সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

অনু গল্প : "নাড়ির টান" #কলমে~পল্লবী


 

 আইসিইউর দরজার পাশে বিছিয়ে রাখা কয়েকটা সোফা সেটের একটিতে বসে আছে সুবোধ। মাঝে মাঝে উৎকন্ঠিত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, যদি কাউকে দেখা যায়? ওখানেই যে জীর্ণশীর্ণ দেহে অজস্র নল লাগিয়ে শুয়ে আছে ওর জন্মদাত্রী মা। সুবোধের চির দুঃখী মা! পাশের লম্বা সোফায় শুয়ে কেউ একজন বিকট শব্দে নাক ডাকছে। সুবোধের কেমন যেন একটু বিরক্তি লাগে! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত প্রায় তিনটা ছুঁইছুঁই করছে। অপারেশান যিনি করেছেন, সেই সার্জন তো বলেই দিয়েছেন যে আটচল্লিশ ঘন্টার আগে রোগীর কন্ডিশন সম্পর্কে কিছুই বলা যাবে না। আঘাতের ফলে মাথার বেশ কয়েকটি জায়গায় রক্ত ক্ষরন হয়েছে। বুকের পাঁজর আর হাত - পায়েও গভীর ক্ষত আছে। তবে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে ব্রেন। বেঁচে থাকলে সারাজীবনের মতো পঙ্গুত্ব নিয়েই থাকতে হবে। ভাবতে ভাবতে একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে সুবোধের। 


 জন্মের পর থেকে সংসারে অভাব অনটন দেখেই বড়ো হয়েছে সুবোধ। বাবার ছিলো হাঁপানির রোগ। সারাবছর কাশি লেগে থাকতো। আর মাঝে মাঝে কাশির সাথে বের হতো রক্ত। সেই রক্তের দিকে তাকিয়ে সুবোধের শরীরের ভেতরে শিরশির করতো। হাঁপানির কারণে বাবাকে কেউ কাজে নিতে চাইতো না। সবাই এড়িয়ে চলত। সুবোধের অভাগী মা সারাদিন মহাজন বাড়ির গৃহস্থলি কাজ করে, কখনো কখনো অন্যদের বাড়ির ফাইফরমাশ খেটে কোন রকমে তিনজনের পেটের ভাত জোগাড় করতো। চাষাবাদের জমি বলতে কিছুই ছিলো না বসতভিটা র সাথে লাগানো ওই এক ফালি জায়গা ছাড়া। সেই জায়গায় সুবোধের মা নানারকম মৌসুমী শাক সবজি ফলাত। এখান থেকেই তাঁদের তিন জনের আহারের একটা বিরাট অংশ আসতো। সুদিনের সময়ে, ধান কাটার পরে ধান গাছের গোড়া তুলে শুকিয়ে, গাছের ঝরে পড়া পাতা কুড়িয়ে কিংবা গরুর গোবর শুকিয়ে তা চুলার জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করতো মা। মোটকথা, এভাবেই জোড়াতালির সংসার ছিলো তাঁদের।

লেখাপড়ায় বরাবরই মেধাবী ছিলো। সবাই আড়ালে বলতো 'গোবরে পদ্মফুল' নামে! মেধাবী হওয়ার কারণে টিচারদের সহযোগীতা সব সময় পেয়েছে সুবোধ। সরকারী- বেসরকারি নানা রকম বৃত্তির টাকায় চলত ওর পড়াশোনার খরচ। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের টাকাও মওকুফ করা হয়েছিল শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে। তো সেবার ও সুবোধ সব প্রতিকুলতাকে জয় করে উপজেলায় সেরা রেজাল্ট করে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলো। স্বয়ং চেয়ারম্যান সাহেব নিজেই এসেছিলেন অনেক মিষ্টি আর ফল নিয়ে। যাওয়ার সময় অনুদান হিসেবে দিয়েছিলেন বেশ কিছু টাকা। সেই শুরু সংগ্রামী জীবনের। ভার্সিটির ভর্তি ফরমের টাকার জোগান দিতে সুবোধ দিন রাত টিউশনী শুরু করল। একসময় অবাক হয়ে দেখলো,তার ছাত্র/ ছাত্রীর সংখ্যা নেহাতই কম নয়। পড়িয়ে রোজগারও বেশ ভালোই হতে লাগলো সুবোধের। সংসারের দারিদ্রতা ও যেন কিছুটা কমলো। আগের মতো সুবোধ ওর মাকে আর উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে দেয় না। বাবার শরীর ও যেনো দিন দিন কেমন ভেঙে পড়ছে। কাশি যাচ্ছে না। রক্ত যাওয়ার পরিমাণও বেড়ে গেছে। একদিন কি ভেবে সুবোধ টিউশন করে ফেরার পথে এনজিও সংস্থার স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়ে আসে বাড়িতে। স্বাস্থ্যকর্মী ওর বাবার কফের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যায় পরীক্ষার জন্য। যাওয়ার সময় বলেও যায় যে রোগের অনুমানের কথা। 
 
সুবোধ সৌভাগ্যবশত ওর নিজ জেলার ইউনিভার্সিটিতেই চান্স পেয়ে যায়, যা নাকি ওর বাড়ি থেকে মাত্র পঁচিশ কিলোমিটার দূরে। বাবা- মায়ের খুশীর যেনো শেষ ছিলো না কোনো। সবচেয়ে বেশী খুশী ওর মা!নাড়ি পোতা ধনকে বাইরে গিয়ে পড়া শোনা করতে হবেনা, এটাই যেনো বিরাট ব্যাপার ছিলো মায়ের কাছে। ভার্সিটিতেই মিলির সাথে পরিচয়। একই ডিপার্টমেন্ট। সেই পরিচয় প্রথমে প্রণয় ও শেষে পরিণতিতে পূর্ণ হয়েছে। আজ তাঁদের সংসার আলো করে রাখে গতকালই তিনে পা দেওয়া , সুবোধের কলিজার টুকরা ওর মেয়ে মিথিলা, সুবোধ আদর করে 'মিম্মু' বলে ডাকে। মেয়ের কথা মনে হতেই সুবোধের বুকের ভিতরটা যেনো হাহাকারে ভরে গেলো। এতো বড় ভুল তার হলো কীভাবে?? অনার্স ফাইনালের আগে দশ দিনের জ্বরে ভুগে বাবা মারা গেলেন। কিছুই করার ছিলো না সুবোধের। যক্ষায় ফুসফুস খেয়ে ফেলেছিল পুরোপুরি। কোন চিকিৎসাই কাজে আসেনি শেষ দিন গুলোই। বাবার মৃত্যুর সময় সুবোধের মায়ের চোখ দিয়ে একফোঁটা পানিও বেয়ে পড়েনি। সুবোধকে শক্ত করে জড়িয়ে ছোট্ট বাচ্চার মতো বুকে মাথা পেতে আধো স্বরে বলেছিল," কাঁদিস না। তোর বাবা দুঃখ থেকে মুক্তি পেয়েছে। তুই যে পিতৃহারা হলি, এটাই আমাকে কষ্ট দিচ্ছে"। 

 অনেক চেষ্টা করেছে সুবোধ। অনেক বুঝিয়েছেও মাকে। চাকরি পাওয়ার পর মিলিকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করার পরে, কিছুতেই মাকে রাজী করানো যায়নি সাথে থাকার জন্য। উচ্চশিক্ষিত, চাকুরিজীবি, শহুরে পুত্রবধুর সামনে সুবোধের মা যেনো বড় বেশী কুন্ঠা বোধ করেন। যদিও মিলি যথেষ্ট চেষ্টা করেছে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার। তিন বছর আগে মিথিলার জন্মের পরেও অনেক চেষ্টা করেছে মাকে নিজের সাথে রাখার। মায়ের এক কথা। স্বামীর ভিটে ছাড়া হবেনা। তাছাড়া, শহুরে পরিবেশে মায়ের কেমন যেনো দমবন্ধ লাগে। সবই বোঝে সুবোধ। কিন্তু করার কিচ্ছু থাকে না। কোন উপায় না দেখে মাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছিল। ওর নম্বর সেভ করে মাকে সেই নম্বরে কল করা আর রিসিভ করা বোঝাতে গিয়েই গলদঘর্ম সে। 

 গতকাল ছিল মিথিলার তৃতীয় জন্মদিন। সুবোধ খুব করে চেয়েছে মেয়ের খুশীর দিনে মাকে পাশে পেতে।মিলিও অনেক করে অনুরোধ করেছে শাশুড়িকে। সকাল থেকে মাকে অনেকবার ট্রাই করেছে ফোনে। প্রতিবারই 'নট রিচেবল' দেখাচ্ছে। শেষ অবধি থাকতে না পেরে বড় রাস্তার মুখে পরিমল কাকার দোকানে ফোন করে যা জানলো, শুনে সুবোধ অবাক ! মা নাকি সেই সকালেই একগাদা জিনিস পত্তর নিয়ে রওনা দিয়েছে। শহরের রাস্তাঘাট পরিচিত নয় বলে মাকে বলাই আছে একা না আসার জন্য। তবে আজ কি এমন হয়েছিল? মা কি ওদের চমকে দিতে চেয়েছিল?? মোবাইলের কল লিস্টে অনেক গুলো মিসড কলের মধ্যে দেখে একটা নম্বর থেকে অনেক কল এসেছে। তাড়াতাড়ি সেই নম্বরে কল দেয় সুবোধ। ও প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কথা শুনে সুবোধের মাথাটা যেন ঝিমঝিম করে ওঠে। মনে পড়ে বহু আগে, হাড় কাঁপানো শীতের রাতে যখন ওদের ঘরের বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আসা উত্তরের হিমেল হাওয়ায় পুরো শরীর অবশ,ছেঁড়া ফাটা কাঁথায় যখন কাঁপন থামছে না, সুবোধের মা পরম মমতায় নিজের নাড়ি পোতা ধনকে বুকের মাঝে গভীর ভালবাসায় জড়িয়ে উষ্ণতা দিতে দিতে বলেছিলেন," হ্যা রে খোকা ঘুমা। দেখ, ওই শীত ব্যাটা কেমন পালিয়ে যায় এবার"!  

সমাপ্ত।। 

 Copyright©️ All rights reserved
 Pallabi Barua

৮টি মন্তব্য:

  1. দুর্দান্ত ভালো লাগলো পল্লবী👌🏻👌🏻👌🏻👌🏻👌🏻

    উত্তরমুছুন
  2. দারুণ একটা গল্পো ,লেখক কে ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন
  3. দারুণ লাগল। ধন্যবাদ। ❤❤💫💫💥💥💅💅

    উত্তরমুছুন
  4. হগগলেরে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা,কৃতজ্ঞতা

    উত্তরমুছুন
  5. অসাধারণ 👌👌
    কি অপূর্ব লিখেছো গো, পোলো।💕

    উত্তরমুছুন
  6. মন ছুঁয়ে এক গল্প। অপূর্ব 👌👌👌

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...