বিকল্প মা।
পারমিতা মন্ডল।
আজ আট বছর হলো ওদের বিয়ে হয়েছে ।ওরা মানে নীল আর তিতাসের ।দুজনেই ইঞ্জিনিয়ার । তাই কর্ম সূত্রে দুজনকে দুদিকে থাকতে হয় । নীল থাকে মুম্বাই ।আর তিয়াসার অফিস কলকাতাতেই । তাই ওদের দেখা সাক্ষাৎ খুব কম ই হয় ।নীল অনেক চেষ্টা করেছে কলকাতায় আসার জন্য ।কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কলকাতায় ভালো কাজের অফার পায়নি। তাই ট্রান্সফার নেয়নি । অন্য দিকে তিয়াসাও চেষ্টা করেছিল মুম্বাই তে যদি কোন ভাল কাজ পায় তাহলে চলে যাবে। কিন্তু সেটাও ,হয়নি। নীল একবার তিয়াসা কে বলেছিল সব ছেড়ে মুম্বাইয়ে চলে আসতে ।
।
কিন্তু তিয়াসাও চাকরি ছেড়ে যেতে চায় নি । তাই দুজন দুদিকে ।
কিন্তু তাই বলে ওদের মধ্যে কোন ঝগড়া বিবাদ নেই। দুজনেই খুব সহজেই এই জীবন মেনে নিয়েছে ।আসলে ওরা দুজনে খুব বন্ধু ছিল । সেখান থেকে ওদের মধ্যে প্রেম হয় ।দীর্ঘদিন প্রেম করার পর দুজনেই যখন চাকরি পায়, তারপর বিয়ে করে।এই পযর্ন্ত সব ঠিক ঠাক চলছিল ।কিন্তু সমস্যা হলো বিয়ের এতদিন পর ও বাচ্চা না হওয়ায়। দু- দু -বার বাচ্চা এসেছিল তিয়াসার গর্ভে ।কিন্তু ধরে রাখতে পারে নি ।মিস্ ক্যারেজ হয়ে যায়।ডাক্তার বেডরেস্ট নিতে বলেছেন । কিন্তু তাও শেষ রক্ষা হয়নি।
এই ভাবে কেটে গেল আট আটটা বছর । এখন তিয়াসা ট্রান্সফার নিয়ে মুম্বাইতে চলে এসেছে । একটা সমস্যা মিটেছে ঠিক ই , কিন্তু দিন শেষে বাড়িটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে । ওরা ভেবেছিল দত্তক নেবে ,একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে । তাকেই নিজের সন্তানের মতো গড়ে পিঠে মানুষ করে তুলবে । কিন্তু সেখানেও এমন আইনি সমস্যা দেখা দিল যে সেটাও সম্ভব হলো না । খুব ভেঙে পড়ে তিয়াসা। তাহলে সে কি আর কোন ভাবেই মা ডাক শুনতে পাবে না ! নীলের ও খুব খারাপ লাগে , মনে মনে কষ্ট হয় ।কিন্তু তিয়াসার কাছে কিছুই বলে না ।
একদিন অফিসে খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে একটা খবরে তিয়াসার চোখ আটকে গেল। সরোগেট মাদার । কর্ম ব্যাস্ত মায়েরা বিদেশে এই পদ্ধতিতে মা হয় ।এতে করে দশমাস দশদিন সন্তান গর্ভে ধারণ করে ঘুরে বেড়ানোর সমস্যা যেমন নেই তেমনি কোন মায়ের যদি সমস্যা থাকে তাহলে তিনিও অন্যের গর্ভ ভাড়া নিয়ে মা হওয়ার আনন্দ পেতে পারে । তিয়াসার মুখ আনন্দে চক্ চক্ করে ওঠে । তাহলে উপায় আছে ।সেও মা হতে পারবে । কিন্তু সরোগেট মাদার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না তিয়াসা । তাই সেদিন একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বাড়িতে চলে এলো ।নীলের সাথে কথা বলতে হবে ।
নীল বাড়িতে এলে তিয়াসা তাকে কাগজ টা দেখায়। কিন্তু নীলের ওএ সম্পর্কে বিশেষ কোন ধারণা না থাকায় সেও কিছু বলতে পারে না । তখন ওরা ঠিক করে ডাক্তারের কাছে যাবে ।ইন্টারনেটে ঘেঁটে ওরা ডাক্তারের খোঁজ বের করে। তারপর যোগাযোগ করে ডাক্তার নয়না দাসের সাথে ।তখন ওরা জানতে পারে সরোগেট মাদার কি ?
আসলে যেসব দম্পতিরা নিঃসন্তান অথবা গর্ভ ধারনে অক্ষম বা কর্মব্যাস্ত , যেখানে সন্তান গর্ভে ধারণ করে কাজে যাওয়া খুব কষ্টকর
তারা এই পদ্ধতিতে সন্তান নিতে পারেন । আসলে ব্যাপারটা হলো বাবা ও মায়ের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু নিয়ে ভ্রুণ তৈরী করে গর্ভ ভাড়া দেওয়া মায়ের গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয় । যার গর্ভে এই ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করা হয় তিনি হলেন সরোগেট মাদার । অর্থাৎ বাংলা ভাষায় হলো বিকল্প মা ।তখন বাচ্চাটি ঐ সরোগেট মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠে ।এবং জন্মোর পর ঐ মায়ের আর কোন অধিকার থাকে না বাচ্চার উপর । তখন ঐ সন্তান কে তুলে দিতে ,হয় দম্পতির হাতে । এর পরিবর্তে সরোগেট মাদার অনেক টাকা পান । কিন্তু তিনি কোনো ভাবে ই সন্তান দাবি করতে পারবেন না ।
সব শুনে এলো নীল আর তিয়াসা ।টাকা না হয় দেওয়া গেল, কিন্তু এমন মা কোথায় পাওয়া যাবে ? তবে আমাদের মতো গরীব দেশে সব কিছু ই সম্ভব । আর্থিক অনটন দূর করার জন্য মানুষ এমন কাজকেও পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ।তবে শুধু আর্থের জন্য নয় , একজন নিঃসন্তান দম্পতির মুখে হাসি ফোটানো ও একটা মহৎ কাজ । এতে দুপক্ষের ই লাভ ।একজন নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান পায় ,অন্য দিকে একজন গরীব মা তার সন্তানকে লালন পালন করার , ভালো ভাবে বাঁচার জন্য কিছু আর্থিক সুবিধা পায় । অনেক খুঁজে তিয়াসার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়কে পেল ।
সম্পর্কে তিয়াসার বোন হয় । খুব গরীব ।একসময় তিয়াসার বাপের বাড়িতে কমলা থাকতো। ওর মাকে কাজে সাহায্য করতো। অনেক গুলো ভাইবোন , তাই কমলাকে তাদের বাড়ি তে দিয়েছিল কাজ করার জন্য । তারপর কমলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে ওর বাবা এসে ওকে নিয়ে যায় । পরে শুনেছে কমলার স্বামী ও নাকি ভালো হয়নি । সংসারে এমনিতেই অনটন ছিল , তারপর পরপর তিন খানা মেয়ে হওয়াতে ওর বর ওকে মোটেই পছন্দ করে না । দিন রাত অশান্তি লেগেই থাকে ।একদিন তিয়াসার মায়ের কাছে এসে ছিল কিছু টাকার জন্য । অবশেষে কমলাকে খবর পাঠানো হলো । অনেক বুঝিয়ে ওর স্বামীকে রাজি করানো গেল ।
কমলাকে নিয়ে ওরা চলে এলো মুম্বাই ।সমস্ত আইনি সমস্যার সমাধান করে কমলাকে ওরা ক্লিনিকে নিয়ে গেল। সেখানে কমলার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হলো নীল আর তিয়াসার সন্তানের ভ্রুন কে । পুরো কাজটা সফলতার সাথেই হয়েছে ।আর কোন চিন্তা নেই ।এবার শুধু সময়ের অপেক্ষা । কমলাকে ওরা ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল । নয় মাসের অপেক্ষা, তারপর সন্তানের মুখ দেখবে নীল আর তিয়াসা। আনন্দ যেন ধরছে না আর । ওরা ঠিক করে রেখেছে ছেলে হলে কি নাম দেবে আর মেয়ে হলে কি নাম দেবে ।
কমলার যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেই জন্য একজন আয়া রেখে দিয়েছে । সে সময় মতো কমলাকে খাবার ,ঔষধ দেয়। কোনো রকম অনিয়ম হতে দেয় না । । কমলা জীবনে কোনো দিন এতো আদর যত্ন পায়নি ।যদিও সে জানে এটা তার জন্য নয় , তবুও বেশ ভালো লাগে ।কিছু দিনের জন্য সে অন্তত বড়লোকের মতো থাকতে পারছে । বাড়িতে। অনেক টাকা দিতে পেরেছে । তার স্বামী এবার হয়তো অশান্তি টা একটু কমাবে । তবে সে যখন ভালো ভালো খাবার খায় ,তখন তার মেয়েদের কথা ভেবে চোখে জল চলে আসে । শত হলেও মা তো। সন্তানদের ফেলে এতো ভালো ভালো খাবার খেতে মন খারাপ হয়ে যায়।তবুও ওদের জন্যে সে এ কাজ করছে বলে মনকে স্বান্তনা দেয় ।
এই ভাবে দেখতে দেখতে নয়টি মাস কেটে গেল ।আজ সেই শুভদিন । নীল আর তিয়াসার সন্তান আজ প্রথম পৃথিবীর আলো দেখবে । খুব খুশির দিন আজ ।ডাক্তার বলেছেন কোন অসুবিধা নেই, সব কিছুই নরমাল ।সুস্থ সবল সন্তান ই জন্ম নেবে। সকাল বেলাতেই ভর্তি হয়েছে কমলা ।নীল আর তিয়াসা অধীর আগ্রহে ক্লিনিকের বাইরে অপেক্ষা করছে । কখন সুখবর আসবে । আর যেন দেরী সইছে না তাদের । বেলা তখন একটা দশ । কমলা জন্ম দিল এক ফুটফুটে সন্তানের ।যেন এক রাজপুত্র । চারিদিকে খুশির হাওয়া ছড়িয়ে পড়লো । নীল আর তিয়াসা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল ।তাদের এতো দিনের স্বপ্ন আজ বাস্তবে পরিনত হলো ।খুশিতে হাসপাতালের সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালো ওরা । ।সন্তানের মুখ দেখে তারা এতোটাই খুশী হলো যে যে যা বকশিশ চাইলো তাই -ই দিয়ে দিল।
এবার ঘরে ফেরার পালা ।ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো তিয়াসা। কমলাকে ও নিয়ে এলো । সাধারণত গর্ভধারিনী মা যখন অঞ্জান থাকেন তখনই বায়োলজিক্যাল মায়ের হাতে সন্তানকে তুলে দেওয়া হয় । কিন্তু এখানে কমলা যেহেতু তাদের পরিচিত , এবং অনেক দূরে থাকে তাই সেটা করা হয়নি ।তাকেও নিয়ে এসেছে তিয়াসা। তবে টিকিট কাটা হয়ে গেছে। এবার কমলার ফেরার পালা । কিন্তু বাচ্চাটার উপর কমলার মায়া পড়ে যায়। সে ভাবে "এতো আমার ই সন্তান । প্রসব যন্ত্রণা তো আমি ই ভোগ করেছি। সব কষ্ট আমি সহ্য করে ওকে আমি জন্ম দিয়েছি ।তবে ওরা তো আমাকে বাচ্চার কাছে যেতে দিচ্ছে না । এতদিন কষ্ট করে সন্তান তো আমি পেটে ধরেছি ।সব কষ্ট মুখ বুজে আমি সহ্য করেছি ।ওতো আমার নাড়ীছেড়া ধন। কি করে এ বাচ্চা ওদের হয়। আমি তো মুখ্য সুখ্য মানুষ। অতো কিছু বুঝি না । তবে এ বাচ্চা যে আমার সেটা বুঝতে পারছি। কেমন দেবশিশুর মতো সন্তান হয়েছে।একটা ছেলের জন্য আমার বর কতো গালমন্দ করেছে। পর পর তিন খানা মেয়ে । এই ছেলেকে দেখলে আমার বর খুব খুশি হবে।"
কমলার আগামীকাল চলে যাওয়ার কথা । কিন্তু ছেলেকে ছেড়ে সে যেতে চাইছে না ।মন কেমন করছে । কমলা তিয়াসা কে বলে একটা রাত যেন ছেলেকে একটু তার কাছে থাকতে দেয়। কিন্তু তিয়াসা রাজি হয়না । ওরা যেন কেমন হয়ে গেছে। এই যে কমলাকে এতো যত্ন করতো, এতো ভালো বাসতো এখন যেন চিনতেই পারেনা। ছেলেকে পেয়ে কমলার কথা ভুলে গেছে। কিন্তু ছেলে টাতো কমলার ও। কমলা আইনের কথা অতো কিছু বোঝেনা ।সন্তানকে সে পেটে ধরেছে , তাই সন্তান তার। কিন্তু তবুও তাকে সন্তান কে ছেড়ে চলে যেতে হবে । মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
আজ সকাল বারোটায় ট্রেন।
।কমলা আজ চলে যাবে ।তার টাকা পয়সা সব সে বুঝে পেয়েছে চুক্তি মতো । তাই তার আর কোনো দাবী নেই । কিছুক্ষন আগে তিয়াসা দেখে এসেছে কমলা রেডি হয়ে গেছে । নীল অফিস গেছে ।কয়েক দিন অফিস কামাই হয়ে গেছে ।তাই যেতে হয়েছে । তবে তিয়াসা কিছু দিন ছুটি নিয়েছে । ছেলেকে আয়া মাসির
কাছে রেখে একটু টুকিটাকি কেনাকাটা করতে গেল তিয়াসা, কমলার জন্য । এসে কমলা কে গাড়িতে তুলে দেবে ।
এদিকে আয়া মাসি কমলার কাছে ছেলেকে রেখে বাথরুমে যায় । বাথরুম থেকে বেরিয়ে সে কমলাকে আর কোথাও দেখতে পায়না । সারা বাড়ি খুঁজে না কমলাকে পায় , না বাচ্চাটাকে পায় ।ভয়ে আয়া মাসি কাঁদতে শুরু করে দেয়। এদিকে তিয়াসা ফিরে আসে । সেও সারা বাড়িতে খুঁজে কোথাও কমলাকে পায় না । কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না । নীলকে ফোন করে । নীল ও তাড়াহুড়ো করে বাড়িতে চলে আসে । পুলিশে খবর দেওয়া হয় । এদিকে খোঁজাখুজি করতে করতে কমলা যেখানে থাকতো সেই ঘরে একটা চিঠি পায় তিয়াসা ।তাতে কাঁচা হাতে লেখা------
"
"দিদি আমি মুখ্য সুখ্য মানুষ। এতো কিছু বুঝি না ।কিন্তু এ সন্তান তো আমার পেট থাকেই বেরিয়েছে ।ওতো আমার নাড়ীছেড়া ধন। তিন তিনটি মেয়ের পর আমার ছেলে হয়েছে ।একেবারে দেবশিশু। আমি ওকে ছেড়ে যেতে পারবো না ।তাই নিয়ে চলে গেলাম । "
চিঠি পড়ে তিয়াসা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে ।এবার সে কি করবে ? তীরে এসে যে তরী ডুবে গেল ।
সমাপ্ত।
অসাধারণ! এই না হলে গল্প! ধন্যবাদ। 👌👌👍👍💥💥💫💫💯💯❤❤
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো
উত্তরমুছুনকিছু বলার নেই।খুব ভাল লিখেছ এটাই বলব এক কথায়।
উত্তরমুছুনখুবই সুন্দর। ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুন