শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

পালঙ্ক (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)


নতুন ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটটা সাজাতে অভয় ঠিক করেছে অ্যান্টিক আসবাবপত্রের ব্যবহার করবে বলে । প্ল্যানমতো ও কলকাতার বিভিন্ন অকশান হাউজগুলোর সাথে যোগাযোগ করে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পেয়ে গেল একটা দুর্দান্ত মেহগনি কাঠের বিশালাকায় অ্যান্টিক পালঙ্ক । পালঙ্কটা ঠিক অভয়ের মনের মতো । বিশাল ষোলো বাই ষোলো বেডরুমের ঠিক মধ্যিখানে পালঙ্কটা রেখেছে ও । ঘরটায় ও একটা সেগুন কাঠের আয়নাবসানো আলমারী ও একটা হরিণের সিংয়ের ওপরে শালকাঠের তৈরী বেডসাইড টেবিল দিয়ে সাজিয়েছে মনের মতো করে । 


অভয়ের কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিলনা । স্ত্রী শ্রীপর্ণা আর ষোলো বছরের পুত্র প্রয়াগকে নিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বেশ । কঠোর পরিশ্রমে ধীরে ধীরে হাতে কিছু টাকা জমিয়ে, ভাড়া বাড়ি ছেড়ে এই নতুন ফ্ল্যাট কিনে, শহরের উপকণ্ঠে বেশ মনোরম নিরিবিলি জায়গায় একটা ঝাঁ চকচকে কমপ্লেক্সের মধ্যে ওরা শিফ্ট করে আসে । 


প্রথম প্রথম দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বেশ । গোল বাঁধলো অ্যান্টিক আসবাবে ঘর সাজানোর পর থেকে । সেদিন রাতে অভয়, শ্রীপর্ণা আর প্রয়াগ পালঙ্কে শুয়ে গভীর ঘুমে অচেতন । প্রয়াগ মা আর বাবার মধ্যিখানে শুয়েছে । ঘড়িতে তখন ঠিক রাত দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । ছটফট করে প্রয়াগের ঘুম ভেঙে গেল । যেন ওর মুখের ওপর কিছু একটা ভারী জিনিস চেপে বসেছে । দরদর করে ঘামছে ও । বিছানায় উঠে বসলো বুকে হাত চেপে ধরে । জল খেতে হবে একটু, বাথরুম যেতে হবে । বাবাকে ডিঙিয়ে ও নামলো নীচে । বেডসাইড টেবিল থেকে নিজের জলের বোতলটা তুলে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে খেলো কিছুটা জল । তারপরে বোতলটা নামিয়ে রেখে পেছন ঘুরতেই ওর চোখ পড়ল সামনে রাখা সেগুন কাঠের আলমারীর আয়নাটার ওপরে । ও দেখলো ওর বাবা আর মায়ের মাঝে বসে আছে একটা ওরই বয়সী ছেলে । চোখটা একবার রগড়ে নিলো ও । হয়তো ভুল দেখছে সেই ভেবে । না, চোখের ভুল নয়, ছেলেটা তো এখনো বসে আছে ওর বাবা আর মায়ের মাঝে । এবারে ছেলেটা ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো । ছেলেটার চোখে মণি নেই । কালো গর্ত হয়ে আছে সেই জায়গায় । দাঁত বের করে ওর দিকে চেয়ে হাসছে ছেলেটা । প্রয়াগ ভয়ে চিৎকার করে উঠলো প্রাণপণে ।


চিৎকারে ওর মা-বাবার ঘুম ভেঙে দেখে প্রয়াগ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মাটিতে । মাঝরাতে শোরগোল পড়ে গেল । সিকিউরিটির কাছে ফোন করে সেই কমপ্লেক্সের এক ডাক্তারের সন্ধান পেলো অভয় । ডাক্তারকে ফোন করতে উনি এসে প্রয়াগকে ভালো করে চেক করে বললেন, "মনে হয় মাঝরাতে কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছে । হার্টরেট খুব ফাস্ট চলছে ।" 


সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসার পরে প্রয়াগ চোখ মেলে তাকালো । ডাক্তারের নির্দেশমতো ওকে কেউ তখন কিছু জিজ্ঞাসা করলো না । ডাক্তার ওকে হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধ দিয়ে চলে গেলেন । 


পরেরদিন অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙল প্রয়াগের । খুব দুর্বল লাগছে । মাথাটা ভার হয়ে আছে আর ঘাড়ের দিকে প্রচন্ড চাপ ধরে আছে ওর । শরীরটা খুব ভার লাগছে । উঠে বাথরুম গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হলো ও । ওর বাবা ততক্ষণে অফিস চলে গেছে । ঘরে ওর মা আর ও । ছেলে ঘুম থেকে উঠেছে দেখে ওর মা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, "কাল মাঝরাতে অমন চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেছিলিস কেন রে বাবু? কি হয়েছিল?"


প্রয়াগ অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই মনে করতে পারছেনা যে কাল রাতে কি হয়েছিল! শুধু নিজের তারস্বরে চিৎকারটাই ওর কানে ভাসছে । 


মনে করতে পারছেনা দেখে ওর মা খানিক নিশ্চিন্ত হলেন । কি না কি ব্যাপারে ভয় পেয়েছিল, ওসব মনে না পড়াই ভালো । ছেলেকে ব্রেকফাস্টে টোস্ট, অমলেট আর একগ্লাস দুধ দিয়ে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন শ্রীপর্ণা । 


প্রয়াগের কিচ্ছু খেতে ভালো লাগছে না । শরীরটা এত ভারী কেন লাগছে! ঘাড়ে মাথায় এতো চাপ কেন ধরছে! ওহঃ, অসহ্য যন্ত্রণা । খাবার ফেলে রেখে ও উঠে আবার গিয়ে শুয়ে পড়লো পালঙ্কে । এই জায়গাতেই যেন পরম শান্তি । কি আরাম! আরামে আবার দুচোখ বুজে এলো প্রয়াগের । 


ছেলে ব্রেকফাস্ট করেনি । অনেক ডেকে ডেকে লাঞ্চের জন্যেও উঠলো না । সন্ধ্যেবেলা ঘুম থেকে একবার উঠে মা বলে ডাকলো । শ্রীপর্ণা ছেলের মাথার কাছেই বসেছিল । ততক্ষণে অভয়ও বাড়ি এসে গেছে । বড় ডাক্তারকে কল করা হয়েছে প্রয়াগকে দেখানোর জন্য । ডাক্তার এসে অনেক রকমের পরীক্ষা দিয়ে, ওষুধ আর ভিটামিন লিখে দিয়ে চলে গেলেন । 


সেদিন মাঝরাত । ঘড়িতে ঠিক দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । বাথরুম যাবার জন্য অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল প্রয়াগের । ঘুম থেকে উঠে প্রয়াগ যেন আর দাঁড়াতেই পারছে না । কাঁধে, ঘাড়ে, মাথায় অসহ্য চাপধরা যন্ত্রণা ওর । কোনোমতে শরীরটা টেনে টেনে নিয়ে গেল বাথরুমে । প্রস্রাবের পরে মুখে জল দেবার জন্য বেসিনের সামনে দাঁড়ালো ও । বেসিনের সামনে লাগানো বড় আয়না । তাতে নিজেকে দেখে ভয়ে আত্মা যেন শুকিয়ে এলো ওর । ওর দুটো কাঁধের থেকে ঝুলে আছে সাদা শুকনো দুটো পা । আর ওর মাথার পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে সেই চোখবিহীন ছেলেটার মুখ, যাকে দেখে প্রয়াগ ভয় পেয়েছিল গত রাতে । বিশ্রীভাবে ওর কাঁধের ওপর দিয়ে ওর ঘাড়ে চেপে আছে সেই ছেলে । হাসছে দাঁত বের করে ওর দিকে তাকিয়ে । একেই দুর্বল শরীর, তার ওপরে আয়নায় এই দৃশ্য দেখে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আবার জ্ঞান হারালো প্রয়াগ । 


হুড়মুড় শব্দে ঘুম ভেঙে অভয় আর শ্রীপর্ণা দেখে ছেলে পাশে নেই । তাড়াতাড়ি বাথরুমের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতে দিতেও খুলছেনা প্রয়াগ । সিকিউরিটি ডেকে দরজা ভেঙে বের করা হল ওর অচৈতন্য দেহটা । অ্যামবুলেন্সে করে সেই রাতেই হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল ওকে । হসপিটালে সেই রাতেই এমার্জেন্সিতে সমস্ত ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেও ডাক্তার বুঝে উঠতে পারলোনা কেন এমন হচ্ছে ওর । সব রিপোর্টই নর্মাল । 


শ্রীপর্ণার মনে সন্দেহ দেখা দিলো । ও অভয়কে বললো, সবই তো ঠিক চলছিল । যেদিন থেকে পুরোনো জিনিসে ঘর সাজালে সেদিন থেকেই ছেলের এমন হলো । কার না কার চোখের জলের জিনিস হয়তো । হয়তো কত বিপদে পড়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে । তুমি খোঁজ নিয়ে দেখো কোথা থেকে এই জিনিসগুলো এসেছে । 


যদিও অভয় এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেনা, তবুও সন্তানের ব্যাপারে পৃথিবীর সব বাবা-মা'ই দুর্বল । অভয় ঠিক করলো আজকেই খোঁজ লাগাবে আসবাবপত্রগুলোর সোর্স কি!


অনেক ফোন করে করে, অনেক চেষ্টা চরিত্রের পরে যে ভয়ানক সত্যের সন্ধান পেলো অভয়, তাতে ওর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো । ও জানতে পারলো, যে পালঙ্কটা ও কিনেছে, সেটা বহু বছর পুরোনো এক জমিদার রায়বাহাদুর অমরীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সম্পত্তি । তাঁর মৃত্যুর পরে, সম্পত্তির লোভে তাঁর উত্তরাধিকারী একমাত্র পুত্র জগদীন্দ্রনাথকে হত্যা করে জমিদারের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, অর্থাৎ, ছেলেটির সৎ মা । মাঝরাতে, বাড়ির চাকরের সাহায্যে ওই পালঙ্কের ওপরে ঘুমন্ত ষোলো বছরের জগদীন্দ্রনাথকে মুখের ওপর বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয় । অনেক ধস্তাধস্তির পরে, নিরীহ ছেলেটার যখন প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়, ঘড়িতে ঠিক তখন রাত দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । 


সমস্ত কিছু জানতে পেরে অভয় আর শ্রীপর্ণা বুঝতে পারলো যে, খুন হবার পরে ওই পালঙ্কের মধ্যেই রয়ে গেছে সেই ছেলের অতৃপ্ত আত্মা । সেই আত্মার মুক্তিই একমাত্র পথ প্রয়াগকে সুস্থ করে তোলার । 


কালবিলম্ব না করে অভয় সেই রাতেই ট্রেনে করে চলে গেল গয়ায় পিণ্ডদানের উদ্দেশ্যে । একবার প্রেতশিলায় পিণ্ডদানের পরে আত্মার মুক্তিলাভ অবশ্যম্ভাবী । ভোররাতে পূজারী ব্রাহ্মণকে সাথে নিয়ে প্রেতশিলায় পিণ্ডদানের সময় অভয় যেন টের পেলো কোনো দুটো অস্থির হাত এসে ওর হাত থেকে পিন্ড ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল । অভয় বুঝতে পারলো যে জগদীন্দ্রনাথের আত্মার এখন মুক্তিলাভ ঘটলো । নিরীহ ছেলেটির দুঃখে চোখ জলে ভিজে এল আরেক পিতার ।


আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক তার পরেই সুস্থ হয়ে চোখ মেলে তাকালো প্রয়াগ । কাঁধে, ঘাড়ে আর কোনো চাপ নেই । অভয় গয়া থেকে ফিরে ছেলেকে সুস্থ দেখে আনন্দে আত্মহারা । পরেরদিন সকালেই প্রয়াগকে হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করে দিলো ডাক্তার । 


পালঙ্কটা থেকে চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছে বিদেহী আত্মা । অভয়ের ফ্ল্যাটে সেটা এখনো শোভা বাড়ায় ওদের বিশাল বেডরুমের ঠিক মধ্যিখানে ।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

১০টি মন্তব্য:

  1. দারুণ লাগল। মন ভরে গেল। অসাধারণ!👌👌❤❤⚘⚘🖋

    উত্তরমুছুন
  2. বেশ ভয়ঙ্কর জিনিস লিখতে। আমি আবার ভিতু। কিন্তু পড়া ছাড়তে পারি না। দারুন দারুন💐💐💐💐💐

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...