বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০

ভালো বাসার ঘরে ফেরা । কলমে----(পারমিতা মন্ডল।)


ভালো বাসার  ঘরে ফেরা

পারমিতা মন্ডল।
আজ ননীবালা দেবীর জীবনে এক বিশেষ দিন ।জীবনের  ষাট
টা বছর পেরিয়ে এসে আজ তার কপালে এতো সুখ এসে ধরা দেবে ;ভাবেনি কখনো ।তাই চোখের জল যেন বাঁধ মানতে চাইছে না । তার জীবনে এমন ঘটনা ঘটবে সে কখনোই ভাবেনি। ।

ওনাদের সময় প্রেম করা বড় অপরাধ ছিল ।কেউ যদি জানতে পারতো তাহলে ছি ছি করতো ।আর যদি গ্রাম হতো তাহলে তো কথাই নেই । তবুও তো জীবনে প্রেম আসে, ভালো বাসা আসে, কালবৈশাখী ঝড়ের মতো,। যতই তাকে বারন করোনা কেন , যৌবন তো আসবেই । আর যৌবনের সাথে সাথে আসে বসন্ত, আর সেই চোরাগলি পথে চলে আসে প্রেম । তেমনি ননীবালা দেবীর জীবনেও সে এসেছিল । অতি গোপনে ,খুব নীরবে ।

তখন কতোই বা বয়স হবে ।এই চৌদ্দ পনেরো । মেয়েরা তখন একটু  আধটু লেখা পড়া করতো । কেউ কেউ স্কুলেও যেত ।কিন্তু বেশিদূর না । ঐ ফোর ফাইভ পর্যন্ত ।ননীবালা দেবীও ফাইভ পযর্ন্ত লেখা পড়া করেছেন । কিন্তু তারপর আর ওনাকে পড়তে দেওয়া হয়নি । বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় ।গ্রামের স্কুলে ই পড়াশোনা করতেন ননীবালা দেবী । বাড়ির থেকে একটু দূরে । পাশের স্কুলে পরেশ বলে একটি ছেলে পড়তো ।ও পাশের গ্রামে ই থাকতো।  ননীবালা দেবীর চেয়ে বয়সে একটু বড়ই ছিল ।গ্রামের ছেলে হলে কি হয় , পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল । তাই মাঝে মাঝে  ননীবালা বালা ওর কাছে যেত পড়া দেখে নিতে ।ওদের বাড়িতে ও যেত ননী বালা। খুব ভাব হয়ে যায় দুজনের ।

কিন্তু এ ব‍্যাপারটা গ্রামের বড়দের চোখে পড়ে যায় । তারা ব‍্যাপারটা ভালো চোখে নেয়না ।ওরা ননীবালার বাবাকে ডেকে সব কথা বলে ।এব‌ং যতো তাড়াতাড়ি পারে মেয়ের লেখা পড়া ছাড়িয়ে বিয়ে দিতে বলে । একথা শুনে ননীবালা দেবীর বাবা খুব রেগে যান । ননীবালার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ।আর পরেশের সাথেও দেখা হয় না ।

এদিকে ননীবালা স্কুলে আসছে না দেখে পরেশ একদিন ওদের বাড়িতে যায় ।কিন্তু ননীবালার বাবা পরেশকে বাড়িতে ঢুকতে দেয় না । খুব বকাঝকা করে  তাড়িয়ে দেয় বাড়ি থেকে।কিন্তু পরেশ বুঝতে ই পারে না কি তার অপরাধ । আসলে তখন ওরা এতটাই ছোট যে  ভালো বাসা টাও বোঝার ক্ষমতা নেই । (যদি ও এখনকার দিনে আরো ছোট বয়স থেকে অনেক কিছু শিখে যায় ।) এমনি ভাবে মন খারাপ করে চললো বেশ কিছু দিন । ননী বালার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল । কিন্তু ওর ও পরেশদার জন্য খুব মন খারাপ হতো ।

দেখতে দেখতে দুবছর কেটে গেল । আজ ননীবালার বিয়ে । বাড়িতে মহা ধুমধাম । সবাই খুব খুশি ।একটি খুব ভালো ছেলে পাওয়া গেছে । যদিও ছেলে টার একটু বয়স বেশী ।কিন্তু খুব অবস্থাপন্ন ঘর । জমিজমা আছে । চাষাবাদ করে ।বেশ সচ্ছল পরিবার । তাই রাজি হয়ে গেছে ননীর বাবা । কিন্তু ননী এখন একটু বড় হয়েছে ।তাই পরেশদার প্রতি তার আকর্ষণ যে ভালো বাসা সেটা বুঝতে পেরেছে ।ওদিকে ননীর বিয়ের কথা শুনে পরেশ ও খুব ভেঙ্গে পড়ে । সেও বুঝেছে যে ননীকে না দেখতে পেলে তার মনে যে কষ্ট টা হয় সেটা ভালো বাসা ।কিন্তু সে তখনো ছোট । তাই ননীকে বিয়ে করার কথা কাউকে বলতেই পারেনা । বিয়ের আগে গোপনে একদিন ননীর সাথে দেখা করে পরেশ। দুজনেই সেদিন বুঝতে পারলো যে তারা দুজন দুজনকে কতটা ভালো বাসে । কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না। পরেশ ননীকে বলে '; "'আমি বড় হয়ে মস্ত বড় একটা বাড়ি বানাবো । তারপর তোকে আমার কাছে নিয়ে আসবো ।তুই কাঁদিস না " 

বিয়ে হয়ে যায় ননীবালার। শ্বশুর বাড়িতে চলে যায় ননী ।আস্তে আস্তে গ্রামের স্মৃতি ভুলে যায় ননী । জীবন বড় বিচিত্র ।মানুষকে  কোথায় কিভাবে দাঁড় করিয়ে দেয় ভাবা মুসকিল ।সেদিনের পনেরো বছরের ননী আজ ষাট বছরের বৃদ্ধা । তার সেদিনের বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি । বিশাল বড় পরিবারে বিয়ে  হয়েছিল ননীবালা । সারাদিন সংসারের কাজ করতে করতে নিজের কথা ভাবতে ই ভুলে গিয়ে ছিল ননীবালা ।তার পর বিয়ের এতদিন পর ও কোনো সন্তান না  হওয়ায় পরিবারের সবার কাছ থেকে নানা রকম গঞ্জনা শুনতে ,হতো ।অবশেষে শাশুড়ি একদিন ছেলের আর একটা বিয়ে দিয়ে নিয়ে এলেন ।তখন অত‍্যাচারের  পরিমাণ আরো বাড়লো বেশী। না, আর এখানে থাকা চলে না মনে মনে ভাবে ননী ।কিন্তু কোথায় যাবে ?

তাই একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে আসে ননীবালা ।তাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে এসে ওঠে ।ওরা একটি বাড়িতে বাচ্চা দেখার কাজ ঠিক করে দেয় । সেই থেকেই এই ডাক্তার দাদার বাড়িতে এতো বছর ধরে আছে ।এখন বাচ্চা টা বড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু ননীবালাকে ওরা রেখে দিয়েছে , এমন বিশ্বাসী লোক পাওয়া খুব ভাগ্যের ব্যাপার ।

এই বাড়িতেই পরেশের সাথে ননীবালা আবার দেখা হয়।  এখানে ডাক্তার দাদার ড্রাইভার হয়ে আসে পরেশ। হঠাৎ একদিন ননী বালার সাথে তার দেখা হয়ে যায় ।কিন্তু এতো বছর বাদে  ননীকে দেখে ও তারা কেউ কাউকে  চিনতে পারে না । সেদিন গাড়ি চালাতে চালাতে ডাক্তার বাবু পরেশকে জিঞ্জাসা করেন যে , "আপনার বাড়িতে কে কে আছে ? "আসলে নতুন লোক তো, তাই একটু খোঁজ খবর নেওয়া ।  পরেশ বলে;

"আমার মা মারা গেছেন কিছু দিন আগে । আর বাবা আরো আগেই মারা গেছেন। আমি একমাত্র সন্তান। লেখা পড়া শেখার ইচ্ছা থাকলেও সেভাবে করতে পারিনি। সংসারের বোঝা মাথায় এসে চাপে । একদিকে রোজগার নেই, তারপর বাবা মারা গেল, সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ল আমার উপর।এদিকে অসুস্থ মা , সবকিছু মিলিয়ে আমার আর স‌ংসার ক‍রা হয়নি । তবে একজনকে খুব ভালো লেগেছিল। কিন্তু তাকে ধরে রাখতে পারিনি ।"

এদিকে হসপিটাল চলে এলো । তাই ডাক্তার বাবু নেমে গেলেন ।তাই পুরো টা আর শোনা হলো না। উনি চলে যাওয়ার পর পরেশের আবার নতুন করে মনে পড়ে গেল ননীবালার কথা।কি জানি সে বেঁচে আছে কিনা? বা কেমন আছে ? মনে মনে ভাবে পরেশ। 

পরদিন ডাক্তার বাবু ননী বালাকে বললেন , "  

তোমাদের গ্রামের একজন বয়স্ক লোক আমার গাড়ির ড্রাইভার হয়ে এসেছে । জানোতো কথায় কথায় বলছিল পলাশ পুর গ্রামের কথা । তখন মনে পড়ল তোমার কথা। ঠিক আছে আজ যখন আসবে তখন তোমাকে ডাকবো । দেখো চেনো কিনা ?"

পরদিন পরেশ এলে ডাক্তার বাবু ননীকে ডাকলেন । "দেখতো চেনো নাকি ? তোমাদের গ্রামের লোক ।" আসলে নতুন লোক তো তাই বোধহয় ডাক্তার বাবু একটু ভয় পাচ্ছিলেন ।পরিচয় দেওয়ার পর দুজনেই দুজনের দিকে ফ‍্যাল ফ‍্যাল করে চেয়ে  রইলেন । এভাবে , এতো বছর বাদে যে তাদের দেখা ,হবে তা ওরা নিজেরাই কখনোই ভাবতে পারেনি । আঝোরে কাঁদতে থাকে দুজনে । ডাক্তার বাবু তো , হতোবাক।

সব কথা শোনার পর প‍রেশ ননীবালাকে নিজের কাছে নিয়ে রাখতে চায় ।উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে । যা একদিন সে পারেনি লোক লজ্জার ভয়ে বা পা্রিপার্শিকের চাপে ।আজ সে কাজটা সম্পন্ন করতে চায় । ননীবালাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঘরে নিয়ে যেতে চায় ।ডাক্তার বাবুর সহযোগিতায় আজ এতো বছর পরে নিজের ভালো বাসার ঘরে ফিরে গেল ননীবালা । এতো বছর পরে ননী বালা শেষ পযর্ন্ত নিজের ঘরে ফিরতে পারল । এই ভাবে ভালো বাসা বেচেঁ  থাকুক প্রতিটি মানুষের মনে।
চলুন আমরা সবাই মিলে কামনা করি তাদের বাকি জীবনটা যেন সুখে, শান্তি তে ও আনন্দে কাটে।
সমাপ্ত।


৩টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...