আক্ষরিক অর্থে ফ্যাশনের বাংলা হল হালফিলের রীতি- রেওয়াজ, প্রচলিত ধারা, আদবকায়দা, সাজপোশাকীয় কেতা ইত্যাদি। ফ্যাশন যেমন প্রয়োজন তেমনই অতিরিক্ত ফ্যাশনের কারণে অনেক প্রাণ হারিয়ে যায় অন্ধকার পথের বাঁকে।
************************
অভিষেক ফার্স্ট ইয়ার কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্টুডেন্ট। প্রচুর টাকা খরচ করে ম্যানেজমেন্ট কোটায় ভর্তি হয়েছে কলকাতার টপ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। ধনী বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ার দরুণ প্রাচুর্যের মধ্যে মানুষ। কেতার লালিত্য ঝরে পড়ছে অভিষেকের শরীরে, ওর ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিসে। ওকে দেখে ক্লাসের অনেক ছেলেই ঈর্ষান্বিত। অনেকেই ওর সাথে বন্ধুত্ব করে ওর মতো হতে চায়।
মেধার ভিত্তিতে চান্স পাওয়া অনীক অভিষেককে একটুও পছন্দ করেনা। ছেলেমেয়েরা ওকে নিয়ে অকারণ হ্যাংলামি করলে অনীকের গা জ্বলে। এভাবেই কেটে যায় দিনগুলো।
অনীকের পছন্দ সায়নীকে। কি অপূর্ব রূপ মেয়েটার। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সায়নীর মুখটা ভেসে ওঠে অনীকের সাদা খাতার পাতায়। কিন্তু, ও যে অভিষেকের থেকে চোখ ঘোরাতেই নারাজ। অনীকের দিকে ও তো একটিবারের জন্যও ফিরে তাকায় না। অভিষেকে নিমজ্জিত হয়ে আছে। অনীক ঠিক করলো সাহস করে ওকে নিজের মনের কথাটা বলবে। টিফিন ব্রেকে সায়নী যখন ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছে, অনীক ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সায়নী অবাক হয়ে বললো, "কি ব্যাপার? কিছু বলবি?"
অনীক: রাখ ঢাক করে কথা আমার আসেনা, তাই সরাসরি বলছি শোন, আমি তোকে পছন্দ করি, ভালোবেসে ফেলেছি তোকে।
সায়নী: হোয়াট! হ্যাভ ইউ গন ক্রেজি? নিজের দিকে একবার আয়নায় দেখ। তেলতেলে চুল, ঝোলা ব্যাগ, না আছে গ্ল্যামার, না আছে ফ্যাশনের সেন্স। তুই আর আমি! জাস্ট গো টু হেল, আদারওয়াইজ তোর নামে কমপ্লেন করবো প্রিন্সিপালের কাছে।
কথাগুলো বলে গটগট করে চলে গেল সায়নী।
অনীকের সোজা মনে গিয়ে ধাক্কা মারলো ওর কথাগুলো। সত্যিই তো, বাকি ছেলেদের তুলনায় কি বেমানান ও এই কলেজে, কি বিশ্রী ড্রেসিং সেন্স ওর, ফ্যাশনের বিন্দুবিসর্গ ওর জানা নেই। এই নিয়ে কোনো মেয়ে দেখবে ওর দিকে ফিরে! পড়াশুনো জলাঞ্জলি দিয়ে শুরু হল অনীকের কেতচর্চা।
জিম, ডায়েট থেকে শুরু করে চুলের তেল বদলে এলো হেয়ার জেল, ফর্মাল প্যান্টের জায়গা নিলো হাল ফ্যাশনের কার্গো, জিন্স। ফর্মাল শার্টের জায়গায় গায়ে উঠলো স্কিন ফিট টি-শার্ট, ট্রান্সপারেন্ট পার্টিওয়্যার শার্ট।
ছাপোষা বাবা-মায়ের পক্ষে নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। নিত্যদিন শুরু হল অশান্তি। শেষে অনীকের বাবা সাফ জানিয়ে দিলেন যে, পড়াশুনোর খরচ চালিয়ে তার ওপরে এসব এক্সট্রা খরচ করা ওনার পক্ষে অসম্ভব। রেগে উঠলো অনীক। সমাজের চোখে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য চাই টাকা। অনেক টাকা।
একদিন বিকেলে হতাশ হয়ে বসে আছে কলেজের পাশের ফাঁকা মাঠটায়। একটা বেশ হ্যান্ডসাম চেহারার ছেলে ওর পাশে এসে বসলো, "কি ব্রাদার, আপসেট মনে হচ্ছে।"
অনীক: তোমাকে ঠিক চিনলাম না ভাই!
ছেলেটা: কি প্রবলেম তোমার! গার্লফ্রেন্ড ছেড়ে গেছে নাকি বাড়িতে অশান্তি! নাকি অন্য কিছু!
অনীক চাইছিল কারোর সাথে নিজের মনের ভাবগুলো শেয়ার করতে। অনেকসময় আমরা চেনা মানুষের থেকে অচেনা মানুষের কাছে মন খুলে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ছেলেটা জিজ্ঞাসা করাতে অনীক সমস্ত কথা ওকে খুলে বললো।
সব শুনে ছেলেটা বললো, "বেসিকালি টাকার প্রবলেম তাইতো! ডোন্ট ওয়ারি। আমাকে যদি বিশ্বাস করতে পারো তবে, আমার সাথে চলো একটা জায়গায়। টাকার প্রবলেম আর থাকবে না।"
অনীকের তখন খড়কুটো আঁকড়ে ধরার অবস্থা। ছেলেটা ওকে নিয়ে গেল একটা বার কাম হোটেলে। সেখানে ওর চেনা একজন মহিলার সাথে ফিসফিস করে কিছু বললো। মধ্যবয়স্ক সেই মহিলা আপাদমস্তক দেখলো অনীকের দিকে। তারপরে "ডান" বলে চলে গেল।
ছেলেটা: একটা পার্সোনাল কোয়েশ্চেন করছি, তুমি কখনো কারোর সাথে দৈহিকভাবে মিলিত হয়েছ?
অনীক: না, কোনোদিন না।
ছেলেটা: আজকে হবে প্রথমবার, আর মজার কথা হল তার জন্য পাবে নগদ পাঁচ হাজার টাকা। শুধু আজকেই নয়, যতবার কাজ করবে, ততবার পাবে। এটাকে নিজের পার্ট টাইম প্রফেশনে হিসেবে বেছে নাও। জীবনে টাকার অভাবে ভুগতে হবে না।
অনীক চমকে উঠল। কাজটা করতে ওর মন ওকে সায় না দিলেও টাকার অঙ্কটা শুনে কচি বয়সে লোভে পড়ে গেল ও।
অর্থের লোভের কাছে পরাজয় স্বীকার করলো মেধাবী অনীক। নিজেকে বিলিয়ে দিতে রইলো দিনের পর দিন এক বিছানা থেকে আরেক বিছানায়। গ্ল্যামার, ফিজিক, লুক সব পারফেক্ট এখন অনীকের। শুধু পারফেক্ট রইলনা যা ছিল ওর অমূল্য সম্পদ, ওর চরিত্র।
কত তারা হারিয়ে যায় কৃত্রিম রোশনাইয়ের মাঝে,
কত কলি ঝরে যায় বিলাসিতার সাজে,
কত তারা নিভে যায় অত্যাকর্ষণ তরে,
ফ্যাশনের দুনিয়ায় সকল নক্ষত্রই ঝরে পড়ে।
Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

খুব সুন্দর লাগল। অসাধারণ! 👌👌❤❤⚘🖋
উত্তরমুছুন