজাতাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে দেয় ।অবশেষে সুজাতা রাজি হয় । তবে তার একটা শর্ত আছে ।বোনের বিয়ে আর ভাইয়ের চাকরি হবে তারপর সে বিয়ে করবে । কারণ এতদিনে তাদের মাও মারা গেছে । তাই একমাত্র অভিভাবক সে। যদি সে বিয়ে করে চলে যায়, তবে এদের কে দেখবে ? অভিক তাতেই রাজি হয়ে যায়। সে তো সুজাতাকে ভালো বাসে।তাই এইটুকু অপেক্ষা সে করতে পারবে।
জীবনের অনেকটা পথ সুজাতা একা পাড়ি দিয়েছে । আজ কাউকে পাশে পেয়ে বড় শান্তি পায় মনে ।এবার হয়তো তার দুঃখের দিন (মনের দুঃখ) দূর হবে । কারো উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে , নিজে একটু হালকা হবে ।কিন্তু মানুষ চায় এক আর হয় আর এক ।
সেদিন নন্দনে এক আর্ট প্রদর্শনী দেখতে যায় সুজাতা আর অভীক। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে একটা ছবিতে চোখ আটকে যায় অভিকের । কি অপূর্ব ছবিটি ।" যিনি এঁকেছেন তাঁর হাত খুব ভালো" বলে অভিক । কিন্তু মডেল যিনি তাকে খুব চেনা চেনা লাগে অভিকের । আসলে এটা তো সুজাতারই ছবি । সুজাতা জানতো না এখানে তার ছবি সে দেখতে পাবে ।তাই একটু অপ্রস্তুত হয়ে অভিককে নিয়ে সরে যায় সুজাতা ।কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না । কিছু টা এগিয়ে এসেই অনিকেত স্যারের সাথে দেখা । যিনি সুজাতার ছবি এ়ঁকেছেন । স্যার এগিয়ে এসে বললেন "দেখো তোমার ছবির কতো প্রশংসা হচ্ছে ।আমি একটা প্রাইজ ও পেয়ে যেতে পারি ।" বলতে বলতে তিনি এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে ।
আর ঠিক তখনই অভীকের মুখটাতে একটা অদ্ভূত পরিবর্তন এলো । চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে সুজাতাকে বলল," তুমি তো কখনো বলোনি, তুমি আর্ট মডেলিং কর ? ঐ অল্প পোশাক পরে তুমি দিনের পর দিন পুরুষ শিল্পীর সামনে দাঁড়াও ?" কথাগুলো বলার সময় সমস্ত চোখে মুখে একটা অবজ্ঞা ফুটে উঠেছিল ।সে যেন পতিতা বৃত্তি করেছে , অভিকের মনোভাব এমনই । এক নিমেষে সব কিছু ভেঙে চু্রমার হয়ে গেল । সুজাতা ভেবেছিল অভিককে বুঝিয়ে বলবে । কিন্তু সেই সুযোগ সে পায়নি । ভেবেছিল বলবে ,সে সময় সংসারের চাপে তাকে এই কাজ করতে হয়েছিল । কিন্তু এটা তো কোন খারাপ কাজ না ।তাই সে ঠিক করলো অভিক যায় যাক ,সে কাজ কখনোই ছাড়বে না।
তা্রপর কেটে গেছে অনেক বছর। অভিক আর কখনোই ফিরে আসে নি । এমনকি ওর ভাই বোনেরা জানার পর আর সুজাতার সাথে কোন যোগাযোগ রাখেনি । যাদের জন্য জীবনের মূল্যবান সময় গুলো নষ্ট করেছে, আজ তারা সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাদের সবার কাছে সে আজ বড় অপরাধী । এখন আর আগের মত কাজ করতে পারেনা ।বয়স হয়েছে। এতোক্ষন বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। তবুও দিন চলে যায়। আজ বড় একা লাগে ।
আজ 12ই জানুয়ারি। সুজাতার জীবনে এক বিশেষ দিন ।তার এতদিনের পরিশ্রমের ফল আজ মিলেছে। সে শ্রেষ্ঠ জাতীয় মডেলের পুরস্কার পেয়েছে । জীবনের শেষ বেলায় এসে সে তাঁর কাজের স্বীকৃতি পেল ।আজ সবার সামনে গর্ব করে বলতে ইচ্ছা করে কোন কাজ ছোট নয়। অভিকের সাথে সংসার করার চেয়েও সে অনেক বড় পুরস্কার পেয়েছে।তার কাজের স্বীকৃতি। আজ ভীষন খুশি সুজাতা। ।লক্ষ্যে স্থির থাকলে সফলতা আসবেই।
সমাপ্ত ।
বাহ্! দারুণ! দারুণ! ধন্যবাদ। 👌👌👍👍❤❤💫💫💥💥💅💅💅
উত্তরমুছুনবাহঃ খুব ভাল লাগল।
উত্তরমুছুন