আজকের বিষয়, *“হাজার মাইলের যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে”*।
✍️ শুভব্রত ভট্টাচার্য
আজ আপনাদের শোনাবো এক অনন্ত মহাজীবনের কথা। এক সামান্য মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে তিনি কিভাবে হয়ে উঠলেন ভারতের এক প্রভাবশালী ধর্মগুরু এবং সারা বিশ্বের হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের প্রধান মুখ। সারাবিশ্বে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্ব কে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁর তৈরি সংগঠন আজ সারা পৃথিবীতে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের মাধুর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বলছি ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজের কথা।
১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি গৌড়ীয় মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অনন্তলোকের যাত্রী হয়ে গেলে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় অভিভাবক হীন হয়ে যায়। যদিও সরস্বতী ঠাকুরের কয়েকজন মুখ্য শিষ্য ছিলেন যাঁরা অত্যন্ত জ্ঞানী ও পন্ডিত। তাঁরা প্রত্যেকেই সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত যোগ্য ছিলেন। তখন গৌড়ীয় মঠের ৬৪টি শাখা ও ১ টি প্রচার কেন্দ্র ছিল সমগ্র ভারতে। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মৃত্যুর পর এক বিতর্ক শুরু হয় এবং মূল গৌড়ীয় মঠ মিশনটি দুটি প্রশাসনিক সংস্থাতে বিভক্ত হয়।যারা আজকের দিন পর্যন্ত নিজেদের প্রচার করে চলেছে। এক বন্দোবস্তে তারা ৬৪ টি গৌড়ীয় মঠ কেন্দ্রকে দুটি ভাগে ভাগ করে। শ্রী চৈতন্য মঠ শাখা শ্রীল ভক্তি বিলাস তীর্থ মহারাজের নেতৃত্বে ছিল। গৌড়ীয় মিশন ছিল অনন্ত বাসুদেব প্রভুর নেতৃত্বে ।যিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর শ্রী ভক্তি প্রসাদ পুরি মহারাজ হিসাবে পরিচিত হন ।
ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের অন্যান্য যোগ্য শিষ্যরা এই বিভাজনের সাথে একমত হন নি। তাঁরা কেবল তাদের গুরুর মিশন সম্প্রসারিত করার জন্য অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাই তাঁরা নিজেদের পৃথক মিশন শুরু করেছিলেন। এই স্বায়ত্তশাসিত মিশনের অনেকগুলি এখনও বিভিন্ন গৌড়ীয় মঠ নামে পরিচিত। এইসব অত্যন্ত জ্ঞানী ও বিচক্ষণ শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ। ১৯২০ সালের স্কটিশ চার্চ কলেজের স্নাতক অভয়চরণ দে ১৯২২ সালে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৩ সালে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আনুষ্ঠানিক ভাবে মঠে যোগদান করেন ও সরস্বতী ঠাকুরের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। সরস্বতী ঠাকুর অপ্রকট হবার কিছু দিন আগে স্বামী মহারাজকে বিদেশে হরিনাম সংকীর্তন প্রচারের আদেশ দিয়েছিলেন। তাই যখন সরস্বতী ঠাকুরের শিষ্যরা মঠ ভাগাভাগি করে নিলেন বা নিজেদের আলাদা আলাদা করে সংগঠন তৈরি করলেন, স্বামী মহারাজ তখন এসবের মধ্যে গেলেন না। বিভিন্ন বৈষ্ণব গ্রন্হ প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করলেন তিনি। আর নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন বিদেশে ধর্ম প্রচারের জন্য। ১৯৪৭ সালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ তাঁর পান্ডিত্যের জন্য তাঁকে ভক্তিবেদান্ত উপাধি দিয়ে সম্মানিত করলেন। এরপর তিনি বৃন্দাবনে থাকতে শুরু করেন, বিখ্যাত রাধা দামোদর মন্দিরে। এখানেই বসে তিনি রচনা করেন ভাগবত পুরাণের টীকা। তিন খন্ডে ভাগবত পুরাণের টীকা বৈষ্ণব সাহিত্যের এক অদ্ভুত গ্রন্হ। ১৯৫৯ সালে এলাহাবাদ গৌড়ীয় মঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিম গুরুভাই কেশব মহারাজের সন্ন্যাসব্রত গ্রহন করলেন।
এরপর তাঁর মধ্যে বিদেশে কৃষ্ণনাম প্রচার করতে যাবার ইচ্ছে আরো প্রবল হল। কোন রকমে এক ভক্তের সহায়তায় জলদূত নামে এক জাহাজে একটি জায়গা পেলেন। একটি ছাতা, সামান্য কিছু শুকনো খাবার, কয়েকখানি বই ও আট টাকা সম্বল করে আমেরিকা যাত্রা করলেন। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হিসাবে আমেরিকায় তিনি তার আধ্যাত্মিক মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন। ১৯৬৬ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমীর পরের দিন তিনি পাশ্চাত্যে প্রথম দীক্ষা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন ও ১১ জনকে দীক্ষা দেন। প্রতিষ্ঠা করলেন ইসকন (ISKCON) আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের। এর মাধ্যমে বৈষ্ণব ভাবধারাকে পাশ্চাত্য দুনিয়ার কাছে উন্মুক্ত করে দিলেন তিনি। শুরু হলো আন্তর্জাতিক হরেকৃষ্ণ আন্দোলন।
১৯৬৭ সালের ৯ জুলাই সানফ্রান্সিসকো শহরের রাজপথে তিনিই পাশ্চাত্যে প্রথম রথযাত্রা পরিচালনা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত ও অন্যান্য জায়গায় ভ্রমণ করে তিনি অসংখ্য শিষ্যসংগ্রহে সফল হন। সংকীর্তন বই বিতরণ ও জনসভার মাধ্যমে হরেকৃষ্ণ আন্দোলনকে পাশ্চাত্যে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলতে থাকেন। যত সময় এগোতে থাকে দিকে দিকে ইসকনের শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে। হরেকৃষ্ণ আন্দোলন প্রচারের জন্য চোদ্দবার তিনি বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং ছটি মহাদেশে পদার্পণ হয়েছিল তাঁর। বিদেশের মাটিতে বৈষ্ণববাদ এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবধারাকে প্রচার করে ১৯৭১ সালে দেশে ফিরে আসেন। মায়াপুর ইসকন মন্দির তৈরি হলো। মায়াপুর ছাড়াও বৃন্দাবন, দিল্লি সহ ভারতবর্ষের অন্যান্য সমস্ত বড় বড় শহর এবং তীর্থক্ষেত্রে ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হলো। ধীরে ধীরে বিদেশের মাটি ছাড়াও দেশের মাটিতে ইসকনের প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ভাবধারা ছড়িয়ে পড়লো তাঁর হাত ধরে। অসীম সাংগঠনিক শক্তি এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান। জীবনে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন গীতা, চৈতন্য চরিতামৃত, শ্রীমদ্ ভাগবত গ্রন্থ গুলি সহ ষাটটিরও বেশি গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন তিনি। এছাড়াও তার অসংখ্য লেখা গ্রন্থ আছে বৈষ্ণব ধর্মের ওপর যেগুলি বর্তমানে আশিটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।
এক বিশাল সংস্থা তৈরি করে গেছেন তাঁর জীবদ্দশায়। ইসকনের বিশাল কর্মকাণ্ড, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোককে প্রতিদিন দুইবেলা করে খাওয়ানো হয়। যেখানে বন্যা খরা প্রাকৃতিক বিপর্যয় সেখানেই ইসকনের উপস্থিতি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে অসংখ্য মন্দির অতিথিশালা এবং নরনারায়ন সেবার ব্যবস্থা এক অলৌকিক কাজকারবার।
প্রভুপাদের অন্য শিষ্যদের মতো তিনি নিজের ভাগে একেকটা মঠ নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাননি। প্রভুপাদের আদেশ বিদেশে গিয়ে হরিনাম প্রচার করো, এ কথা সারা জীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে। তাই সাহস করে তিনি আমেরিকা যাবার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন একরকম কপর্দকহীন অবস্থায়। যার জন্য আজ এত বড় অরগানাইজেশন উনি তৈরি করে যেতে পেরেছেন।১৯৭৭ সালের ১৪ ই নভেম্বর তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেন। তাঁর নির্দেশিত পথেই ইসকন আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আধ্যাত্বিক চেতনায় পথ দেখাচ্ছে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ নরনারী কে।
অসম্ভব সুন্দর লেখা 🙏🙏🙏🙏সমৃদ্ধ হলাম
উত্তরমুছুনঅসম্ভব ভাল লেখা।সমৃদ্ধ হলাম।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ একটি তথ্যসমৃদ্ধ লেখা পেলাম। চমৎকার!👌👌❤❤⚘⚘🖋
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ
উত্তরমুছুনঅসাধারণ।
উত্তরমুছুনঅপরূপ লেখনী...💐👌
উত্তরমুছুন