সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

# হিন্দুধর্ম- ( ৮ম পর্ব)

#বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'

#নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
        ✍ - মৃদুল কুমার দাস।


                 ( ৮ম পর্ব )
  যাজ্ঞযজ্ঞের বদলে মন্দিরে বিগ্রহ পূজার প্রাধান্য থেকে বৈদিক যুগের অবসান ঘটল। মন্দিরে বিগ্রহ পূজো ও নানা দেবদেবীর কল্পনা ও সেইসব দেবদেবীদের ঘিরে ব্রহ্মণ্যশ্রেণীর নতুন বিধিবিধান এবং উপাসনা থেকে যে নতুন যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হল তার নাম পৌরাণিক যুগ। পৌরাণিক যুগ শুরুর সময়কাল ধরা হয় খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতক থেকে। অবশ্য এর জন্য প্রস্তুতি তারও অনেক আগে থেকেই। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দু'শ শতক থেকে ধরা হয়। মনুর 'মনুসংহিতা' বা মানবধর্ম শাস্ত্রের সময় থেকে। এমনি পুরাণগ্রন্থের সংখ্যা আঠারো। উপপুরাণ ছত্রিশ। উপপুরাণ রচনায় দক্ষিণী দ্রাবিড় সম্প্রদায় সর্বাধিক কৃতিত্ব স্বীকৃতি লাভ করেছিল। বৈদিক যুগের তেত্রিশ দেবতা পৌরাণিক যুগে তা বাড়তে বাড়তে তেত্রিশ কোটি দেবতা হয়ে গেলেন। বৈদিক দেবতা ইন্দ্র,বরুণ,মিত্র ইত্যাদির যুগ অতীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বিষ্ণু ( কৃষ্ণ),শিব। তারও কিঞ্চিত পরে মাতৃশক্তির ( চন্ডী,দুর্গা,কালি...) আধিপত্য । আর শ্রেষ্ঠ পুরাণের স্বীকৃতি ভাগবৎকে দেওয়া হয়। ভাগবতের পুরুষ 'সচ্চিদানন্দ'। তিনিই জগতের সার। তিনিই গোপন কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন তিনি যুগে যুগে অবতার রূপে আবির্ভূত হন দুষ্টের নাশ ও শিষ্টের পালন করতে ( 'যদা যদা হি ধর্মস্য...')। তিনিই পরমপুরুষ। তিনিই ভগবান স্বয়ম্ ('কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্')।
যাই হোক খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতক থেকে পৌরাণিক যুগ ধরে এগনো যেতেই পারে। এই পৌরাণিক যুগে দ্রাবিড় রাজবংশগুলি মন্দির-স্থাপত্য- ভাষ্কর্য শিল্পে খুবই দক্ষতা অর্জন করেছিল। তার মধ্যে নটরাজ মূর্তি শ্রেষ্ঠ ভাষ্কর্য শিল্পের নিদর্শন ধরা হয়। মন্দির ও মূর্তি পূজার ব্যাপক প্রচলন হয়। এই মন্দির ও মূর্তি পূজাকে ঘিরে গুরুবাদের খুব রমরমা দেখা যায়। গুরুবাদের সাথে সাথে ভক্তিবাদ জন্ম নেয়। এই গুরুবাদ ও ভক্তিবাদের জন্ম দ্রাবিড়ীয় সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান  বা কেন্দ্রস্থল কর্ণাটক। তা ক্রমে পৌঁছে যায় মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে। এবং অবশেষে কায়েম হয় বৃন্দাবনে ও তৎসহ সমগ্র আর্যাবর্তে। তবে তা অবশ্যই চতুর্দশ শতাব্দীর পরে।
উত্তর ভারতে ভক্তিবাদের প্রথমগুরু রামানন্দ। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ। পরবর্তীকালে গুরুদের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন কবীর নামে এক জোলা, দাদু নামে এক ধুনি। রবিদাস নামে এক চামার। সুফিবাদের প্রভাবপুষ্ট সন্তযুগের ধারার আগমন ঘটে।
এর পরে এলেন বাউল সম্প্রদায়। এরপরে সপ্তদশ শতাব্দী। জন্মসূত্রে কেউ কেউ হিন্দু,কেউ কেউ মুসলমান সন্তসাধক। বাউল সম্প্রদায় দেশ জোড়া জাতপাত ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে লাগলেন। শ্রীচৈতন্য ষোড়শ শতাব্দীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পূরোধায় এলেন। তিনি বৈধীভক্তির স্থানে নিয়ে এলেন অনুরাগা ভক্তি। বৈধী ভক্তি হল বিধিবিধান মেনে ভক্তি। অনুরাগ হৃদয়ে ও ভাবে জন্মালেই তাই অনুরাগা ভক্তি। লাগে না ধূপ ধূনা,মন্ত্রের তথা বিধিবিধানের শাস্ত্রাচারের বেড়ির বাঁধন। সেই বাঁধন কাটলেন শ্রীচৈতন্য।
  ভগবান পরমপুরুষ সচ্চিদানন্দই বৈকুণ্ঠ্যধাম থেকে লীলার জন্য মর্ত্যে প্রেমিক পুরুষ রূপে বৃন্দাবনে জন্ম নিলেন। শুধু বৈকুন্ঠের তরে বৈষ্ণবের গান নয়। ভগবানের লীলার তিনটি স্তর- বৃন্দাবনলীলা,মথুরালীলা, দ্বারকালীলা। নিজেই বলেছেন বৃন্দাবন লীলায় মধুর প্রেমলীলা শ্রেষ্ঠ লীলা। কারণ সব কিছু প্রেম দিয়ে জয় করা সহজ। শাসন দিয়ে নয়- মথুরায় দুষ্টের দমন ও দ্বারকায় প্রজাপালনের চেয়ে বৃন্দাবনের মধুর লীলাকে তিনি শ্রেষ্ঠ লীলা বলেছেন।
  আর এই জন্য বৈষ্ণবগণ মুক্তি চাননা, মোক্ষ চাননা। তাঁরা চান কেবল বৃন্দাবনের রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলার রস আস্বাদন।
  তাই বৈষ্ণব কবিদের প্রেম আর সখিদের প্রেম নিঃস্বার্থ প্রেম। কামনা বাসনা শূন্য। এই প্রেমকেই শ্রেষ্ঠ প্রেম বলা হয়।
  বৃন্দাবনে যেমন সখিরা ভাবতেন তাঁরা রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা দেখে নয়ন সার্থক করতে চান, কেননা কৃষ্ণ নিজেকে দুই অংশে ভাগ করেছিলেন। একটি সখী অংশ। আরেকটি রাধা অংশ। রাধা অংশে লীলা করবেন,আর সেই লীলা রস আস্বাদন করবেন সখীরা। লীলার প্রত্যক্ষ করার কেউ না থাকলে সেই লীলা আর লীলা হয় না। তাই সখীপ্রেম শ্রেষ্ঠ প্রেম (আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলে কাম/ কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম)। তাদের প্রেম কামগন্ধহীন। বৈষ্ণব কবিগণও তেমনি।  আর বৃন্দাবনের কৃষ্ণপ্রেমের কথা অলীক হতো যদি নদীয়ায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু না আবির্ভূত হতেন। তিনিই তো একই অঙ্গে ধারন করেছিলেন রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি ( রাধাভাবোদ্যুতিরসুবলিতকৃষ্ণস্বরূপ)-অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ,আর বহিরঙ্গে রাধা। বৃন্দাবনে রাধা যেমন কৃষ্ণের জন্য পাগল হতেন, নদীয়াতেও মহাপ্রভুর আচরণও অনুরূপ ছিল। তাই বৃন্দাবন লীলার কীর্তন যখন কীর্তনীয়াগণ শুরু করেন তখন তাঁরা গৌরচন্দ্রিকার পদের আখর দিতে দিতে বৃন্দাবন লীলায় প্রবেশ করেন। এই হল বৈষ্ণব কুলের অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তিবাদ।
  তিনিই মানবতাবাদের একনিষ্ঠ সাধকও ছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে তিনিই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন - সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ তাহার উপরে নাই (চন্ডীদাস)- নবজাগরণের শিরোমণি তিনি। প্রেমের অবতারে আবির্ভূত হন। তাঁর ভক্তিবাদের চেতনাই মানবতাবাদে যুক্তিবাদ এনেছিল। সেজন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত। কেননা মাটি চাই। তখনো মানবতাবাদের জমিন প্রস্তুত হতে বাকি ছিল। কেননা তখনো পর্যন্ত  হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছিল দেববাদ নির্ভরতা ভক্তিবাদ দিয়ে। ভাবভক্তি ভালবাসা নিয়ে একেবারে দেবতায় নিবেদন করা হচ্ছে এদেশে যখন তখন পাশ্চাত্যে চলছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা- প্রযুক্তি ও বস্তুবাদের সুবর্ণযুগ। জ্ঞান চর্চায় ইউরোপীয় নবজাগরণ। সেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে আসতে সময় দিতে হবে তো। উনবিংশ শতাব্দী লাগল পৌঁছতে।
  উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে এসে লাগল যুক্তিবাদের ঢেউ। হিন্দুত্বের আধুনিক মডেল নিয়ে সনাতন প্রথার প্রবল সংস্কারের দাবি উঠল। ধর্মের নামে উচ্ছৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হল। রাজা রামমোহন রায় এই নবজাগরণের অগ্রদূত। যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর,কেশব সেন প্রমুখগণ। পাশ্চাত্যে পর্যন্ত এঁদের অভিযান রীতিমত সাড়া জাগিয়েছিল।
  তারপরেই এলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব। 'যত মত তত পথ' -এর প্রচার দিয়ে হিন্দু ধর্মের সহিষ্ণুতার বীজ বপন করলেন- কালী-কৃষ্ণ-খ্রিষ্ট- মহম্মদ সব মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দিলেন।
আর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের সহিষ্ণুতার গাছে ফুল ও ফল ফলালেন। আর তার পরে ১৯১০ থেকে পন্ডিচেরীর সাধনগৃহ থেকে যোগগুরু রূপে মর্ত্যে অতিমানস চেতনার অবতরণ ঘটানোর জোর তৎপরতা শুরু করলেন। এর পরে পর পর এলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গুরুরা। যেমন- প্রভুপাদ,মহাঋষি মহেশযোগ, শ্রীরজনীশ,শ্রীশ্রীরবিশঙ্কর,
অমৃতানন্দময়ী মা। এঁদের পথ ধরে এলো জ্ঞানমার্গ। এই ভক্তিমার্গ ও জ্ঞান মার্গের জোয়ারে হিন্দু মুসলমান কাছাকাছি এলো। কিন্তু সন্দেহ ভেতরে ভেতরে। ইংরেজ এলো সাম্রাজ্য করতে। তাঁরা দেখলেন এঁদের মধ্যে সম্পর্ক গুলিয়ে দিলে এঁদের দীর্ঘ এক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা যায়।
  সহজেই তাই হাসিল করেও ফেলল। সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের পূর্ণ সদ্ব্যবহারে শোষন নিপীড়ন ক্ষমতার উজ্জীবন ও পরজাতি নিপীড়কের ভূমিকায় ব্রিটিশরা এক নতুন মেরু শক্তিরূপে আবির্ভূত হলেন।
ইংরেজরা ভারতীয়দের বহুর মধ্যে একাত্মবাদের, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সূত্র দেখে, নিজেরা বহুজাতিক হওয়া সত্ত্বেও, ভারতবর্ষকে এক দীর্ঘ শাসন ব্যবস্থার আওতায় আনতে গেলে ধর্মের নামে বিচ্ছিন্নতা আনার কৌশল নিলেন।
   ধর্মের সংহতিকে আমূল বিদ্ধ করতে হবে রাজনৈতিক অস্ত্র দিয়ে। এদের শাসনে সুবিধা এই যে এঁরা বৈদেশিক শাসনের দ্বারা চিরকাল চালিত হয়ে আসছে। এতেই এঁরা বিস্তর অভ্যস্ত। ধর্মীয় কারণে কখনো বিদ্বেষ, কখনো ঐক্য যেন ক্ষণে ক্ষণে ভাবের বদলে নমনীয়তার দুর্বলতা স্রোত তলে তলে আছে। উস্কে দিল ব্রিটিশরা হিন্দুদের দেশ কেন ইসলামরা শাসন করবে। হিন্দুর উপর মুসলমান অনেক অত্যাচার করেছে। বরং ইংরেজরা দেশ চালাক। তাই নিয়ে হিন্দুদের মধ্যে একটা আস্থা কাজ করল। তাদের চালনার নতুন অভিভাবক হোক ইংরেজরা।
পদে পদে ধর্মীয় দুর্বলতা ও তার বিধিবিধানের নানা উপদ্রবে হিন্দুরাও জর্জরিত। হিন্দুদের বিধিবিধানের উপদ্রবে ইসলাম যেমন অনায়াসে চেপে বসতে পেরেছিল, ঠিক তেমনি হিন্দু ও ইসলামকে ঘোরতর শত্রু উস্কে দিয়ে ব্রিটিশ ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারে এগিয়ে এল।
  এই শত্রুতা আরো বাড়াতে হবে। আর তাই দিয়ে চিত্রনাট্য বানানো অতি সহজ দেখল ব্রিটিশরা। এদের এই পদে পদে ধর্মীয় দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে শাসন করা মোটেই কঠিন নয়।
  হিন্দু ও হিন্দুত্ব দিয়ে পরজাতি আগ্রাসক হলে এদের শাসন করা মুশকিল ছিল। কিন্তু বহুর মধ্যে এক ধর্মের অনুশাসনে বাঁধা। সেই বাঁধন আলগা করে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। হলোও তাই। তাই তো প্রায় হাজার বছরের লক্ষ্য নিয়ে শুরু করলেও দু'শ বছরের কাছাকাছি গিয়ে ইনিংস শেষ করেছিল ব্রিটিশরা।
এই দু'শ বছর শাসনের নাম করে অরাজকতা,শাসন,শোষন, নিপীড়ন... কোনো কিছু বাকি রাখেনি। আবার অনেক কিছু দিয়েছেও। শৃঙ্খলা, নিজেদের শাসন করার মতো আস্থা,যুক্তিবাদ, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হওয়ার মানসিকতা, বিজ্ঞান চর্চার অনুকূল পরিবেশ, শিক্ষায় আমূল সংস্কার, নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,আইন,প্রশাসন.... ইত্যাদি থেকে আমাদের জাগিয়ে তোলাটাও মন্দ ছিল না। আমরা তাদের হাত দিয়ে নবজাগ্রত ভারতবর্ষকে পেয়েছি। সনাতন সংস্কৃতির মধ্যে আধুনিকতার আলোয় আলোকিত হয়েছি।
এতসবের মধ্যেও ভারতবর্ষ তার নিজস্বতাকে কোনোদিন বর্জন করেনি। হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ তার নিজস্ব পরিচয়। তা অক্ষয় ও অমর। তাই তার প্রাণের প্রকৃত অস্তিত্ব।
ব্রিটিশ বলয়ে থেকে হিন্দুত্বের গরীমা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল, তাই পর্যালোচনা প্রসঙ্গক্রমে এসে যায়। হিন্দু ও হিন্দুত্ব কীভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল তাই নিয়ে আলোচনায় পরের পর্বে আসব।
                         ( চলবে )

   @ copyright reserved for Mridul Kumar Das. 


৫টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...