রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

বিষয় : গল্প# নাম : মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব ৫ লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব


মালদার রবিকা বিশ্বাসকে কড়কড়ে তিনশো দিতে হল কাঁথির "শক্তিশেল"কে সুন্দর একটা প্রবন্ধের জন্য। মনটা খচখচ করে। ভাবতে থাকে এতই কি ফেলনা লেখে! রবিকা ঘরোয়া মহিলা, কেমন করে এক সম্মেলনে দেখা হয়েছিল ইব্রাহীম রজ্জাক মোল্লা  নামে স্কুল টিচারের সাথে। তার থ্রু এই "শক্তিশেল"....  অনেক খেটে এই ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লিখেছিল। লেখক পয়সা পায় চিরকাল শুনেছে। পয়সা দিতে হতে নিজেকে কেমন যেন অসহায় লাগছে। কেউ শুনলে পাক্কা বলবে - পয়সা দিয়ে লেখা ছাপায়। কখনও কি সে প্রমাণ করতে পারবে, ওই প্রবন্ধটা কখনও সাধারণ ছিল না। কোন কি পথ আছে রবিকাদের নিজেকে প্রমাণ করার। এই মফস্বল থেকে কখনও প্রমাণিত হবে সে? কি ভাবে! পথ খোঁজে রবিকা।

তরুণ বড়ো এক কোম্পানিতে আছে। শখ ও কিছুটা আসক্তির কারণে এই সাহিত্যের জগতে পড়ে থাকা। প্রায় চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। বিয়ে হয়নি। বাড়ীতে তেমন তাড়া দেবার কেউ নেই হয়ত। সাহিত্যের জগতে একটু দু কলম লিখলে জানতে চায় বয়স? তারপর প্রশ্ন বাড়ী? লোকেশন সিলেক্ট হয়ে গেলে বিত্ত বা স্ট্যাটাস। কটা গাড়ী , ঠিক কটা বৌ, কটা বান্ধবী ইত্যাদি। মহিলা হলে উল্টো ।কার সাথে আছে? বরই তো। বর ছেড়ে দিয়েছে? কেন? এই বয়সে এ্যাফেয়ার? হাজার প্রশ্ন কাটিয়ে এক সময় হয়ত হাঁপিয়ে গেলে জানতে চায়, কতগুলো লেখা? সেরা কোনটা? লেখার ধরন কেমন? তা সেই ওকাকুরার অনুষ্ঠান করানো তরুণ ঘোষও ডায়মন্ডহারবার সাহিত্য মেলায় আমন্ত্রিত। রতন ঋতুপর্ণাকে জুটি বেঁধে ঘুরতে দেখেছে অনেক সময়। হোটেলের ঘরে রতন ঋতুপর্ণাকে "উল্লাস " বলে গ্লাস ওপরে করতে দেখেছে। সেই মহিলা স্টেজে উঠে বলে, " আসলে মূল্যবোধ পাল্টে যাচ্ছে, আগে সিগারেট বড়োদের সামনে চলত না, আমাদের আগের জেনারেশনের সাহিত্যিকরা সিনিয়দের সামনে মেনে নিতেন তারা সব কাজে ছোট, যেহেতু তারা বয়সে ছোট। অনেক সময় ভুল ধরিয়ে দিতেও অনেক আড়ষ্টতা ছিল কিংবা ভুল ধরাতোই না। সময়ে আমরা দাদা বলে ভুল ধরিয়েদি। সিনিয়ররা আর গুরুগম্ভীর মাস্টার মশাই নেই। অনেক সহজ এক সম্বন্ধ। মূল্যবোধ অন্যখাতে বয়ে চলেছে, সহজ করে বাঁচাই আসল মোটো। " এত গভীর কথাও বলতে পারে মেয়েটা! আসে পাশে তো দিতি অরুন ধিতি  বিশ্বজয়  মিলির গ্র্যামি হয়ে ঘোরে। ধরন আলাদা। উগ্ৰ একটা ভয়হীন ভাব এদের লেখায় এবং স্বভাবে। অনেকে এই দলটা এড়িয়ে চলে। তরুণ অনেক বার শুনেছে ঋতুপর্ণা সঙ্গী মরশুমে বদলায়। এখন রতন! কিন্তু ও এখন এই সন্ধ্যায় একা কেন জেটিতে! রতন ওর ছায়া সঙ্গী কোথায়? এই সময় মফস্বল ফাঁকা , জেটি তো আরও। ও পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় - এখানে একা কেন? বসবো?
- বসুন । আমি তো একাই। আপনি এই নিঃসঙ্গ দ্বীপে রতনের মতো বেলাকে খুঁজতে এলেন নাকি?
সামান্য নেশায় আছে। কেমন যেন মায়া হল । হাত বাড়িয়ে বলল - এখানটা ভালো নয় পর্না । যদি হটেলে গিয়ে কথা বলি তোমার আপত্তি আছে?
কি বুঝল ঋতুপর্ণা চুপচাপ বাচ্ছা মেয়ের মতো উঠে চলে এলো।

রতনের বুকে আগুন ছিল ঋতুর জন্য বোঝেনি তো। লোকে বলে এখন ওর মাল। বললেই হলো। তমা জুতিয়ে ইলিশ ফ্রাই করে দেবে। বেল্লা বরকে খাওয়ায়, ছেলে মানুষ করে, সর্বোপরি মাতাল রতনের সাহিত্যের মহল তৈরি করে, সাধন সঙ্গীনি। তাকে ফাঁকি দিয়ে ঋতু! না বাবা যত আগুন থাকুক নিভিয়ে দাও। তমা হারানো চলবে না। সাজানো বাগান শুকিয়ে যাবে। নিড কমফোর্ট। রতন মালের নেশায় হোটেলের এক ঘরে নিজের সাথে বকে। শেষ কবিতা শুনেই আজ ঋতুপর্ণাকে একা ছেড়ে ঘরে এসে ঢুকেছে। বলতে গেলে পালিয়েছে সে। ঋতুকে বড়ো আপন করে সাথে নিয়ে নদীর বুকে ভাসতে ইচ্ছা করছিল। বলেও ছিল মজার ছলে। কুকুরকে লাথি মারার মতো ঋতুপর্ণা মক্ষম ঝাড় দিয়েছে। "ঋতুপর্ণা সাহিত্য করতে এসেছে রতন স্যার, রাখেল হতে নয় "। তারপর বুকের জ্বালা বেড়েছে। আরও বাড়লো, এই মুহূর্তে বাড়লো যখন দেখল ঋতুপর্ণা আর তরুণ একটা টেবিলে বসেছে কফি নিয়ে। বলার কিছু নেই। সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক। নিজের ইচ্ছার মালিক। কিন্তু ঋতুপর্ণা কি ওর আবেগের সাথে খেলেনি! মনে হতেই হতাশা চেপে ধরে। কিন্তু ঋতুপর্ণাকে সন্ধ্যায় কেন যে এমন অফার দিল। সব গেল। ঋতুপর্ণা বর খোয়ানো মেয়ে, বেচারা সেজে থাকে। তাতেই সব ফাঁসে। বড়লোকের বকা মেয়ে। আর কিছু মনে এল না, ঋতুপর্ণার বিরুদ্ধে মনে মনে এটুকু বিষোদগার করে নিজের ঘরে ফিরে গেল রতন।

ঠিক তার একমাস পরে ব্রাম্ভ মতে উপনিষদের মন্ত্র পড়ে অনাড়ম্বর বিয়ে হল তরুণ ঋতুপর্ণার। রতন সস্ত্রীক উপস্থিত ছিল। ঋতুপর্ণার সেদিনের কবিতা এমন ছিল :
আজ একটু বৃষ্টি চাই,
ভিজতে চাই প্রিয়তম।
আজ একটু কুয়াশা চাই
ভুলতে চাই সব পুরাতনো।
আজ দিশা চাই
দুহাতে ভরতে চাই সোনালী চূর্ণী যত।
একটু চুম্বন দিতে পারো!
ভুলবো  শত হতাহত।
অজস্র ক্ষত গোলাপি পাপড়ি
ঢেকে দিক আজ সুগন্ধি আঘ্রাণ।
©copyright reserved for Sharmistha Bhatt.

ক্রমশঃ

১২টি মন্তব্য:

  1. বাহ! বেশ ভালই লাগল। সুন্দর। 👌👌👍👍❤❤🙏🙏

    উত্তরমুছুন
  2. হ্যাঁ দিদি, এই পর্বও অসাধারণ ছিল

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...