সোমবার, ১৯ জুলাই, ২০২১

#অনুগল্প- চিলেকোঠা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ অনুগল্প বাসর। 
  # বিষয় - *অনুগল্প।*
  #নাম- *চিলেকোঠা।*
   ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

       সিদ্ধিনাথ গুপ্ত। তিনতলা  বাড়ির প্ল্যান কাকে দিয়ে করাবেন বেশ গোলে পড়লেন। সিদ্ধান্ত নিতেই বছর কাবার। কাকে দিয়ে করান যে, স্ত্রী উমাশশীর বুদ্ধিতেও ভরসা হয়না। তাই  নিয়ে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে এমনও ভেবেছেন ফ্ল্যাট কিনে নিলে এতো ঝুটঝামেলা হয় না। অফিসের কলিগ বিশাল পাকড়াসি, নামেতে যেমন বিশাল,তার সবেতেই বিশাল বিশাল ভারিক্কি ভাব!সিদ্ধিনাথকে এমন গল্প দেবেন যে সেই গল্পের কাছে সিদ্ধি নাথ কুঁকড়ে যান।
    তাঁর বাড়িখানা পেল্লাই আকারের। কিন্তু বাড়ির মনের মতো চিলেকোঠা ঠাকুর্দা রেখে যায়নি বলে বিশাল পাকড়াশি তাঁর বাবাকে খুব অসন্তুষ্ট হতে দেখেছেন। বিশালবাবুও ইদানিং বয়স হয়েছে,গিন্নির সঙ্গে ইদানিং বেশ ঝগড়া হলে একটা চিলেকোঠার খুব অভাব বোধ হয়। বউয়ের তবু বাপের বাড়ি আছে,তাঁর ঐ চিলেকোঠা হলে বেশ হতো। দুটো দরজার মাঝখানে অনেকটাই দূরত্ব,তাই দরজায় ধাক্কা দিয়েও কোনও যায় আসতো না। নাগালের বাইরে থাকার টের পাওয়ানো যেত। কিন্তু বিশালবাবুর এদিক থেকে কপালটা যা একটু মন্দ। তাই সিদ্ধনাথকে বলেছেন "নিজের জায়গা থাকতে ফ্ল্যাট কিনে বোকামি করো না। আর ফ্ল্যাট বাড়িতে যাইহোক চিলেকোঠা তো আর পাওয়া যায় না। চিলেকোঠা জানবে নিজের জীবনের খুচরো ভাঙানির মতো। বউয়ের শাড়ি,গহনা,বাপের বাড়ি নিজের বলে কিছু আছে। তোমার কী আছে! সংসারের তুমিতো  চারপায়া চৌকী। সবাই তোমার উপর চড়ে বেশ দিব্যি আছে। তোমার নিজের বলতে ঐ চিলেকোঠা। বাড়ি করলে ঐ চিলেকোঠার জন্য একটু স্পেশাল নজর রেখো।" বেশ এক নিশ্বাসে বিশালবাবু কথাগুলো বলে যান। সিদ্ধিনাথ বাবু তখন বললেন- "বউ বলেছে চিলেকোঠা ঠাকুর ঘর হবে।" তখন বিশালবাবু বলা শেষ হতে না হতে কুইক অ্যাকশনের ভঙ্গিতে বললেন - "না,না। খবরদার এই ভুলটা করিও না। প্ল্যানারকে বলে একটা স্পেশাল কুঠরি ঠাকুরঘরের জন্য অ্যারেঞ্জ করে দিতে বলো,কিন্তু চিলেকোঠায় বউকে হাত দিতে দিও না। নাহলে পরে পোস্তাতে হবে। এখন এ শর্মার কথা বাসি মনে হলে যখন বিপদে পড়বে ঐ সাধুর কলাচপা খাওয়ার মত অবস্থা হবে।" এই বলে ক্যান্টিনের রঘুকে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল দুটো চা দিতে বলে।পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বের করে একটা আছে দেখে সিদ্ধিনাথকে অসহায়তা প্রকাশ করে,সেই সঙ্গে রঘুকে সিগারেট দিতে বলে বিশালবাবু। অনেক প্ল্যান দিতে গিয়ে মগজে ধোঁয়াটার অভাব বোধ থেকে আরো অভিজ্ঞতা ঢেলে দেওয়ার ভান করেন। 
  সে সব কথার মুখ ঘোরাতে সিদ্ধিনাথ পরামর্শ নিতে বলেন - "কাকে দিয়ে প্ল্যান করাই বল তো বিশাল দা।"
 - "তুমি তো আগে বলবে। পৌরসভার বিমল জালালকে দিয়ে করাও।"
  - "ওর কাছে করালে ওর ইট,বালি,সিমেন্ট, রডের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিতে হবে। কমিশন খায়।"
  - "তাতে কি আছে। পৌরসভা থেকে প্ল্যান পাশ থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে ইন্সপেকশন ফ্রি! আর তোমার তো এক চিলতে জায়গা,ও কম জায়গার উপর ভাল প্ল্যান করে। অনেক সুবিধা আছে। আর আমার শ্যালকের বন্ধু হয়। ঠিক আছে আজ অফিসের শেষে দু'জনে যাব ওর বাড়িতে।" আরো টুকিটাকি কথা ও  চা টা পর্ব সেরে যে যার কাজের টেবিলে চলে যায়।
  সিদ্ধিনাথ উমাশশির চিলেকোঠা ঠাকুর ঘরের বায়না ধরে। কিন্তু সিদ্ধিনাথ বলেন- "ঠাকুরকে ঐ ছাদে একা কুঠরিতে রাখব? কেন গিন্নি তোমার ঠাকুর ঘরের আলাদা ব্যবস্থা যদি হয়।" খুব ম্যানেজের সুরে সিদ্ধিনাথ বলেন। উমাশশি রাজি হয়েও কেমন সন্দেহ হয়- এই একচিলতে জায়গায় নিজেদের শোওয়া বসার জায়গার অভাব হচ্ছে,কি করে ঠাকুর ঘর হবে!" 
  সিদ্ধিনাথ বলেন- "সে  প্ল্যানার ভাববে।"
  "আমার বাবার বাড়ির..."। সিদ্ধিনাথ গিন্নির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন- "সবেতেই  বাপের বাড়ির তুলনা। এত বছরেও বাপের বাড়ির মায়া কাটল না। বাপকে বল না ঘরটা করে দিতে..." যেই না বলেছে সিদ্ধিনাথ,অমনি উমাশশি জোঁকের মুখে নুন দেওয়ার মত বলেন- "জোঁক হয়ে সারাজীবন বাপটাকে শুষলে, জায়গাটা কিনেছ তো বাপের পয়সায়,ঘরটা করার মুরোদ পর্যন্ত হচ্ছে না..." 
  সিদ্ধিনাথ এই তেজের কাছে যেন সেঁতানো বারুদ হয়ে আস্তে আস্তে কেটে পড়া মঙ্গল মনে করেন।
উমাশশি কথার রেশেই বলতে থাকেন- "চিলেকোঠা ঠাকুর ঘরই হবে। এই বলে দিলুম।" 
  বাড়ির প্ল্যানে চিলেকোঠাই ছিল, সিঁড়ির একটা কোনায় স্পেশ করে ঠাকুরঘর করা হল। চিলেকোঠাও হল। 
   কিন্তু ছেলে সিদ্ধান্ত মায়ের জোর খাটিয়ে ঘরটা নিজের ঘুড়িঘর বানিয়ে নিয়েছে। খেলার বিভিন্ন সামগ্রি এখন রাখে। ভবিষ্যতে জিম ঘর করবে বাবাকে প্ল্যান দিয়ে রাখে। উমাশশী ছাদে বড়ির ডালা ও ঘরকন্নার কুলো,হাঁড়ি,কড়া,নগণ্য কিছু জিনিস ঢুকিয়েছেন। মা বেটার দখলে। সিদ্ধিনাথ বললে উমাশশির জবাব - "নিজেদের পা নাড়ার জায়গা নেই,এদের কি তাহলে বাপের ঘরে রাখতে যাব?" 
  চৌকী অর্ডার দিয়েও বায়না ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছেন সিদ্ধিনাথ। উমাশশির কাছে বলেও ছিলেন তার নিজের বলে কিছু একটা থাকুক। উমাশশির সপাটে জবাব ছিল- "আমরা কি তাহলে তোমার নিজের নয়।"
  বিশাল পাকড়াসি হাসে,সিদ্ধিনাথ হাসিতে যোগ না দিয়ে পারে না এই ভেবে চিলেকোঠার ভরকেন্দ্রে মনের যতসব উদ্ভট ভাবনায় কম জল গড়াল না।
          *******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...