শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১

#নাম- একদিন আলাদিন। ✍ - সৌগত মুখোপাধ্যায়।

*একদিন আলাদিন*
*কলমে:সৌগত মুখোপাধ্যায়*
মহামারী স্থায়ী চাকরি থেকে ছুটি করিয়ে দিয়েছে, স্বল্প মাইনের পি এফ গ্রাচুইটি বলতে হাতে যা এসেছিল, তাতে সংসার চালানো ছেলে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো কেনো দুরস্ত চিন্তা ছিলো।একটা মার্কেটিং এজেন্সির চাকরি পেয়েছি ৬ হাজার বেতন বাকি কমিশন।মাসে ৮ / সারে আটে কোনোক্রমে চারজনের খেয়ে পড়ে বাঁচাটা হয়ে যাচ্ছে।রেহাই পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে তাই মাস্টার স্কুলের ফিস দিতে হচ্ছে না।
   কড়া রোদে বাড়ি বাড়ি মশলা ফাইনাল বেচার হবে এটা কোনোদিন ভাবিনি।ভর দুপুর তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে,মাথাটাও ঘুরছে সকালে এক গ্লাস ছাতু খেয়ে বেড়িয়েছি,ভেবেছিলাম পথে কিছু দোকানে খেয়ে নেবো।এমন পোড়া কপাল আজ এখানের সব দোকান পাট বন্ধ,মহামারীর বিরুদ্ধে মানবিক লক ডাউন।মাথাটা ঘুরছে,সামনে একটা বাড়ি ভাঙা হতে হতে বন্ধ হয়ে গেছে,ওখানেই একটু বিশ্রাম নিতে ঢুকলাম।বেশ বড়ো কোনো বাড়ি ছিলো, আজ সেটা ভাঙা পড়ছে কাল এখানে মস্ত ফ্ল্যাট উঠবে,বাকি সব পুরোনো ঐতিহ্যর মতো এ বাড়ির সব ইতিহাস হয়ে যাবে।যেখানটায় বসে আছি এটা কোনো ঠাকুর ঘর ছিলো মনে হয়।ছোট ছোট ঘুল ঘুলি কিছু শুকিয়ে যাওয়া ফুল,কতকাল আগের কে জানে,কালো অঙ্গারি হয়ে গেছে।ঈশ্বর বোধহয় অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছেন।
   হটাৎ মন বললো এসব বাড়িতে গুপ্তধন পাওয়া যায়,একটু খুঁজে দেখলে কেমন হয়।যদি পড়াকপালে একটু আলো জ্বলে।একটা লোহার শিক নিয়ে খোঁচা খুঁচি শুরু করলাম।বলা যায়না গুপ্তধন থাকুক না থাকুক বিষধর সাপ এখানে থাকবে না এ হতেই পারে না।
  প্রায় সব কোনা ঘুল ঘুলি খুঁচিয়ে পুরোনো ধুলো নোংরা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেলো না।যদিও দুটো তামার পয়সা পেয়েছি,ওর আর কি দাম।ক্লান্ত বিফল মনোরথে মাটিতে বসে নিজের দুর্ভাগ্য চিন্তা করে এদিক ওদিক চাইতে থাকি।হটাৎ অর্ধ ভগ্ন একটা বেদীর দিকে আমার চোখ আটকে যায়,আরে এখানটা খোঁজা হয়নি তো।শিক দিয়ে। খোঁচা খুঁচি করতে ভিতরে একটা ঢঙ করে আওয়াজ হলো।অনেক কসরত করে জিনিষটা টেনে বের করে দেখি ছেলেবেলায় বইয়ে পড়া আলাদিনের প্রদীপের মতো একটা জিনিষ বেরিয়ে এলো।একটু ফুঁ দিয়ে ধুলো সরিয়ে দেখি হ্যাঁ ঠিক আলাদিনের প্রদীপ।তবেকি এটা ঘষলে জিন বেরোবে,নিজেই নিজের উপর হাঁসলাম, অভাব মানুষকে শুধু বোকা নয় লোভী ও কম করে না।যাইহোক জিন বেরোক না বেরোক এটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে এন্টিক হিসাবে বিক্রি করতে পারলে কিছু টাকা হাতে আসবে।সেটা পকেটে ভরে আবার নিজের কাজে বেরিয়ে পড়লাম।
   কাল রবিবার বেরোতে হবে না,রাতে বসে আমার আলাদিনের প্রদীপ পরিষ্কার করতে বসলাম।ছেলে নীচে বায়োডাটা তৈরিতে ব্যাস্ত শুনলাম ও মাকে বলেছে রেগুলার কলেজ ছেড়ে দেবে,একটা চাকরি পেয়ে পরে প্রাইভেটে পড়ে নেবে।মেয়েটাও শুনছি সেলাই শিখতে পাশের বাড়িতে যাচ্ছে।কেনো প্রশ্ন করার ক্ষমতা আমাদের মতো বাবাদের আজ আর নেই,মহামারী সব অধিকার কেড়ে নিয়েছে। প্রদীপটা কাপড় দিয়ে মুছে একটু ব্রাশ দিয়ে ঘষে উজ্জ্বলতা ফেরাবার চেষ্টা করলাম।বার তিনেক ঘষতেই প্রদীপের মুখ দিয়ে গল গল করে নীলাভ ধোঁয়া
বের হতে লাগলো আমি ভয় পেয়ে সেটা ফেলে দিলাম।সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী জমতে জমতে একটা শীর্ণকায়,কঠোরগত চোখ,সারা মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি,দড়ির মতো ক্ষুধার্ত পেটের মানুষের চেহারা নিলো।সেই মানুষটা আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে করুন সুরে বললো আদেশ করুন আকা আমি আপনার কি উপকারে লাগতে পারি।তবে এমন কিছু চাইবেন না যা আমি আপনাকে দিতে পারবো না।আমি অবাক হয়ে তাকে দেখতে থাকি,এ তো আমার ছেলেবেলায় পড়া স্বপ্নের সেই নাদুস নুদুস জিন নয়,তাহলে এ কে?আমি বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার এই অবস্থা কি করে হলো।
  জিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সময় আকা সময়,সময়ের সঙ্গে মানুষ জিন কেউই পেরে ওঠে না।তার নির্দেশে আমাদের সবাইকে চলতে হয়।আমি অবাক হয়ে বলি তবে যে আমি পড়েছি তুমি এক নিমিষে বাড়ি ঘর ধন সম্পদ সব এনে দিতে পারো।আমার অতো বরো হবার সাধ নেই,আমার জন্য এমন কিছু করো যাতে দুবেলা পেট ভরে খেতে পাই,ছেলেমেয়েরা তাদের পড়াশোনা চালাতে পারে।
  জিন চোখ মোছে বলে আমাকে একটু জল দেবেন।আমি জল বাড়িয়ে দিই।ঢক ঢক করে সমস্ত জল খেয়ে যেনো কতো বছরের তৃষ্ণা মেটায়।খানিক্ষণ চুপ করে বসে বলে,ছেলেবেলায় যা পড়েছেন ওসব গল্প,শৈশবের রঙিন তুলি দিয়ে বাস্তবের কঠিন ঢেকে একটা স্বপ্নের দেশে ভ্রমন করানো।সব গল্প কথা ।আসল সত্যি শ্রম ,আমার শ্রম দিয়ে আমি অন্যের স্বপ্ন পূরণ করেছি।সে অর্থে আপনারা সবাই এক একজন আমারই মতো জিন,আপনাদের শ্রম পরিশ্রম বেচে কতো আজকের আলাদিনের প্রাসাদ গড়ছেন।তাদের সন্তান ক্লাব পার্টি করছে আপনার সন্তান নিজের ভবিষ্যৎ ফেলে আবার একটা আমার মতো জিন হচ্ছে।ইতিহাস আলাদিনকে মনে রাখে কিন্তু জিনের স্বপ্ন প্রদীপের অন্ধকারে বন্ধ থাকে,শুধু জিন গল্প হয়ে বেচে থাকে আর সবাই প্রদীপটা খুঁজে পেতে চায়।
   এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে জিনটা থামে।আবার বলতে শুরু করে বহু বহু বছর আগে আমি এক সাধারণ মানুষ ছিলাম,তখন জাত পাতের লড়াই ছিলো না তবে ধনীর শোষণ ছিলো।আমি নির্বিবাদী মানুষ ছিলাম,নিজের পরিশ্রমে বিশ্বাস রাখতাম,পশুর মতো পরিশ্রম করে রাজার কোষাগার ভর্তি করতাম ।আপনার মতো আমারও একটা পরিবার ছিলো তাদের জন্য সব অত্যাচার সহ্য করতাম।আর এই সহ্য আমার মৃত্যুর কারণ হলো।মরার পরে এক দুষ্ট পীর আমার আত্মাকে ভুল বুঝিয়ে ওই প্রদীপে বন্দী করলো।আমার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আমায় ক্রীতদাসে পরিণত করলো।তারপর তার সুখ কিনে দেবার জন্য আমি পরিশ্রম করতে লাগলো,কথা দিলো তার প্রয়োজন ফুরোলে আমায় মুক্তি দেবে।প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করালো এই প্রদীপের সঙ্গে।মানুষের প্রয়োজনের শেষ নেই মালিক বদল হতে থাকলো ,আমি নিজেকে নিঙড়ে মুক্তির পথ খুঁজে চললাম।অভুক্ত শরীরে ক্ষয় হতে হতে আজ আমি নিঃস, দুর্বল আপনার এই ছোট্ট আশা পূরণের ক্ষমতা আমার নেই।তবুও আমি আপনার সংসারে আমার না পাওয়া সংসার দেখতে পেয়েছি,আমি আমার শেষ ক্ষমতা দিয়ে আপনাদের সেবায় লাগবো।আমায় একটা কাজ খুঁজে দিননা আকা যা দিয়ে আমি আপনাদের উপকারে লাগি।
  আমি ঐ শীর্ন জিনটার জোর হাতটা চেপে ধরি।হোক না জিন ওর ও মুক্তি আছে প্রদীপটা ছুঁড়ে পাশের পুকুরে ফেলে দিলাম।জিন আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
   না আমি এখন দিব্যি আছি,ছেলেটাকে রেগুলার কলেজ ছাড়তে হয়নি।আপনাদের কাছে বিনীত নিবেদন এই মহামারীতে আপনার দরজায় যদি কেউ একটু ধুপ,মশলা কিংবা ফিনাইল নিয়ে কলিং বেল টেপে, প্রয়োজন থাকলে কিনে সাহায্য করবেন।আমি কিংবা আমার ওই জিন ভাইটা আমরা নিজেদের পরিশ্রমে বাঁচতে চাই।আপনাদের সাহায্য না পেলে তা সম্ভব নয়।
   🙏🙏🙏🙏🙏
কপিরাইট রিজার্ভ @সৌগত@মুখোপাধ্যায়#2021

৩টি মন্তব্য:

  1. খুব ভাল লাগল।অর্থনীতির বাস্তব চিত্র গল্পের আকারে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ চিন্তা ভাবনা 🙏🙏🙏🙏🙏

    উত্তরমুছুন
  3. দারুণ একটা লেখা পড়লাম।অসাধারণ! 👍👍❤❤⚘⚘🖋

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...