শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

অনু গল্প : শিরোনামহীন #কলমে ~ পল্লবী




আধা ঘণ্টা ধরে জ্যামে বসে রাশির বিরক্তির শেষ নেই। শহরের এই মোড়ের জ্যাম বিখ্যাত খুব। অনায়াসে বসে বসে দু তিন ঘণ্টা পার করে দেয়া যায়! নতুন রাখা ছোকড়া ড্রাইভার অনেক ক্ষণ থেকে উসখুস করে চলছিল। রাশি বুঝলো যে, ড্রাইভারের তামাকের নেশা চড়েছে। খানিকটা গম্ভীর মুখেই বলল," যাও কি খাবে খেয়ে এসো। আর হ্যাঁ আসার সময় একটা ডাব নিয়ে এসো" বলে পার্স থেকে টাকা বের করে দিলো। "এফএম টা অন করে যাও" উদাস স্বরে বলল রাশি আবারো।
 
 
বেশ কিছুটা দূরে সিগন্যালের জ্বলতে থাকা লাল বাতির দিকে তাকিয়ে ভাবছে কবে বাড়ি পৌঁছবে? সেই কবে সাত সকালে ওটমিল খেয়ে বেরিয়েছিল আর এখন বাজে পৌনে দুটো! মাকে একবার ফোনে বলে দিলো বসে না থেকে খেয়ে ফেলার জন্য। কতক্ষন লাগবে জ্যাম ছুটতে কোন ঠিক নেই। শহরের ব্যস্ততম রাস্তা গুলোর মধ্যে এই মোড়ের ট্র্যাফিকও ভয়াবহ। লাঞ্চ আওয়ার বলে রাস্তার দু পাশের ফুটপাথে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা খাবারের মোবাইল ভ্যান গুলোতে উপছে পড়া ভিড়। কি পাওয়া যায়না এ সব ভ্যানে?!? পাপড়ি চাট থেকে শুরু করে মোগলাই কিংবা চাউমিন থেকে মোরগ পোলাও, সবই পাওয়া যায় এখানে। খাবারের মতো কাস্টমারদের ও বিভিন্ন ক্যাটাগরী। সব শ্রেণী পেশার লোকজন এখানে খেয়ে থাকে যার যার সাধ্য ও রুচি অনুযায়ী। মুখরোচক সেসব খাবারের দিকে তাকিয়ে অজান্তেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে।
 
 
এক সময় এই মোড়টা ছিল সময় কাটানোর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা! সারাটাদিন ঘুরে ঘুরে কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো ফুলের দোকানে, কখনো বা শহীদ মিনারের ওই দিকে খোলা জায়গায় নয়তো পার্কের ভেতরে বসে আজেবাজে যত্ত সব খাবাবের সাথে সময় গুলো তরতরিয়ে কেটে যেতো টেরও পেতো না! নিজের উপর খানিকটা বিরক্ত হয় রাশি। একা থাকলেই এ সব স্মৃতি কাতরতায় পেয়ে বসে তাঁকে! পাশের গ্লাসে টুকটুক শব্দে তাকিয়ে দেখে, দশ বারো বয়সী কচি মুখ টা ইশারায় জানতে চাইছে ফুল নেবে কিনা? কি ভেবে গ্লাসটা নামালো রাশি। কয়েকটা লাল গোলাপ আর বেলী ফুলের মালা নিয়ে আগ্রহ ভরে চেয়ে আছে ওর দিকে। আহা!! কি মায়ায় ভরা চোখ দুটি!! " আপা, সব নিয়া নেন। তাইলে পরে খাবার কিইন্যা খাইতে পারুম। ছোড ভাইডা না খাইয়া বইসা আছে গো। নিয়া নেন আপা। পাঁচ টাকা কম দিয়েন" বলে করুণ হাসে। এই ধরনের সংলাপ এই মোড়ে খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। কিন্তু আজ যেনো রাশিকে কিছুটা ভাবালুতায় পেয়ে বসেছে। সাতপাঁচ না ভেবেই সে সব কিনে নেয় আর বাড়তি টাকাও ফেরত নেয় না। কচি মুখটা যেনো কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠে। রাশি সামান্য হেসে গ্লাসটা আবারো তুলে দেয়। কি করবে সে এত্তো এত্তো গোলাপ আর বেলী দিয়ে?? কাকে দেবে??
 
 
পিঁপড়ের সারির মতো দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ী আস্তে আস্তে চলতে শুরু করেছে। ড্রাইভার ও ডাব নিয়ে এসে রাশিকে দিয়ে গাড়ীতে স্টার্ট দেয়। ডাবের ঠান্ডা পানি খেতে খেতে রাশি আনমনে শুনছে সিমিনের অনেক আগে গাওয়া গানের লিরিক্স। কি অসাধারণ! "তুমি হীনা নগরের এই গতিময়তায়.....বলো তুমি এমন কেনো? একবার দেখে যাও"! ধীরগতিতে চলতে থাকা গাড়িতে বসে রাশি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরে। খাবারের ভ্যানগুলোতে এখনো বেশ ভীড়। দীর্ঘ, সুদর্শন, ওর দিকে এক পাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবকের দিকে চোখ পড়ে হঠাৎ। পাশে দাঁড়ানো আরেকজনের সাথে কথা বলে বলে চা খাচ্ছে। বুকের বাম পাশটা কেমন যেন মোচর দিয়ে ওঠে রাশির। ফাঁকা পেয়ে গাড়ির গতি বেড়েছে। পিছনে ফিরে ফেলে আসা অতীতের দিকে তাকিয়ে রাশি অস্ফুটে উচ্চারন করে একটি নাম..." অরিত্র"!
 
(সমাপ্ত)
 
 

Copyright©️ All rights reserved

 Pallabi Barua

১৪টি মন্তব্য:

  1. খুব সুন্দর গল্প 👌👌👌👌💐💐💐💐😊😊😊😊

    উত্তরমুছুন
  2. বাহ! বেশ সুন্দর লাগল। 👍👍👌👌💯💯❤❤💫💫💥💥

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভাল।সম্পর্ক নামহীন
    অধিকার দাবিহীন
    জমাট ব্যথা সারাদিন।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...