বৃহস্পতিবার, ১ জুলাই, ২০২১

# নাম- 'সে এক কাহিনি শোনাই শোনো।' ✍ - শিপ্রা ঘোষ।

   সে এক কাহিনী শোনাই শোনো
                কলমে--শিপ্রা ঘোষ 


মিঠি তখন ছোট্ট মেয়ে। 
খেলাধুলো, নাচগান, পড়াশোনা  আর দুষ্টুমি এই ছিলো তার নিত্যদিনের কর্মপ্রবাহ। এই সব কিছুর মধ্যে নিংড়ে আনন্দ খুঁজে নেওয়াই ছিলো তার জীবনের আদর্শ।

এখন মিঠি ক্লাস নাইন। শরীরে আর খাতায় কলমে বড় হলেও মিঠির মননে চঞ্চল, ছটফটে, অভিমানী, দুষ্টু-মিষ্টি এক শিশুরই বাস। আর পড়াশোনা?না বাবা না --অতো ভালো মেয়ে ও নয়। তবে খুব যে খারাপ তাও কেউ বলতে পারবে না। স্কুলের যে কোনো অনুষ্ঠানে মিঠির ডাক পড়বেই। সব দিদিমণিরাই এক ডাকে মিঠিকে চেনে।

ওদের স্কুলে এই তিন বছর হলো পূজোর ছুটির আগে আট দিনের একটা যোগব্যায়াম এর ক্লাস হচ্ছে। এর আগের দুবছর -মিঠি এই ক্লাস করে ফার্স্ট ক্লাস সার্টিফিকেট ও পেয়েছে। ঐ আট দিন বাইরে থেকে স্যার-ম্যাডামরা ক্লাস করাতে আসতেন। স্কুলের হোস্টেলে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা হতো। আর তার বিনিময়ে কিছু টাকা ছাত্রীদের দিতে হতো।

এ বছর ও সেই ক্লাস শুরু হয়েছে। আর টাকা সংগ্রহের ভার পড়েছে মিঠির ওপর। এ বছর কোনো ম্যাডাম আসেন নি--শুধু দুজন স্যার এসেছেন। একজনের বয়স ৩০-৩৫এর মধ্যে আর একজনের বয়স ২০-২২এর মধ্যে। তাই সব ছাত্রীরাই তাঁদের ছোট স্যার আর বড় স্যার বলে ডাকে।
যেহেতু ছাত্রীদের থেকে টাকা সংগ্রহের ভার মিঠির ওপর ছিলো --তাই সবার আগে এসে সকলকে লাইনে দাঁড় করিয়ে যে যে টাকা দেবে তার নাম লেখা আর টাকা নেওয়ার কাজ শেষ হওয়ার পর ক্লাস শুরু হতো। তিনটে থেকে ছটা পর্যন্ত চলতো সেই ক্লাস।
এরকমই  একদিন মিঠির দশ মিনিট দেরি হয়েছে ক্লাসে যেতে। সেদিন বড় স্যার ছিলেন না  --ছোট স্যার সকলকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ক্লাস শুরু করে দিয়েছিলেন। মিঠির আর চার পাঁচ জনের কাছে টাকা সংগ্রহ করতে বাকি ছিলো। তাই সে এসেই ঐ ক জনের টাকা সংগ্রহ  করতে শুরু করে দেয়। তাই দেখে ছোট স্যার মিঠিকে দেরি করে আসার জন্যে এত্তো বকতে থাকেন যেনো সে দশমিনিট নয় একঘন্টা দেরী করেছে। এরপর মিঠি যাই করতে যাচ্ছে তাতেই স্যার এতো বকছেন যেনো মনে হচ্ছে-- কত জন্মে র রাগের ঝাল মেটাচ্ছেন। অথচ যোগব্যায়াম এ মিঠি যথেষ্ট ভালো। এতোদিন সব পেয়েছির আসরে যোগব্যায়াম নাচ সব কিছুতেই সে প্রশংসা পেয়ে এসেছে। আজ তাই এতো বকা শুনে রাগে অভিমানে ফুঁসতে ফুঁসতে  কোনোরকমে দিনটা সে পার করে।

পরের দিন বড় স্যার আসতেই কেঁদে কেটে বড় স্যারের কাছে মিঠি স-ব নালিশ করে। বড় স্যার ওর সামনে ছোট স্যারকে কিছু বলেন নি ঠিকই কিন্তু পরের দিন ক্লাসে সে দেখলো অন্য আর একজন স্যারকে। এই স্যার বড় স্যারের থেকে ও ভালো একদম বকেন না-- আর খুব হাসিখুশি ঠিক যেমনটি মিঠি পছন্দ করে। সেদিন মিঠি মনের আনন্দে ক্লাস করে বাড়ি ফিরল আর মনে মনে ছোট স্যারকে জব্দ করতে পেরেছে বলে গর্ব অনুভব করতে লাগলো। 

পরের দিন রবিবার স্কুল বন্ধ তাই মিঠি চললো সকাল সকাল সাইকেল নিয়ে শ্রেয়াগ্নীর বাড়ি।যতক্ষণ না ছোট স্যারকে জব্দ করার গল্প বন্ধুকে বলতে পারছে ততক্ষণ ওর মনে শান্তি নেই। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই বাড়ি--ওরা থাকে দোতালায়। মিঠি কোনো রকমে সাইকেলটা রেখেই ওপরে উঠে যায়। তারপর পাক্কা তিরিশ মিনিট ধরে ছোট স্যারের মুণ্ডপাত করে অবশেষে ক্ষান্ত হয়।
এবার তো বাড়ি ফেরার পালা--যেরকম নাচতে নাচতে উপরে এসেছিল তেমনি নাচতে নাচতে নীচে নেমে সাইকেলে হাত দেবে দ্যাখে সামনে ছোটস্যার দাঁড়িয়ে। মিঠির তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। ও কিছু বুঝে ওঠার আগে স্যার বলে উঠলেন--কি ব্যাপার?এখানে কি কোনো দরকার ছিল?
মিঠি তো মিথ্যা কথা একদম বলতে পারে না-- কিন্তু সত্যি কারণটা বললে স্যার তো রেগে ভুত হয়ে যাবে। তাই জীবনের প্রথম মিথ্যেটা বললো --স্যার আমি কাল টিউশনিতে যাই নি তো--তাই পড়া --কথাটা শেষ হওয়ার আগেই স্যার শুরু করলেন-- ফাঁকিবাজ, পড়া জানতে এতো সময় লাগে? আর এতো বড়ো মেয়ে সাইকেল লক করে না গেলে চুরি হয়ে যেতে পারে---জানো না? তোমার জন্যে একটা বাস ছেড়ে দিতে হলো--বাড়ি পৌঁছাতে আমার কত দেরি হয়ে যাবে --কোনো ধারণা আছে?যাও তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও বাঁদর মেয়ে কোথাকার-- বলে একটা বাস দাঁড়িয়ে ছিলো তাতে উঠে গেলেন--আর বাসটাও ছেড়ে গেলো। 

মিঠি বোকার মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল--এই দু দিন যাকে স্কুল থেকে তাড়ানোর আনন্দে সে দু-মুঠো ভাত বেশি খেয়েছে। যাকে অপমান করার আনন্দ দ্বিগুণ করার জন্যে সে আজ এখানে এসেছে--সেই মানুষটাই নাকি নিজের ক্ষতির কথা না ভেবে আজ শুধু তার যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন!!যে মানুষটার জন্যে মিঠির মনে রাগ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না --আজ তার জন্যই মানুষটার মনে এতো বড় দুর্বল কোণ!!
আজ প্রথম মিঠির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো--কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার উপায় এখন তার নাগালের বাইরে। তার মন তার ভেতরের এই তোলপাড়ের খবর পেয়ে দু ফোঁটা চোখের জল বিসর্জনের মাধ্যমে তার মনের কলুষতা দুর করতে সাহায্য করলো।

আজ যেনো মিঠি তার জীবনের এক ধাপ আরও এগিয়ে এলো তার অব্যাক্ত যন্ত্রণার হাত ধরে। 
আর স্মৃতির পাতায় লেখা হলো এক নাম।যে নাম তার কিশোরী মনকে দোলা দিয়েছিলো কোনো একদিন।
আজ মিঠি আর মিঠি নেই জীবনের অর্ধেক পথ পেরিয়ে আসা ঋজুতা সরকার।সামান্য এক গৃহবধূ ।স্মৃতিই যাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল।

                              সমাপ্ত

@কপিরাইট  রিজার্ভ ফর শিপ্রা ঘোষ ****



                         

৮টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ লিখেছ বন্ধু ❤️🌷🎉

    উত্তরমুছুন
  2. দারুণ! দারুণ লাগল! অসাধারণ! 👍👍❤❤❤⚘⚘⚘🖋

    উত্তরমুছুন
  3. অসম্ভব ভাল লাগল।স্মৃতিরাও বড় অভিমানী।💝💝💝💝

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...