আলটুসি ক্যান্টিন
©সুদেষ্ণা দত্ত
“কে হারায়…..ইশারায়
সাড়া দাও ফেলে আসা গান
রূপকথারা রা রা রা রা
চুপকথারা রা রা রা রা
ফুরফুরে এক রোদের জন্মদিন….।“(অপরাজিতা তুমি)
ক্যান্টিনে ঢুকেই গানটা কানে এল কিঞ্জলের।মেয়েটার গলায় এক অদ্ভুত মাদকতা আছে।গিটার বাজিয়ে গাইছে কিঞ্জলের প্রিয় গানটা।কিন্তু কেন জানে না কিঞ্জল শ্রেয়াকে দেখলেই ওর মাথা গরম হয়ে যায়।কিঞ্জল মাইক্রোবায়োলজির ফোর্থ সেমের ছাত্র। মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে পড়লে গবেষণা ছাড়া অন্য সুযোগ কম শুনে সিরিয়াস ছাত্র কিঞ্জলের এমনিতেই মন মেঘ—পাহাড়ের কুয়াশায় ঢাকা থাকে বেশিরভাগ সময়।আর মেয়েটাকে দেখ!ঝ্যাং—ঝ্যাং করে ফুরফুরে রোদ রোদ করে চেঁচিয়ে যাচ্ছে কানের গোড়ায়।শ্রেয়াও ফোর্থ সেমের বাংলা বিভাগের ছাত্রী।কিঞ্জল ভাবে সবেতেই আছে এই মেয়ে,গান—কবিতা লেখা—লিটিল ম্যাগ—শুধু লেখা পড়াটা বাদ দিয়ে।
ইতিমধ্যে কিঞ্জলের বন্ধু কুন্তল ঢোকে ক্যান্টিনে।ওরা দেখে শ্রেয়াকে ঘিরে ওর ভাতের মাড় গুলো আঠার মত চিটে আছে।শ্রেয়ার মুখে সর্বদাই খই ফোটে।ওর এই বহির্মুখী স্বভাব যা কিঞ্জলের অপছন্দ,তাই-- সবাইকে চুম্বক আকর্ষণে ওর দিকে ধরে রাখে। কলেজের অধ্যাপক—অধ্যাপিকাদেরও প্রিয় পাত্রী শ্রেয়া।দুই বন্ধুতে দুটো এগরোল খেয়ে হাঁটা লাগায় ক্যাম্পাসের উত্তর দিকের পুকুর পাড়ে তাদের ডিপার্টমেন্টের দিকে।কৃষ্ণচূড়া বিছানো সীমন্তিনী পথটা বড় প্রিয় কিঞ্জলের।
এক শীতসকালে কিঞ্জল দেখেছিল কলেজের প্রাক্তন কর্মী,যিনি কলেজেই থাকেন—অতি বৃদ্ধা হীরা পিসিকে একগুচ্ছ শীত পোশাক দিতে,কোন দিন দেখে কুকুরকে খেতে দিচ্ছে,কোন দিন কলেজের বাইরের চায়ের দোকানের বাচ্চাটার চুল ঘাঁটতে দেখে শ্রেয়াকে।এরপর ধীরে ধীরে শ্রেয়াকে দেখলে কিঞ্জলের মনও ঝলমলে রোদে ভরে উঠত।যদিও প্রকাশ করত না।
এরকম একদিন কলেজ গেটে ঢোকার সময় আলটুসি ক্যান্টিন গান গাওয়া রত শ্রেয়ার সাথে ধাক্কা খায় কিঞ্জল।মাথায় জোর লেগেছে।শ্রেয়া হাসতে হাসতে বলে ওঠে,”
কি রে রামগরুরের ছানা খুব লেগেছে বুঝি!!
বাড়িয়ে দাও তোমার হাত,আমিও যে শুধু তোমাকেই খুঁজি”—
বলে গেয়ে ওঠে।অনেক ছেলে—মেয়ে যাওয়া—আসা করছে।শ্রেয়াকে যারা চেনে তারা হাস্যবিনিময় করে চলে যাচ্ছে।ভীষণ অস্বস্তিতে পরে লাজুক কিঞ্জল।আলটুসি ক্যান্টিন গাইতে গাইতে শ্রেয়াও মিলিয়ে যায় স্টেজের দিকে।এই গানটা সব সময় ওর ঠোঁটে লেগে থাকে।
বয়েজকাট চুল,ধারালো মুখ,চোখে গাঢ় কাজল—মুখের অন্য কোথাও নাম মাত্র প্রসাধনের চিহ্ন নেই।মেয়েলি ন্যাকামোহীন ঝরঝরে মেয়েটিকে কখন মনের ক্যান্টিনে জায়গা দিয়ে ফেলে কিঞ্জল!এখন ওরা খুব ভাল বন্ধু।একদিন কিঞ্জল শ্রেয়াকে বলে, কি রে সব মেয়ে লিপস্টিক লাগায়,তুই এত কথা বলিস,তাই উঠে যাওয়ার ভয়ে লিপস্টিক লাগাস না।এই কথায় সম্মতি জানিয়ে হেসে ওঠে শ্রেয়াও।
বহমানতার ধারা বজায় রেখে জীবন এগিয়ে চলে নিজের গন্তব্যে। কিঞ্জল—শ্রেয়া এখন স্বামী—স্ত্রী।কিঞ্জলের একটি ল্যাব আছে।শ্রেয়া ওর স্বভাবগুণে একটি এন.জি.ও র সাথে যুক্ত।কিন্তু এডভেঞ্চারপ্রিয়তা ছাড়তে পারেনি।ওর জেদেই লোন নিয়ে একটা লাল টুকটুকে ইওন গাড়ী কিনেছিল কিঞ্জল।মাঝে মাঝেই পক্ষীরাজে করে রাজা—রানী পাড়ি দিত রূপকথার জগতে।
এক কুয়াশা জড়ানো শীত সকালে ওরা যাচ্ছিল লাচেন।জি.টি রোডে একটি পিচ বোঝাই গাড়ী নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা মারে ওদের গাড়ীতে।হৃদয় বিদারক শব্দে জ্ঞান হারায় কিঞ্জল।
সেই ঘটনার পর নিজেকে সম্পূর্ণ খোলসে পুরে নেয় শ্রেয়া।আজ বছর দুই পর শ্রেয়াকে জোর করে দার্জিলিং নিয়ে এসেছে কিঞ্জল।গ্ল্যানারিজ থেকে কিছু খাবার নিয়ে ওদের পাইন ভিউ রিসর্টের ঘরে ঢোকার মুখে শুনতে পায় শ্রেয়ার গলায়-- "মনপাহারা রা রা রা রা
বন্ধুরা রা রা রা রা
আজ খোলা আলটুসি ক্যান্টিন...”
চমকে ওঠে কিঞ্জল তবে কি শ্রেয়া....!ঘরে ঢুকে দেখে ফুলশয্যার রাত্রে কিঞ্জলের রেকর্ড করা শ্রেয়ার গানটা বাজছে ব্লুটুথ স্পীকারে।পাহাড়ের গভীরতার কাছে এসে এতদিন জমা শ্রেয়ার নির্বাক কথার পাহাড় ঝর্ণায় মিশে কিঞ্জলের তিস্তার মত বুকের গভীরতায় হারিয়ে যায়।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার—টিম ‘অপরাজিতা তুমি’
ছবি সৌজন্য--গুগুল
©Copyrights reserved for Sudeshna Dutta

দারুণ!দারুণ! 👍👍👌👌💥💥💫💫💯💯💅💅💅
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দাদা।
মুছুনঅপূর্ব মন ছোঁয়া এক গল্প পড়লাম। ভাতের মাড় ছাড়া শ্রেয়াদের চিন্তা করা যায়?
উত্তরমুছুনহা হা।তা ঠিক বন্ধু।
উত্তরমুছুনCollege canteen will remain cardiac canteen for ever. So many stories, memories, dreams
উত্তরমুছুনand happenings are related with college canteen.
Pls share with us
উত্তরমুছুনAmi piyasha panja.
উত্তরমুছুনMon chuye jaoa ak asadharon golpo.
এরকম পাঠক পেলে ধন্য হব।
মুছুনদারুন.. দারুন.... 👌👌 অদিতি.....
উত্তরমুছুননিজেদের কলেজ জীবনের ফেলে আসা দিন মনে পড়ে গেল।
মুছুনদারুন,দারুন লাগলো👍👍👍
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দাদা।
উত্তরমুছুনদারুণ ।
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ তোমাকে।
মুছুনখুব ভালো, ভালো মানে পুরোনো স্মৃতির গোড়ায় বেশ অনেক দিন পরে জল পড়লো। তবে শেষটায় মন খারাপ হয়ে গেল খুব , মেঘ করে এলো, আলটুসি ক্যান্টিন নিমেষে একলা আকাশ হয়ে গেল, তাই শেষের অঙ্ক টা মিললোনা, ভাগশেষ রয়ে গেল।
উত্তরমুছুনজীবনের সব অঙ্ক কি মেলে!কখনও কখনও ভাগশেষ সঙ্গে নিয়েই চলতে হয়।
মুছুনদারুণ স্মৃতিস্মৃতচারণ👋👋👋👋
উত্তরমুছুনমিষ্টি প্রেমের গল্প। পাহাড়ের ভালোবাসায় একদিন শ্রেয়াও গেয়ে উঠবে।❤😍
উত্তরমুছুনধন্যবাদ তোমায়।
মুছুনখুব সুন্দর গল্প 👌👌💐💐💐😊😊😊
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনঅনেক ভালো লাগলো
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
উত্তরমুছুনতোমার লেখার মাঝে twist টা দারুণ। দেবলীনা
উত্তরমুছুন