বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০

ঘোষ বুড়ী(সুদেষ্ণা দত্ত)


 ঘোষ বুড়ী

©সুদেষ্ণা দত্ত

 

   গ্রামের নাম সুন্দরগ্রাম--বাংলা মায়ের কোল ঘেঁষা সুজলা,সুফলা,শান্তির নীড় ঘেরা এক গ্রাম।গ্রামের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী।সেই গ্রামে বিঘে খানেক জায়গা নিয়ে ঘোষ বুড়ী বলে এক বুড়ী থাকত।সবাই তাকে ঘোষ বুড়ী বলেই জানত,নাম কেউ জানলেও বলত না-কারণ কালে কালে সে ঘোষ বুড়ী থেকে ‘ফোঁস বুড়ী’তে পরিণত হয়েছিল।বুড়ীর বাগানে আম—জাম--নারকেল থেকে হেন ফলের গাছ নেই যা ছিল না।এত ফলের গাছ থাকায় বুড়ীর টিনের চালে প্রায়ই নানা শব্দতরঙ্গ বাজত।সজাগ বুড়ী-সাদা থান, শন নুড়ির মত চুল আর হাতে লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ত।সদাই তার মুখে বুলি ছিল—”পাড় পাড় বাজ পড়ে মড়বি”।

        গ্রামের ছোট ছোট ধানি লঙ্কাগুলো বুড়ীকে নিয়ে ছড়া বেঁধেছিল—

“ঘোষ বুড়ী না ফোঁস বুড়ী

দেখি আগে তুই মরিস

 না আমরা মরি!”

এ কথা শুনলে বুড়ী তেলে বেগুনে জ্বলত আর গোটা গ্রাম মাথায় তুলে চেঁচাত।প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই চলত।তাই গ্রামের মানুষও এ নিয়ে বেশি মাথা ঘামাত না।সকলেই মজা পেত।কখনো ছেলেদের খারাপ কথা বলার জন্য রাগও করত মায়েরা।তারা মনে মনে ভাবত একা থাকে বুড়ী,কত খাবে!ছেলেগুলোকে কিছু দিলে কি কম পড়বে!কিন্তু বুড়ীকে মুখের ওপর সে কথা বলার কারোর সাহস ছিল না।

          গ্রামের কোন লেখাপড়া জানা নাতনী স্থানীয় বউরা বুড়ীকে কত বোঝাত—'আমরা রান্না করার সময় দেখেছ তো ঠাকমা আমরা খেয়ে দেখি।কেন বলত!যাতে পরিবারের লোকের পাতে ভাল খাবার তুলে দিতে পারি।নুন-মিষ্টি কম হলে সেগুলো মিশিয়ে দি।তেমন কথার তীরেও বড় ধার হয় গো।এমনি তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও কথার তীর কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না।বড় জ্বালা ধরায় বুকে,ঘটি ঘটি জল ঢাললেও সেই জ্বালা জুড়োয় না,রেখে যায় ক্ষত।তারপর তুমি ছেলেগুলোকে এত অভিশাপ দাও কোনদিন বিপদ ঘটলে তার মা-বাপে তোমায় ছাড়বে!তিনকাল গিয়ে তো এককালে ঠেকেছে, একটু সংযত হও ঠাকমা।বুড়ী রেগে বলে—'তা বাছারা ইস্কুলের মেস্টর হলিই তো পারতে, হাঁড়িতে মুখ গুঁজে পড়ি আছ কেন?

            এমনই এক কালবৈশাখীর রাত।মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে,পাল্লা দিয়ে চলছে ঝড়ের তান্ডব,সঙ্গে অশনি সংকেত।ছেলেরা ঘরে ছটফট করলেও তাদের ওপর আজ কড়া পাহারা।বুড়ীর চালেও বৃষ্টির ফোঁটা বুনে চলেছে নানা শব্দজাল।এক হাতে লাঠি,অন্য হাতে লণ্ঠন নিয়ে বুড়ীও বেরিয়েছে বাগান পাহারা দিতে।হঠাৎ কাছেই কান ফাটানো বাজ পড়ার আওয়াজে ছেলেরাও মুখ লুকিয়েছে মায়ের কোলে।

       স্বাভাবিকভাবেই কিছু সময় তান্ডব চালিয়ে প্রকৃতিও হয়েছে শান্ত।ছেলেরা সকাল বেলায় আশায় আশায় যাচ্ছে বুড়ীর বাড়ীর দিকে আর ভাবছে ফোঁস বুড়ী কি আর তাদের জন্য কিছু ফেলে রেখেছে,সবই ঘরে তুলেছে!কিন্তু বুড়ীর বাগানে গিয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় ঝাল কমে যায় ধানি লঙ্কাগুলোরই।দেখে বুড়ীর বাগানের একটা নারকেল গাছ বাজ পড়ে জ্বলে গিয়েছে,তার নীচে বুড়ী পড়ে আছে মরে কাঠ।বুড়ীর কথাই বুড়ীর কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।আর বুড়ীকে নিয়ে গিয়েছে সব হিসাব—নিকাশের বাইরে।


ছবি সৌজন্য:গুগুল

© কপিরাইট রিজার্ভ ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

 

২৪টি মন্তব্য:

  1. Ami piyasha panja
    A to bancharam.seshta khub dukhkher.khub bhalo laglo.

    উত্তরমুছুন
  2. গল্পটা , শিক্ষনীয়। ।দারুন।। 👌👌👌👌👌💗

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভালো লেগেছে । আহা রে ঘোষ বুড়ি!

    উত্তরমুছুন
  4. বাহ্!বেশ সুন্দর লিখেছিস। অসাধারণ! 👍👍👌👌💯💯❤❤

    উত্তরমুছুন
  5. সুন্দর বর্ণনা দিয়েছো ঘোষ বুড়ির। 👌

    উত্তরমুছুন
  6. বেশ ভালো লাগলো...একটু দুঃখও লাগল..😢 অদিতি

    উত্তরমুছুন
  7. নিজের না পাওয়া ক্ষোভের থেকে বুড়ো বুড়িদের এই রকম অবস্থা হয়। খুব দুঃখজনক।
    খুব সুন্দর লিখেছেন।

    উত্তরমুছুন
  8. Bhari sundar likhechhis to!Ghosh burir ai samaptite keu chokher jal phello ki?

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. সেই উত্তর তো আমার পাঠকের কাছ থেকে প্রাপ্য😊😊।

      মুছুন
  9. susantaduttaas: khoob sundar bhabe octogenarian der sampatti aglano & teens der Na pow r kshob phoote uthechhe,

    উত্তরমুছুন
  10. হুম। সেই। মুখের কথা ফিরিয়ে নেয়া যায়না।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...