বুধবার, ২১ জুলাই, ২০২১

বিষয় *প্রতিশোধ* ©শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 শব্দমালার দিন

বিষয় *প্রতিশোধ*

©শর্মিষ্ঠা ভট্ট



প্রতিশোধ এর বাংলা অর্থ

[প্রোতিশোধ্‌] (বিশেষ্য) অন্যায়কারী ক্ষতিসাধন; শত্রু নির্যাতন; হিংসার পরিবর্তে হিংসা; প্রতিহিংসা।


(যাইব, কিন্তু আগে এ যন্ত্রণার প্রতিশোধ করিব-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।


(তৎসম বা সংস্কৃত) প্রতি+শোধ


"প্রতি" মানে কাউকে "শোধ" মানে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কি ভাবে? নিষ্কাম পথে? না ।।প্রতিশোধে এক দহন থাকে যা নিজেকে এবং অন্যকে পোড়ায় । এক ধ্বংস থেকে শুরু হয়ে অন্য ধ্বংসে সমাপ্তি। অর্থাৎ একটি কহিনীর সৃষ্টি। প্রতিশোধ মনের এমন এক অবস্থান যেখানে ক্রোধ, হিংসা, ক্রড়তা কৌশল ইত্যাদি হিংস্রতা মন বা মানসিক অবস্থাকে ঘটনার ফলাফলের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। মহাভারত থেকে নিয়ে যত ধর্মীয় এপিক আছে সব কোন না কোন প্রতিশোধের থেকে শুরু গল্প। 

মানে প্রতিশোধ পুরনে মানসিক শান্তি এক কথায় স্বীকৃত। 


আমার নিজস্ব মত...... প্রতিশোধ যতই হিংসা থেকে সৃষ্টি হয় এবং তা পূরণে শান্তি আসে, তবু মানসিক স্থিরতা নষ্ট হয়। এক ভবর বা ঘূর্ণন জীবনকে শান্তির সাথে ধ্বংসের পথেও নিয়ে যায়। প্রতিশোধ শেষে শ্মশানের নিস্তব্ধতা জীবনকে সেই শান্তি দিতে পারে না যা তার হয়ত আগে ছিল। কখনও শত্রুতা বেঁচে থাকার মধ্যে জীবনানন্দ অনুভূত হতে পারে। অবাক হলেন? হ্যাঁ ঠিকই বলছি। মহাভারতের যুদ্ধে হয়ত সব ফিরে পেয়েছিল পান্ডব কিন্তু হারিয়ে ছিল অসংখ্য বন্ধু আত্মিয় অসংখ্য আবেগ। মহা শূণ্যতা গ্রাস করেছিল তাদের। তারা অনুভব করেছিল অখণ্ড শান্তিতে অনাসক্তি লুকিয়ে আছে। কি জন্য বাঁচবো? এই প্রশ্ন আমাদের বাঁচায়। কিন্তু এই প্রশ্ন যখন আর থাকে না তখন বাঁচা যান্ত্রিক হয়ে যায়। মহাভারত যুদ্ধের পর "চার্ম অফ লাইফ" ছিল না বা কমে গিয়েছিল তা স্পষ্ট। 


এটা বোঝা গেলো প্রতিশোধের ইচ্ছায় একটা প্রবল শক্তি থাকে। যেমন চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকে পদার্থ তেজ গতিতে ধাবিত হয় ঠিক তেমনি একটি মন ও কর্ম ছোটে প্রতিশোধ পূরণের আশায়। আর তার ফলে ঘটে ঘটনা। সুতরাং বলা যায় কেবল নিরাসক্ত শান্তির থেকে এই প্রতিশোধ জীবনের ক্যানভাসে নানা নক্সা এঁকে চলে।  মানসিক সকারত্মক ও নঙার্থক সকল অনুভূতির মত প্রতিশোধ একটি কর্মের গঠন দানের পক্ষে তেজি পদক্ষেপ। তাই "জীবন এরকম" এই  কথা মনে রেখে এইটি স্বীকার করে নিতে হবে। তবে প্রতিশোধ ধ্বংস ও দুঃখের গভীরতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় এই কথা মনে রেখেই শিশু শিক্ষা দেওয়া হতে পারে প্রতিশোধ কখনও শুভফলদায়ী নয়। 


তবে সাহিত্যের চোখে দেখলে প্রতিশোধ কেবল ঘটনার অনুঘটক। যেমন একটা গল্প বলি। সবার জানা তবু মনে করিয়েদি। শর্মিষ্ঠা অসুর কন্যা ধরে নিলাম নীচু জাতীয় কন্যা, কিন্তু আর্থিক অবস্থা উন্নত। গুরু বা ব্রাম্মন কন্যা দেবযানীর প্রথম থেকেই তা ঠিক লাগে না। তারও ইচ্ছা করে সমবয়সী বন্ধু মহলে পরিচিত মেয়েটার মত দামী গহনা কাপড় মান সম্মান পেতে, মনে ইর্ষা জন্মায় ( ইর্ষা প্রতিশোধের প্রথম সোপান) । দুই বন্ধু স্নানে গেছে। হয়ত দামী কাপড় পরিধানের লোভে শর্মিষ্ঠার কাপড় পড়ে ফেলল দেবযানী। ব্যাস তার থেকে বচসা ও হাতাহাতি (সহ্যশক্তির অভাব) । শর্মিষ্ঠা ক্ষত্রিয় কন্যা, গায়ের জোর ক্রোধ ও রাজকীয় শক্তি (সুপ্ত অহমিকা) তে এক ধাক্কায় কুপে ফেলে চলে এলো ঘরে। দেবযানীর ভাগ্য এসে দাঁড়ালো (নিয়তি আর একটি সিঁড়ি) । যযাতি, রাজা যযাতি তুলে আনলো হতভাগ্য ব্রাম্মন কন্যাটিকে। অর্থ সৌন্দর্য ও সামাজিক খ্যাতি দেবযানীর মনে আকাঙ্ক্ষা জাগালো। যার নাম দেওয়া হল প্রেম। সৃষ্টি হল নতুন গল্প। প্রতিশোধের গল্প। নিজেদের সামাজিক মর্যাদা পাবার লিপ্সা বা সমাজের ওপর প্রতিশোধ। ব্রাম্মন, তখন কার সমাজে প্রথম শ্রেণীর সম্মান পেলেও আর্থিক ও রাজকীয় ক্ষমতার দিকে নীচে ছিল। দেবযানী চাইল সামাজিক  এই বিভাজনের প্রতি, শোধ তুলতে। 


বাবার কাছে জানালো যযাতি হবে স্বামী আর শর্মিষ্ঠা দাসী হয়ে তার সাথে যাবে। দুই প্রতিশোধ চরিতার্থ করে দেবযানীর মন তো শান্ত হল। কিন্তু যযাতি, যাকে সামাজিক খেলনা হিসেবে প্রেমের টোপোর পরানো হল! তার মন আছে ,চাহিদা আছে। বোধ আছে। হয়ত দরিদ্র, ব্রাম্মন কন্যায়কে সামাজিক চাপে বিয়ে করলেও তার মধ্যে সেই আকর্ষণ বা রাজকীয় চালচলন পেলো না। রাজার ঠাটবাট  সে নারী হয়ত রপ্ত করতে পারল না, উপযুক্ত হতে পারলো না যযাতির। গোছাখানেক সন্তানের মা রাজমহিষী হলেও মনের প্রেমিকা হওয়া সহজ কাজ নয়। সামাজিক প্রতি পত্তি প্রতিশোধের আগুনে অধিকার করা যায় ।।

কিন্তু মন!! ত্রিশঙ্কু প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল দেবযানীর জীবন। প্রতিশোধ নিয়েও শূণ্যতা। যযাতি শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে উদ্যান বাটিকায় সুন্দর সংসার পাতল ।তাদের কেবল দেবার ইচ্ছা ছিল , ছিল নীরব সহানুভূতি। প্রেম ছিল। অকাল বার্ধক্য এলো দেবযানীর লাগানোর ফলে। দেবযানীর পিতা শুক্রাচার্য অভিশাপ দিলেন বা কোন ধরে নিলাম কোন ঔষধ দেওয়া হল অকাল বর্ধক্যের। এদিকে রাজকার্য আছে প্রজা দেশ শত্রু আছে। রাজার কি বুড়ো হয়ে বসলে চলে? দেবযানীর পরিবারের কেউ এ অসুখ নিয়ে মুক্তি দেবে না রাজাকে। শর্মিষ্ঠার প্রেমের সন্তান, সর্ব কনিষ্ঠ পুরু এ রোগ নিয়ে যযাতির জীবন এগিয়ে দিল। কথা হল..... প্রতিশোধ থেকে সৃষ্ট এই গল্প আবার একটা গল্প লিখে দিয়ে গেলো.... মহাভারত সৃষ্টি। তাই প্রতিশোধ স্পৃহা ঘটনা, হীন মনোবৃত্তি হলেও ঘটনা ঘটবেই।। 

ধন্যবাদ🙏💕 

৩টি মন্তব্য:

  1. প্রতিশোধ স্পৃহা থেকেই ঘটে একাধিক অঘটন।সে যাই হোক।গল্পটা অসাধারণ।চোখের সামনে ফুটে উঠল।

    উত্তরমুছুন
  2. কি সুন্দর বিশ্লেষণ! অসাধারণ! অভিভূত! 👌👌❤❤⚘⚘🖋

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...