বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০

তিন বছর বয়সের একাকীত্ব(চন্দনা লাহা)


 হ্যাঁ  সেদিন ছিল রবিবারেই।  আমার স্পষ্ট মনে আছে সকালবেলায় সেই হৃদয় ভাঙ্গা কান্না আর খোল করতালের সঙ্গে  পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা বল হরি হরিবোল শব্দ টা তীব্র হতে হতে ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল। এই হরি বোল কোন বয়সে মৃত্যু বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার ছিল না। এই মরদেহ ছিল তিন বছর বয়সের মান্তুর মায়ের মরদেহ। সেদিনই শুরু হয়েছিল তার জীবনে একা কাটানো রবিবার।

         

         বডিটা হসপিটাল এবং পুলিশ দুজনেই সকাল সাত টাতে ছেড়ে দিয়েছে। গরীব ভুবনের স্ত্রীর শবদেহ আনতে আনতে প্রায় দশটা বেজে গিয়েছিল। পাড়ায় হঠাৎ একটা গাড়ি থামতে দেখে সবাই ছুটে গিয়েছিল দেখতে। ভেবেছিল ভুবনের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। হসপিটাল থেকে ছুটি নিয়ে ফিরছে। কিন্তু না। সামনে আসতেই সবার মুখের চিত্রটা বদলে গেল। আঁতকে উঠল সব কটা মুখ। অবস্থা দেখে মান্তুর এক পরিচিত তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়ে পাশের ঘরে রেখে এলো। তার মা ফিরে আসবে এই প্রতিশ্রুতিতে সে এখনো শান্ত এবং স্থির। তারপর মান্তু বিন্দুমাত্র কোন কিছু টের পেল না। মরদেহ  নামিয়ে মাঝ বাহিরে একটা খাটের উপর রাখা হলো তার দেহটাকে। দেখলে মনে হয় দেহে এখনো প্রাণ আছে। দিব্যি ঘুমোচ্ছে। ভুবন ব্যাস্ত হয়ে পরলো কাঠ পালা লোকজন জোগাড় করতে। ঘরে আছে বলতে ওই বছর সত্তরের মান্তুর বিধবা ঠাকুমা। একে একে সবাই এসে দেখে ফিরে  গেল। মান্তুর মা যেন একাকী অপেক্ষা করতে থাকলো তার সন্তান কখন এসে একবার শেষবারের মতো তার সঙ্গে দেখা করে  যাবে।  কিন্তু মান্তু কে আর  কেউ আসতে দিল না। কত এয়োতি এসে সৌভাগ্য লাভ করে গেল। তাদের ধারণা এয়োতি নারীর মৃত্যু দেখা নাকি খুবই সৌভাগ্যের। তাই অনেকেই আলতা সিঁদুর পরিয়ে তাকে রাঙ্গিয়ে তুলল। তারপর তার মা  এসে পৌঁছল । বাস গোলযোগে এত দেরি। অনেক দুর্ভাগ্য নাহলে এমন দৃশ্য মায়েরা দেখেনা। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জড়িয়ে ধরল মেয়েকে। মায়ের বাঁধভাঙ্গা কান্নায় যেন গোটা আকাশ বাতাস কেঁপে উঠছে। এতক্ষন অবধি নিথর দেহটা বড় অসহায় ভাবে পড়েছিল। এক ফোটা চোখের জল ফেলারও কেউ ছিলনা।

           ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটে বাজে। এমন সময় দুজন ডোম এসে হাজির হলো। তারা বলল ওই বউয়ের পেট কেটে বাচ্চাটাকে বের করে দেব কিন্তু তার জন্য মদের দাম দিতে হবে। একশ দুশো নয় একেবারে পাঁচশো টাকা। ভুবন দিতে অক্ষমতা জানালেও তারা দু একজন সহ বাবা মা টাকাটা দিয়ে দিল।

          তারপর সব শেষে যখন মরার খাট তোলা হলো কাঁধে তখন প্রায় সন্ধ্যা হব হব অবস্থা। কেউ বলল মান্তু কে  আনার দরকার নেই। আবার কেউ বলল একবার শেষবারের মতো মায়ের মুখটা দেখতে দাও। তারপর মান্তুর দিদা  কাঁদতে কাঁদতে মান্তু কে নিয়ে এলো তার মায়ের কাছে। আর বলল মাকে প্রণাম কর। মা যে চলে যাচ্ছে। মান্তু জিজ্ঞেস করল মা কোথায় যাচ্ছে? আমিও যাব মায়ের সঙ্গে। কথাটা শুনে সকলের বুকে কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। পাড়ার সকলের চোখে জল এসে গেল।

          তারপর মায়ের মুখ দেখার পর মান্তুর কান্না আর ঢোল করতাল এর বাজনা মিলেমিশে এক একাকীত্ব বয়ে নিয়ে এলো গোটা পরিবেশে। 

         


১৬টি মন্তব্য:

  1. খুব মর্মস্পর্শী গল্প ❣️❣️❣️❣️

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. সময় করে লেখা পড়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। । ❤️♥️💝💐💐

      মুছুন
  2. লেখনীর গুণে ভারাক্রান্ত পাঠক মন।বড় বেদনাদায়ক।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. কিছু সত্য এমনি বেদনাদায়ক গো। পাশে থাকার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ ও ভালবাসা। 💐💐💝💝

      মুছুন
  3. কে লিখেছেন? বেদনাদায়ক। লেখা খুবই ভালো 👌

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ওটা আমারই লেখা গো । লেখা পড়ে পাশে পাশে থাকার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। 💐💐♥️♥️

      মুছুন
  4. খুব অনুভবী লেখা। ধন্যবাদ। 👍👍👌👌💥💥💫💫❤❤

    উত্তরমুছুন
  5. এতো মর্মান্তিক লেখা কেন লিখলে চন্দনা

    উত্তরমুছুন
  6. কলমের কাজেই যে হল গো সত্য কে, বাস্তব কে, সুখ, দুঃখ প্রভৃতি কে তুলে ধরা। অনেক অনেক ধন্যবাদ ও ভালবাসা। 💐💐♥️♥️

    উত্তরমুছুন
  7. কত সুন্দর লিখেছ চন্দনা ।মন ছোঁয়া লেখা ।👌👌👌👌❤❤❤❤

    উত্তরমুছুন
  8. অনেক অনেক ধন্যবাদ দিদি। 💐💐❤️❤️

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...