বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

প্রিয়তমা তোমাকে (পিয়ালী চক্রবর্তী)



আজ বহুদিন পরে আবীর বাড়ির বাইরে পা রেখেছে । নিজ পছন্দের গাড়িটি ড্রাইভ করতে করতে শুনছে জীবনানন্দ দাশের "দু'জন" কবিতাটি, “আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন....কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো । এক নক্ষত্রের নিচে তবু,

একই আলো পৃথিবীর পারে,

আমরা দুজনে আছি,

পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রকেও একদিন মরে যেতে হয়… ”

 । আর হারিয়ে যাচ্ছে বিগত সুখের দিনগুলোয়, যখন তার জীবনে ছিল রাইমা । 


কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান । হৈ - চৈ কাণ্ড যাকে বলে । প্রথম বছর ফিজিক্স অনার্সের ছাত্রী রাইমা চ্যাটার্জী । মোহময়ী সাজে বন্ধুদের সাথে হাসির ঢেউ তুলে প্রবেশ করলো কলেজ অডিটোরিয়ামে । বেশ কিছু ছেলের আত্মা খাবি খেতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই । একেই ওই ফেটে পড়া রূপ, তার ওপরে মুক্তোর মতো দাঁতের সুন্দর হাসি । ছেলেদেরকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না । 


অনুষ্ঠান শুরু হলো । হাতে মাইক নিয়ে তৃতীয় বর্ষ মাথাম্যাটিক্স অনার্সের আবীর সঞ্চালকের ভূমিকায় । ব্লু - জিন্সের সাথে দুধসাদা পাঞ্জাবী আর চোখে রিমলেস চশমায়, ছ ফুটের স্বাস্থ্যবান আবীরকে দেখে "হায়!! হায়!!" রব তুলবেনা এমন মেয়ে বিরল । 


জীবনানন্দের "বনলতা সেন" কবিতার একটি ছত্র পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করলো আবীর, "চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর,

হাল ভেঙে যে-নাবিক, হারায়েছে দিশা,

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে, চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে, অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মতো চোখ, তুলে নাটোরের বনলতা সেন ।


স্টেজের সামনের দিকে বসা রাইমা তো পুরো কুপোকাত । যাকে বলে, "লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট" । আবীরের চোখের অতলে মনের হদিস পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো রাইমার মন । যতক্ষণ অনুষ্ঠান চললো, সঞ্চালকের দিক থেকে নজর তুলতে পারলোনা রাই । 


অনুষ্ঠানের শেষে স্টেজ থেকে নেমে আবীর ওর সামনে দিয়ে চলে গেলো । বাকি সব ছেলেরা যেমন চোখ দিয়ে ওকে গিলে খায়, আবীরের মধ্যে সেরকম কোনো প্রবণতাই নেই । বরং দেখে মনে হলো বেশ নাক উঁচু আছে । এ ছেলেকে বশে আনতে বেগ পেতে হবে । মনে মনে রাইমা ঠিক করলো, প্রথমেই ওর মোবাইল নম্বরটা জানতে হবে । 


ওরই এক বান্ধবী ম্যাথস ডিপার্টমেন্টে প্রথম বর্ষের ছাত্রী । রাই ওকেই দায়ভার চাপিয়ে দিলো আবীরের নম্বর জোগাড় করার । সেদিনই টিফিন ব্রেকে ওর বান্ধবী এসে  ক্যান্টিনে ওর সাথে দেখা করে আবীরের নম্বর দিয়ে গেলো । রাই যেনো হাতে আকাশের চাঁদ পেলো । 


তড়িঘড়ি মোবাইল নম্বরটা সেভ করে নিল ফোনে । WhatsApp এ পিং করলো, "হাই!" কিছুক্ষণের মধ্যে রিপ্লাই এলো, "হ্যালো, হু ইজ ইট?"

রাই : আপনার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ।

আবীর : ওহ্হঃ, রিয়েলি!!

রাই : ইয়াপ । ক্যান উই মিট । আই এম এট ইয়োর কলেজ ক্যান্টিন ।

আবীর : ওয়েট করুন, আসছি ।


মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ক্যান্টিনে ঢুকে ওই নম্বরটায় মেসেজ করতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে ওর পেশীবহুল কাঁধে কোমল হাতের স্পর্শ অনুভূত হলো । ঘুরে দাঁড়িয়ে রাইকে দেখে ওর রূপের ঝলকে আবীর পুরো ফ্ল্যাট । 

আবীর : আপনি, মানে তুমি করেছিলে মেসেজ? 

রাই : হুম । হ্যালো, আমি রাইমা চ্যাটার্জী । 

আবীর : আমি আবীর ভট্টাচার্য । চলো, বসে কথা বলি । 


এভাবে আলাপ হবার পরে রোজ কথা বলতে বলতে দিনের পর দিন যেন কোন ফাঁকে পার হয়ে যায় । দুজনেই পছন্দ করে দুজনকে । কেউই বলতে পারেনা একে অপরকে নিজেদের মনের কথা ।


কালক্রমে চলে এলো স্বরস্বতী  পুজো, অর্থাৎ, বাঙালির প্রেম দিবস । আবীর মনে মনে ঠিক করেছে , আজকে রাই কে ওর মনের কথা বলতেই হবে । ওদিকে রাইও আবীরকে মনের কথা বলতে ব্যাকুল । ওদের প্ল্যান মতো অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে ওরা যাবে একটা সিনেমা দেখতে । 


দূর থেকে হলুদ শাড়ি, খোলাচুল, আর প্রসাধনীর বাহুল্যে রাইমাকে আসতে দেখে আবীরের মনে যেন তুফান উঠলো । আজকে বলতেই হবে ওকে যা বলার ।


রাইমা দূর থেকে নীল পাঞ্জাবী আর সাদা চোস্ত পরিহিত আবীরকে দেখে নিজেকে আর যেন সামলাতে পারছিল না । আজকেই ওকে নিজের করে নিতে হবে । আর যেন অপেক্ষা সইছেনা এই প্রাণে । 


দুজন দুজনার কাছে এলো । একসাথে অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে আবীরের গাড়িতে উঠলো দুজন । আবীর আড় চোখে তাকাতে তাকাতে চললো পুরো রাস্তাটা । সিনেমা হলে পৌঁছে সোজা ঢুকে গেলো হলের ভেতরে । টিকিট আগে থেকেই কেটে রেখেছিল আবীর । 


হল অন্ধকার হতেই দুজনের বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল । এই প্রথম অন্ধকারে পাশাপাশি ওরা দুজন । সিটের হাতলে রাখা রাইমার হাত । আবীর আর যেনো লোভ সামলাতে পারলোনা । রাইমার কোমল হাতটা ধরে নিলো ওর জিম করা শক্ত তালুর মধ্যে । রাইমা গলতে শুরু করেছে আগেই । এখন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মাথাটা ঠেকিয়ে দিলো আবীরের কাঁধে । 


দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসই ঘন হয়ে এলো । আবীর ডান হাত দিয়ে রাইমাকে টেনে মিশিয়ে নিলো ওর বুকের সাথে । শক্ত পুরুষালি বুকে রাইমার নরম শরীর যেন পিষে গেল । পরম সুখাবেশে রাইমার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো । আবীর ওর ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট এনে বললো, "ভালোবাসি" । রাইমা আবীরের মাথাটা ধরে টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে বললো, "আমিও, খুব বেশি ।"


শুরু হলো ওদের প্রেমকাহিনী । চোখধাঁধানো এই জুটিকে দেখে কলেজের অনেকেই ঈর্ষান্বিত । আবীরের বেস্ট ফ্রেন্ড কুণালের বার্থ ডে পার্টি সেদিন । গার্লফ্রেন্ড হিসেবে রাইমারও নিমন্ত্রণ । পার্টি হবে পার্ক স্ট্রিটের এক নামকরা নাইট ক্লাবে । বন্ধুদের সাথে সাথে প্রত্যেকের পার্টনারদেকেও ইনভাইট করেছে কুনাল । আবীরের বারণ করা স্বত্তেও রাইমা বেশ কিছু ছেলের সাথে ডিস্কোথেকে কোমর দোলাচ্ছিলো মিউজিকের তালে তালে । আবীর দেখছিল, আর ওর গা জ্বালা করছিল । অজানা অচেনা ছেলেদের সাথে অত নাচের কি আছে কে জানে । মনে মনে ভাবতে লাগলো, আজকে আচ্ছা করে ঝাড় দেবে ও রাইমাকে ।


খাওয়া দাওয়ার সাথে সাথে মদ্য পানও চলছিল সমান তালে । রাইমার ড্রিংক করা সহ্য হয়না । তবুও সেই ছেলেগুলোর পাল্লায় পড়ে দুটো ব্লাডি মেরি খেয়ে ও প্রায় অচেতন । আবীর পড়লো মহা মুশকিলে । ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে । রাইমাকে একটা সোফায় বসিয়ে ও গেল পার্কিং লট থেকে গাড়িটা বের করতে । গাড়ি বের করে লাউঞ্জে ফিরে এসে দেখে, যে সোফায় রাইমা বসে ছিল সেটা ফাঁকা । ও ভাবলো হয়তো টয়লেটে গিয়ে থাকবে রাই । 


লেডিস টয়লেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ । রাইএর পাত্তা নেই । আবীর এবারে ভয় পেয়ে গেল । প্রায় আধঘন্টা পার হয়ে গেছে ।  কুণালকে বলে পার্টি লাউঞ্জে গান বন্ধ করিয়ে মাইকে আনাউন্স করতে লাগলো রাই এর নাম । কোনো পাত্তা নেই । 


এমন সময় ওদের বন্ধুদের মধ্যে একজন চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে এলো স্টেজের সামনে । ভয়ে , টেনশনে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে তার । জড়ানো গলায় যতটুকু বললো, "রাইমা, পেছনের দিকে বাগানে, পড়ে আছে ।" 


আবীরের পায়ের তলায় যেন মাটি সরে গেল । একদৌড়ে পেছনের দিকের বাগানটায় গিয়ে দেখে, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ওর প্রাণের চেয়েও প্রিয়, ওর প্রিয়তমা রাই । শরীরটা যেন ছিঁড়ে কুটে খেয়েছে কামাতুর জানোয়ারের দল । গলায় কেউ যেন ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করেছে । সবার বুঝতে বাকি রইলো না রাইমাকে কেউ বা কারা ধর্ষণ করে খুন করে ফেলে রেখে পালিয়েছে । 


কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে রাইমার বডি হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্যে পাঠিয়ে দিলো । আবীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু পাওয়া গেলো না, কারণ ও সেই যে চুপ করে গেছে , অঝোরে চোখ দিয়ে জল পড়ে চলেছে ওর, কোনদিকে নজরই নেই । 


নাইট ক্লাবের সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়নি পুলিশদের । কিন্তু, আবীর আর ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে । পড়াশুনো ছেড়ে দিয়ে গত পাঁচ বছর গৃহবন্দী থাকার পরে আজ এত বছর পরে রাস্তায় বেরোলো ও । 


গাড়িতে তখন চলছে জীবনানন্দের আরেক অপূর্ব সৃষ্টি, “সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,

বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে,

ফিরে এসো সুরঞ্জনা,

নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে,

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে,

ফিরে এসো হৃদয়ে আমার,

দূর থেকে দূরে.....আরও দূরে.....

যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর। ”


চোখের জলে রাস্তা ঝাপসা হয়ে এলো । কিন্তু, পথ তো চলতেই হবে, অপেক্ষা তো করতেই হবে ওকে ওর রাইমার জন্য । ও যে বলে রেখেছিল রাইমার প্রাণহীন দেহের কানে কানে, “শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে

বলিলাম, ‘একদিন এমন সময়

আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!–

পঁচিশ বছর পরে!”

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

১৯টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ। আবার আসিব ফিরে. . মন একটা চেতনা বলছে রাইমা যদি আসে!

    উত্তরমুছুন
  2. ভালোবাসার মানুষের তরে অপেক্ষা করার যন্ত্রণাকে আপন লেখনীর মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছো...এই অপেক্ষার অবসান শেষে রাইমা আবার আবিররাঙা হয়ে উঠুক এই কামনা রাখি...অসাধারণ☺️😌💗💗

    উত্তরমুছুন
  3. অপূর্ব। কি লিখেছো গো!!!!! মনে হলো চোখের সামনে পুরোটা দেখতে পাচ্ছিলাম।

    উত্তরমুছুন
  4. বার বার ফিরে দেখে রাইএর মুখ
    এই বেঁচে থাকাতেই আবীরের সুখ।
    বেদনাদায়ক ভাল লাগা।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...