# নাম - 'যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি'
(পর্ব- ৫)
(আধ্যাত্মিক)
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
নরেন্দ্র নাথ দত্ত। সিমলা পল্লির। বিশ্বনাথ দত্ত ও ভুবনেশ্বরী দেবীর ছেলে। বিশ্বনাথ দত্ত পেশায় ব্যারিস্টার। বিরাট নাম ডাক। একদিকে দত্ত পরিবার। অন্যদিকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি।
বাবা বিশ্বনাথ দত্তের ব্যারিস্টারির বড্ড রসকসহীন জীবনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে খুব টান ছিল। রসকসহীন জীবনে ওটুকুই যা রসের জোগান দিত।
১৮৭৭ সাল। নরেন্দ্রনাথ তখন চোদ্দ বছর। নরেনের তো খুব মন খারাপ। বাবা বাড়িতে নেই। কাজের জন্য বাড়ি ছেড়ে আছেন মধ্যপ্রদেশের রাইপুরে। বাবা নরেনকে চিঠি লেখেন। সেই চিঠি পেলে নরেন ক'টা দিন ভালো থাকেন। কিন্তু বাবা কবে আসবেন? মাকে তিষ্ঠোতে দেন না। হঠাৎ একদিন নরেনের নামে চিঠি না এসে স্ত্রী ভূবনেশ্বরী দেবীর নামে চিঠি এলো। নরেন তো খুব খুশি। তাতে তিনি লিখেছেন নরেনকে নিয়ে রাইপুরে চলে আসতে। কাজের বড্ড চাপ। তিনি এসে নিয়ে যেতে পারবেন না। নরেন যথেষ্ট বড় হয়েছে। নরেনের সঙ্গে যেন চলে আসেন। ব্যাস নরেনের সেকি আনন্দ! আহ্লাদে আটখানা। পারবেন না মানে! আলবত পারবেন। তিনি এখন অনেক বড়!
লাঠিখেলায় ওস্তাদ। বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন। দক্ষ সাঁতারু। নিয়মিত কুস্তি করেন। কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে নবগোপালবাবুর আখড়ায় সে মল্ল যুদ্ধ থেকে অসি-চালনা, জিমন্যাস্টিক খেলা দেখানোয় অস্তাদ, আবার ঘোড়ায় চড়তেও কমদক্ষ নন...কোনটা শিখতে বাকি আছে! এখন তো রীতিমত বীরপুরুষ! সে রাইপুর হোক না অনেক দিনের পথ- এলাহাবাদ ও জব্বলপুর হয়ে নাগপুর পর্যন্ত ট্রেন। তারপর সেখান থেকে চোদ্দদিন ধরে অরণ্য পথ ধরে একমাত্র গরুর গাড়িতে চেপে রাইপুর পৌঁছতে হবে।
নির্ভীক নরেন তো মাকে নিয়ে বেরিয়েই পড়লেন। কিন্তু মায়ের মন বলে কথা। এতটা পথ! দুধের শিশু নরেন কি পারবে! স্বামী কেন যে নরেনের উপর দায়িত্ব দিলেন বুঝে উঠতে পারছেন না।
আর নরেন ভেতরে ভেতরে তো দায়িত্ব পেয়ে খুব খুশি। মায়ের সামনে ছেলে কতটা বীরপুরুষ দেখানো হয়ে যাবে। গুরু দায়িত্ব বলে কথা। আর এই দায়িত্ব যদি পালন করতে না পারবেন তাহলে এতোসব শিক্ষা কিসের!
নরেন্দ্রনাথ তো অনায়াসে পৌঁছে গেলেন মাকে নিয়ে। থাকতে হবে,সে তো চারদিন নয়। বৎসরাধিক। তাহলে নরেনের পড়াশোনার কি হবে! রাইপুরে ভালো স্কুলও নেই যে ভর্তি করে দেবেন। অবশ্য রাইপুরে বিদ্যান ব্যক্তিদের অভাব নেই। তাঁরা বিশ্বনাথ দত্তের বাড়িতে প্রায়ই আসেন। নানা বিষয়ে সাংস্কৃতিক আলোচনা হয়। বড়দের আলোচনায় ঐটুকু ছেলের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। আড়ালে থেকে আলোচনা কানে যায়। আর অতিথিগণ চলে গেলে আলোচনা যতটা বুঝেছেন তাই নিয়ে বাবার সঙ্গে আলোচনা করেন। চন্দনের পাশে থাকলে যেমন চন্দন হয়ে যায়,এও ঠিক তেমনি।
সেই সঙ্গে বিশ্বনাথ দত্ত ছেলের নিঃসঙ্গতা কাটাতে রীতিমত সঙ্গীত চর্চা শুরু করে দিলেন। বিশ্বনাথ দত্ত সঙ্গীতজ্ঞ ও রসিক মানুষ। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ধারা তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। আর নরেনের অপূর্ব গলা দেখে বিশ্বনাথ দত্ত তো পেয়ে গেলেন সঙ্গীত চর্চার আরো রসদ। ঠুংরি, টপ্পা,গজলে বিশ্বনাথ দত্তের অগাধ ব্যুৎপত্তি ছিল। আর তাই নরেনের গলায় শুনে গানের মজলিস জমে উঠত। এইভাবে দেড় বছর রাইপুরে কাটিয় শেষে কলকাতায় ফিরলেন সপরিবারে বিশ্বনাথ দত্ত।
ইতিপূর্বে নরেনের জন্মের তিন বছর পরে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মেজবাবু মথুর বিশ্বাসকে নিয়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এসেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে। ঠাকুর তখন ৩০, দেবেন্দ্রনাথ ৪৯ বছরের।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করেই ঠাকুর দিব্য দৃষ্টিতে ঠাকুর পরিবারের অন্দরমহল দেখে ফেললেন। দেখলেন অনেক ছেলেপুলে। মহর্ষি যেন কলির জনক। একাধারে নিষ্ঠাবান সংসারি। অন্যদিকে ঈশ্বরে প্রবল ভক্তি। ঠাকুর ঈশ্বর ভক্তির কথা শুনতে চাইলেন। মহর্ষি বেদ পাঠ করে শোনান। এই সাক্ষাৎকারের মাহেন্দ্রক্ষণে বালক রবিও রাইপুরে নরেনের মতো আড়ালে থেকে গভীর আগ্রহে উভয়ের আলোচনা শোনার চেষ্টা করেছিলেন। বালক রবি তখন পাঁচ বছরের।
ঠাকুর ও মহর্ষির এই সাক্ষাৎকারটিই যেন রবির মধ্যে ব্রহ্মোপাসনার সলতে পাকালেন ঠাকুর। আর শলাকা যোজনা করবেন মহর্ষি। অর্থাৎ ব্রহ্মোপলব্ধির কৃপার উৎসে ঠাকুর, পরবর্তীতে প্রেরণা পিতা মহর্ষি। ১৮৮১ পর্যন্ত চললো তারি প্রস্তুতি। রামকৃষ্ণলোকের আশীর্বাদে বিশ্ব খ্যাতি অপেক্ষা করবে জোড়াসাঁকোর রবি,আর সিমলাপল্লীর দুরন্ত বিলে তথা নরেনের জন্য।
১৮৭৭-এ নরেন যখন মেট্রোপলিটনের ছাত্র, সেই স্কুলে সহপাঠী মহর্ষির নাতি ( দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র )দ্বিপেন্দ্রনাথ। আভিজাত্যে কোথায় নরেন, কোথায় দ্বিপেন্দ্র। দ্বিপেন্দ্রের সূত্রে নরেনের জোড়াসাঁকোতে যাতায়াত মাঝেমধ্যে হয়। ইতিমধ্যে বছর দেড়েক রাইপুরে থেকে ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে সাময়িক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।
কিন্তু নরনের মহর্ষিকে ভালো লাগে, মহর্ষির মগ্ন উপাসনার জন্য। মহর্ষি যে ব্রহ্মোপাসক। ঈশ্বরের সন্ধান দিলেও দিতে পারেন। মহর্ষিই তাকে বলেছেন ধ্যানের মাধ্যমে নিরাকার ব্রহ্মের উপলদ্ধি হয়। এই নিয়ে একটি ঘটনা ঘটেছিল।
একদিন মহর্ষি গঙ্গা বক্ষে বোটে ভেসে চলেছেন। উপাসনায় মগ্ন। হঠাৎ নরেন সেই বোটে উঠে পড়লেন ঝড়ের গতিতে। মহর্ষির মুখোমুখি। মহর্ষি খুব রুষ্ট হলেন। এসময়ে তার কাছে ঘেঁষবার কারো সাহস হয় না। নরেনের অতশত ভাবার সময় নেই। একটুও সময় নষ্ট না করে নরেনের সরাসরি প্রশ্ন - আপনি ঈশ্বর দেখেছেন? তখন মহর্ষি শান্তভাবে বললেন, তাঁকেতো দেখার উপায় নেই, ধ্যানে উপলব্ধি করতে হয়। নরেনের ধ্যান যেহেতু প্রিয়,তাই মহর্ষি-বৃত্তে চলার অভ্যাস এলো। কিন্তু স্বস্তি কোথায়!
ব্রাহ্মসমাজ মোটামুটি পছন্দের। এঁরা গুরুবাদে ও অবতারবাদে বিশ্বাসি নয় বলে। আর পছন্দের কারণ উপনিষদের মন্ত্রে আত্মশুদ্ধির কথা বলে বলেই। তাই মহর্ষিতে বিশ্বাস আপাতত রাখা যেতেই পারে,কেননা তিনি সাধক। তিনি সত্যদ্রষ্টা। তবে ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হতে ভেতর থেকে কোনো সায় জাগে না। আশ্বস্ত কেবল সহপাঠী দ্বিপেন্দ্রনাথতো আছে। ব্রাহ্মসমাজের অনুষ্ঠানে ডাকের অভাব হবে না। হয়ও তাই। ব্রাহ্মসমাজে নরেনের বড়ই কদর গানের জন্য। সমাজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া তার নিয়ম ছিল। তাইতো জোড়াসাঁকোতে যাতায়াত ছিল অবাধ।
ব্রাহ্মসমাজে গানের জন্য গাইয়ে রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথের দ্বৈত ভূমিকা সে আর বলতে!
(চলবে)
@ copyright reserved for Mridul Kumar Das.
খুব ভালো। তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা। লিখতে থাকুন।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤🙏🙏
মুছুনখুব সুন্দর করে লেখা ,পড়ে মন ভরেগেলো
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤🙏🙏
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগছে। পরের টার অপেক্ষায় রইলাম 💐💐
উত্তরমুছুনখুব তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা।চালিয়ে যাও ভাই।বিদ্বান বানান ঠিক করে দিও।
উত্তরমুছুনজানা অজানার পথে চলেছি।দেখি গন্তব্য কোথায় নিয়ে যায়!
মুছুন