বুধবার, ২৮ জুলাই, ২০২১

# নাম- লোকশিক্ষা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

সান্ধ্যকালীন আলোচনা-বাসর। 
  # বিষয় - *লোকশিক্ষার ভিত্তি কিপ্রকারে নির্ধারিত হয়! এর ভিত্তিই বা কি!*
   # নাম- *লোকশিক্ষা।*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

         শিক্ষা একটি নিরন্তর প্রসেস। এই শিক্ষার দুটি ধারা - ব্যবহারিক শিক্ষা ও পুঁথিগত শিক্ষা। 
 ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে মানুষ আগুনের আবিষ্কার, চাকার আবিষ্কার দিয়ে সভ্যতার জয়যাত্রা শুরু হল। কথাকে লিখিত রূপ দিতে এল লিপিমালা। তা থেকে লিখিত পুঁথিগত শিক্ষা এল। কত কথাই মানুষ বলে। তারই  নির্বাচিত কথাকে লিখিত হিসাবে গন্য করে লিখে রাখার মাধ্যমে পুঁথিগত শিক্ষার প্রচলন হল। 
   ব্যবহারিক জীবনের শিক্ষায় লোকসাধারণ শিক্ষিত যারা তারাই আবার যত্নসহকারে পুঁথিপাঠ করে শুনে শিক্ষা লাভ করতে থাকলেন। বেদ শুনে শুনে মনে রাখতে হত বলে বেদের আরেক নাম শ্রুতি। যিনি বেদ শিক্ষা দেন তিনি গুরু,যে শেখে সে হল শিষ্য। শিক্ষার কার্যক্রম চলে গুরু শিষ্যের জ্ঞান চর্চা থেকে। আর অন্যধারে লোকসাধারণ তাঁদের ব্যবহারিক জীবন থেকে অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান যা লাভ করেন তাই আরেক ধরনের লোকশিক্ষা। বুদ্ধদেব  সমগ্র ভারতবর্ষকে যে বৌদ্ধধর্ম শিখিয়েছিলেন লোকসাধারণ কি সকলেই পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন? তা তো নয়। তাহলে তাঁরা বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জানলেন,বুঝলেন কী করে?  সেই কূটতত্ত্বময়,নির্বাণবাদী,অহিংসাত্মা,দুর্বোধ্য ধর্মাচারণকে অনুসরণ করলেন কী করে? লোকসাধারণ অনুসরণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন গার্হস্থ্য,পারিবারিক জীবনের কথা নিয়ে বুদ্ধ শিক্ষা দিয়েছিলেন বলে। তাই লোকশিক্ষা তথা লোকসাধারণের মত করে শিক্ষা দান বুদ্ধদেব করেছিলেন। সেখানে লোকসাধারণ বলতে গৃহস্থ,ব্রাহ্মণ,পন্ডিত, মূর্খ,বিষয়ী,উদাসীন,শূদ্র সকলেই ছিলেন। আমাদের ঘরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তো নিরক্ষর অথচ লোকশিক্ষাই ছিল তাঁর অবতারত্বের ভিত্তি।  
   বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয়কে নস্যাৎ করে হিন্দুত্বের পুনঃরুজ্জীবিত করেছিলেন শঙ্করাচার্য। গুরুগিরির পথে কত আপামর লোকসাধারণ তো তাঁর পথে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের কথায়- "যে লাঙ্গল চষে,যে তুলা পেঁজে,যে কুটনা কাটে,যে ভাত পায় না সেও শিখত। কি শিখত - আত্ম অন্বেষণ,পরের জন্য জীবন,পাপ-পুণ্য আছে, পাপের দন্ড আছে, পুণ্যের পুরস্কার আছে,যে জন্ম আপনার জন্য নহে,পরের জন্য, যে অহিংস পরমধর্ম্ম,যে লোকহিত পরম কার্য...." তাই তো লোকশিক্ষার অন্যতম পাথেয়। শ্রীচৈতন্য লোকশিক্ষা দিয়ে গেলেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের। আমাদের কবিয়াল সমাজ ইংরেজদের সময় পুঁথিগত ইংরেজী শিক্ষার সমান্তরাল লোকশিক্ষা দানে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। 
       এই কবিগানের উদ্ভব কিন্তু হঠাৎ করে হয়নি। কবিগানের সূচনা কাল আঠারো শতকের মধ্যভাগে,আর বিকাশ উনিশ শতকজুড়ে। প্রায় দু'শ' বছর আবির্ভাব ও বিকাশ নিয়ে কবিগান বাংলার শহর থেকে মফঃসল পর্যন্ত আকাশ বাতাস মুখরিত করেছিল, ইতিহাস তাই বলে।
 এই দু'শ বছরের আবির্ভাব ও বিকাশের মধ্যে কবিগান কিন্তু আটকে নেই। অনেক আগে থেকেই এর প্রস্তুতি ছিল। 
ধর্মীয় বাতাবরণ ও পুরাণ শাস্ত্রালোচনার আড়ালেই ছিল তার এই প্রস্তুতি। 
  সে চর্যাগীতির সময় থেকে। কেননা আদিরসেও চর্যাপদ সমান পুষ্ট। বৌদ্ধধর্মের বিষয় নিয়ে বাঙালির ধর্মপথগামীর আচরণগত শিক্ষায় জোর তদবিরের মাঝে সাধারণ মানুষ কামনা বাসনা,অবৈধ সম্পর্কের আবেদন তলে তলে বেশ ভালই পোষন করত। যেমন দিনের বেলা কাক দেখে, যে ঘরের বউ ভয় পেত সেই কিন্তু অন্ধকার নামলে পা টিপে টিপে পরপুরুষের বাড়ি যেত('... রাতি ভইলে কামরু জাঅ')। চুরি ছিনতাই থেকে সকল প্রকার কৌম জীবনের কথা পাই চর্যার সমাজ ও বাস্তব জীবনে।
এর পরে আসি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নাটগীতির কথায়। নাট্যকাব্যটি কবি একেবারে লোকায়ত করে পরিবেশন করেছেন। মূলে আদিরস। এই নাটগীতির শ্রোতা,দর্শক একেবারে সাধারণ শ্রেণীর মানুষ। কবি বড়ুর শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও কাব্যের ক্ষেত্রে আদিরস যত আলগা করেছেন সাধারণ মানুষ তত এই নাটগীতি উপভোগ করেছেন। কবির এই নাট্যকাব্যটির পরীক্ষা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে। ভালোই সাফল্য কবি পেয়েছিলেন। এই নাট্যকাব্যে আবার ভক্তিরসও কেউ পেতে চাইলে বঞ্চিত হতেন না। 
    তবে পদাবলী সাহিত্য প্রেম-ভক্তি-দিব্যভাব, রামায়ণের বাঙালিয়ানায় করুন ও ভক্তিগীতি বা মহাভারতের যুদ্ধ যুদ্ধ কাহিনীর মধ্যে বীরত্বের বাঙালিয়ানায় আকর্ষণ থাকলেও সাধারণ মানুষ খুঁজেছে তার দৈনন্দিতার সহজ সুরের গান। আর তারই রসদ লাভে মঙ্গলকাব্যগুলির দিকে ভালই ঝোঁক থাকত। ওখানে আদিরসের সরবরাহ করার সুযোগ সুবিধা কবিগণ সহজেই নিতেন। 
পৌরাণিক দেবদেবীর পাশে লৌকিক দেবদেবী নিয়ে মঙ্গলকাব্যের জনপ্রিয়তা সে বলার অপেক্ষা রাখে না। কেন চন্ডীমঙ্গল কাব্যের নায়ক ব্যাধ পুত্র কালকেতু ও নায়িকা ব্যাধ কন্যা ফুল্লরাকে করার মূলে লোকায়ত জীবনের কাছে কবি তাঁর কাব্যের জনপ্রিয়তা খুঁজেছিলেন। ব্যাধ কালকেতুকে অধিপতিও করলেন। আসলে লোকায়ত জীবন,লোকমুখের ভাষা সবসময় সাহিত্যের নতুন নতুন পথ রচনা করে এসেছে।
     আর রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র মঙ্গলকাব্যের লৌকিক ধারার ও আদিরসের শেষ কবি। তিনিও ছিলেন দ্ব্যর্থবোধক ভাব সৃষ্টির অসাধারণ প্রতিভাবান কবি। তাঁর এই ভাবধারা কবিগানে পরিপূর্ণ প্রভাব পড়ল। 
  সাধারণ মানুষ কাব্যের পালাগান শুনতে শুনতে কেউ কেউ পালা রচনায় পারদর্শিতা অর্জন করলেন। যত লঘু বিনোদন ততই তার দর,কারণ সাধারণ মানুষের কাব্য চর্চায় তারাও কম নন বলে স্বতঃপ্রমাণিত হলো। পান্ডিত্য অপেক্ষা লোকায়ত কথা তাদের মধ্যে প্রিয় আস্বাদন হয়ে উঠল। 
  সর্বোপরি সংস্কৃত, আরবি,ফারসি ভাষার প্রভাবকে পেছনে ফেলতে ইংরেজি ভাষা উঠে পড়ে লেগেছে। পাশ্চাত্য শিক্ষার ঢেউ লেগে গেছে। মাতৃভাষায় গদ্যচালও পুরোদমে হাজির, কিন্তু সাহেবি ইংরেজি তার উপর চড়াও - কলকাত্তাই ককনির বেশ ভালই দর। এই আবহের মাঝে এই পাঁচালী ও কবিগান চটুল আদিরসাত্মক হয়ে সাধারণ মানুষের মনের খোরাক জোগানোয় একদম সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠল। কবিগানে দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় ভক্তির কথা জানতে চাইলে পাওয়া যেত,আবার আদি রস উপভোগ করতে চাইলে বিমুখ হতে হত না। আর লোকসাধারণ মানুষের মধ্য থেকে যখন এক একজন কবিওয়ালা উঠে আসছেন, তাই নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজনার ঢেউ ছিল প্রবল। আগ্রহ তুঙ্গে। সেই ঢেউয়ের রেস এতো তীব্র ছিল যে দেড়শ' পেরিয়ে প্রায় দু'শ ছুঁয়ে গিয়েছিল,ঐ আরকি যেমন দৌড়বীর প্রান্ত ছুঁয়েও আরো কিছুটা দৌড়ে নিজেকে ঠিক করে নেন,এও ঠিক সেই রকম।
সুতরাং পাঁচালি,কবিগান - পাঁচালিকার ও কবিওয়ালা এক বিশেষ যুগচেতনার চাহিদা পূরণের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল। 
        ঊনবিংশ শতাব্দীর মাটি লোকোসাধারণের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাঁচালি ও কবিগানে ছিল এক অনন্য প্রস্তুতি। সেই হিসেবে এই লোকসংস্কৃতি আজ যতই লুপ্তপ্রায় বলি না কেন, এই ধারায় আমরা আমাদের ঐতিহ্যের স্বাদ বহন করে আত্মবিমোহিত হই।
     লোকশিক্ষা এক আর ইংরেজদের প্রবর্তিত প্রশাসনিক শিক্ষা পুঁথিপাঠ, সরকারী কাজের জন্য কতকগুলি পাশ লোকশিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। মাতৃভাষার সঙ্গে ইংরেজী ভাষা,বিজ্ঞান শিক্ষা জ্ঞানের সাম্রাজ্য চষে বেড়ানো। একজন এম এস সি (ম্যাথ.ও ফিজিক্স)পাশ বেকার যুবককে যদি আলুদোকান দিয়ে পেট চালাতে হয়,তাতে ক্যালকুলাস (ইন্ট্রিগাল ও ডিফারেনসিয়াল), আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব বা নিউটনের গতিসূত্রের জ্ঞান ডাস্টবিনে পড়ে থাকবে। সাধারণ যোগবিয়োগ ও লাভ লোকসানের হিসেব লোকশিক্ষা তার প্রধান সহায়ক হয় তখন। ব্যবহারিক শিক্ষা ও লোকশিক্ষা একাকার। যে লোকশিক্ষা -  লোকসাধারণের  ব্যবহারিক জীবনের যথাযথ মূল্যই হল লোকশিক্ষা। 
            *****
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...