# নাম- 'রিংটোন গোধূলি'
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
(১)
গ্রামের নাম রঘুনাথপুর। ৯ নং অঞ্চলের সমৃদ্ধ গ্রাম। বাজার জুড়ে স্কুল। শিবমন্দির। দোকানপাট ভালই সংখ্যায়। আর ভেতর পানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শ'দেড়েক পরিবার। মাঝখানে মদনমোহনজীর মন্দির। বছরে প্রত্যেকের পালা পড়ে মন্দিরের সেবায়েত হওয়ার। অনেক পুরুষের বংশ পরম্পরায় চলছে এইভাবে মদনমোহনে ভাব ভক্তি ভালোবাসা দিয়ে গ্রামের আধ্যাত্মিক বহমানতা। খুব নিষ্ঠাবান গ্রাম। বছরে হোলির সময় মদন মোহন রাসমঞ্চে বেরোন। মেলা বসে। দশ বিশ গ্রামের লোক মেলায় আসে। স্থায়ী পুরুত ব্রাহ্মণ বংশ পরম্পরায় এই মন্দিরে নিত্য পূজো করেন। জাগ্রত দেবতা। কথিত আছে সে অনেক অনেক কাল আগে, মুসলিম এক শাসক মন্দির লুঠ করতে এসেছিল। মদনমোহনজীর অলৌকিক শক্তিতে ভয়ঙ্কর প্রতিরোধের মধ্যে পড়ে তারা পালাতে পথ পাচ্ছিল না। সেই কথিত গল্প গ্রামের আধ্যাত্মিক উপাসনার ঐতিহ্য অক্ষত আজও।
(২)
গ্রামের ভালো মন্দ সবই মদনমোহনের কৃপায় বিশ্বাস এমনি অবিচল। গ্রামের প্রথম যুবক সেনাবাহিনীতে যোগ দেন,নাম রমাকান্ত চৌধুরী। বলতেন "সৈনিক হওয়ার মধ্যে এজন্ম সার্থক। যদি সৈন্য হয়ে জীবনকে সার্থক করতে চাও,চলো আমার সঙ্গে।"
নিজের ছেলেকে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়েছেন। সেই ছেলে এখন ব্রিগেডিয়ার অরূপরতন চৌধুরী। রমাকান্ত এখন আর নেই। তিনিই গ্রামের পিঠোপিঠি বয়সের ছেলেকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ছেলে টিকল, ছেলের সঙ্গী সনাতনের হাফ ইঞ্চি হাইট ছোটো বলে হলো না।
গ্রামে ছুটিতে অরূপরতন এলে গোটা গ্রাম হামলে পড়ে, তাদের ভি.আই.পি.কে দেখার জন্য। অরূপরতন ছুটিতে এলে গোটা গ্রাম টগবগিয়ে টহল দিতে দিতে সকাল গড়িয়ে দুপুর, সন্ধ্যা নামতো। আবার পরদিন। এঘর ওঘরের খবর নিতে নিতে ছুটি পুটুস করে কেটে পড়তো।
গোটা গ্রাম এখন উন্নয়নে বেশ মজবুত হয়েছে। শহরের দিকে ফণা তুলে বাজারের কেন্দ্র থেকে যে রাস্তাটা এগিয়ে গেছে,সে এখন পিচের বর্ম পরেছে। টোটো, ট্রেকার যথেষ্ট ছোটাছুটি করে। ভাতিন্ডা পোষ্টিং অরূপরতন গ্রামের সত্যিই রতন। অরূপ বাদ গেছে,রতন নামে সকলে ডাকে, গ্রামের রতন, ব্রিগেডিয়ার রতন, ব্রিগেডিয়ার উচ্চারণে আটকে গিয়ে গেট রতন। প্রত্যেক বারে এলে রেশনে যত পোশাক বলো,যাই বলো কিছু কিছু জমিয়ে রাখে। গ্রামে ঢোকার সময় পেল্লাই এক বোঝা নিয়ে ব্রিগেডিয়ার বাবু ঢোকেন। বুড়ো, বুড়ি বাচ্চা কাচ্চা সব ছেঁকে ধরে,ভিড়ের মাঝে ছোটোরা এর ওর ঠ্যাং গলে রতনের পায়ের কাছে দাঁড়ায়। আর ঐ দশাশই চেহারাকে তাদের ঘাড় তুলে তাকাতে হয়। রতন নিচের দিকে তাকিয়ে হাসে ঐ লিলিপুটগুলোর রকমসকম দেখে। বাড়িতে ঢোকার আগে নিজের আর মায়ের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস,আর নিজের খুব প্রিয় হুইস্কি নিয়ে যখন ঘরের দরজায়,মা চোখ পেতে অধীর অপেক্ষায়। এতো যে উদার মন,তা তার বাবাই বলে গিয়েছিলেন, এভাবে আসার সময় গ্রামের দুস্থদের জন্য কিছুমিছু নিয়ে আসতে। এতে তার মা রমা দেবীর সায় আছে, স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা বশতই।
যাক ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরেন। আসার প্রহর গুনতে গুনতে মদনমোহনের কৃপায় ছেলেকে ক'টা দিনের জন্য পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ওসব জিনিসে টিনেসে কি হবে। আসল জিনিস তো তার রতন। রতন ঘরে পা দিয়ে মায়ের হাতে মুড়ি মুড়কি খেতে খেতে সনাতনের খোঁজ নেয়।
রমা দেবী বললেন,"ক'দিন হলো ওর বউটার বাচ্চা হবে বলে শ্বশুর বাড়িতে দিতে গেছে। আজ কালের মধ্যে ফিরবে। ওর মা তো কাল সকালে এসেছিল। জানিস তো সনাতনের বউটা খুব লক্ষ্মীমন্ত। বীণা খুব গল্প করছিল বৌয়ের। তুই এবার বিয়ে কর আমার একা একা দিন কাটে না আর।"
"দাঁড়াও সনাতনকে ফোন করি।" ফোনে রিংটোন বাজছে। রমা দেবী ছেলের দিকে ঐ হাতে ফোনের দিকে উৎকন্ঠা নিয়ে তাকিয়ে।
"পেয়েছি। পেয়েছি রিংটোনে।"
ওদিক থেকে সনাতন ধরলো। ফোনে গলায় উচ্ছ্বাস ফেটে পড়ছে। "কথা হলো?" ঘরের ভেতর থেকে ফিরে এসে রমা দেবী খোঁজ নেন।
"হ্যাঁ হলো। ও আজ বিকেলে আসবে বলেছে।"
রমা দেবী বলেন "ও এলে ওর বৌয়ের মতো একটা তোর জন্য পাত্রী খুঁজে দিতে বলব। ও বাবা ছেলের দেখো লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেছে।"
(৩)
সনাতন বিকেলে হাজির। বৌকে অনেক বুঝিয়ে বাঝিয়ে এসেছে। "কথা দিতে হয়েছে তোকে নিয়ে যাব। যাবিতো।" দু'জনের মজা আর থামে না।
" সে এখন হবে। এখন বল দেখি হুইস্কি চালানোর নিরিবিলিটা পাবো কোথায়? ঠিক আছে তোকে ভাবতে হবে না। আমার ঘরে।" দু'জনে আবার হাসতে থাকে হো হো শব্দে। রিংটোন বাজে রতনের ফোনে। রিংটোনে বন্দেমাতরম গান। সনাতনের খুব প্রিয় গান। সঙ্গে সঙ্গে রতনকে তার ফোনে ঐটাই সেভ করে দিতে বলে। মুহূর্তে হয়ে গেল। রমা দেবী এসে সনাতনকে বলে ছেলের মেয়ে ঠিক করে দিতে। এই দু' একদিনের মধ্যে। রতন রাজি নয়। সনাতনকে নিয়ে ওপরের ঘরে চলে যায়। রমা দেবী রান্নার আয়োজনে ঢোকেন। সনাতনকে খেয়ে যেতে বলে। সনাতন বলে " না। মায়ের রান্না নষ্ট হবে। সে এখন পরে হবে।"
হুইস্কির পর্ব চলতে চলতে বার কয়েক রিংটোন বাজে। যারা একসঙ্গে ছুটিতে এসেছে, তাদের কল। রতন ঠিকমতো ফিরেছে কিনা। সনাতন রতনের সবার কাছে খুব খাতির এটুকু বুঝতে পারে।
এবার নেশার ঝোঁকে ভাতিন্ডায় শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে সদাসতর্ক কিভাবে থাকতে হয়,সব গল্প আসে। মিলিটারি কোয়ার্টারে এক অফিসারের মেয়ের প্রপোজ কাহিনি আসে। কিন্তু সম্ভব নয়। মায়ের থেকে স্বার্থপর হয়ে যাওয়া বাবা স্বর্গ থেকে ক্ষমা যে করবে না, তাই বলে গড়গড়িয়ে নেশার ঝোঁকে। আর মদনমোহনজীও ক্ষমা করবে না, খুব ভক্তি ভরে বলে।
মেয়ে দেখা,সনাতনের শ্বশুর বাড়িতে যাওয়া সব চরকির মতো সেরে ফেলে।
মেয়েও পছন্দ করে ফেলে। দেনা পাওনা নেওয়ার বিরোধী। কিন্তু মেয়ের বাবা বিনা হাতে মেয়েকে পাঠানই বা কি করে। নিয়ম রক্ষার যতটা সম্ভব তাই পরস্পরের কথায় সায় হলো। ফোন নং নিল রতন,যখন পাত্রী উর্মিলার সঙ্গে একান্তে দেখা করার সুযোগ হলো।
এক মাসের মধ্যে ছুটি শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে একটা বিয়ের দিন পাওয়া গেল। মদনমোহনজীকে সাক্ষি রেখে উর্মিলাকে ঘরে তুললেন রমা দেবী। শুভ কাজ ভালোয় ভালোয় কেটে গেল।
ফুল শয্যার রাতে কত গল্প। ছেলে হলে সেনাবাহিনীতে তাকেও চাকরি করাবে। বংশের রক্তে ঐ চাকরিই যে নেশা। উর্মিলাও কথা দেয়।
ছুটি শেষ। চোখের জলে বিদায়। গ্রামবাসী অনেক অনেক আশীর্বাদ করে বিদায় হলো। মদনমোহনজীর আশীর্বাদী ফুল ব্যাগে নিয়ে গ্রামকে পেছনে ফেলে চলল রতন। উর্মিলা যেতে চেয়েছিল। এবারে নয়, পরেরবার নিয়ে যাবে। মাও একা হয়ে যাবে। কোয়ার্টার পাবে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দেখিয়ে। তখন...
(৪)
রোজ গোধূলি রিংটোনে উর্মির সঙ্গে কথা হয় রতনের। সব খবর নেয় রতন। মায়ের সঙ্গে কথা হয়। যেন দূরে থেকেও কাছে। এর মধ্যে সুখবরও রটে যায় উর্মিলা সন্তান সম্ভবা। রমা দেবী মদনমোহনজীর কাছে মানত করে সন্তান যাই হোক,ভোগ দেবে, গোটা গ্রাম খাওয়াবে ছেলে ফিরলে।
বেশ ক'দিন আর রতনের ফোন আসে না। উর্মিলার গোধূলি বেলা বড়ই বিষন্ন। হঠাৎ একদিন খবর হল শত্রুপক্ষ সীমান্তে সেনা মোতায়েনের কথা। যুদ্ধ লাগলো বলে। পুলওয়ামা হঠাৎ শত্রু আক্রমণে পঞ্চাশ সেনা লাশ হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে ফোন রিসিভ একেবারে বন্ধ। অজানা আশংকায় গোটা গ্রাম খুব আলোচনা হতে লাগলো রতনের খবর নিয়ে। মদনমোহনজীর কাছে অনেকে মানত করলো যেন রতনের কিছু না হয়।
সবকিছুকে মিথ্যা করে উর্মিলার সিঁথির সিঁদুর ঘুচল। গোধূলির ম্লান আলো চিরতরে নিভে গেল। রিংটোন রতন হয়ে গেল গ্রামের কাছে স্মৃতি।
উর্মিলা কাঁদল, রমা দেবী কেঁদে কেঁদে মদনমোহনজীর মন্দিরে মাথা ফাটালো। কিছুদিন লাগলো শোক মুছতে।
বন্দেমাতরম রিংটোনে গোধূলি রতন এখন পূবে সাঁজ তারা, ভোরের শুকতারা হয়ে বেঁচে থাকে পুত্র দিগন্তে। উর্মিলা সরকারি চাকরি পায়, দিগন্তকে মানুষ করে। ওর রক্তে সেনা হওয়ার চলল আবার প্রস্তুতি। গোধূলির রিংটোন উর্মিলার ছেলে আবার কবে হবে!
********
বন্দেমাতরম।জয় হিন্দ।নামকরণ ও রচনা অসাধারণ দাদা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। অনেক অনেক আশীর্বাদ। ❤❤❤💫💫💫💥💥💅💅💅
উত্তরমুছুনদারুণ ভালো লাগলো👌🏻👌🏻👌🏻👌🏻👌🏻
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💥💥💫💫
মুছুনবাহ বাহ সুন্দর একটা লেখা পড়লাম👍👍👍
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত। ❤❤💫💫💥💥
মুছুনখুব ভালো লাগলো। 💐💐
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। ❤❤💫💫💥💥🙏🙏
উত্তরমুছুন