"অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা।
পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহাপাতক নাশনম্।।"
অর্থ :- অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা ও মন্দোদরী পঞ্চকন্যাকে বা পঞ্চসতীকে দিনান্তে একটিবারের জন্য স্মরণ করলে কৃত মহাপাপগুলোর মোচন হয়।
রামায়ণ মহাকাব্য থেকে গৃহীত পঞ্চকন্যার মধ্যে তিনজন হলেন অহল্যা, তারা ও মন্দোদরী । ও মহাভারত থেকে দুজন হলেন দ্রৌপদী ও কুন্তী ।
অহল্যা🙏
আহিল্যা নামে পরিচিতা মহর্ষি গৌতমের ভার্যা, অসামান্য সুন্দরী সতীশ্রেষ্ঠা দেবী তিনি । তাঁর রূপের মোহে আবিষ্ট হয়ে ছলপূর্বক গৌতম মুনির অনুপস্থিতিতে, তাঁর ছদ্মবেশ ধারণ করে, তাঁকে ভোগ করেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র । পাপ করেন ইন্দ্র, কিন্তু শাস্তিস্বরূপ ইন্দ্রের সাথে সাথে দেবী অহল্যাকেও মহর্ষি গৌতমের কোপে পড়তে হয় যে, কেন তিনি তাঁর স্বামীর হুবহুকে চিনতে পারেননি । ঋষি গৌতমের অভিশাপে দেবী অহল্যা প্রস্তরীভূত হন । ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের চরণের ছোঁয়ায় তাঁর শাপমুক্তি ঘটে । তিনি পঞ্চকন্যার অন্যতম সতী নারী । চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম । অহল্যা কেন স্বামীকে চিনতে না পেরে স্বামীর রূপধারী ব্যক্তির সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিলেন তা অনেকের মনে ওনার প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করতে পারে । সেক্ষেত্রে একই ভুল ঋষি গৌতমও করলেন । তিনিও তাঁর স্ত্রীর মন বুঝলেন না, বুঝলেন না যে তাঁর স্ত্রী শুধুমাত্র তাঁকেই মন-মন্দিরের দেবতা মেনে আসছেন । অন্য কোনো পুরুষের সাথে তো তিনি লিপ্ত হননি । তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নিজের ছলকারীকে চিনতে পারা যদি দোষের হয় তবে, ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে স্ত্রীর ভালোবাসার প্রতি সন্দেহ করাও দোষের ।
তারা🙏
কিষ্কিন্ধ্যাধিপতী বানররাজ বালীর সহধর্মিনী এবং বানরবৈদ্য সুষেণের কন্যা ছিলেন তারা । দৈত্যের সাথে যুদ্ধে বালীকে মৃত ভ্রমে ভাই সুগ্রীব রাজা হন এবং তারাকে দখল করেন।কিন্তু, বালী ফিরে আসেন ও তারাকে নিজের অধিকারভুক্ত করেন পুনর্বার । সুগ্রীব পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচান। সুগ্রীবের ওপরে বালী বিশ্বাসঘাতক তকমা লাগিয়ে দেন । কিন্তু, তারা ছিলেন বুদ্ধিসম্পন্না, নির্ভীক এবং স্বামী বালীর একনিষ্ঠ ভক্ত । যিনি দুই ভাইয়ের যুদ্ধের মাঝে পড়েও তাঁর স্বামী বালির প্রতি ভালোবাসা ছিল অটুট । কত মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে জীবদ্দশায় । তবুও তিনি ছিলেন অবিচল । প্রণাম জানাই দেবী তারার শ্রীচরণে ।
মন্দোদরী🙏
লঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণের রাণী ও অসুরাজের মায়াসুর ও অপ্সরা হেমার কন্যা তিনি ছিলেন মন্দোদরী। মহাকাব্য রামায়ণে তিনি পরমা সুন্দরী, ধার্মিক ও ভগবভক্তরূপে বর্ণিত । স্বামী রাবণের শত পাপ থাকা সত্ত্বেও মন্দোদরী রাবণকে ভালোবাসতেন এবং ধর্মের পথ অনুসরণে সর্বদা পরামর্শ দিতেন। স্বামীর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্যবোধ রামায়ণে বর্ণিত । রাবণের মৃত্যুর পর, রামের উপদেশানুসারে রাবণের ভ্রাতা বিভীষণ মন্দোদরীকে বিবাহ করতে বাধ্য হন । রাবণ ছিলেন মাতৃতন্ত্রের প্রতিনিধি ছিলেন। তাই তার মৃত্যুর পর শাসনক্ষমতা পাওয়ার জন্য বিভীষণ রাজরাণীকেই বিবাহ করতে বাধ্য হন। মন্দোদরী ও বিভীষণের বিবাহ "রাজনৈতিক কূটবুদ্ধিপ্রসূত"। এই বিবাহ কোনোভাবেই "পারস্পরিক দৈহিক আকর্ষণে"র ভিত্তিতে হয়নি। রাক্ষসকন্যা এবং রাক্ষসরাজ রাবণের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও দেবী মন্দোদরী সর্বদা ধর্মের পথে চলেছেন । স্বামীকেই একমাত্র পুরুষ হিসেবে ভালোবেসেছেন আজীবন । ওনার চরণে শতকোটি প্রণাম জানাই ।
কুন্তী🙏
রাজা শূরসেনের কন্যা, হস্তিনাপুরের রাজা পাণ্ডুর রাণী ও তিন জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব অর্থাৎ, যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনের জননী ছিলেন কুন্তী । যেহেতু পাণ্ডু অভিশপ্ত ছিলেন যে, "স্ত্রী-সঙ্গমে মৃত্যু অনিবার্য" । বংশকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঋষি দুর্বাশার থেকে প্রাপ্ত মন্ত্রবলে তিনি তিন পাণ্ডবের জন্ম দেন । যুবতী বয়সে রাজা পাণ্ডুর অক্ষমতা সত্ত্বেও তিনি সর্বদা পান্ডুকেই ভালোবেসেছেন । অন্য কারোর প্রতি কোনোদিন আকৃষ্ট হননি । এমনকি যুবতী বয়সে বৈধব্যলাভ করা সত্ত্বেও কারোর সাথে পুনর্বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি । শতকষ্ট সয়েও তিনি শেষপর্যন্ত পাণ্ডুর স্ত্রীর মর্যাদা মাথায় নিয়ে স্বার্গলাভ করেছেন । অনেকে বলবেন, কর্ণকে পৃথিবীতে আনা কর্ণের প্রতি অবিচার হয়েছে । কিন্তু, ভুল তো মানুষ মাত্রই হয় । সেটা ছিল তাঁর কিশোরী বয়সের একটা ভুল । এরকারণে এঁর সতীত্ব কোনো অংশে ক্ষুণ্ণ হয়নি । শতকোটি প্রণাম জানাই তাঁর শ্রীচরণে ।
দ্রৌপদী🙏
ইনি পঞ্চকন্যার দ্বিতীয়, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা, অসামান্য সুন্দরী । পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ চেয়েছিলেন দ্রৌপদীর সাথে অর্জুনের বিবাহ দিতে । সেই কারণে তিনি দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরসভার আয়োজন করেছিলেন । মহাবীর কর্ণ অগ্রাধিকার পেয়েছিলেন সেই মাছের চোখ বিদ্ধ করার । তিনি ধনুক ওঠাবার সাথে সাথে দ্রৌপদী প্রতিবাদ করেন যে তিনি সুতপুত্রকে বিবাহ করতে নারাজ । সেই স্বয়ম্বরসভায় মাছের চোখকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে অর্জুন দ্রৌপদীকে বিবাহের অধিকার লাভ করেন । আমরা জানি, পঞ্চপাণ্ডবের মাতৃআদেশ পালনে কোনোদিন অন্যথায় হয়নি । মাতা কুন্তী যখন কর্মব্যস্ত ছিলেন, অর্জুন এসে কুন্তীকে বলেন, "দেখো মা, আমি কি নিয়ে এসেছি ।" কুন্তী সেদিকে না দেখেই নির্দেশ দেন, "যা এনেছ, পাঁচ ভাই মিলে ভাগ করে নাও ।" এভাবেই মাতৃ আদেশের বলি হতে হল দ্রৌপদীকে । তিনি ভালোবেসেছিলেন শুধুমাত্র অর্জুনকে । ওনার চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম ।
ছবি : গুগুল
Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

বেশ সুন্দর লাগল। অসাধারণ!❤❤⚘⚘🖋
উত্তরমুছুন