রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

নাম - 'সত্যই সুন্দর' ✍ - মৃদুল কুমার দাস। "যাই সত্য তাই সুন্দর। আবার সুন্দরই সত্য।" কথাগুলো সত্যসুন্দর ঈশিকা, বণিতা,উশষীর মাঝে মধ্যমণি হয়ে বলছিল। তখন কলেজের লিজার পিরিয়ড চলছে। চা খাচ্ছিল বিষ্টুর দোকানে। বিষ্ণুচরণ ধর। বিষ্টুর এমনিতেই একটু বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব আছে। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। নাদুসনুদুস। শ্যামলাবরণ। চুলে অল্পস্বল্প পাক ধরেছে। তবে কানে একটু খাটো। কানে কম শুনে যে লোক সে একটু জোরে কথা বলে। বিষ্টু ধরের কথাগুলো তাই একটু জোরে জোরে হয়। জোর শোনায়। অপরের কানে কর্কশ লাগলে কী হবে, নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে কথাগুলো সে জোরেই বলে, আর তা তার কানে স্বাভাবিক লাগে। আগে চোখ ও কান দিয়ে দেখতো,কথায় বলে না রাজা কর্ণেন পশ্যতি,বিষ্টু ধর এই প্রবাদ বাক্যকে ধ্যান জ্ঞান মনে করে বলে, তার কানে দেখার অভিজ্ঞতা, চোখে দেখার অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ সে যে চা দোকানদার। সক্কাল সক্কাল চায়ের দোকানে স্থানীয় ও তুলনামূলক একটু দূরান্তরের খবর যেভাবে কাটতি হবে, পেপারে তা পাওয়া মুশকিল। চায়ে চুমুক চলে আর সারাদিন খবর খদ্দেরদের মুখ থেকে যেন শিশির ভেজা শিউলি ফুলের মতো টুপটাপ খসে পড়ে। কান খাড়া রাখে,চোখ চায়ের কাপে চিনি গোলানোর টুং টাং শব্দে কেবল নজর। কান খাড়া টুংটাংয়ে ও খবরের টুপটাপ ধ্বণিতে। সকাল ন'টা পর্যন্ত পাবলিকের আনাগোনা। দশটার পর ছাত্র ছাত্রীদের। দোকানটা পাবলিক রাস্তার দিকে মুখ করে। পেছন দিকের দরজা দিয়ে কলেজ ছাত্র ছাত্রীরা ঢোকে। বিষ্টু স্কুল দাওয়ায় অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত কোনোমতে কেঁদে কঁকিয়ে টিকে ছিল,শেষে বাপ হারাধন ধর টেনে এনে দোকানে বসিয়ে দিল। বাপ এখন নেই,সে বছর দশেক হলো গত হয়েছে। বিষ্টুর পেটে খুব একটা বিদ্যা না থাকলেও অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞ,আর বিজ্ঞতায় প্রাজ্ঞ। তাই ছেলেমেয়েগুলো যাই বলুক সে তাদের নাদান মনে করে। সত্যসুন্দরের সত্যকে সুন্দর করে দেখার কথা খুব একটা জোরে বলেনি, কিন্তু বিষ্টুর তা কান দিয়ে একেবারে মরমে ঢুকে গেছে। এটাই বধিরতার একটা দোষ, কখনো অল্পেই শুনতে পায়, আবার কখনো ভুল শুনে ভুল প্রতিক্রিয়া দেখায়। সত্যসুন্দরের কথা এক্ষেত্রে বিষ্টু ভালোই ও সঠিক শুনতে পেল। শুনেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বলল -"কি বললে বাছা! আর বলোনা। ওসব বইয়ের কথা। বইয়ে তুলে রাখো।" "ও বিষ্টুদা এটা বইয়ের কথা তুমি কি করে জানলে?" "তোমরা ছাত্র ছাত্রী। তোমাদের কথা বই ছাড়া কি হতে পারে। তোমাদের পাশে থেকে থেকে একটু আধটু আঁচ করতে পারি, কোনটা বইয়ের কথা,আর কোনটা বইয়ের বাইরের কথা। কথায় আছে জানো তো চুম্বকের পাশে লোহা থাকলে লোহাও চুম্বক হয়ে যায়। তুমি তো ভাইপো দু'দিনের ছোকরা। সত্যের কি বোঝ!" মনে মনে বিড় বিড় করতে করতে বলল দু'দিনের ছোকরা,নাক টিপলে দুধ বেরয়, বাকিটা জোরেই বলল "সত্যের কতটুকু দেখেছ বাবু সত্যসুন্দরম্।" বিষ্টু ক'দিন আগে কেরালা বেড়াতে গিয়েছিল। এখন তার অভ্যেস হয়েছে কোনো কোনো সময় শব্দের শেষে 'ম্' যোগ করে কথা বলা। কেরালায় ক'দিন বলতে বলতে এই অভ্যেসের ফল সত্যসুন্দরকে সত্যসুন্দরম্ বলে ডাকল। সকলে হেসে অস্থির। তারা বলল "এই হচ্ছে আমাদের বিষ্টুদা। চুম্বক বিষ্টুদা।" বিষ্টু তাদের কথায় কান দিলনা। ওরা ছাড়া এখন আর কারো চা খেতে আসার সম্ভবনা নেই। মাথায় তখন জ্ঞান গিজ গিজ করছে। সত্যসুন্দর এবার বিষ্টুর পেছনে লাগল, বুঝতে পারছে বিষ্টুদা এবার লম্বা একটা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য রেডি। সত্যসুন্দর তখন বলল - " বিষ্টুদা তোমার সত্য কেমন সুন্দর তাহলে বলো।" বিষ্টু  দেখল তখন বাইরে খর দুপুরের রোদ। খুব চোখ রাঙাচ্ছে। ষাঁড়টা ছাতিম তলায় শুয়ে ঝিমোচ্ছে। একটু আগে এখান থেকে ঘুরে গেছে,হাফ পাঁউরুটি খেয়ে গেছে। চোখে মুখে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়েছিল। আর ঐ জল শূন্য বালতিতে জল দিতে চো চো করে খেয়ে এখন বাবা ভোলানাথের বাহন দেখো দিব্বি চিৎপটাং হয়ে জাবর কাটছেন। সত্যসুন্দর বলল - "ওটাই তো সুন্দর!" "কী বললে?" চোখ বড় করে বলল বিষ্টু। "ওটাই সুন্দর।" সত্যসুন্দর বলল খাটো করে। বিষ্টু ঠিক শুনতে পেল। বিষ্টুর কাছে কেউ যখন কিছু শুনতে চাইবে তখন বিষ্টু যে কতবড় দার্শনিক তা টের পাইয়ে দিয়ে ছাড়বে। তবে শর্ত যখন সে বলতে শুরু করবে চুপচাপ শুনে যেতে হবে। বিষ্টু শুরু করল গত পরশুর ঘটনা বলে। এক মেয়ে। শর্মিলা ঘোষ। বাপ সোহাগি। বাপের কাঁসা পেতলের ব্যবসা। বৌয়ের বাপের বাড়ির দেশ, গৌরাঙ্গ পুর। ঘাটাল। পাঁচ তলা পাকা বাড়ি। যৌথ পরিবার। চার ভাই। সিদ্ধার্থ বড়। বড় ভাইয়ের মেয়ে গোটা পরিবারের একমাত্র মেয়ে। তোমাদের মতো কলেজে পড়তো। ভাইয়েদের সব ছেলে। সেই মেয়ে তলে তলে প্রেম করে বিধর্মী ছেলে রাকিবুদ্দিন ইসলামের সঙ্গে। সেও বাবার বড় লোকের ছেলে। কন্ট্রাকটরী ব্যবসা। একমাত্র ছেলে।বন্ধু সুলতানা বেগমের জ্যাঠতুতো দাদা। রাকিবুদ্দিনও দেখতে যেমন লম্বা তেমনি চওড়া। শর্মিলা ও রাকিবুদ্দিন যেন রাজযোটক। অল্প কানাঘুষোয় শর্মিলার ব্যাপারে বাড়ির লোকের মধ্যে জানাজানি হতে শর্মিলার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলো। শর্মিলা সব জানালো। ঘর থেকে প্রবল আপত্তি। শেষে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলো। আদালতে শর্মিলা হাজিরা দিয়ে বলেছিল- "আমি অ্যাডাল্ট। আমার স্বেচ্ছায় বিয়ে করার অধিকার আছ। "তারপর আর কি আদালতে সিদ্ধার্থ ঘোষের  হার হল। বাপের সামনে দিয়ে মেয়ে গটগটিয়ে চলে গেল। বাপ করুন দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আদালত চত্বরে হার্ট স্ট্রোক। হাসপাতালে যাওয়ার পথে মৃত্যু। তাহলে এই সত্যের মধ্যে সুন্দরটা কোথায়? বাবা মায়ের গর্বতো সন্তান। একটা সম্পর্কের সৌন্দর্য,এ ধরনের সত্যের পথ জীবনকে সুন্দর করলো কী করে?" "এর মধ্যেও সৌন্দর্য আছে বিষ্টুদা।" বলল সত্যসুন্দর। মেয়েগুলো রে রে করে উঠলো। উশষী বলল -"কী সৌন্দর্য দেখলি তুই বল?" সকলে সায় দিয়ে বলল "ঠিকই তো! তুই বল।" এদিকে বিষ্টুর চোখে কোনে জল চিক চিক করছে। তাদের কথা না শুনেই বলে যেতে লাগল - " জন্মের জন্য সাধনা থাকে। মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের কত স্টেশন। সব পেরিয়ে শেষে মৃত্যুর স্টেশনের জন্য মানুষ অধীর অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু তার না চাওয়া ঘটনাই যদি মৃত্যুর বার্তা হয়ে আসে, তখন জীবনের কোন সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে?" এবার সত্যসুন্দর শুরু করলো- "জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে জীবনের যাত্রায় সময় আসে নানা রূপান্তর। জন্মের পদ্ধতি এক,মৃত্যুও তাই। জীবনের তাই হলো চরম সত্য। এই জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে মানুষ ধর্মের নিগড়ে চিহ্নিত হয়। নিজেদের আলাদা আলাদা করে ফেলে। এই আলাদা হওয়ার আত্মসচেতনতা থেকে আসে সংস্কার। এগুলো কিন্তু জীবনের মূল চাহিদা নয়। জোর করে চাপানো। মানুষের জন্ম ও মৃত্যু চূড়ান্ত মুহূর্ত। আর জন্ম থেকে মৃত্যুর মধ্যে জীবনের ছকে সকলে যে যার মত জীবন ভোগ করে। এই ভোগের পথে আছে বিড়ম্বনা।  বিড়ম্বনার মূলে ধর্মীয় সংস্কার। এখানে তাই মনে হয়েছে সৌন্দর্য বিফল। কিন্তু মানুষ তার মৌলিক পার্থক্যটা বোঝে ধর্মীয় সংস্কারে। এটার উর্ধ্বে উঠলে অনন্ত সৌন্দর্য আছে। সিদ্ধার্থ ঘোষ তাই মানতে পারেননি বলে ধর্মীয় সংস্কারে মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুই মুক্তি দিয়েছে। যদি জীবিত থাকতেন মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে ক্রমশ দগ্ধ হতেন। এই মুক্তিটাই সৌন্দর্য। মৃত্যু দিয়েছে এই চূড়ান্ত সৌন্দর্য। এই যে বিষ্টুদা চা পান করায়,এই চায়ের টেস্ট সবাই সমান পায়? কি পায়না? এর সৌন্দর্য ফ্লেবারটুকুতে যে যার মত অংশগ্রহণ করে। আর উপকার একটাই,ধর্ম বিচার করে উপকার আলাদা আলাদা হয়ে যায় না। "চল ক্লাস আছে। বিষ্টুদা তোমার পয়সা কত হয়েছে?" "না পয়সা দিতে হবে না।" "এও এক সৌন্দর্য!"    *** শেষ*** @ copyright reserved for Mridul Kumar Das.  

৫টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...