সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০

পিতৃত্ব।(কলমে -- পারমিতা মন্ডল।)

বিষয়---অণু গল্প  (কলেজের ক‍্যানটিন।)
 নাম---পিতৃত্ব।
 কলমে--পারমিতা মন্ডল।

প্রতিদিনের মতো আজও কলেজের ক‍্যানটিনে এসে বসলো ওরা দল বেঁধে, হৈচৈ করতে করতে। এই সময়টা ওদের অফ পিরিয়ড থাকে। তাই জমিয়ে আড্ডা মারে । এর পরের ক্লাস কে,সি ম‍্যামের। ওটা করতেই হবে। মিস করা যাবে না , বলল ঋতম । রোহিত, ঋতম, পামেলা, সুতপা ,সবাই হাজির ক‍্যানটিনে ।

 ক‍্যানটিনে ঢুকেই শিবুদাকে হাঁক দেয় রোহিত।  ডেকে বলে "শিবুদা চা দিও আমাদের। সাথে বিস্কুটও দিও। লীনা পাশ থেকে বলে -"- শুধু বিস্কুট খাবো না রোহিত। একদম কিপটেমী করবি না। অন্য কিছু অর্ডার কর।" সাথে সাথেই সবাই যেন কথাটা লুফে নেয়। হ‍্যাঁ, হ‍্যাঁ আজ সবাই মিলে রোহিতের ঘাড় ভেঙেই খাওয়া হবে। বেচারা রোহিত কাঁচুমাচু মুখ করে বলে, -"দেখ ,দেখ পকেটে একটাও পয়সা নেই। শুধু বাস ভাড়া। এমন করিসনা তোরা।" ওরা নাছোড় বান্ধা । আজ রোহিতের থেকে ওরা খাবেই। এর আগে অনেকবার এড়িয়ে গেছে। আজ না খাওয়ালে মনে হয় ছাড়বে না। মনে মনে ভাবে রোহিত । কিন্তু----

হৈ ,চৈ শুনে শিবুদা তাড়াতাড়ি চা নিয়ে ছুটে আসে । বড্ড ভালোবাসে শিবুদা এই ছেলেমেয়ে গুলোকে। একদিন নিজের ও খুব ইচ্ছা ছিল কলেজে পড়ার  ,লেখা পড়া করার। কিন্তু হয়নি। স্কুলের গন্ডি পেরোতে না  পেরোতেই বাবা মারা যায়। সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে শিবুদার কাঁধে। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল শিবুদা। কিন্তু কোন জায়গা থেকে সেভাবে কোন সাহায্য পায়নি। তাই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়াশোনা আর করা হয়ে ওঠেনি। এখন কলেজের ক‍্যানটিন চালায় শিবুদা। এই ছেলেমেয়ে গুলো যেন তার মনের সুপ্ত ইচ্ছা পূরন করে। তাই ভীষণ ভালো বাসেন এদের।

 শিবুদা বললেন ," ঠিক আছে তোমাদের ঝগড়া করতে হবে না । আজ রোহিতের হয়ে আমি তোমাদের খাওয়াবো । তোমারা তো সবাই আমার ছেলের বয়সি । বলে রোহিতের দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকায়। রোহিত যেন ভরসা পায়।  সবাই একসাথে চিৎকার করে ওঠে ।"আজ খুব আনন্দ হবে। শিবুদা সবাইকে খাওয়াবে।"
 
বড়লোকের মেয়ে পামেলা রোহিতকে খুব ভালো বাসে। সে আপত্তি করে , বলে--"কেন একজন গরীব মানুষের ঘাঁড় ভেঙে খাওয়া হবে ?  আমরা সবাই কন্ট্রিবিউট করবো "।  কথাটি শিবুদা শুনে ফেলেন। সত্যিই গরীব মানুষের মন থাকতে নেই, ভালোবাসা থাকতে নেই , এমনকি ভালো থাকার অধিকারও নেই। অনেক দিন আগের একটি অপমানের কথা আজ আবার মনে পড়ে গেল।

  শিবুদার যখন বাবা মারা যায়, তখন লেখাপড়া ছেড়ে কলেজের এই ক‍্যানটিনে রান্না করার কাজ পায়। একরাশ স্বপ্ন চোখে নিয়ে যে একদিন কলেজে পড়ার স্বপ্ন দেখতো বলে  যে ছেলেটা ; আজ সে কলেজের ক‍্যানটিনের রাধুনী। স্বপ্ন গুলোকে বুকের মধ্যে চাপা দিয়ে,আটকে রেখে , কাজ করে যাচ্ছিল শিবুদা।  কিন্তু সেদিন সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে  সায়নের সাথে রাই এসে ঢুকলো ক‍্যানটিনে।  শিবুদার হার্টথ্রব ছিল রাই। ভীষণ ভালো বাসতো রাইকে । স্বপ্ন দেখতো দুজনে সংসার পাতার। শিবুদা রাইকে কথা দিয়েছিল যেভাবেই হোক লেখাপড়া চালিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ফিরে আসবে রাইয়ের কাছে। কিন্তু রাই কথা রাখেনি। তার মতো গরীব অসহায় মানুষের জন্য রাই অপেক্ষা করেনি। খুঁজে নিয়েছে বড়লোক বয়ফ্রেন্ড।  সে পারেনি তার ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে।

ক‍্যানটিনে সেদিন ওরা দুজনে হাতে হাত রেখে  অনেকক্ষন বসেছিল।রাই জানতো না এই কলেজের ক‍্যানটিনে শিবুদা কাজ করে ।তার জন্য  নিজেকে তৈরী করছে এখানে বসে। পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে কষ্ট করে শুধু রাইকে বিয়ে করবে বলে । কিন্তু সেদিনের পর মন ভেঙে যায়। আর পারেনি নিজেকে রাইয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে। মন চায়নি  আর।  সায়ন রাইকে খাইয়ে দিচ্ছিল। আর হাসিতে গড়িয়ে পড়ছিল। দূর থেকে সেদিন শিবুদা তার স্বপ্নের সমাধী দেখেছিল। তারপর কেটে গেছে অনেক বছর। 

শিবুদার আর কখনোই ইচ্ছা হয়নি লেখাপড়া করার। সেদিন ক‍্যানটিনের পাশের টেবিল থেকে কেউ একজন শিবুদা এক কাপ চা বলে হ‍্যাঁক দেয়। "শিবু" নাম শুনে চমকে গেছিলো রাই সেদিন । চায়ের কাপ নিয়ে রাইয়ের সামনে এসে দাঁড়ায় শিবুদা। চোখ তুলে তাকায় রাই। চোখাচোখি হয় দুজনের। কিন্তু কেউ কাউকে পরিচয় দেয় না। রাই তো অপেক্ষা করেনি তার জন্য । ওরা চলে গেলে শূন্য ক‍্যানটিনে সেদিন শিবুদা চিৎকার করে কেঁদেছিল।   কিন্তুবিশ্বাসঘাতক  রাইকে কখনোই আর ফিরে চায়নি তার জীবনে। 

রোহিত শিবুদারই ছেলে। নিজের সবটা দিয়ে শিবুদা ওকে মানুষ করছে নিজের পরিচয় লুকিয়ে।  তার মতোই পড়াশোনায় খুব ভালো। কিন্তু কেউ জানেনা সে শিবুদার ছেলে।   বিশেষ করে পামেলা।  শিবুদা জানে সে অন‍্যায় করছে। তবুও নিজের  জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা সে ছেলের জীবনে হতে দেবে না ।রোহিত একদিন অনেক বড় হবে, অনেক বড় চাকরি করবে, তাখন পামেলা তাকে ছেড়ে যাবে না ।  রোহিত যে ওকে বড্ড ভালো বাসে ।ততোদিন না হয় তাঁর পিতৃত্বটা লুকানোই থাক । 

সমাপ্ত।
কলমে----পারমিতা মন্ডল।

৬টি মন্তব্য:

  1. দারুন লাগলো নিজের কলেজ জীবনে ফিরে গেলাম😊😊

    উত্তরমুছুন
  2. বেশ সুন্দর লাগল। ধন্যবাদ। 💯💯💯👍👍👌👌💥💥💫💫❤❤💅💅💅

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভাল।বাবা--মায়ের কোন বিকল্প হয় না।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...