# নাম- 'মায়ের আশীর্বাদ'
✍ -
অঙ্কন মজুমদার। সন্দীপন ও নিরপমা দেবীর সবেধন নীলমণি। আই.ও.সি.তে কর্মরত। লম্বায় ছ'ফুট। মেদহীন জৌলুস। কোঁকড়ানো চুল, কালো মেঘ হয়ে যেন মাথায় বসানো। ফর্সা। হাসলে গালে টোল খায়। অনেক কষ্টে বিয়েতে রাজি করানো গেছে।
এই ছেলে প্রেম করলো না, মাতৃছায়ার বাইরে অন্য কোনো ছায়াকে তার ভালো লাগতো না বলে। প্রেম, বিয়ে এসব হবি তার নেই, তার পিছু এই জীবন দর্শন ধাওয়া করেছে।
অনেক মেয়ে তার পিছু নিয়েছে কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তার নাকি প্রেমের মনটাই নেই। তাই কোনো মেয়ে সেরকম রেসপন্স পায়নি বলে ভেগে গেল না ভাগিয়ে দিল অঙ্কন তা যথেষ্ট গবেষণার বিষয়। তাই নিয়ে মাসির মেয়েরা তার পেছনে লাগতে পর্যন্ত ছাড়েনি।
কনে দেখা হলো। পছন্দ। পছন্দ এক চান্সেই। মেয়েদের রূপ যে দেখেনি অঙ্কন তা নয়। কিন্তু এমন রূপ কনে দেখার মুড নিয়ে দেখেছে বলে, একেবারে পছন্দ। সর্বোপরি কনে রূপাঞ্জলিও কথা বললে গালে টোল পড়ে। তাই পছন্দটা একটু বেশি হয়ে গেল।
বিয়ের কনে দেখা থেকে, বরের সাজা নিখুঁত হওয়া পর্যন্ত মা নিরুপমার সবসময় ছেলের প্রতি নজর ছিল তীক্ষ্ণ।
বিয়ের সময় ওর বাপ সন্দীপনের বর সাজের অনুষ্ঠান তো আর দেখা হয়নি। সম্ভব ছিল না। গল্প করতো সন্দীপন। তা থেকে শোনা। সন্দীপনের কাছে শুনেছে এমন,যেন কাব্য মনে হতো। আজ ছেলের বিয়েতে বাপকে ছাড়িয়ে যাওয়ার গোড়া থেকে ছিল সেই রকম ইচ্ছা।
শাস্ত্রচার মেনে সব হচ্ছে কিনা প্রতিটি বিষয়ের উপর তীক্ষ্ণ নজর দিতে থাকেন নিরুপমা।
নিরুপমারা চার বোন। তারাও এসেছে তাদের পরিবার নিয়ে। নিরুপমা সবার বড়। বোনেদের সব মেয়ে। মেজর তিন মেয়ে। অপূর্ব সব ষোড়শী। চাকরি করে। প্রেম ভালোবাসায় খুব এক্সপার্ট।
সেজর দু'মেয়ে। এরাও মেজোর মেয়েদের থেকে কম নয়।
ছোটোর পাঁচ বছরের মেয়ে। তোতা। এর কথা আর কি বলব।
সবাই এসেছে। অঙ্কন শুধু একা। মায়ের দিকের চেয়ে মাসিদের তরফে আদর যেন কুলফি মালাই। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ আছে না কথাটা, এদের আদিখ্যেতা অনেক অনেক বেশি। অঙ্কনের শরীর খারাপের কথা শুনলে আদিখ্যেতার বহর তখনই বোঝা যায়। আর নিরুপমা সন্দীপনের কাছে বোনেদের মতো আরো দু'চারটে আমদানির বায়না করেছিল। সন্দীপনের চেপে যাওয়ার উপরে আর জোর খাটায়নি নিরুপমা। আর মন চাইলেও নামী স্কুলে ভর্তি করার হ্যাপায় সে সখ গাছের মগ ডালে বাঁধতে হয়েছিল। অঙ্কনকে মানুষ করতে জীবনের সব এনার্জি অঙ্কনে চালিত হয়েছে,আর সখ কালো ধোঁয়া হয়ে বেরিয়ে গেছে।
তাই অঙ্কনকে মানুষের জন্য সন্দীপনকে কোনো দায়ভাগ দিতে রাজি নয়। তাই বলে - "শুধু পয়সা দিলে, মানুষ হয়ে যায় না, ছেলের পেছনে রাতভিত লেগে থেকেছি এই আমি মিসেস মজুমদার নিরুপমা।"
সন্দীপন অবশ্য তা অস্বীকার করে না। বৌকে পুরো ক্রেডিট দিয়ে বড়ই কৃতার্থ বোধ করে। আর গর্বের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলে "আদর্শ গৃহিণী পেয়েছিলাম বলে দুটো রান্না ভাত তৃপ্তি ভরে খেতে পেয়েছি। আর অফিসের কাজে হিল্লি দিল্লি করে বেড়ানো সম্ভব হয়েছে। হ্যাপি কনজ্যুগাল লাইফ।"
তাই অঙ্কনের বিয়ের ব্যাপারে মা ম্যানেজার, সন্দীপন অ্যাসিস্ট্যান্ট। যাবতীয় খরচের বাহক কেবল সন্দীপন। টাকার হুন্ডি নিয়ে সদাই নিজেকে ব্যস্ত রাখছে।
বিয়ে বাড়ি বলে কথা। আত্মীয় স্বজনে ঘর গিজগিজ করছে। হাসি ঠাট্টা মসকরা সব যে যেমন পারছে উপুড় করে দিচ্ছে।
বিশেষ করে নিরুপমা যে বোনেদের কাছে এতদিন বলে এসেছে - "ছেলেটা কবে বড় হবে রে। মায়ের আঁচল ছাড়া একটুও থাকতে পারেনা।"
এবার মেজ বোন উপমা বলে - "কি অঙ্কন এবার তো বউয়ের আঁচলে ঢুকবি।"
ছোট বোন সুরমা ওরফে সুরি বলে-"দিদি তুই তোর আঁচল থেকে আমাদের একবারও শেয়ার করতে দিসনি। তাই তোর দোষ। আর আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত ,এই অঙ্কন তোর বদ অভ্যাস হয়ে গেছে,আঁচল ছাড়া থাকতে পারবিনা। এবার বৌয়ের আঁচলে যাবি। এবার আমাদের আঁচলে মাঝে মধ্যে আসিস। অবশ্য আমার যদি ছেলে এসে যায় তোকে আর লাগবে না।"
সকলে হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ে। হাসির রোল গড়াচ্ছে তুখোড়,এমন সময় সন্দীপন হাজির। বোকা বোকা মুখ। ভাঁড়ার ঘরের দায়িত্ব কাকে দেবে তাই নিয়ে। তখন অত কথা শোনার কান নেই। শ্যালিকারা ধরেছে , মেয়েরাও ধরেছে "কর্নেটো খাব পয়সা দাও।"
শেষে নিরুপমা সন্দীপনের কানে কানে গিয়ে বলে - "বড় ভাই বিলাসকে দায়িত্ব দিতে। এটাও বলে দিতে হবে।"
"হবে না, এখুনি নিজের ইচ্ছায় করলে তুমি হা হা করবে।"
বলে একগাল হেসে অপার তৃপ্তি নিয়ে সন্দীপন প্রেমের চোখ বুলিয়ে বিদায় নিল। নিরুপমা যাওয়ার আগে কিছু টাকা নিল কর্ণেটো খাওয়ার আবদার পূরণ করতে।
পরেরদিন ব্রাহ্মণ ঠাকুর এলন। শাস্ত্রাচার মেনে মঙ্গলাচরণ হল। একেবারে নিখুঁত। গায়ে হলুদ হল। সে বেদম হৈ হুল্লোড়। কনের বাড়িতে হলুদ তত্ত্ব যথারীতি গেল।
বিকেল পাঁচটায় বর সাজাতে এল বিভাস সামুই। এক্সপার্ট। একটু বাড়তি সাজ চাই বলে। হলো তাই। সন্ধ্যায় বরের সাজে অঙ্কন বেরচ্ছে। হঠাৎ বরের ধূতি পছন্দ হয়নি। অনেকগুলো ধূতি কেনা হয়েছিল। কিন্তু নিরুপমা যেটা পছন্দ করে দিয়েছেন অঙ্কন সেটা পরেনি বলে নিরুপমা দেবি খুব বকলেন অঙ্কনকে। শেষে ধূতি খুলিয়ে নিরুপমা দেবীর পছন্দের ধূতি পরতে হলো। টোপর পছন্দ মা- ই করেদিলেন। টোপর গোটা চারেক নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে বাকি তিনটি দোকানে ফেরত যাবে এই শর্তে।
এবার বর ঘরের চৌকাঠ পেরবে। পেরনোর আগে প্রণাম পর্ব শেষ। এবার শেষ প্রণাম নেবেন মা নিরুপমা। মা আশীর্বাদ দেবেন ছেলেকে।
প্রণাম করে মাকে বলতে হয় - "মা তোমার দাসী আনতে যাচ্ছি।" এই বলে আর পেছন ফিরে তাকাবে না।
ব্যাস এইখানে এসে অঙ্কন বেঁকে বসলো সে কিছুতেই এ কথা বলবে না। অঙ্কন বলছে- "কিসের দাসী? আমি বলতে পারবো না।"
সবাই বলছে- "বলতে হয়। এটা সংস্কার।"
"মানিনা। এযুগে চলবে না।"
তাই নিয়ে অঙ্কনের বিদ্রোহ। বললই না অঙ্কন।
সত্যি তো দাসী কেন? আদৌ কি দাসী ভাবা যায় না দাসী করে আনা হয়। যত্তসব কুসংস্কার।
এদিকে ছেলে ঐ স্বীকারোক্তি না করে যাওয়ার জন্য নিরুপমা দেবী পড়লেন ফাঁপরে। যদি অমঙ্গল হয়?
*********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
খুব ভালো লাগলো
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤
মুছুনবাঃ খুব সুন্দর লিখেছেন, আমার শাশুড়ির সঙ্গে অনেকটা মিল ,তবে আমরা বৌমারা সবাই তাঁর আঁচল থেকে নিজেদের আঁচলের তলায় আনতে সময় লাগাইনি বেশি।ওনাকেও ভালো শাশুড়ি হতে হয়েছে বৌমাদের চাপে।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। অনুপ্রাণিত। শুভেচ্ছা।❤❤🙏🙏
মুছুনঅসাধারণ👏✊👍খুব ভালো লাগলো। একদম বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে লেখা
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💫💫💥💥
মুছুনভীষন ভালো লাগলো👌👌👌
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💫💫💥💥
মুছুনখুবই সুন্দর করে সংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা দেখিয়েছেন।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। ❤❤🙏🙏
মুছুনঅসাধারণ লেখনী দাদা..💐💝
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💫💫💥
মুছুনঅদ্ভুত কিছু সংস্কার রয়েছে আমাদের সমাজে, তবে ধীরে ধীরে এগুলো কমছে।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর 👌
ধন্যবাদ। ❤❤
মুছুনখুব সুন্দর। 💐💐
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। ❤❤
মুছুনমায়ের ছায়ায় থাকা সংস্কারমুক্ত অঙ্কনকে খুব ভাল লাগল।
উত্তরমুছুন