মঙ্গলবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০

# বিষয় - আধ্যাত্মিক (✍- মৃদুল কুমার দাস। )

# নাম- 'যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি'||

                  (পর্ব- ৪)
        ✍ -

মৃদুল কুমার দাস।
           ‌ ‌      
     দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে খ্রীষ্টান ধর্ম
যাজক সেন্ট ফ্রান্সিস বলেছিলেন
জগতকে মা ও বোন রূপে দেখতে।
আর ঊনিশ শতকে আমাদের ঠাকুরও
তাই বললেন__
    " ....তুমি যদি সকল নারীকে নিজের মা বলে মনে কর তাহলে তোমার মধ্যে কামের উদ্রেক হবে না।....যে নারীকে ঘৃণা করে,তার মধ্যেও কামনার রেশ আছে।....সকল নারীকে যে নিজের মা রূপে শ্রদ্ধা ও ভালবাসতে শিখেছে সে কখনো কামের বশবর্তী হয় না।"
         নরেন্দ্রনাথকেও ঠাকুর তাই বলতেন__
" কি জান,আমার মাতৃভাব-সন্তানভাব। মাতৃভাব অতি শুদ্ধভাব এতে কোনো বিপদ নাই। স্ত্রী ভাব,বীর ভাব__বড় কঠিন,ঠিক রাখা যায় না,পতন হয়...।"
   এই থেকে স্বামীজী বামাচারীদের পছন্দ করতেন না। বামাচার হল মেয়েমানুষ নিয়ে সাধন,আবার একটি পুরুষ না হলে মেয়েমানুষের
সাধন-ভজন হবে না। এই বামাচার সাধন সম্পর্কে ঠাকুর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন-
   "...দেখলাম,যে লম্বা লম্বা কথা কয়, সেই আবার ব্যাভিচার করে...এ সাধন বড় নোঙরা সাধন,যেমন
পাইখানার মধ্য দিয়ে বাড়ির ভিতর ঢোকা।"
  এই হলেন আমাদের ঠাকুর।
     ধনীর প্রাসাদ থেকে গরীবের পর্ণ কুটির পর্যন্ত ঠাকুরের যে নিত্য যাতায়াত। ঘরে ঘরে মা ভবতারিণীর কৃপা বিতরণটা যে তাঁরই দান। মা নিয়েই ঠাকুরের যত ওঠা-বসা। যত কর্মময়তা। যেন খ্রীষ্টানের কর্মময়তায়
তিনি,হিন্দুর আধ্যাতিকতায় তিনি,বৌদ্ধের করুণায়,আর ইসলামের ভ্রাতৃত্বে। তাই নিয়ে তিনি মা ভবতারিণীর ছেলে। জগৎ ব্যাপি মা ছাড়া তাঁর কেই বা আছে।
         তবে রাজার প্রাসাদ থেকে পর্ণকুটির পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দীতো মাতিয়ে রেখেছেন রামায়ণের রাম,আর মহাভারতের
কৃষ্ণ। যিনি রাম,তিনিই কৃষ্ণ___এই দুই
মিলে আমাদের ঠাকুর 'শ্রীরামকৃষ্ণ'। ঠাকুরের নিজ মুখে তাইতো স্বীকারোক্তি।
     কিন্তু সংশয়বাদী যাঁরা, তাঁদের সংশয়ের তো শেষ নেই। তবে এটা স্বীকার করতে বাধ্য তিনি সর্বধর্ম সমন্বয়ের পথিকৃৎ।
  তবে এতেও সংশয় যাওয়ার নয়। সংশয়টি হলো,ঠাকুরতো নারীকে মা বলে ভাবতে শেখালেন। আর সেই মা যে আজও লাঞ্ছিতা। ভগিনী ও ভার্যা নির্যাতীতা যার দ্বারা সেই মহাপাপীদের তো কোনো শাস্তি হচ্ছে না।
   ঠাকুর তাদের শাস্তির বদলে শ্রীচৈতন্যের মতো কোল বা আশ্রয় দেওয়ার কথা বললেন। কিন্তু 'রামায়ণ' 'মহাভারত'-এ স্বয়ং ভগবান যে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের কথা বলেছিলেন। তিনি তাই করেও দেখিয়েছেন।
     কিন্তু আমাদের ঘরের ঠাকুরের মধ্যে তো সেই বীর ভাব দেখলাম না। বীরত্ব ভাবের তো খুব দরকার ছিল। কেননা এক বৈদেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যে বড্ড বেশী শাসন, শোষন,নিপীড়ন করছে। চতুর্দিকে অরাজকতা নাশ করতে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য যদি শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব ঘটে, আমাদের ঠাকুরেরও তো আবির্ভাব ঘটেছে একই ক্রান্তিকালে। তাহলে!
  অবশ্য শিষ্য স্বামীজীর মধ্যে সে সম্ভাবনা ছিল, সেই অনন্ত সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছিল। কিন্তু ঠাকুর সরিয়ে নিলেন এই ঘোলা জল থেকে। যদি না সরিয়ে নিতেন তাহলে এক অন্য ইতিহাস রচিত হতো নিঃসন্দেহে। ঠাকুর সরিয়ে নিয়ে বিশ্ববাসীকে দেখালেন নরেনের কেন ও কী করার জন্য ধরিত্রীতে আবির্ভূত!
    স্বামীজীর বীরত্বের সবটাই শুষে নিল সন্যাস বেশধারণ। স্বামীজীর জন্য রাজনীতির সাদর আহ্বান ছিল, কিন্তু সন্যাসীর পায়ে বেড়িই তাঁকে তা আর হতে দেয়নি।
  হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম দুই মহাকাব্যের মূল পরিচয় অবতারত্ব। পরস্ত্রী অপহরণ হোক বা প্রকাশ্য রাজসভায় নারীর অপমানের ফলস্বরূপ হোক, যুদ্ধ সে রাম-রাবণের, কিম্বা একটা আঠারো দিনের কুরুক্ষেত্র প্রাঙ্গণে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যদি হয়,ইংরেজ তাড়ানোর একটা যুদ্ধের কি দরকার ছিল না? না সে জাতীয় যুদ্ধও হলো না! তবে যুদ্ধ হয়েছে,যে যুদ্ধের অস্ত্র স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ,বিপ্লব-আন্দোলন,যার শ্লোগান 'বন্দেমাতরম'।
দুই মহাকাব্যের যুদ্ধ ছিল পারিবারিক ঝামেলা নিয়ে, নারীর সম্ভ্রম হানি নিয়ে। লঙ্কাকাণ্ডের যুদ্ধে রাম স্ত্রী উদ্ধার করতে যতটা না গেছেন, তিনি যেন তাঁর ভক্ত রাবণকে উদ্ধার করতে লঙ্কায় বেড়াতে গেছেন।
   ভক্তের হাতে যদি সীতা অপহৃতা হন, তাহলে কীসের অগ্নিপরীক্ষা! অগ্নিপরীক্ষা লঙ্কায় তো হলোই, শেষে অযোধ্যায়ও হলো। তা বলে দু'বার! নারীর সম্রম রক্ষার জন্য যুদ্ধ যে হাতে,সেই হাতেই অগ্নিপরীক্ষা! এ কি ধরণের নিয়ম?
আর কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণতো পুরোপুরি নিজের পাবলিসিটি করেছেন। ধুরন্ধর রাজনীতির ষোলো আনাই অসুল করে গেছেন। অর্জুনের গোঁ ছাড়ানোর জন্য নিজে কি তাই একদম খুল্লাম খুল্লা করে দেখিয়েছেন। যুদ্ধ যে তাঁর সঙ্গে,অর্জুন শুধু কর্তব্য পালকমাত্র। যুদ্ধের মঞ্চ তো ওখানেই সাজানো হয়েছে,তারপর কুরুক্ষেত্রে ইতি দুর্যোধন। মানুষ কি তালটাই না ঠুকল - ঠিক হয়েছে দুর্বিনীত দুর্যোধনটা প্রকৃত শাস্তি পেয়েছে। তা থেকেই কৃষ্ণকে তো আমার মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে খুব স্মার্ট মনে হয়েছে।
         আর আমাদের ঘরের ঠাকুর হলেন নিতান্তই স্বদেশী। হাঁটুর উপর ইটপৌঢ়ে ধূতি পরিহিত হয়ে ভক্তিবাদের মডেলে বাঙালির ঘরে ঘরে ভাব-ভক্তি-ভালবাসা-সেবা ঐ কঠিন সময়ে কি অকাতরে বিলিয়ে গেলেন। চৈতন্য ভক্তিবাদের যেন কিছুটা বাকি ছিল ঠাকুর এসে তাই ঢেলে দিয়ে গেলেন। তিনি স্বদেশী,আর শিষ্যকে দিয়ে হলেন আন্তর্জাতিক।
সার কথা তাহলে কী দাঁড়ালো রাম ও কৃষ্ণ নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় অনেক বীররস বিলিয়েছিলেন। পাশ্চাত্য বেশ সমীহ করে আজও।
   আবার ঠাকুর শ্রীরাকৃষ্ণ,শ্রীমা ও স্বামীজী বললেন জীব সেবা শিব সেবা করো। সেবা নিয়ে আর্তের পাশে বেশী করে দাঁড়াও। এই কথাতে বীর রসের ছিটেফোঁটাও নেই, কিন্তু একেও বিশ্ব সাদরে গ্রহণ করল।
   আসলে ব্যাপারটা কি! ব্যাপারটা হলো শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়ে কর্মবীর করে তুলেছিলেন। আর আমাদের ঠাকুর তাঁর নরেনকে সেবার পথ দেখিয়ে কর্মবীর করেছেন। সাম্রাজ্যবাদী দুর্বৃত্তকে উৎখাত করতে অর্জুন রূপে স্বামীজীর ডাক এসেছিল, কিন্তু সে ডাকে সাড়া দেননি স্বামীজী কেননা গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের নির্দিষ্ট করে দেওয়া পথই যে ছিল তাঁর পথ। সে পথ সেবার পথ। দরিদ্র নারায়ণ সেবা। তাই ঈশ্বর সেবা। ঈশ্বর লাভের একমাত্র পথ।
            
                 ( চলবে )
    
   @copyright reserved for Mridul Kumar Das.  


৭টি মন্তব্য:

  1. ধন্যবাদ। শুভেচাছা। ❤❤❤💅💅💅

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...