ভুতের সাথে একদিন ।
পারমিতা মন্ডল।
অমাবস্যার রাতে নাকি ভূত বেরোয়।অনেক দিন ধরে একথা শুনে চলেছি । অনেকে নাকি ভূত দেখেছে । কিন্তু আমার সেই সৌভাগ্য কখনো হয়নি । খুব জানার ইচ্ছা ভূত কেমন হয় ? কেউ কেউ বলেছে অমাবস্যার রাতে শ্মশানে গেলে নাকি তেনাদের দেখা পাওয়া যায় ।তাই মনে খুব সখ তাদের একটু দেখা পাওয়ার ।
তখন বয়স অল্প, সদ্য চাকরি পেয়েছি । বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবো ঠিক করলাম । আসল উদ্দেশ্য অমাবস্যার রাতে ভূত দেখা । আমার এক বন্ধুর মামার বাড়ি ব্যারাকপুরের নবাব গঞ্জে । এখানে সাহিত্য সম্রাট বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি আছে । এছাড়া গঙ্গা নদীর অপরূপ শোভা আছে , আছে বৃটিশ আমলের বিশাল বড় বড় বাড়ি । গঙ্গার অদূরে একটি শ্মশান ঘাট ও আছে । ঠিক করলাম ওখানেই যাবো । আর রাতের বেলায় শ্মশানে যাবো ভূত খুঁজতে ।সেই মতো সব ঠিক হলো ।আমারা সবাই অমাবস্যার দিন দেখে যাত্রা করলাম ভূত দেখার উদ্দেশ্যে ব্যারাকপুরে ।
সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন পৌঁছালাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে । বন্ধুর মামার বাড়িতে পৌঁছনোর পর ওরা খুব আদর যত্ন করলো ।খাওয়া দাওয়ার পর যখন বাড়িতে আমারা শ্মশানে ভূত দেখার কথা বললাম তখন সবাই বারন করলো ।ওখানে নাকি সত্যিই ভূত আছে ।অনেকে মাঝরাতে কান্না শুনেছে, অনেকে নাকি সাদা কাপড় পরা একজন মহিলা কে অমাবস্যার রাতে ঘুরতে দেখেছে ।এই কথা শোনার পর বন্ধুরা কেউই আর যেতে চাইলো না । কিন্তু ভূত দেখার এই সুযোগ কিছুতেই আমার হাত ছাড়া করতে মন চাইলো না । অগত্যা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়লো তখন চুপিচুপি বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে ।
রাত তখন কটা বাজে ঠিক মনে নেই। সামনে ঐ ভাঙা বাড়িটার পাশ দিয়ে শ্মশান ঘাটের দিকে যেতে হয় ।আমি খেতে খেতে
বন্ধুর মামার কাছে শুনে নিয়েছিলাম ।তাই একটা টর্চ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। একে অমাবস্যার রাত তারপর কারেন্ট ও নেই। তাছাড়া জায়গাটাও চেনা নয়। কিন্তু ভূত তো দেখতেই হবে। ঐ দূরে দেখা যাচ্ছে যে বাড়ি টা ওটা এক কালে জমিদার বাড়ি ছিল ।জমিদার রাজনারায়ন চৌধুরী খুব প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। শুধু প্রতাপশালী নয়, তিনি অত্যাচারীও জমিদার বলেও পরিচিত ছিলেন। একথা আমি আমার বন্ধুর মুখে শুনেছি। যাইহোক দুরুদুরু বুকে এগিয়ে চলেছি ভূত দেখতে শ্মশানের দিকে।
পৌঁছে গেলাম শ্মশানে । আমার ভয়টা ছোট বেলা থেকেই একটু কম। তাই এই ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে শ্মশানে এসেও কোন ভয় লাগছে না ।কিন্তু কিছু ই তো দেখতে পাচ্ছি না ।অনেকক্ষন অপেক্ষা করেও কিছু দেখতে পেলাম না।
আজ বোধ হয় আর ভূত আসবে না । ফিরেই যাই মনে মনে ভাবছি ।অন্য মনষ্ক হয়ে ফিরছি ঐ ভাঙা বাড়িটার পাশ দিয়ে । হঠাৎ কারো খুব জোরে জোরে কাশি শুনতে পেলাম ।এতো রাতে কে এখানে কাশি দিচ্ছে ? কৌতূহল বশতঃ একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি একজন বয়ষ্ক মহিলা । রাতে হয়তো বাথরুমের জন্য ঘর থাকে বেরিয়েছে । আমি গিয়ে বললাম," আপনি কে ? এতো রাতে এখানে কি করছেন ?" উনি বললেন যে ,"ঐ যে কুড়ে ঘরটা দেখা যাচ্ছে ওখানে উনি একাই থাকেন। ওনার কোনো ছেলে মেয়ে নেই ।স্বামীও অনেক আগে মারা গেছেন। তাই তিনি একাই থাকেন।রাতের বেলায় বাথরুমের জন্য বাইরে এসেছেন।তারপর এমন কাশি শুরু হলো যে আর হেঁটে যেতেই পারছেন না । তাই আমাকে একটু ঘর পযর্ন্ত দিয়ে আসতে বললেন। আমি আর কি করি। ভূত দেখা তো হলোই না। তাই ভাবলাম একটু এগিয়েই দেই।
বাড়ির কাছাকাছি এসে ওনাকে বললাম, "আচ্ছা বুড়িমা এখানে নাকি ভূত আছে ? আপনি কখনো দেখেছেন ? " কথাটা শুনেই বুড়িমা একটা বিকট আওয়াজ করে হেসে উঠলো। রাতের বেলায় সেই হাসি যেন অট্টহাসির মতো মনে হলো। উনি হাসি থামিয়ে বললেন ," অনেক বার দেখেছি তাকে । তুমি দেখবে তাকে ? শুনবে তার কথা ? তাহলে এখানে বস।এই ভূতের পিছনে একটা গল্প আছে সেটা তোমাকে বলি ।আর রাত গভীর হলে কপাল ভালো থাকলে তার সাথে তোমার দেখাও হয়ে যেতে পারে।" আর কি ! আমি তো এটাই চাইছিলাম।
বুড়ি মা বলতে শুরু করলেন---"এখানে সবাই মাঝে মাঝে ভূত দেখে ।সে ঘুরে বেড়ায় এই পড়ো বাড়িতে ।অমাবস্যার রাতে বড়ই অস্থির হয়ে ওঠে । আশা করে ও যাকে ভালো বাসতো ওর প্রেমিক এই দিনে ফিরে আসবে ।ওকে নিয়ে যাবে এই নরক কুন্ড থেকে ।ঐ যে দূরে ভাঙা বাড়ি টা দেখছো ওটা জমিদার রাজনারায়ন চৌধুরীর। উনি খুব অত্যাচারী জমিদা্র ছিলেন। কোনো সুন্দরী মেয়েদের দেখলে তুলে নিয়ে যেতন। একদিন তার খারাপ নজরে পড়ে যায় রুপাই। গ্রামের একটি সহজ সরল মেয়ে ছিল রুপাই । ভালো বাসতো সাজুকে। ওদের গ্রামের ই ছেলে । দুজনে ভালো বেসে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু জমিদার রাজনারায়ন রুপাইকে তার লেঠেল দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। এনে বন্ধি করে রাখে এই রাজপ্রাসাদে। দিনের পর দিন রুপাই কেঁদেছে তার সাজুর জন্য ।কিন্তু নিষ্ঠুর জমিদার তাকে ছাড়েনি। রুপাই কে সে বাধ্য করেছে মুজরা করতে ।রুপাই থেকে সে হয়েছে পিয়ারী বাই ।আর দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে
তার সাজু একদিন ফিরে আসবে।তাকে নিয়ে যাবে ।না , সাজু আর ফিরে আসেনি কোনদিন। একদিন পিয়ারী বাই রাজপ্রাসাদ থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় জমিদারের লেঠেল দের হাতে । ।তখন জমিদারের আদেশে তার লোকেরা পিয়ারীকে খুন করে গুম ঘরে ফেলে দেয় । সেদিন থেকে মৃত্যু হয় পিয়ারী বাইয়ের। কিন্তু বেঁচে থাকে রুপাই । সে আজও অপেক্ষা করে সাজু ফিরে আসবে। তাই সে অমাবস্যার রাতে সাজুকে খুঁজে বেড়ায় এই রাজপ্রাসাদের আসে পাশে। কতো বছর হয়ে গেল সাজুর জন্য সে অপেক্ষা করছে। সাজু যদি এসে ফিরে যায় ,তাই সে অন্য কোথাও যেতে পারেনা।
এতোক্ষন ধরে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলাম বুড়ি মায়ের কথা । তাকিয়ে দেখি ভোর হয়ে এসেছে। এবার ফিরতে হবে । ভূত দেখা তো আর হলো না। ওরা জেগে গিয়ে আমাকে দেখতে না পেলে চিন্তা করবে ।কিন্তু বুড়ি মা এতো কথা কিভাবে জানলো ? বুড়ি মাকে জিঞ্জাসা করলাম ,তুমি এতো কথা কিভাবে জানলে বুড়িমা ? মুচকি হেসে বুড়ি মা বললো -- আমিই তো সেই রুপাই। আজ ও খুঁজে বেড়াই সাজুকে । বলে ঐ পড়ো বাড়িটার দিকে হাঁটতে হ়াঁটতে মিলিয়ে গেল । হঠাৎ আমার সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তাহলে আমি এতোক্ষন ভূতের সাথে কথা বলছিলাম ? এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।
পরদিন আমাকে খুঁজতে খুঁজতে ঐ পড়ো বাড়ির সামনে অচৈতন্য অবস্থায় পেয়েছে আমার বন্ধুরা ।
ভূত দেখার সখ সারা জীবনের মতো আমার মিটে গেছে।
সমাপ্ত।
দারুণ একটা উপহার। মন ভরে গেল।👌👌👍👍❤❤💅💅
উত্তরমুছুনদারুন! দারুণ! পারোদি।
উত্তরমুছুনদারুন লাগলো
উত্তরমুছুনরুপাই,সাজুর ভালোবাসায় মোড়া নক্সী কাঁথা জমিদারী অত্যাচারে ছিঁড়ে ফুটিফাটা।অসাধারণ লিখেছ।
উত্তরমুছুন