শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

মন পলাশের পদাবলী(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


মন পলাশের পদাবলী

©সুদেষ্ণা দত্ত

        পলাশ ভট্টাচার্য একজন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী।বর্তমানে মেয়ে মহুয়ার সঙ্গে মুম্বাইয়ের বাসিন্দা।তাঁর আদি বাড়ী ছিল চট্টগ্রামের কালুরঘাট। মেয়ে মহুয়া ও জামাই বিভাস দুজনেই আই.সি.আই.সি.আই. ব্যাঙ্কে কর্মরত।আর আছে তিন বছরের নাতি সাগ্নিক ও সর্বক্ষণের একটি কাজের মেয়ে মিনতি।স্ত্রী মহুল অনেক কাল আগেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অন্যপারে বাসা বেধেছেন।মুম্বাইয়ের জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারিতে প্রায়ই পলাশ বাবুর ছবির সোলো প্রদর্শনী হয়।কিন্তু পলাশবাবুর ছবিতে আগুন রঙা পলাশের উজ্বলতা থাকে না বললেই চলে।তার অধিকাংশই থাকে যুদ্ধের ছবি,মানুষের পদদলিত হওয়ার ছবি,পুঁটলি নিয়ে চোখের জলে নিঃসঙ্গ মায়ের ছবি,রক্তাক্ত শিশুর ছবি।মানুষ নিজের জীবনে হতাশা দেখতে না চাইলেও,শিল্পবোদ্ধা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হতাশা,দারিদ্র্যের ছবি,চলচিত্র বেশ উপভোগ করে।তাই মুম্বাইয়ের বহুতল বিলাসবহুল স্যান্ডেলিয়ার শোভিত ফ্ল্যাটে স্পটলাইটের ঝলকানি থাকে পলাশ বাবুর ছবির উপর।বহুমূল্যে বিক্রি হয় সেসব ছবি।তবে পলাশ বাবু নিজে স্পটলাইটের ঝলকানি থেকে চিরকাল দূরে থাকতেই পছন্দ করেন।শিল্পচর্চা আর নিজের সঙ্গে কথা বলেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন তিনি।তাছাড়া মেয়েই বা নাতিকে দেখাশোনার জন্য বিনা বেতনের এমন বিশ্বস্ত চাকর কোথায় পেত!যতই থাক স্ব-বেতনের কাজের লোক!তাই তো তাঁর মুম্বাইয়ে আসা।তাদের তো কথা বলারও ফুরসৎ মেলে না।

          আজ আনন্দী বলে একটি মেয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নেবে।আগেই বলেছি,তিনি এসব বিষয় এড়িয়ে চলেন।কিন্তু মেয়েটির জোরাজুরিতে আর তাকে উপেক্ষা করতে পারেন নি।তবে মেয়েটি তার অফিসে সাক্ষাৎকারের বন্দোবস্ত করেছে,এটা ঠিক মনঃপুত হয়নি পলাশ বাবুর।অবশ্য একজন বহিরাগতকে বাড়ীতে ঢোকালে তাঁর মত পরিযায়ীর অবস্থাও খুব সহজেই অনুমেয়।সেই কারণেই আরও রাজি হয়েছেন।

            আনন্দীর ঘরে ঢুকে দেখেন উজ্জ্বল হলুদ বাংলাদেশি ঢাকাই শাড়ী পরিহিতা বছর আঠাশের এক প্রজাপতি যেন।তবে মেয়েটির ঘরের ইন্টিরিওরটা পলাশ বাবুর তেমন পছন্দ হয়নি।কেমন জানি অদ্ভুতুড়ে ছবি টাঙানো,নীল রঙের পর্দা,লালচে আলো।যাইহোক মেয়েটির আন্তরিক ব্যবহারে জমে ওঠে গল্প,যাকে আর সাক্ষাৎকার বলা যায় না।মেয়েটির শাড়ী যে তার মনে বহু বছরের জমে থাকা কথায় বোনা আঁচলকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

             তিনি আনন্দীকে বলতে থাকেন,১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তি যুদ্ধ শুরু হয়—পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম-পাকিস্তানের,যার মাধ্যমে বাংলাদেশ  মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে--তখন তিনি বছর ১০-এর এক বালক।তাঁর বাবা ডাক্তার অরবিন্দ ভট্টাচার্য মুক্তিবাহিনীর ডাক্তার ছিলেন।কি ভয়ানক সে যুদ্ধ!চারদিকে ধ্বনিত হত সন্তানহারা মায়ের হৃদয়বিদারক কান্না,বিধবা নারীর গুমরে মরা,ধর্ষিতা নারীর যুদ্ধ-সন্তানের প্রথম চিৎকার।রক্তে রাঙা হয়ে  ওঠে তাঁর দেশের মাটি।তারপর একদিন তাঁদের জীবনেও ঘনিয়ে আসে কালবৈশাখীর কালো মেঘ।আল-বদর ও আল-শামস পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্দেশে প্রায় ৩০০ বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে—সেদিনই পিতৃহারা হয় দশ বছরের বালক।তাঁর বিধবা মা সন্ধ্যা মনকে মুষলধারায় সিক্ত করে কান্নাকে সরিয়ে রেখে পলাশকে বুকে আঁকড়ে জন্তু—জানোয়ারের গাদার মত ভারতে পালিয়ে আসেন।যাঁর জীবনে সন্ধ্যা আসার আগেই নামে রাত্রির ঘন আঁধার।ভাসতে ভাসতে এসে প্রথমে পৌঁছান বাঁশবেড়িয়ার পুনর্বাসন কেন্দ্রে।সেখান থেকে  কলকাতার  বিজয়গর এলাকার কলোনিতে ঠাঁই হয়।একটু থেমে আবারও বলতে থাকেন,মায়ে—পোয়ে মিলে তৈরী করলাম গরাণের খুঁটি,হোগলা পাতার চাটাই দিয়ে বেড়া আর ছাউনির ঘর।মেঝে ছিল মাটির।সম্পন্ন অবস্থা থেকে ভাগ্যের ফেরে কোথায় এসে পড়লাম!ছলছল করে ওঠে প্রৌঢ়ের চোখ দুটো।সারা জীবন ধরে ভাঙা নৌকার হাল ধরে শুধুই ভেসে চলা।

            পলাশ বাবুর মা প্রায়ই বলতেন,”অহনও রাত্রে স্বপ্ন দ্যাহি দ্যাশের বাড়ীর।দ্যাশের চার বিঘা জমিতে চাইরটা ঘর,চাইর পাড় বান্ধানো দুইটা পুকুর ছিল।কারও বিয়া-শাদি হইলে সেই পুকুর থিক্যা মাছ নিয়া যাইত।আর অন্য পুকুরটা নদীর সঙ্গে জোড়া ছিল,সেখানে কত্ত মাছ”!পলাশ বাবু বলেন,আমরা নদীকে গাঙ বলতাম।গাঙে স্নান করতে যেতাম।তবে মা খুব স্বভিমানী ছিলেন,তাই কোনদিন কারোর কাছে কোন সাহায্য নেননি।লোকের বাড়ী মুড়ি ভেজে আর কিছু গয়না যেটুকু আনতে পেরেছিলেন বিক্রি করে তাই দিয়েই চলছিল আমার পড়াশোনা।কিন্তু আই.এ পাশের পর মাও অপুষ্টি ও যক্ষ্মা রোগে ভুগে মারা যান।

                 সেবার লক্ষ্মী পুজোর দিন বাইরে থেকে আসা কিছু মুসলমান সব কলাগাছ কেটে দিল,যাতে আমরা পুজোকরতে না পারি।রামদা হাতে কি লড়াইটাই না করেছিলাম তাদের সাথে।জান এখনও তাই ওরা আমার পিছু নেয়।আমায় খুন করতে আসে।সেই ভয়েই তো আমি বাড়ী থেকে খুব কম বেরোই।আনন্দী বুঝতে পারে প্রৌঢ় ডানা মেলেছেন কল্পনার।

          আনন্দী জিজ্ঞেস করে,আপনার মায়ের মৃত্যুর পর আপনার কি হল?যেন অনেকটা পথ পেড়িয়ে বাস্তবে ফিরে এলেন পলাশ।তারপর বি.এসসি.পাশ করলাম।ভাল চাকরীতেও ঢুকলাম।কিন্তু টিকতে পারলাম কই!ছোটবেলা থেকে আকাশের মত নকশিকাঁথায় রামধনু রঙ ছড়িয়ে ছবি আঁকতে ভালোবাসতাম।সেটাই কখন নেশা থেকে পেশা হয়ে গেল।তবে ছবিতে উজ্জ্বল রঙ একেবারে সহ্য করতে পারিনা—বলে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলেন মাথার রগ দুটো।ঠিক আছে আজ তবে এই থাক,আনন্দী বলে ওঠে।মহুয়ার পাঠান গাড়ীতে বাড়ী ফেরেন প্রৌঢ়।

           এরপর কেটে গেছে মাস পাঁচেক।প্রৌঢ় পলাশবাবু  খুন করতে আসা লোকগুলোর হাত থেকে করেছেন আত্মগোপন,বার বার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা।ছবি আঁকা এখন প্রায় বন্ধ।আজ মহুয়াদের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনন্দী বাসুর চিকিৎসাকেন্দ্রের গাড়ী।এবার বেশ কিছুদিনের জন্য আবার তল্পিতল্পা গুছিয়ে যাওয়া।

         মাসখানেক পর মহুয়া নিতে আসে বাবাকে।আনন্দী তাকে জানায়,সিজোফ্রেনিয়ার মত জটিল মানসিক ব্যধিতে সাহচর্য,সহানুভূতি খুব দরকার মহুয়া।আর একটা কথা এরিপাইপ্রাজল ওষুধটা কিন্তু কোন ভাবেই বন্ধ করা যাবে না।বংশগতি,প্রচন্ড মানসিক আঘাতের পাশাপাশি অনেক কারণ থাকে এই রোগের।আমার মনে হয় বারবার পরিযায়ীর মত ঘুরতে ঘুরতে আপনার বাবা এই রোগের শিকার।যা গভীর ভাবে রেখাপাত করেছে ওঁর মস্তিষ্কে।সব পাখীই বাসা খোঁজে মহুয়া।আপনার বাবাকে নির্ভরতার ডানায় জড়ানো বাসায় রাখুন,যাতে আর উড়ে যেতে না হয় জীবনের শেষ শান্তির বাসায় পৌঁছান পর্যন্ত।বাড়ী ফেরার আগে পলাশবাবু একটি ছোট্ট চিরকুট দিয়ে যান কন্যাসমা আনন্দীর হাতে।ওঁরা চলে গেলে আনন্দী খুলে দেখে তাতে লেখা--

      মনের খোলা রুদ্ধদ্বারে

     কেই বা কখন কড়া নাড়ে!

       একলা আমার বিজন ঘরে--

      যে জন এসে হাতটি ধরে

      দখল যে নেয় মনের কোণ,

     সেই তো আমার আপনজন।

 

ছবি সৌজন্য:গুগুল

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত

 

              

          

২২টি মন্তব্য:

  1. Mon chuye jaoa ak asadharon golpo.tor kolom er jor ache.

    Piyasha panja.

    উত্তরমুছুন
  2. Mindblowing. Unknowingly the mind works somewhere sometimes. Well decorated story.

    উত্তরমুছুন
  3. অসাধারণ লেখা। মনোস্তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক সমন্বয়ে অপূর্ব🌷🌷

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভালো লাগল ।দারুন লিখেছ সুদেষ্ণা ।👌👌❤❤❤❤

    উত্তরমুছুন
  5. দারুণ!দারুণ! অসাধারণ!👍👍👌👌❤❤💫💫💥💥💅💅

    উত্তরমুছুন
  6. খুব খুব ভালো লাগলো রে...দারুন .. অদিতি...

    উত্তরমুছুন
  7. বাহ! অসাধারণ! খুব সুন্দর লিখেছিস। 👌👌👍👍❤❤💯💯💯💅💅💅

    উত্তরমুছুন
  8. যত দিন যাচ্ছে ততই খুরধার কলমী আরও আরও গভীর হচ্ছে এ। চলতে থাকুক দিদি❤😍☘

    উত্তরমুছুন
  9. কি অসাধারণ লিখলে গো সু...!!! নিজের দেশের কাহিনী এতো সুন্দর লিখতে আমিও পারতাম না।আর কালুরঘাট কিন্তু আমার বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. সত্যি!তবে আমার সখীর হাত ধরেই না হয় চলুক আমার মনের পদাবলী।

      মুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...