শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

কুন্তীর প্রতি দ্রৌপদী (অনুগল্প) @শর্মিষ্ঠা ভট্ট




 


মাগো,
আমি দ্রৌপদী। তোমার সন্তানের ....না...তোমার সন্তানদের  অর্ধাঙ্গিনী। তোমার কুলবধূ, লক্ষ্মী। সংসারের শ্রী আমি। আমি সেই নারী যে অজস্র প্রশ্ন অজস্র কুটিল ভ্রুকুটি। হ্যাঁ মাতে, আমি এক অপূর্ব শ্যামাঙ্গিনী আগুন 🔥 জলন্ত কাম। আমি সেই নারী যার জন্ম বিশ্লেষণের উর্ধ্বে ,তাই আমি দ্রোহী অজনি সংহিতা। মাতৃ পরিচয়হীনা দ্রুপদ দুহিতা। অমি রাজ নন্দিনী, বৈভব বিলাসিনী । আমি মাতৃহারা।

আমার মায়ের কোন পরিচয় নেই, আমি যজ্ঞ থেকে আবির্ভূতা। কিন্তু আমার মন সে যে মানবীর মন। জানো কত কত রাত, আধো ঘুমে মায়ের স্বপ্ন দেখেছি। ঊষা কালে অবগুণ্ঠন নিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। মার উষ্ণ আদর কত মূল্যবান ... ...সে কেবল এক অনূঢ়াই বোঝে। না মা, পুত্র সন্তান নয়, এক কন্যা সন্তানের থাকে সেই কতরতা । কেউ কখনও বোঝে না। কেউ বুঝতে চায় না। কত গোপন কথা সবার জন্য নয়, শুধু মা আর মেয়ের গোপন গল্প গাথা সে। যাকে পাইনি, যাকে মন থেকে চেয়েছি, তাকে পাবো এমন সুক্ষ্ম আশা মনের মাঝে ছোট্ট মেঘের মতো তুলতুলে নরম অবয়ব নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ছিল। তোমার গান্ডিবধারীকে মালা দিলাম, কর্ণের মতো প্রেম পূজারীকে দূরে সরিয়ে দিয়ে। বর্ন সমাজ পিতা সামনে এসে দাঁড়াল। সবার সামনে হৃদয়ে এসে দাঁড়ালো তোমার শ্যামাঙ্গ ঋজু সৌম্য কান্তি পুত্র অর্জুন। ভালবাসলাম।। সত্যি ভালবাসলাম তাকে, সেই দিবালোকে সভার মাঝে। আমার যৌবনের প্রথম ভালবাসা, প্রথম পুরুষ। তাকে যখন প্রথম দেখলাম। রাজ সাজে নয়। সামান্য দ্বিজ সে তখন। তোমরা আত্মগোপন করছিলে, জ্ঞাতি শত্রুদের কাছ থেকে। তখন  জতুগৃহ থেকে সবে বেঁচে নিঃসহায় দরিদ্র । বাঁচতে গিয়ে নানা রূপ বদল করে ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজেদের লোকাচ্ছিলে। বাঁচার তাগিদে অভিনয়। আমি তখন প্রজাপতির পাখায় উড়ে সামান্য ব্রাম্ভণের পেছনে বৈভব ত্যাগ করে এসে দাঁড়ালাম তোমার কুটির দ্বারে। তোমার ছেলেরা উৎসাহে ডেকে উঠলো " মা" ........ আমার সেই মায়ের স্বপ্নের নরম কালো মেঘ থেকে বর্ষা পড়বে ভাবলাম। আকন্ঠ মাতৃস্নেহ এসে ভেজাবে গো আমায়। না...... হল না...... বুক ভেঙে কানে বাজল দুই শব্দ ....." ভাগ করে নে " । ভাগ হলাম আমি। তোমার একটা সমান্য বাক্য আমায় সামান্য নারী থেকে অসামান্যা করে দিল। মার আঁচল হয়ে গেল শশ্রূমাতার বরন ডালা। চিরায়ত এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক অভিনয় লুকিয়ে রইল ওই পরিচয়ে। যে পরিচয়ে নারী নিজের সন্তানের স্বার্থ সব কিছুর প্রথমে রাখে, যে পরিচয়ে শত চেষ্টা করেও কখনও বধূ সন্তানের থেকে বা সন্তানের মতো সমান প্রিয় হতে পারে না। একটা অভিনয় চলেতে থাকে দীর্ঘ পথে অগ্রসর হতে হতে। আমার জন্য একবার ভাবলে না তাই বিলিয়ে দিলে। আমার প্রথম প্রেম সরে গেল জীবন থেকে। প্রথম স্পর্শ .......তোমার এক বাক্য মা গো। তুমি আমার মা হতে পারলে না। তুমি অনেক দূরে সরে গেলে। তবু সমাজ - দায়বদ্ধতা ।।কেউ লক্ষ্য করল না আমার আর তোমার কি বিশাল একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। কি বিশাল অভিনয় আশ্রয় করে সম্ভ্রান্ত কুলের দুই নারী বসবাস করেছি এক ছাদের নিচে।তর্ক বিতর্ক ছাড়াও দুজনের দুরত্ব বড়ো গভীর।

তুমি কি পারতে না এই অনর্থ থেকে বাঁচাতে? বলতে পারতে না.. না দেখে ভুল করে..... না তুমি তা বলোনি।
বলতে চাওনি। কারন একটা বড়ো শক্তির সাথে আঁতাত চাইছিলে। আমি একটা কারন , একটা পাশার ঘুটি। তোমার পান্ডবদের রক্ষা কবচ। আমার দেহের আগুন দেখে চমকে ছিলে। ন্যায় দন্ড শ্রদ্ধা সহনশীলতা আর ভক্তির পরাকাষ্ঠা তোমার পরিবারের ঐক্যের জন্য দরকার আমার রূপ গুন বৈভব । আমার পেছনে থাকা হাজার শক্তিশালী হাত।

তুমিও তো নারী। দেবতাদের কাছে বরপ্রাপ্ত সন্তান পেয়ে পেয়ে সতীত্ব নিয়ে ভাবাই কি বন্ধ করে দিয়েছিলে?কেবল পান্ডুর পত্নী এটুকু পরিচিতি প্রাপ্তিতে তুমি নিজেকে কি গুটিয়ে নিয়েছিলে? কেবল পান্ডব জননী তুমি! আর নিঃশব্দ চারিনী কুরু কুলবধূ। তোমার সন্তানদের দুঃখের কারণ যারা, সেই ধীতরাষ্ট্র গান্ধারীর সেবায় বৃদ্ধ বয়সে কাটিয়ে দিলে। এত যদি উদার তোমার মন আমায় কেন একবার নিয়ম থেকে মুক্তি দিলে না। যৌবনের প্রথমে অর্জুনকে একবার অধিক সময় আমার সাথে..... না মা আজ তোমায় অনুযোগ করবো না। তোমায় বোঝার চেষ্টা করছি। তোমার সমস্ত সততা আমার মাথায় ঝরে পড়ল না। "বেশ্যা " আমি পাঁচ স্বামী গমনকারিনী ..... সভায় ওরা যখন টেনে নিয়ে গেল একটি প্রতিবাদ নেই কেন মা!! আমার মন তোমায় ডেকে ছিল মা.............

তাই আর তুমি নও, পঞ্চপাণ্ডব আমার অনুগামী। বনে জঙ্গলে রাজসিংহাসনে আমি নিজেকে ছেয়ে দিয়েছি। বলতে পারো এ অস্তিত্বের লড়াই। তুমি হারিয়ে গেছো বৃদ্ধদের ভীড়ে। তোমার কথার আর কোন দাম নেই। নেই তোমার থাকা না থাকার ফারাক , বৃদ্ধাশ্রমে তোমরা। আমি ইন্দ্রপ্রস্থের রানী। কুরু কুলমনী দ্রৌপদী। আমি লজ্জা আমি ত্যাগ আমি ভোগ আমি সত্য আমি পরিপূর্ণ নারী। আমি দ্রোহী । এক বিশাল অভিনয়ের আমরা দুই  নটী।। রাজবধূ রাজকন্যা আর নিঃস্ব জীবন পথের পথিক। । 🌸🌸


৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...