বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

দর্পচূর্ণ

স্নিগ্ধা‌, বাবা মায়ের একমাত্র কন্যা। রূপে তার জোড়া মেলা ভার। স্নিগ্ধার‌ পিতা জমিদার সৌরদ্বীপ‌ রায় অত্যন্ত দয়ালু কিন্তু তার মেয়ের যেমন রূপ তার থেকে বেশি তার অহংকার। স্নিগ্ধার‌ মা পুষ্পাদেবী‌ অনেক বছর আগে ইহলোকের‌ মায়া ত্যাগ করেছেন। তাই সৌরদ্বীপ‌ তার একমাত্র কন্যাকে খুব আদরের সাথে বড় করেছেন। সকল আবদার সব সময় পূরণ করেছেন। আর এত আদর আর রূপের অহংকারে স্নিগ্ধার‌ যেন মাটিতে পা পড়ে না।

কিন্তু সৌন্দর্য আর কতদিনের। অহংকার সব সময় পতনের মূল হয়। যেমন গোলাপ, প্রেমিক‌ মাত্র‌ই আকর্ষন করে। অহংকার তার সারা অঙ্গ জুড়ে। কিন্তু তার সৌন্দর্য আর কতদিনের। আস্তে আস্তে তার সব পাপড়ি ঝরে মাটিতে পড়ে যায়।

সৌরদ্বীপ‌ অত্যন্ত সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। দরিদ্রদের থেকে খাজনা আদায় করতে পারতেন না। তাই সঠিক খাজনা আদায় করতে না পেরে আস্তে আস্তে তার জমিদারি নিঃশেষ হতে হতে নিলামে উঠে যায়। সৌরদ্বীপ‌ পথে এসে যায়। কিন্তু তার দয়াশীল মনোভাবের জন্য অনেকেই তাকে খুব ভালবাসত। তাদের মধ্যে এক ঘর চাষীও ছিল। তার নাম হরিনাথ। সৌরদ্বীপ‌ তার বহু খাজনা ম‌ওকূপ করেছেন।আর শুধু তাই নয় তার ছেলেকে কলকাতার বড় কলেজে পড়াশোনা করার অনেক খরচ বহন করেছেন। যার ফলে চাষীর ছেলে চাকরি করে তাদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। সৌরদ্বীপের‌ এই অবস্থায় হরিনাথ তাকে ও তার মেয়েকে স্থান দেন। রূপে অহংকারী স্নিগ্ধার‌ প্রথম থেকেই বাবার উপর রাগ ছিল। চাষীর বাড়িতে স্থান নেয়ার জন্য তার রাগ উত্তরোত্তর বেড়ে যায়। এখানে না আছে চাকর-বাকর ,না আছে জমিদারি হালে থাকার ব্যবস্থা। অন্যদিকে চাষীর দুই ছেলে মেয়ে। মেয়ে মালতি আর ছেলে সোমেন‌। সোমেন কিছু দিন কলকাতায় চাকরি করে গ্ৰামে চলে আসে। সে কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করেছে। তাই তার ইচ্ছা ছিল গ্ৰামে এসে গ্ৰামের মানুষদের চাষাবাদের সঠিক কৌশল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জমির‌ উর্বরতা বৃদ্ধি জ্ঞান দিয়ে কৃষি ব্যবস্থার উন্নতি করা। তাই সে কলকাতা ছেড়ে গ্ৰামে আসে। কিন্তু গ্ৰামে এসে জমিদারের অবস্থা দেখে তার কষ্ট হয়। অন্যদিকে স্নিগ্ধা রূপে এত সুন্দর যে সোমেন তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। সোমেন ছোট থেকেই স্নিগ্ধাকে‌ ভালোবাসতো। অনেক দিন পর তাকে দেখে বাল্যকালের ভালবাসা জেগে উঠে। কিন্তু স্নিগ্ধার‌ গরিবদের প্রতি ঘৃণা আর অহংকারী মনোভাব সোমেনকে‌ আহত করে। জমিদারি হারালেও স্নিগ্ধা নিজেকে এখনও জমিদারের মেয়ে বলে মনে করে। তাই তার হুকুম সবার উপর বহাল থাকে। এদিকে সৌরদ্বীপ‌ সোমেনের‌ মনের কথা বুঝতে পেরে সোমেনের‌ সাথে স্নিগ্ধার‌ বিবাহ দেন এবং কিছুদিন পর মারা যান। এদিকে স্নিগ্ধা চাষী পরিবারকে ঘৃণা করে। তাই সোমেনকে‌ স্বামীর স্থান দিতে নারাজ। মাঝে মাঝে অনেক কটুক্তিও করে। সোমেন স্নিগ্ধাকে‌ বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। একদিন সোমেন নিজ জমিতে কাজ করছিল। মালতি স্নিগ্ধাকে‌ নিয়ে সোমেনের‌ খাবার দিতে যাচ্ছিল। খাবার স্নিগ্ধা দেয়না। তবে গ্ৰামটা ঘুরে দেখার জন্য মালতির‌ সাথে আসে। হঠাৎ এক চাষী মাথায় ধানের বোঝা নিয়ে যাবার সময় অসতর্কতা বশত স্নিগ্ধার‌ সাথে ধাক্কা লাগে। স্নিগ্ধা গরিবদের অত্যাধিক ঘৃণা করত। তাই সে চাষীর গালে সজোরে থাপ্পড় দিয়ে বলে -"ছোটলোক দেখে চলতে পারিস‌ না।"

চাষী ভয়ে তটস্থ হয়ে বলে -"ক্ষমা করবেন মা। মাথায় ধানের বোঝা থাকায় দেখতে পায়নি।"

"দেখতে পারিস নি নাকি সুন্দরী দেখলে চোখ ঠিক থাকে না।"
স্নিগ্ধার‌ চড়া গলায় অনেক লোক জমায়েত হয়। চাষী লজ্জায় মাথা নিচু করে কাঁদছে। মালতি স্নিগ্ধাকে‌ বোঝানোর চেষ্টা করেও না পেরে শেষে দৌড়ে সোমেনকে‌ ডেকে নিয়ে আসে। সোমেন ঘটনাস্থলে গিয়ে স্নিগ্ধার‌ এরূপ আচরণের জন্য যত রাগ ছিল সব রাগ দিয়ে স্নিগ্ধার‌ গালে থাপ্পড় মারে। তারপর হাত ধরে বাড়ি নিয়ে এসে ঘরে বন্ধ করে রেখে দেয় দুদিন। অনেক চেষ্টা করেও এই দুই দিনে মালতি বা সোমেনের‌ বাবা মা স্নিগ্ধাকে‌ বের করতে পারে না। তৃতীয় দিন সোমেনের‌ রাগ কমে যায়। সে বন্ধ ঘরের দরজা খুলে দেখে দুদিন অনাহারে থেকে স্নিগ্ধা অজ্ঞান হয়ে গেছে। সোমেন তাকে কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তার পর দুদিন আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করে স্নিগ্ধার‌ সেবা করে তাকে সুস্থ করে তোলে। কিন্তু অহংকারী স্নিগ্ধা জ্ঞান ফিরে সোমেনকে‌ দেখে তার সব মনে পরে যায় । সে সোমেনকে‌ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। সোমেন তাকে আটকায় না কারণ দুদিনে তার শরীর‌ও ভেঙে গেছে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্নিগ্ধা কোথায় যাবে ঠিক করতে না পেরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে যায়। ক্লান্ত স্নিগ্ধা এক গাছের নিচে আশ্রয় নেয়। হঠাৎ কিছু লোক তার দিকে অগ্রসর হয়। তাদের দৃষ্টি খুবই খারাপ। তারা স্নিগ্ধাকে‌ নিয়ে ঠাট্টা করতে থাকে এমন সময় সোমেন স্নিগ্ধাকে‌ রক্ষা করে। স্নিগ্ধা রাগে ক্ষোভে সোমেনকে‌ বলে -"কেন এসেছ তুমি চলে যাও।"
সোমেন উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে -"চলে যাব। তবে তোমার বাবা কিছু টাকা রেখে গেছিল তোমার জন্য তাই দিতে এলাম।"
এই বলে একটা থলে তার মুখের উপর ছুড়ে সোমেন চলে যায়। স্নিগ্ধা দুঃখে সেখানে বসে অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদে তার পর আস্তে আস্তে থলে উঠিয়ে চলে যায়। হাঁটতে হাঁটতে অন্য গ্ৰামে চলে যায়। সেখানে এক জমিদারের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। স্নিগ্ধা ভেবেছিল হয়ত তার রূপে মুগ্ধ হয়ে জমিদার তাকে রাজরাণী‌ করে রাখবে। কিন্তু দীর্ঘ পথ অতিক্রমে ক্লান্ত আর অনাহার শরীর যেমন তার সৌন্দর্যে মলিনতা‌ সৃষ্টি করেছে তেমনি তার ধূলোমাখা বস্ত্র দেখে কেউ তাকে চাকরাণী‌ ছাড়া অন্য কিছু মনে করবে না‌। তাই জমিদার তাকে আশ্রয় দিলেও চাকরাণীর‌ মতোই তাকে দিয়ে কাজ করায়। কাপড় ধোয়া,বাসন মাজা সব কাজ তাকে করতে হয়। এমনকি দুবেলা খাবার জন্য তাকে খোটা শুনতে হয়। কিন্তু স্নিগ্ধা মুখ বুজে সব সহ্য করে। শশুর বাড়ির আদরের কথা মনে পড়ে। জমিদারি হারানোর সত্ত্বেও মেয়ের মতো যেরূপ‌ ভালবাসা তারা দিয়েছে তা স্নিগ্ধা মনে পরে কষ্ট পায়। এক দুপুরে সবাই ঘুমিয়ে থাকলে সে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে এবং সোমেনের‌ বাড়ি চলে যায়। সে প্রায় পাঁচ দিন বাড়িতে নেই অথচ তাকে দেখে কেউ অবাক হয়না। কোন কথা পর্যন্ত বলে না। একবার তার দিকে তাকিয়ে শাশুড়ি নিজের কাজে মন দেয়। মনে হয় যেন কিছুই হয়নি। তার শশুর তাকে খুব ভালবাসত তাই তার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে -"এতদিন কোথায় ছিলে মা। মালতির‌ বিবাহের দিন এলে না। সোমেন বলল তুমি নাকি কোন মামার বাড়ি গিয়েছিলে। তোমার এই অবস্থা কেন মা। অনেক রোগা হয়ে গেছ।"

স্নিগ্ধা কোন উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকলো। লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাওয়া দাওয়া করে বিছানার এককোণে মূর্তির মত বসে থাকল। রাতে সোমেন ঘরে ফিরে স্নিগ্ধাকে‌ দেখেও কোন কথা বলল না। বিয়ের পর থেকে স্নিগ্ধা বিছানায় শুতো‌ আর সোমেন মেঝেতে। তাই সোমেন মেঝেতে মাদুর পাতার সময় স্নিগ্ধা বললো -"আজ তুমি উপরে শোও।"

সোমেন এবার স্নিগ্ধাকে‌ ভালো করে দেখল। স্নিগ্ধা সেই আগের স্নিগ্ধা নয়। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগের মত লাবন্য নেই।কথার মধ্যে অহংকার বা চড়া ভাব নেই। সোমেন বলল -"না স্নিগ্ধা আমি নিচেই শোব।"

"ক‌ই তুমি তো জিজ্ঞেস করলে না আমি এতদিন কোথায় আর কিভাবে ছিলাম।"-অভিমানের‌ সুর করে বলল স্নিগ্ধা।

"দেখতেই তো পাচ্ছি ভালো আছ হয়তো ভালো কোথাও ছিলে।"

এবার অভিমান কান্নায় পরিণত হলো। সোমেন কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থেকে তারপর স্নিগ্ধার‌ কাছে গিয়ে তার হাত দুটো জোর করে নিজের হাতের মধ্যে রেখে বলল -"আমি তো আনতেই চেয়েছিলাম তুমিই তো ফিরিয়ে দিয়েছ।"

"তুমি জোর করে কেন নিয়ে আসনি।"

"সে জোর কি আমার ছিল।"

"অবশ্যই তুমি আমার স্বামী হ‌ও‌ সে জোর তোমার ছিল।"

এবার স্নিগ্ধা সোমেনের‌ পায়ে মাথা গুঁজে কাঁদতে শুরু করল সোমেন জোর করে তাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।


৩টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...