নীলকুঠির কান্না
***************
#কলমে_পিয়ালী_চক্রবর্তী
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফরাসিদের হাতেই বাংলায় নীল চাষের উদ্বোধন হয়েছিল | ১৮৩০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী , এই বাংলায় এক হাজারেরও বেশি নীলকুঠি ছিল | কালের নিয়মে তা বিলুপ্ত হয়েছে | তবে রেখে গিয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনী | কখনও কালনা, কখনও বেলপাহাড়ির শিলদা - নীলকর সাহেবের কুঠিগুলোকে জড়িয়ে প্রচুর অশরীরীর উপাখ্যান আছে |
১৭৭৬ সালে ক্যারল বুশ নামে এক ইংরেজ সাহেব কালনায় নীলকুঠি তৈরি করেন | এই নীলকুঠি যে ঠিক কোথায় ছিল তা আজ আর ঠিক ভাবে জানা যায় না | এই কুঠির কোনও ধ্বংসাবশেষও অবশিষ্ট নেই |
আমার এই কাহিনীটি বুশ সাহেবের নীলকুঠি - কে কেন্দ্র করে লেখা | এটি একটি কাল্পনিক কাহিনী যা নীলকুঠির ইতিহাসের সাথে কল্পনা মেশানো | নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও তার প্রতিবাদভিত্তিক এই গল্পটি পাঠকগণের ভালো লাগলে আমার প্রয়াস ধন্য |
দুঁদে ব্রিটিশ সাহেব ক্যারল বুশ আর তার সহচর হেনরি সবেমাত্র ইংল্যান্ড থেকে বাংলার মাটিতে পদার্পন করেছে | ইতিমধ্যেই নীলচাষ এবং তার লাভজনক দিকটি তাদের চোখে পড়ে যায় | কম খরচে বেশি লাভ করতে নীলচাষের জুড়ি মেলা ভার |
বুশ আর হেনরি মিলে ঠিক করলো , বাংলার উর্বর জমিতে , বাংলারই গরিব চাষীদেরকে দিয়ে নীলচাষ করিয়ে , সেই নীল কমদামে কিনে , বহির্বিশ্বে চড়া দামে বিক্রি করবে |
তৎকালীন বাংলাতে নীল চাষের ব্যাপারে কেউই সেরকম অভিজ্ঞ ছিলোনা | চাষীদেরকে একত্রিত করে দুই সাহেব মিলে অনভিজ্ঞ চাষীদেরকে নীল চাষ করার পরামর্শ দিলো | বিঘা প্রতি ছয় - কাঠা জমিতে প্রত্যেককে নীলচাষ করতে হবে | অমান্য করার কোনো পথ নেই | চাষীদেরকে নীলচাষের জন্য 'দাদন'
অর্থাৎ চাষের খরচ বাবদ কিছু করে টাকা অগ্রিম দেওয়া হলো |
চাষীরা মোটামুটি খুশি হয়েই নীলচাষ করতে শুরু করে | কিন্তু নীল উৎপাদনের পর এত কম দামে সেগুলো সাহেবদের কাছে বিক্রি করতে হয় যে তাতে চাষের খরচের পর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা | তার ওপর উপরি পাওনা নীলকর সাহেবদের অত্যাচার | কোনো চাষী যদি নির্দিষ্ট পরিমান নীল , সাহেবদের হাতে তুলে না দিতে পারে , তাকে গাছের সাথে বেঁধে চাবুকের বর্ষণ চলে তার ওপর | রক্তাক্ত অবস্থায় সেইভাবেই তাকে গাছে বেঁধে ফেলে রাখা হয় | জল পর্যন্ত জোটেনা তার কপালে ।
হটাৎ একদিন বুশ সাহেব ঘোষণা করে দিলো , ' এবার থেকে বিঘা প্রতি দশ-কাঠা জমিতে নীলচাষ করা বাধ্যতামূলক | অন্যথায় চাবুক আর অনাহার | ' নীলচাষীরা এই শুনে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে | ওরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে যে , এবারে দাদনের টাকা নিয়েও , নীলচাষ আর করবেনা |
অবস্থা বুঝে নীলকর সাহেব বুশ এবং হেনরি প্রমাদ গোনে | নীলচাষীরা যদি একবার বেঁকে বসে তাহলে ওদের লাভের জোয়ারে ভাঁটা পড়বে | বুশ সাহেব ঠিক করেন যে , সন্ধ্যাবেলা যখন চাষীরা বাড়ি ফেরে , তখন কালনার প্রতিটা চাষীর ঘরে গিয়ে হুমকি দিয়ে আসবে |
সন্ধ্যের ঠিক মুখে মুখে বুশ সাহেব তার পোষা ঘোড়ায় চড়ে রওনা দেয় | খানিকটা যাবার পরেই জঙ্গলাকীর্ণ পথের শুরু | বুশ সাহেব বীরদর্পে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে | অকস্মাৎ ঝোপের আড়াল থেকে হাতে দা নিয়ে বেরিয়ে এলো কয়েকজন লোক |
বুশ সাহেব বিদ্যুৎগতিতে কোমরের থেকে রিভলভার বার করার আগেই দা - এর একটা কোপ | বুশ সাহেবের কাটা মুন্ডুটা ছিটকে গিয়ে পড়লো ঘোড়ার পায়ের সামনে | এরপর ওই ঘোড়াটার ওপরেও দা - দিয়ে কোপের পর কোপ পড়তে লাগলো | ঘোড়াটাও রক্তাক্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো |
অনেক রাত হয়ে গেছে | বুশের এখনো ফেরার নাম নেই | হেনরি সাহেব তার পাইক - বরকন্দাজ নিয়ে , লণ্ঠন জ্বালিয়ে , ঘোড়ার পিঠে চেপে বুশ সাহেবকে খুঁজতে বেরোলো |
জঙ্গলপথে কিছুদূর অগ্রসর হয়েই হেনরি সাহেব লণ্ঠনের আলোয় দেখলেন এক বীভৎস দৃশ্য | বুশ সাহেবের কাটা মুণ্ডুটা একটা বাঁশের খুঁটির মাথায় গাঁথা রয়েছে | আর পাশেই পড়ে আছে ওনার প্রিয় ঘোড়াটার রক্তাক্ত শরীর | কিন্তু বুশের দেহের কোনো সন্ধান পাওয়া গেলোনা |
কাটা মুণ্ডুটাকে লোকজন তুলে নিয়ে গিয়ে সমাধিস্থ করলো | হেনরি সাহেব বাইরে দুঃখের ভান করলেও , ভেতরে ভেতরে বেশ খুশি | নীলচাষের পুরো ব্যবসাটা এখন তার দখলে |
কিন্তু গ্রামের মানুষ ভীত - সন্ত্রস্ত হয়ে আছে | রোজ সন্ধ্যেবেলা নাকি জঙ্গলের দিক থেকে ঘোড়ার খুর আর আর্তচিৎকারের শব্দ শোনা যায় | জঙ্গলে মধু আনতে গিয়ে অনেকে দেখেছে একটা মুণ্ডুহীন শরীর ঘোড়ায় চেপে জঙ্গলে বিচরণ করছে | ভয়ে আজকাল কেউ আর জঙ্গলের দিকে যেতে পারেনা |
হেনরি সাহেব এসব ব্যাপারে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করেননা | বরং নীলচাষীদের ওপর অত্যাচার আরো বাড়িয়ে দিলেন | গরিব নীলচাষীরা না খেয়ে মরতে লাগলো | সবাই মিলে তখন ঠিক করলো , যা করার আজ রাত্রেই করতে হবে |
রাত গভীর , হেনরি সাহেব ঘুমে অচৈতন্য | নীলচাষীদের একটা দল গেলো নীলকুঠির দিকে | ওরা নীলকুঠিটা চারদিক থেকে ঘিরে ফেললো | জনা তিনেক চাষী প্রবেশ করলো কুঠির মধ্যে | তাদের হাতে জ্বলন্ত মশাল |
ওরা হেনরি সাহেবের ঘরের মধ্যে রাখা সিন্দুক ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে গেলো | তারপর আবার প্রবেশ করলো নীলকুঠিতে | এবারে হেনরি সাহেবের বিছানায় চারপাশ থেকে আগুন লাগিয়ে দিলো |
হটাৎ উত্তাপের স্পর্শে হেনরির ঘুম ভেঙে দেখে , সারা ঘর জ্বলছে | পালাবার সব পথই বন্ধ | সারাবাড়ি দাউদাউ করে জ্বলছে | হেনরির সারা শরীরে আগুন ধরে গেছে | এঘর - ওঘর পাগলের মতো ছোটাছুটি করেও ওই আগুন কিছুতেই নেভাতে পারছেনা | ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ভাবে দগ্ধ হয়ে চিৎকার করতে করতে হেনরির মৃত্যু হলো |
নীলকুঠীও সম্পূর্ণভাবে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলো |
সেই থেকে কুঠির দিক দিয়ে আর্তনাদ আর কান্নার শব্দ মাঝেমধ্যেই ভেসে আসে | জঙ্গলে বুশ সাহেব আর পোড়া নীলকুঠির ভগ্নস্তূপে হেনরি সাহেবের অতৃপ্ত আত্মা আজও কেঁদে কেঁদে ফেরে |
Copyright © All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
ছবি সৌজন্যে গুগল
.........................সমাপ্ত .........................

ভালো লাগলো। 💐💐
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো। 👌👌👌👌👌
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো। 👌👌👌👌👌
উত্তরমুছুনBesh bhalo laglo golpo ta
উত্তরমুছুনভালো বেশ ভালো।।
উত্তরমুছুনভাল হয়েছে।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লিখেছ
উত্তরমুছুনদারুন,দারুন 👏👏
উত্তরমুছুন