বিষয় ---অণু গল্প। (বাইশ বছরপর।)
নাম-- প্রতীক্ষা ।
কলমে-- পারমিতা মন্ডল।
আজ আবার তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল দীর্ঘ বাইশ বছর পর । ঠিক যে জায়গায় তোমার জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম আমি। আজ আবার সেখানেই দেখা হয়ে গেল । দেখ ভাগ্যের কি পরিহাস। তোমার আমার সম্পর্কটা ওরা মেনে নিল না কিছুতেই । আলাদা করে দিল আমাদের। কিন্তু সত্যিই কি আলাদা করতে পেরেছে ?
একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে পায়েলের বুক চিরে। এতোদিন বাদে যে তার আবার মৈনাকের সাথে দেখা হবে ভাবতে পারেনি পায়েল । দীর্ঘ বাইশ বছর পর। কি হয়েছিল তাদের ? কেন তারা আলাদা হয়ে গেল ? আর আজ কিভাবেই বা তাদের দেখা হলো ? চলুন ফিরে যাই বাইশ বছর আগে।
আজ থেকে বাইশ বছর আগে সমাজের চিত্রটা আজকের মতো ছিল না । তখনো বাবা মায়ের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো সাহস সব মেয়ে যোগাড় করে উঠতে পারেনি । সেই সময় মন দেওয়া নেওয়া হয় পায়েল আর মৈনাকের । পায়েল সম্ভ্রান্ত ব্র্যাক্ষ্মন পরিবারের সন্তান ছিল । বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে । ওদিকে মৈনাক ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান। টাকা পয়সার কোন অভাব ছিল না । কিন্তু ব্রাক্ষ্মন ছিল না । এখানেই ছিল পায়েলের বাবা মায়ের জোর আপত্তি । কিন্তু ওরা ভেবে ছিল মৈনাক ভালো চাকরি পেয়ে গেলে এই বাঁধা আর বাঁধা থাকবে না । হয়তো পায়েলের বাবা মা মেনে নেবে। কিন্তু না , ওরা মেনে নেয় নি । মৈনাক খুব ভালো পোস্টে চাকরি পায় । তবুও তার জন্ম পরিচয় তাদের কাছে বাঁধা হয়েই থাকে ।কিন্তু ওরা দুজন দুজনকে এতোটাই ভালো বাসতো যে তারা কেউ কাউকে ছাড়তে চায়নি। তাই পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভেবেছিল কিছু দিন কেটে গেলে বাবা মা সব মেনে নেবে ।
সেদিন ছিল ২৪ শে ডিসেম্বর। বড় দিনের আগের দিন । দু'জন বন্ধুর সাথে প্ল্যান করে পায়েলকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় মৈনাক । সেই মতো নৈহাটির কাছে এই ছোট্ট পার্কটিতে অপেক্ষা করতে থাকে মৈনাক । এখান থেকে কালি মন্দির বেশী দূরে নয় । ওখানেই ওদের বিয়ে হবে মাকে সাক্ষী রেখে । দুরু দুরু বুকে এক রাশ স্বপ্ন নিয়ে মৈনাক অপেক্ষা করছে তার স্বপ্ন সুন্দরীর জন্য । চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছে লাল চেলী পরে , চন্দনের সাজে পায়েল এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে । কি অপরূপ লাগছে পায়েলকে ।যেন স্বপ্ন সুন্দরী ।চোখ খুললেই যেন স্বপ্নটা ভেঙে যাবে।কিন্তু স্বপ্নটা ভেঙেই গেল । প্রতীক্ষা করতে করতে রাত ভোর হয়ে গেল। পায়েল এলো না । কি হলো ব্যাপারটা ? কেন এলো না সে ? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না । তাহলে কি কোন সমস্যা হলো ?
সারারাত বসে থেকে ভোর বেলায় এক বুক হতাশা নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে মৈনাক। তখন মুঠোফোনের এতো প্রচলন ছিল না । তাই একটু সকাল হতেই বন্ধুর বাড়িতে ছোটে পায়েলের খোঁজ নিতে। জানতে পারে ওদেরই একটি বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করে পায়েলের বাবা মাকে সব ঘটনা জানিয়ে দেয় । তাই পায়েলকে কিছু বুঝতে না দিয়ে রাতারাতি তারা বাড়ি ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেছে। পায়েলকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। প্রচণ্ড ভেঙে পড়ে মৈনাক। সে সত্যিই পায়েলকে ভালো বেসেছিল। কি অপরাধ ছিল তার ? শুধু তথাকথিত উঁচু জাত ছিলো না বলে ?
তারপর থেকে আজ বাইশ বছর ধরে প্রত্যেক বছর এই দিনটিতে মৈনাক এসে বসে পার্কের সেই নির্দিষ্ট জায়গায়। যেখানে সে বাইশ বছর আগে পায়েলের জন্য অপেক্ষা করেছিল। তার বিশ্বাস ছিল একদিন না একদিন পায়েল ঠিক আসবে । সে অন্য কাউকে ভালো বাসতে পারে না । তাকে আসতেই হবে । তাদের ভালোবাসা জন্ম জন্মান্তরের । কেউ তাদের আলাদা করতে পারবে না । আর আজ এতো বছর পর তার দেখা পেল।
বাইশ বছর বাদে পায়েলও এলো এদেশে । ওকে সেই রাতে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল মাসির বাড়ি । সেখান থেকে লন্ডন। আর কোন ভাবেই সে মৈনাকের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেনি । দিনের পর দিন অসহ্য যন্ত্রণায় ভাঙচুর হয়েছে। কাটা ছাগলের মতো ছটফট করেছে । গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে দৌড়ে পালাতে গিয়েও পারেনি। সে যে কিছুই চেনে না এই শহরের। তারপর আস্তে আস্তে একদিন স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। দীর্ঘ বাইশ বছর কেটে গেছে তারপর। কিন্তু মৈনাককে সে একদিনের জন্য ও ভুলতে পারেনি। আবীরকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু মন পড়ে আছে মৈনাকের কাছে। ওরা জোর করে মৈনাককে কেড়ে নিয়েছে । ওদের মিলন ঘটাতে দেয়নি । কিন্তু মন থেকে কখনোই কেড়ে নিতে পারেনি। আজও এতো বছর পরেও পায়েলের একমাত্র ধ্যান জ্ঞান মৈনাক।
মাঝে মাঝে মনে হয়েছে সে আবীরকে ঠকাচ্ছে। কিন্তু আবীরের কোন ইচ্ছা সে অপূর্ণ রাখেনি । তবে মনের মধ্যে যাকে একবার স্থান দিয়েছে ,কোনদিন সেই জায়গায় আর কাউকে বসাতে পারেনি পায়েল । তাই মৈনাককে ভুলে যাওয়া তার পক্ষে কোন দিন সম্ভব হয়নি। এদেশে আসার পরই পায়েলের প্রথম মনে পড়েছিল সেই পার্কটার কথা । যেখানে সারারাত শীতের মধ্যে মৈনাক তার জন্য অপেক্ষা করেছিল । তবে সে ভাবতে পারেনি আজও মৈনাক একই ভাবে একই জায়গায় তার জন্য অপেক্ষা করবে। বাইশ বছর পরেও তাদের ভালো বাসায় একটুও কম হয়নি।
পায়েলকে চোখের সামনে দেখে মৈনাক প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি যে, সত্যিই সে এসেছে ? তার এতদিনের প্রতীক্ষা কি আজ তবে শেষ ? এবার কি সে পায়েলকে নিয়ে সুখী হবে ? গড়তে পারবে ছোট্ট সুখনীড়? না, তা যে আর হয়না । পায়েল আজ অন্য কারো ।দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে কথা হারিয়ে যায় । দু'চোখ বেয়ে শুধু জল পড়ে। কেন এমন হলো ? কিছু মানুষের ভুলে তাদের দুটি জীবন নষ্ট হয়ে গেল । পরিনতি পেল না তাদের ভালো বাসার।
"বিয়ে করেছো মৈনাক ?"- হঠাৎ বলে ওঠে পায়েল । "হ্যাঁ, করেছি তো । আজ থেকে বাইশ বছর আগে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। লাল চেঁলী পরে, কপালে চন্দনের রেখা এঁকে সে আমার ঘরে কখনো আসেনি কিন্তু মনে তার নিত্য আশা যাওয়া । সে আমার সুখ দুঃখের সাথী । আজ বাইশ বছর ধরে আমি তার সাথে ঘর করছি।"
পায়েল ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে । এতো ভালো বাসে সে তাকে আজো ? কিন্তু আজ আর পায়েলের কোন অধিকার নেই তার কাছে যাওয়ার । তাকে ছুঁয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার । পায়েল তাকিয়ে দেখে মৈনাকের অনামিকায় আজও তার দেওয়া সেই রূপোর আংটি আর সস্তা দামের সেই ঘড়িটা । আজও একই ভাবে টিক টিক করে বয়ে চলছে।
আবীর এসে ডাক দেয় পায়েলকে । চলে যেতেই হবে । থাকা হবে না আর মৈনাকের কাছে । তবে আর বেশী দিন নয় । পায়েল ফিরবে মৈনাকের কাছে । সে দিনের আর বেশী দেরী নেই ।" যেদিন ওদের দেখা হবে আকাশ পথে । যেতে যেতে পায়েল বলে যায় "--- অপেক্ষা কর মৈনাক, আমি আসছি----- তোমার আমার আবার দেখা হবে আকাশ পথে ।"
সমাপ্ত।
(দেরী হওয়ার জন্য দুঃখিত ।)
copyright s are reserved for paramita mandal.
অপূর্ব সুন্দর😍💓
উত্তরমুছুন