রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

অনু গল্প :"দূরত্ব" #কলমে ~পল্লবী

 


পার্লারের সাজ শেষে বসে আছে রাকা। বেস্টি সাবা, নিচে নেমেছে মোবাইল রিচার্জ করতে। সেই সাথে গাড়ি এসছে কিনা, তাও দেখে আসবে। বাড়িতে এতবার ফোন করার পরও কেউ রিসিভ করছে না দেখে ভারী বিরক্তবোধ করে রাকা। মনে  মনে যেনো একটু ভয় ও পায়। মায়ের কি কোনো আবার পেইন আসলো নাকি?? গত মাসে ওঠা হার্টের ব্যাথা এতোই প্রকট ছিল যে, রাকার মামারা পর্যন্ত  ভয় পেয়েছিলেন। সেদিনের সেই ঘটনার পর, মামারা যেনো ওর বিয়ে দিতে উঠে পরে লাগলেন! যতোই বোঝায় যে, ওর পক্ষে মাকে ছেড়ে এই অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়, মামারা অনড়। দু সপ্তাহ আগে যখন অমিয়র পরিবার এসে পছন্দ করে গেলো, রাকা শেষ পর্যন্ত ওর মাস্টার্স কমপ্লিটের পর বিয়ের কথা বলে ছাড় পেতে চেয়েছিল। বাধ সাধলো মা!! মায়ের এক কথা, অমিয়র মতো ভাল পাত্র পাওয়া যাবেনা। লম্বা চওড়া গড়নের উজ্জ্বল শ্যামলা অমিয়র মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুলের নিচে প্রায় ঢাকা পড়া কালো, মায়াবী চোখের চাহনি কারো কথা যেনো মনে করিয়ে দেয় রাকা কে! এত্তো মিল!! কীভাবে সম্ভব??


গাড়িতে বসে ড্রাইভার কে ঝাড় দিতে দিতে রাকা বাড়ির খবরও জেনে নেয় একবার। গত রাতে হলুদ অনুষ্ঠানের ক্লান্তি নিয়ে ভুলেই গেছিলো মোবাইল চার্জ দিতে! সকালেও তাড়াহুড়ো তে খেয়ালই ছিলো না। গত চব্বিশ ঘণ্টা যেনো একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সে। একটু আগে বাড়ি থেকে আসা কল ধরতে গিয়ে মোবাইলটা গোঙাতে গোঙাতে বন্ধই হয়ে গেলো। তার উপর ড্রাইভারের দেরি দেখে ভয়ই পেয়েছিল সে। মায়ের হাতে দুধ - কলা খেয়ে রাকা নিজের রুমে এসে বসে একটু বিশ্রামের আশায়! আট টার পরে বিয়ের লগ্ন দেওয়া আছে। মায়ের শারীরিক অসুস্হতার কথা ভেবে মামারা প্রস্তাব দিয়েছিলেন বিয়ের মঙ্গল অনুষ্ঠান বাড়িতে করার জন্য। আনুষ্ঠানিকতা কমিউনিটি সেন্টারে হবে। অমিয়র পরিবার কোন দ্বিমত পোষণ করেননি প্রস্তাবের। বালিশ দুটো পেছনে দিয়ে অবসন্ন দেহ এলিয়ে দেয় রাকা। একটু একটু নিদ্রালুতাই পেয়ে বসছে। কান পাতলেই যেন অনেক গভীর থেকে ভেসে আসে... 

"খুব কাছে এসো না কোনদিন, যতটা কাছে এলে,কাছে আসা বলে লোকে,এ চোখ থেকে ঐ চোখের কাছে থাকা"...."তার চেয়ে বরং দূরেই থেকো, যেমন দূরে থাকে ছোঁয়া থেকে স্পর্শ, রোদ্দুরের বু্‌ক থেকে উত্তাপ,শীতলতা থেকে উষ্ণতা", ... হ্যা.. ঠিক ততোটা দূরে সে আজ। যোজন যোজন দূরে!! এই দূরত্বের পরিমাপ করা পৃথিবীর অসাধ্য!!


 ঢাকের শব্দে রাকার সম্বিৎ ফিরে আসে। না..ফেলে আসা ছায়ার পানে সে আর ফিরে তাকাবে না। একদমই না! নীল কষ্ট গুলোকে এক পাশে রেখে, আস্তে আস্তে নিজের বেশভুশা ঠিক করে, ধীর পায়ে এগিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। দোতলার এই জানালা দিয়ে নিচেরটা পরিস্কার দেখা যায়।বরণডালা নিয়ে লাল শেরওয়ানি স্যুট পরিহিত অমিয়কে বরণে ব্যস্ত সবাই! সাবাকে দেখতে পাচ্ছে, ওশেন ব্লু স্যুটের টল ফিগার একজনের সাথে কথা বলছে। ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে,পরিচিত কেউ! কথার মাঝেই সাবা ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকালো। একই সাথে ঘুরে তাকালো সেই ওশেন ব্লু স্যুট!! নীল বিষে যেনো মুহুর্তেই ছেয়ে গেলো রাকার পুরো দেহমন!!  


"আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো,,তুমি আমার".... আজও কান ফাটা চিৎকারে গ্রুপটা গাইছে। উফফ,,কি অসহ্য যন্ত্রণা! কোনরকমে ক্যান্টিনে ঢুকে দুটো সিঙ্গাড়া আর দু পিস কেক নিয়েই দে ছুট রাকা।  কলেজের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে এই অত্যাচার! ভেবেছিল, কিছু একটা বলবে। পরে জানলো যে, সবাই অনার্স স্টুডেন্ট..অনেক সিনিয়র! শুনে কিছু বলার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে রাকা। সব কিছু দেখেও না দেখার ভান করে সে। পারতপক্ষে ক্যান্টিন এড়িয়ে চলে। শুধু সাবার যেদিন হায়ার ম্যাথের ক্লাস থাকে,সেদিনই ওকে যেতে হয়, যেমন আজ। আজও বের হতে হতে চোখে চোখ পড়েছে গ্রুপের শিরোমনি 'তার' দিকে। কি অদ্ভুত বিষণ্ণ সেই দৃষ্টি!


যাবেনা, যাবেনা করেও নবীন বরনের দিন একটু বেলা করেই কলেজে যায় রাকা। গেট দিয়ে ঢোকার সময়েই কানে আসে "শেষের কবিতা"! কি অদ্ভুত বিষণ্ণ সেই কণ্ঠ!! ভাবতে ভাবতেই পড়িমরি করে ছুটে অডিটোরিয়ামে। স্টেজে আবৃত্তিকার কে দেখে চোখ ছানা ভরা!! এতো সেই শিরোমনি! সব লাজুকতা বোতলবন্দী করে সাবাকে নিয়ে গেছিলো পরিচিত হতে। অর্কের সাথে!! পরের চার বছর যে দেখতে দেখতে কীভাবে কেটে গেলো, বলতেও পারেনা। যে ক্যান্টিন একদা রাকা সযত্নে এড়িয়ে যেতো, সেটিই হয়ে গেলো সবচেয়ে প্রিয়! অর্কের বন্ধুরা ও হেড়ে গলায় গায়..." তুমি আমার প্রথম সকাল..একাকী বিকেল..ক্লান্ত দুপুরবেলা"! সবকিছু বড়োই মধুময় লাগে রাকার! মাস্টার্সে ভাল রেজাল্ট করে অর্ক চলে গেলো দেশের বাইরে চাকরি নিয়ে। আপাতত পাঁচ বছরের কনট্র্যাক্ট। অনার্স ফাইনালের রাকার ও পড়াশোনার ভীষণ চাপ। নতুন দেশ,চাকরি নিয়ে ব্যস্ত অর্ক আগের মতো আর সময় করতে পারেনা। দুজনের টাইমিং ও বড়ো ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে অভিমান বাড়তে থাকে। শরীরের সাথে দুজনের মনের দূরত্বও বেড়ে যায় শত গুণ। একজন ভাবে, "তার কি এতটুকু সময় নেই আমার সাথে কথা বলার? রাতের পর রাত জেগে বলা গল্পকথা সে কীভাবে পারলো ভুলতে?" অপর প্রান্তে আরেকজন ভাবে, " সে কেনো এতো অবুঝ? একটুও বুঝতে চাইনা আমায়?" অভিমান!! বড্ডো ছোঁয়াচে! বেড়ে যাওয়া অভিমানকে পেছনে ফেলে দুজনের "ইগো" হয়ে ওঠে বড়। কেউ কাউকে নক করেনা ভুলে ও। এক সময় "ইগো" এসে থামে ব্লকে! দু প্রান্ত থেকে একটা "ভার্চুয়াল ব্লক" এসে সমাপ্তি টানে এতো বছরের পথ চলার!


সাবাকে এগিয়ে আসতে দেখেই রাকা বলে, " কিচ্ছু বলতে হবেনা। সব হিসেব মিটে গেছে"। আসলেই কি পেরেছে?? ধীরস্থিরভাবে মণ্ডপে গিয়ে বসে অমিয়র পাশে। পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করেছেন। সে কি তবে চিনতে পারেনি বন্ধুর হবু সঙ্গীনি কে? ঝুঁকে থাকা মাথা ধীর পানে তুলে, পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় সামনের সারিতে বসা অর্কের দিকে! কৃত্রিম হাসির আড়ালে, অনেক বছর আগের সেই বিষণ্ণতায় ভরা চোখ! সেই চোখের ভাষা পড়ে রাকার অন্তরাত্মা খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে যেতে চাই যেনো! অনেক দূর থেকে শুনতে পায়, নবীন বরণে আবৃত্তি করা বিষণ্ণতায় ভরা সেই কণ্ঠ...


"কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।

  তারি রথ নিত্যই উধাও....


 ফিরিবার পথ নাহি;

 দূর হতে যদি দেখ চাহি

 পারিবে না চিনিতে আমায়।

 হে বন্ধু, বিদায়।


মোর লাগি করিয়ো না শোক,

আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক"!!


সমাপ্ত।।

কৃতজ্ঞতাঃ রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের "শেষের কবিতা", রুদ্র মহাম্মদ শহিদুল্লাহ'র "খুব কাছে এসো না কবিতা"।

 

Copyright©️ All rights reserved

 Pallabi Barua


১৩টি মন্তব্য:

  1. খুব সুন্দর লিখেছিস। অসাধারণ! ধন্যবাদ। 👍👍👌👌💥💥💫💫💯💯💯💯❤❤💅💅💅

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ এক গল্প। মন ছুঁইয়ে দিল ❤❤❤

    উত্তরমুছুন
  3. কলেজ ক্যান্টিনের সুখছোঁয়া অপূর্ব লেখনী👌👌👌
    এতো কম লেখেন কেন

    উত্তরমুছুন
  4. খুব সুন্দর লেখা আগেই বলেছি আবার বললাম 💐💐

    উত্তরমুছুন
  5. খুব সুন্দর হয়েছে 👌👌👌💐💐💐💐

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...