সোমবার, ১২ জুলাই, ২০২১

অণুগল্প--রং নাম্বার। শিরোনাম---দুই মা । কলমে-- পারমিতা মন্ডল।

অণুগল্প  ----রং নাম্বার।
শিরোনাম---দুই মা।
কলমে-- পারমিতা মন্ডল।

"হ‍্যালো খোকা শুনতে পাচ্ছিস ? আমি মা বলছি রে ? খুব ব‍্যস্ত আছিস ?" মা অতসীলতা ওদিক থেকে ফোনে ছেলের গলা পেয়ে আত্মহারা। 
     ছেলে অরিত্রর গলা- "না, মা বল । ব‍্যস্ত নেই । কি হয়েছে ?"
 
 - "তুই ভালো আছিস তো বাবা ? কিছু খেয়েছিস ? খালি পেটে থাকিস না কিন্তু । শরীর খারাপ হবে।"

  - "না, না চিন্তা করো না । আমি খেয়ে নিয়েছি। এবার বলো কেন ফোন করেছো ?"

অতসীলতার মনে ও চোখে সন্দেহের ভাব,অরিত্র এতো ভালো করে কথা বলছে ? মনে হয় বৌমা পাশে নেই।অন্য সময় ফোন করলে তো গজগজ করতে থাকে। ধরা ধরা গলায় বলেন- "না, বলছি বাবা, তুই তো গত দুমাস ধরে টাকা পাঠাসনি । এমাসের ও পনেরো তারিখ হয়ে গেল । আমার কাছে চাল কেনার আর টাকা নেই। সামনের দোকান থেকে ধার করে এক কেজি চাল এনেছিলাম। তাও শেষ।  এবার আমাকে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই ফোন করলাম। তুই রেগে যাস না যেন । জানি তোর অনেক খরচ ।ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা , সংসার খরচ।  আবার একটা কুকুর ও আছে। ওর পিছনেও অনেক টাকা লাগে। তুই এই মাসে কয়টা টাকা দে । সামনের মাসে আমি কিছু একটা কাজের চেষ্টা ঠিক করে নেবো।"
 ওপাস থেকে অরিত্র বিস্ময়ের সঙ্গে বলে -- "সেকি মা ? তুমি কাজ করবে কেন আমি থাকতে ? আসলে তোমার একাউন্ট নাম্বারটা হারিয়ে ফেলেছি। ফোনে ছিল তো ডিলিট হয়ে গেছে । তুমি আর একবার পাঠাও তো নাম্বারটা।"
   অতসীলতাদেবীর এবার আরো অবাক হয়ে ভাবতে সময় নেন,সেকি! অরিত্র রাগ না করে টাকা পাঠাবে বলছে। এতো ভালো করে কথা বলছে! কি হলো ছেলেটার! অরিত্র মাকে একটু চুপ করে আছে দেখে ভাবে ও বলে -"কি হলো মা?"
 মা বলেন-"তোর গলাটা এমন লাগছে কেন খোকা? ঠান্ডা লাগিয়েছিস ?শরীর খারাপ নাকি ?" অরিত্র তেমন কিছু নয় বলে আশ্বাস দিয়ে বলে - "হ‍্যাঁ, ঐ একটু ঠান্ডা লেগেছে। ঠিক হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা করো না।"
 অতসীলতা দেবী স্নেহের  সুরে বলতে থাকেন- "শোন বাবা,এর মধ্যে আর এক বিপদ হয়েছে। হাতের থেকে চশমাটা পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। এখন তো ভালো দেখতে পারছি না। তোকে তো ফোনটাও করতে পারছিলাম না। নাম্বার খুঁজে পেতে অসুবিধা হচ্ছিল।
না,না - তোকে টাকা দিতে হবে না চশমার জন্য । তুই যা দিস ওখান থেকে জমিয়ে দু'তিন মাস পরে আমি ঠিক বানিয়ে নেবো । আর পুতুল বানিয়ে তো কিছু টাকা পাবো। যদিও এখন লকডাউনে কাজ বন্ধ আছে। পরে দেবে বলেছে।"

অরিত্র অতসীদেবীর একমাত্র সন্তান। কলকাতায় থাকে । অনেক উঁচু পোস্টে চাকরি করে । মাকে মাসে মাসে টাকা দেয়। যদিও তাতে বৌমার খুব আপত্তি। দু'মাস হলো সেই টাকাও বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে ফোন করে অরিত্রকে। কিন্তু অরিত্র তো ফোন করলে বিরক্ত হয়। আজ তো বেশ ভালোই কথা বলছে। মনে মনে খুব খুশি হন অতসীদেবী। ছেলে অরিত্রর ওধার থেকে উত্তর আসে-  "মা তোমার একাউন্ট নাম্বারটা পাঠাও। আমি টাকা পাঠাচ্ছি। আর ব‍্যাংকের পুরো ঠিকানাটা দিও।"

আজ দুদিন হলো অরিত্র টাকা পাঠিয়েছে। অনেক টাকা । এতো টাকা তো লাগে না । কেন এতো দিলো ? ওদের অসুবিধা হবে তো ? আমার আর কতটুকু প্রয়োজন ? তাই নিয়ে ভাবনার কাহনে অস্থির। আবার ভগবানের দিকে হাত তুলে অফুরন্ত বিশ্বাসে অতসীলতা দেবীর গাল বেয়ে অশ্রু বাগ মানছে না। 
 সেদিন অরিত্র মায়ের ফোন ছেড়ে খুব কেঁদেছিল। হারিয়ে মায়ের গলা এতো হুবহু হয় কি করে। সেই কন্ঠ! তার মায়ের নামও তো অতসীলতা। সেই আদর! সেই মায়ের গলা! তার ভেতরের দলাপাকানো শুকনো কান্নায় এলো আবার জোয়ার! কারণ সেদিনও মায়ের মায়ের মৃত্যু দিন। ফোনটা ছেড়ে দিয়ে চুপ করে বসে থাকে অরিত্র রায়। এখন একটি রেস্টুরেন্টের মালিক সে । একদিন অনেক কষ্ট করেছে। মায়ের সামন‍্য জমানো টাকা দিয়ে শুরু করেছিল এই রেস্টুরেন্ট। আজ অনেক টাকার মালিক সে । সেই মা আজ আমার কাছে আজ আপনার হয়ে এলো।  আজ যেন সে তার মায়ের গলা শুনতে পেলো। একটু হলেও মাকে সেবা করার সুযোগ পেলো। ভাগ্যিস ওটা রং নাম্বার ছিল।
               ******

All rights are reserved by paramita.

৪টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...