শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

# নাম- সুদেষ্ণা ।✍ - শুভব্রত ভট্টাচার্য।

শুভ জন্মদিন সুদেষ্ণাদি। আপনি ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন করুণাময় আপনার মঙ্গল করুন। 

আপনার জন্মদিনে আমি পুরাণ এবং ইতিহাসের তিন বিখ্যাত সুদেষ্ণার আখ্যান লিখলাম। 

মহাভারতের প্রথম সুদেষ্ণা-

 আমাদের বঙ্গ দেশের উৎপত্তির সঙ্গে সুদেষ্ণা নামটি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে । আরণ্যক ব্রাহ্মনে বঙ্গ নামের জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায় ।
মহাভারত থেকে জানা যায় যে, দৈত্য রাজ প্রহ্লাদ পুত্র বলি রাজের স্ত্রী সুদেষ্ণা হতে অঙ্গ,বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুক্ষ ও পুণ্ড্র নামে পাঁচ পুত্রের জন্ম হয় । এরা সকলেই নিজের নামানুসারে নামীয় প্রদেশের রাজা হন । বঙ্গের নামানুসারে এর শাসিত রাজ্য বঙ্গ নামে অভিহিত হয় ।

মহাভারতের দ্বিতীয় সুদেষ্ণা-

মহাভারতের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা মৎসদেশের রাজা বিরাটের পত্নী তথা অভিমন্যুর পত্নী উত্তরার মাতা সুদেষ্ণার কথা তো আমরা সবাই জানি৷ রাজকুমার উত্তর, শ্বেত, এবং শঙ্খ নামে তিন পুত্র ও রাজকুমারী উত্তরা ছিল তাঁর চার সন্তান। কেকয়ের রাজা কেকয়া ও রাণী মালভীর কন্যা ছিলেন তিনি। 

ভাষাশহীদ সুদেষ্ণা-

পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দু’টি ভাষার জন্যই জনগণকে লড়াই করতে হয়েছে, বুকের রক্ত ঝরাতে হয়েছে – ভাষা দু‘টি হলো বাংলা এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার আন্দোলন পুরোপুরিভাবে জাতিগত অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত ছিল। বাংলার মতোই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদেরকে তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামে অনেক রক্ত ও প্রাণ ঝরেছে এবং সে সংগ্রাম ছিল বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেয়েও দীর্ঘতর। মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চরম পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে আত্মাহুতি দিয়েছিল সুদেষ্ণা সিংহ নামের এই বিদ্রোহী তরুণী।পৃথিবীর ইতিহাসে এ যাবত দু’জন নারী ভাষার লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছেন। কমলা ভট্টাচার্য আসামের বাংলাভাষা আন্দোলনে শহীদ হন এবং সুদেষ্ণা সিংহ শহীদ হয়েছেন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আন্দোলনের জন্য। এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন সুদেষ্ণা; পরিবারের সহায়-সম্বলহীন সামর্থ্যকেই চিরসঙ্গী করে নিয়ে তাঁর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। ১৯৯৬ সাল। একদিন আসামের ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী’ অধ্যুষিত এলাকায় ডাক আসে ‘ইমার ঠার' আন্দোলনের। বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় ইমার ঠারের অর্থ 'মায়ের ভাষা'। দলে দলে বিষ্ণুপ্রিয়াভাষী মানুষ জড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলনে। নিজ ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় রেল অবরোধ কর্মসূচীতে অংশ নিতে অন্য সবার মতো সুদেষ্ণাও মার্চের (বাংলা চৈত্র মাস) এক কাঠফাটা দিনে বিদায় নেন মায়ের কাছ থেকে। সেই বিদায়ের দিনটিই হলো সুদেষ্ণার চিরবিদায়ের দিন! ১৬ মার্চ ১৯৯৬ সাল দিনটি ছিল শনিবার, বাংলা ১৪০২ সনের ২রা চৈত্র। লোঙাই ঘাটের দক্ষিণ পাড়ে কচুবাড়ি গ্রাম। দলে দলে জয়োধ্বনি করতে করতে কচুবাড়িবাসীরা ‘ইমার ঠার’-এর আন্দোলনে যোগ দিতে লাগল। সুদেষ্ণাও ছিল কচুবাড়ি গ্রামের। সে ঘর থেকে বের হবার সময় মায়ের কাছে কিছু টাকার আবদার করেছিলো। কিন্তু দুঃখিনী মায়ের কাছে ছিল না কানাকড়িও।

সুদেষ্ণার সাথে ছিল তাঁর বান্ধবী প্রমোদিনী, বিলবাড়ি গ্রামের এক তরুণী। সুদেষ্ণা অবশেষে প্রমোদিনীর কাছেই দুটি টাকা ভিক্ষা চেয়ে নেয়। সকৌতুকে প্রমোদিনী তার বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করে, “কিসের জন্য এ দুটো টাকা? কলকলি ঘাটের এ পথে তো কোনো দোকানপাটও নেই!” সুদেষ্ণা নীরব। প্রমোদিনী দুটো টাকা বেঁধে দেয় সুদেষ্ণার আঁচলে। মিষ্টি হাসিতে সুদেষ্ণা তখন বলেছিল, “এ দুটো টাকা খেয়াপারের জন্য” (মৃত্যুর পর খেয়া পারাপারের মাধ্যমে অন্য জগতে পদার্পণ করতে হয় বলে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মণিপুরীদের বিশ্বাস)।

প্রাণপ্রিয় বান্ধবী প্রমোদিনীর কাছে সুদেষ্ণার দ্বিধাহীন শেষ কণ্ঠবাণী,

"মোর রকতলো অইলেউ মি আজি ইমার ঠারহান আনতৌগাগো চেইস" (দেখিস, আমার রক্ত দিয়ে হলেও আজকে আমি আমার মাতৃভাষাকে কেড়ে আনবো)।

সেদিন পুলিশের গুলিতে আহত হন শতাধিক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী। ঘটনাস্থলেই মারা যান বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বিপ্লবী নারী সুদেষ্ণা সিংহ। 

বিষ্ণুপ্রিয়ারা শহীদ সুদেষ্ণাকে সম্মান জানিয়ে বলে ‘ইমা সুদেষ্ণা’; ‘ইমা’ শব্দের অর্থ মা। নিজেদের ভাষাকেও তারা ‘ইমার ঠার’ অর্থাৎ 'মায়ের ভাষা' বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।  সুদেষ্ণাকেই আদিবাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভাষাশহীদ গণ্য করা হয়। 
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আসাম ও ত্রিপুরাজুড়ে গণআন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এসবের জেরে পরবর্তীতে সকল দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় আসাম সরকার। ২০০১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি আসামে বরাক উপত্যকার প্রায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (১৫২টি) বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় পাঠপঠনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ছয় বছর পর সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক স্বতন্ত্র মণিপুরী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা।
সুদেষ্ণা সিংহ নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে একটি ভাষাকে তার মৃত্যুদশা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। 

“ইমার ঠার পুঞ্চি পালক” (মাতৃভাষা অমর হোক)
রাষ্ট্রের বন্দুকের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে সুদেষ্ণা সিংহ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তাঁর মাতৃভাষার সম্মান।

১০টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।🙏

    উত্তরমুছুন
  2. এতো তথ্য বহুল লেখা পড়ে আমি অভিভূত। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

    উত্তরমুছুন
  3. অসাধারণ 🙏🙏🙏 সমৃদ্ধ হলাম

    উত্তরমুছুন
  4. অসাধারণ👏✊👍👏✊👍👏✊👍👏✊👍👏✊👍

    উত্তরমুছুন
  5. সুদেষ্ণার জন্মদিনে আমাদের সবার জন্য সুন্দর উপহার।
    অনেক জানলাম ও সমৃদ্ধ হলাম।🙏

    উত্তরমুছুন
  6. অসাধারন ... তথ্যসমৃদ্ধ একটা লেখনী এত সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে যে সুদেষ্ণার জন্মদিনের উপহার হিসেবে এর থেকে ভালো আর কী ই বা হতে পারে...

    উত্তরমুছুন
  7. জন্মদিনের সেরা উপহার।নিজেকে সব মানুষই ভালবাসেন।কিন্তু আজ আপনার কলমে নিজের নামটিকে এই আলোকে পেয়ে আরও বেশি করে ভালবাসতে শিখলাম।অসম্ভব ভাল তথ্যবহুল লেখা।ভাল থাকবেন।

    উত্তরমুছুন
  8. সত্যিই... জন্মদিনের সেরা উপহার একটা...নিজের নামের পিছনে যে পৌরাণিক গাথা আছে সেটাকে কেউ যখন একটা সুন্দর লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরে তার থেকে ভালো কিছু হয় না... লেখককে অনুরোধ যদি "অদিতি" নামের পিছনে কি পৌরাণিক গাথা আছে যেয়ে নিয়ে যদি কখনো লেখেন খুব ভালো হয়. আমি তো শুধু জানি যে দক্ষ প্রজাপতির কন্যা আর কশ্যপ মুনির স্ত্রী.... এই লেখাটা আমাকে তো কৌতুহলী করে তুলেছে....
    আমার এত ভালো লেগেছে যে কি বলবো...👌👌

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...