শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

পরিণতি (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 


বিজিৎ সিনহা, বর্ধিষ্ণু পরিবারে একমাত্র সন্তান । ব্রাইট স্টুডেন্ট । সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো চাকরি পেতে বাবা - মায়ের সে কি আনন্দ । চাকরিক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা ও বুদ্ধির জোরে বস মিস্টার সেনের ভালো নজরে আসতে বেশি সময় লাগলো না ওর । 


অফিসের অ্যানুয়াল ডে ফাংশনে আলাপ হলো বসের মেয়ে রিধিমা সেনের সাথে । প্রথম দেখাতেই স্মার্ট সুন্দরী শিক্ষিতা রিধিমাকে দেখে বিজিতের খুব ভালো লেগে গেলো । রিধিমাও বিজিতের সাথে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই যেচে পড়ে কথা বার্তা চালিয়ে যাচ্ছে । দুজনে মোবাইল নম্বর বিনিময় করে নিলো শীঘ্রই । ফোন, ভিডিও কল, চ্যাটে চলতে শুরু হলো ওদের অবাধ মেলামেশা, কথাবার্তা । 


বেশ কিছুদিন কেটে গেছে । বিজিত মনে মনে রিধিমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে । রিধিমাও বিজিতের প্রতি দুর্বল । বিজিত ঠিক করলো সামনের সপ্তাহেই রিধিমার জন্মদিনে ওকে মনের কথা বলে দেবে, তাতে যা হয় হোক ।


জন্মদিনের দিন ঠিক রাত বারোটায় রিধিমার ফোনে টুং করে শব্দ, জন্মদিনের শুভকামনার সাথে বিজিতের একটি ছোট্ট মেসেজ-

হয়তো আমার থেকে, 

অনেক ভালো সাথী পাবে তুমি, 

হয়তো অনেক বেশি বাহুল্যে 

ভরা থাকবে তোমার জীবন, 

তবুও জেনে রেখো আজ এই দিনে, 

তোমার দুচোখে দেখেছি আমার মরণ । 


মেসেজ দেখে রিধিমা তৎক্ষণাৎ রিপ্লাই করলো, "ডু ইউ লাভ মি বিজিত?"


বিজিত : ইয়েস, আই ডু ।


রিধিমা : কিন্তু আমি ভাবতাম আমরা ভালো বন্ধু । তুমি যে আমাকে ভালোবেসে ফেলবে তা বুঝিনি । 


বিজিত : ভালোবাসা তো বলে কয়ে হয়না । এটাও জাস্ট হয়ে গেছে । তোমার ওপরে কোনো জোর নেই । এমন নয় যে আমি ভালোবাসি বলেই, তোমাকেও আমায় ভালোবাসতে হবে । চিন্তা করে দেখো, টেক ইয়োর টাইম ।


রিধিমা : আসলে কি ব্যাপার বলতো, আমার কাছে প্রেম-ভালোবাসা হলো একটা খাঁচার মতো, যাতে আমি বন্দী থাকতে চাই না । আমি টাইম পাস করার জন্য বা জাস্ট ফ্লার্ট করার জন্য আমার পছন্দের ছেলেদের সাথে চ্যাট, কল এসব করে থাকি ।


বিজিত : তাহলে এটা তো মানছো যে আমি তোমার পছন্দের ছেলেগুলোর মধ্যে একজন । খুব তাড়াতাড়ি আমি তোমার মোস্ট ফেভারিট হয়ে উঠবো । তখন ঠিক ভালোবেসে ফেলবে আমায়, দেখে নিয়ো । 


রিধিমা : আই লাইক ইয়োর কনফিডেন্স । অল দা বেস্ট । চেষ্টা চালাও আমার মোস্ট ফ্যাভ হবার । 


বিজিত : কালকে তো রবিবার,  অফিস ছুটি, আমরা কি মিট করতে পারি? 


রিধিমা : হোয়াই নট । সন্ধ্যেবেলা আমার বন্ধুরা আমার বার্থডে পার্টি রেখেছে । তুমিও ইনভাইটেড । দেখা হবে । 


বিজিত : ওকে দেন, সি ইউ টুমরো । বাই, গুড নাইট । 


রিধিমা : বাই ।


ফোনটা কেটে দিয়ে বিজিত ভাবতে লাগলো, "ঠিক মেয়েকে ভালোবাসলাম তো? এ আমার ভালোবাসার মর্যাদা  দিতে পারবে তো? ওর তরফ থেকে তো কিছুই নেই । তবুও ভালো যখন বেসেছি, ওকে ঠিক নিজের করে নেবই আমি । ওর মনও একদিন শুধুই আমাকে চাইবে ।" স্মিত হাসি মুখে নিয়ে রিধিমার WhatsApp ডিপিতে একটা চুমু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো বিজিত । 


পরের দিনটা যেন কাটতেই চাইছে না । সেই সন্ধ্যেবেলা দেখা হবে রিধিমার সাথে । সারাটা দিন গিফ্ট কেনা, প্রেম নিবেদন করার জন্য নিজেকে ঠিক মতো তৈরী করা এসব কাজেই অতিবাহিত হলো । 


সন্ধ্যায় পার্টিতে বিজিত পরেছে ডেনিম এর সাথে হোয়াইট টি শার্ট আর শাইনিং ব্ল্যাক ব্লেজার । হালকা দাড়ি, চশমার পেছনে দীপ্ত চোখ আর সুপুরুষ চেহারা দেখে অনেক মেয়েই ক্রাশ খাচ্ছে ওকে দেখে । রিধিমার দিকে যেন তাকানো যাচ্ছেনা এমন চোখ ঝলসানো রূপের সাথে প্রসাধনীর ঔজ্জ্বল্যে । জন্মদিনের সাজ বলে কথা । পার্পল রঙের পার্টি গাউনের সাথে ম্যাচিং দুল, নেকলেস, ওয়াচ আর স্যান্ডেল । 


দুজনেই দুজনের দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে । রিধিমা হাত ধরে ওকে নিয়ে গেল পার্টি হলে । মিউজিকের তালে তালে রিধিমার কোমর ধরে হালকা শরীরের দুলুনি যেন বিজিতের মনের দোলাকে দশগুণ বাড়িয়ে দিল । রিধিমার কানে কানে ও বললো, "ভালোবাসি"।


রিধিমা কোনো জবাব না দিয়ে  ওকে সাথে করে নিয়ে গেল একটা রেস্টরুমে । ওকে সোফায় বসিয়ে নিজে বসলো ওর কোলে । বাহুডোরে বেঁধে নিলো ওর গলা । বিজিত কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিধিমা নিজের নরম তুলতুলে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো বিজিতের ঠোঁটে । একেই ভালোবাসার মানুষকে প্রথম বার কাছে পাওয়া, তার ওপর রিধিমার আগুন যৌবন দেখে বিজিত আর নিজেকে সামলানোর পরিস্থিতিতে নেই । রিধিমার সরু কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রেমের উষ্ণতায় ভরে উঠল ওর দেহ মন । তৃপ্তির চরমে পৌঁছানোর পরে বিজিত রিধিমাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো । ওর মনে আজ শুধুই প্রশান্তি । একমাত্র ভালোবাসার মানুষকেই নারী তার শরীর অর্পণ করে ।  যাকে ও ভালোবেসেছে, সেও যে ওকেই ভালোবাসে তা নিয়ে ওর মনে আর কোনো সন্দেহই রইলো না । 


সেই রাত থেকে বিজিত আরো গভীর, আরো পাগলের মতো ভালোবাসতে শুরু করলো রিধিমাকে । মাঝে মাঝেই ছোটো খাটো ভ্রমণ বা রিধিমার এক বন্ধুর বাড়িতে ওরা মিলিত হতো । কাছে আসত, ভালোবাসার উষ্ণতায় ভরিয়ে তুলতো একে অপরকে ।


রিধিমার সেই বন্ধুটি চাকরিসূত্রে ব্যাঙ্গালোরে । ফ্ল্যাটের চাবি রিধিমার কাছেই রাখা । বিজিতের কাছেও সেই ফ্ল্যাটের একটা চাবি দিয়ে রেখেছে রিধিমা । বিজিত কোনো কোনোদিন তাড়াতাড়ি অফিস ছুটি হয়ে সোজা পৌঁছে যায় সেই ফ্ল্যাটে । ফোন করে ডেকে নেয় রিধিমাকে । 


এমনই একটা দিনে বিজিতের অফিস হাফ ডে হয়ে ছুটি হয়ে গেলো । ও রিধিমাকে ফোন করলো ফ্ল্যাটে আসতে বলবে বলে । কিন্তু ফোনটা নট রিচেবেল । যাইহোক, চাবি তো কাছেই রাখা, ফ্ল্যাটে পৌঁছে নাহয় আবার ফোন করবে ওর প্রাণ প্রিয় রিধিমাকে, সেই ভেবে গিয়ে পৌঁছলো সেই ফ্ল্যাটে । চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলল । কেমন একটা মনমাতানো গন্ধ আর সুন্দর মিউজিক ভেসে আসছে বেডরুম থেকে । কৌতূহলবশত ধীরে ধীরে বেডরুমের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ও । যা দেখলো তাতে ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিদ্যুৎ খেলে গেলো । শরীর ঝিমঝিম করতে লাগলো, প্রবল বমিভাব আর ঠকঠক করে কাঁপুনি সারা শরীরে ।


ব্যাঙ্গালোরের সেই বন্ধুর সাথে  সঙ্গমে রত ওর রিধিমা । ওকে দেখে মনে হচ্ছে সুখের চরম শিখরে পৌঁছে গেছে ও । চোখেমুখে পরম তৃপ্তি আর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে সেই বন্ধুটিকে ।


বিজিত চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলো, "রিধিমা, এটা করতে পারলে আমার সাথে? বিবেকে বাঁধলো না তোমার? তাহলে কেন আমায় ভালোবাসলে?"


রিধিমা : শান্ত হও বিজিত, আমি কোনদিন কি তোমায় বলেছি যে ভালোবাসি? 


বিজিত : তার মানে? সব খেলা ছিল আমাদের মধ্যে? কিছুই কি নেই? কিছুই কি ছিল না?


রিধিমা : অবশ্যই ছিল আর তুমি যদি চাও ভবিষ্যতেও থাকবে আমাদের দৈহিক সম্পর্ক । মনে আমি কাউকে প্রবেশ করতে দিই না ।


বিজিত : ছিঃ রিধিমা । ঘেন্না লাগছে আমার নিজের ওপরে তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম ।

এই বলে বিজিত এক দৌড়ে সেই ফ্লাট থেকে বেরিয়ে গেলো । বিজিতের অবস্থা দেখে রিধিমা আর ওর ব্যাঙ্গালোরের বন্ধুটি হাসিতে ফেটে পড়লো ।


বাড়ি ফিরে বিজিত কোনোমতে ব্যাগ মোবাইল সব ছুঁড়ে ফেলে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকালো । কান্নায় ওর গলা বন্ধ, বুকটা ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রনায় । কিকরে পারলো রিধিমা এমনটা করতে । বারে বারে একই প্রশ্ন ওর মনকে ধাক্কা মেরে যাচ্ছে, কুল কিনারা পাচ্ছেনা বেচারা । রিধিমাকে ও সত্যিই মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছে । 


অফিস যাওয়া বন্ধ, খাওয়া দাওয়া করছে না, কারোর সাথে কথা বলেনা, নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে চুপ করে পড়ে থাকে দেখে বিজিতের মা-বাবা চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন । 


ওনারা ঠিক করলেন ছেলেকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখাবেন । শীঘ্রই ওনারা এপয়েন্টমেন্ট নিলেন । আগামীকাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে বিজিতকে ।


সেদিন অনেক রাত । বিজিতের চোখে ঘুম নেই । কিছুতেই ভুলতে পারছে না ও রিধিমাকে । কেবলই মনে হচ্ছে সব দুঃস্বপ্ন । রিধিমাকে একটা ফোন করার প্রবল ইচ্ছা জাগছে মনে । থাকতে না পেরে একটা ফোন করেই বসলো ও । 


ওদিক থেকে রিধিমা : হ্যালো, ফোন কেনো করেছো? 


বিজিত : তোমাকে ভুলতে পারছিনা যে । প্লিজ আমার কাছে ফিরে এসো । তুমি ছাড়া যে আমার পৃথিবীটা অন্ধকার । একটুও বোঝোনা আমার ভালোবাসা!!


রিধিমা : ভালোবাসা মানে কি বিজিত? একে অপরের কাছে আসার লিপ্সা, একে অপরকে নিজের করে পাবার কামনা । তুমি যেমন আমার শরীর ভোগ করেছো, আমিও তোমাকে সম্পূর্ণ উপভোগ করেছি । তুমি চাইলেই আমরা আবার সম্ভোগে লিপ্ত হতে পারি । 


বিজিত : তোমার কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা শুধুই কামনা? ছি রিধিমা, ছি । আমি ভেবেছিলাম সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে, তুমি নিশ্চয় অনুতপ্ত হবে । কিন্তু আমি চরম ভুল ছিলাম । গুড লাক অ্যান্ড বাই ফর এভার । আর কোনোদিন বিরক্ত করবোনা তোমায় । আমার একটা কথা মনে রেখো, এই কামনার আগুনেই একদিন তুমি ছারখার হয়ে যাবে । 


ফোনটা কেটে দিলো বিজিত । বারান্দায় লাগানো রয়েছে নতুন কেনা লাইলিনের দড়ি । চুপিসাড়ে খুলে আনলো সে । গভীর রাতে মা - বাবার একমাত্র সন্তান ঝুলে পড়লো ফ্যানের থেকে চিরশান্তির পথে । 


বেলা দশটা বেজে গেছে । বিজিত এখনও ঘুম থেকে উঠছে না । ওর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়েও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ওর মা - বাবা চেঁচামেচি শুরু করলো । পাশের বাড়ির ছেলেরা এসে দরজা ভেঙে দেখে বিজিত ঝুলছে ফ্যান থেকে । চোখটা বিস্ফারিত, জিভটা বেরিয়ে এসেছে । দৃশ্য দেখে ওর মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন । বাবা হাহাকার করতে লাগলেন পুত্রশোকে ।


কোনো সুইসাইড নোট না থাকায় শুধুমাত্র চ্যাট আর কলের ওপরে ভিত্তি করে পুলিশ রিধিমাকে কিছুই করতে পারলো না ।


কেটে গেছে বেশ কটা মাস । রিধিমা খুব অসুস্থ । ওর যে কি হয়েছে কিছুতেই ধরা পড়ছে না ডাক্তারের চোখে । অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে ধরা পড়লো ওর সেই সর্বনাশা অসুখ হয়েছে, যার চিকিৎসা এখনও বেরোয়নি । হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন আপনারা, ও এইচ. আই. ভি পজিটিভ, এডস রোগে আক্রান্ত রিধিমা । বিছানার সাথে মিশে গেছে সে । সব সঙ্গীরা ওকে পরিত্যাগ করেছে । একা, সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত পড়ে আছে বিছানায় । এমনকি ওকে যে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো ওর বাবা, তিনি পর্যন্ত ওকে ঘৃণার নজরে দেখেন । সময় বেশি নেই হয়ত ওর হাতে । তবুও একা একা, সবার অন্তরালে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে হবে ওকে । 

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

১৬টি মন্তব্য:

  1. গল্পটি পড়ে খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  2. দারুণ গল্প 👌👌👌👌💐💐💐💐😊😊😊

    উত্তরমুছুন
  3. খুব সুন্দর এক গল্প পড়লাম।🖤🖤👌👌👍👍

    উত্তরমুছুন
  4. দারুণ গল্পটাতো! ধন্যবাদ। 👌👌💯💯❤❤💥💥💫💫💅💅

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...