বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

অর্থের অর্থ (পিয়ালী চক্রবর্তী)



সত্য ঘটনা: অর্থের অর্থ

#কলমে_পিয়ালী_চক্রবর্তী


একটি সত্য ঘটনা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই । এই ঘটনাটি থেকে বোঝা যায় যে, অর্থের কি অর্থ বা অর্থের মূল্য ঠিক কতটা ।


অনেক বছর আগের কথা । আমাদের পাড়াতে এক গরীব পরিবার বসবাস করতো । পরিবারের মাথা যিনি, দুরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধিতে আক্রান্ত । এক ছেলে, এক মেয়ে ও বউ পুরো দিশাহারা । আমার বাবা দানী মানুষ ছিলেন । তাদের পরিবারে কিছু করে টাকা প্রতিমাসে দিতেন, কিন্তু সর্বনাশা রোগের কারণে সেই টাকা ওষুধ কিনতেই ব্যয় হতো । বাবা আমাকে বললো, "মাম, তুই তো টিউশন করিস । ওদের বাচ্চা দুটোকে বিনাপয়সায় পড়াবি । ভগবান তোর ভালো করবেন ।" আমি বাবার কোনো কথা আজ পর্যন্ত অমান্য করিনি । রাজি হয়ে গেলাম পড়াতে । 


মেয়েটার নাম সোনালী । খুব একটা মন ছিলোনা পড়ায়, কিন্তু ছেলেটা অর্থাৎ সৌরভ সাংঘাতিক মেধাবী । ক্লাস ইলেভেনে আমার কাছে ও বায়োলজি, কেমিস্ট্রি আর ইংলিশ পড়তো । 


ইতিমধ্যে ওদের বাবা মারা যান । চরম বিপাকে পড়ে পরিবার । দেখতে দেখতে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট বেরোলো । সৌরভ আমার পড়ানো তিনটে সাবজেক্টেই লেটার মার্কস নিয়ে পাশ করেছে । সে বেচারা নিজের হাত খরচ চালানোর জন্য নিচু ক্লাসের বাচ্চাদেরকে পড়াতো । সেই টিউশনের টাকায় মিষ্টি কিনে আমার সাথে দেখা করতে এলো সেদিন সন্ধ্যে বেলা । আমি ওকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছিলাম । কিন্তু, ওর মনটা খুব চঞ্চল ছিল সেদিন । তখন তার কারণ আমার বোধগম্য হয়নি । আমি ভাবলাম রেজাল্ট নিয়ে খুশি , তাই হয়তো আনমনা ।


পরেরদিন খুব ভোরবেলায় প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচি শুনে  লাফিয়ে ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরোলাম । আমাদের রাস্তার সামনেটায় লোকে লোকারণ্য । কিছু বোঝার আগেই আমার এক কাকিমা বললেন, "তোর ছাত্রটা যে কালকে রেজাল্ট নিয়ে এলো তোর সাথে দেখা করতে, আজ ভোরে মারা গেছে । ওর মা আর পড়াশুনোর খরচ চালাতে পারবে না বলেছিলো । তাই মাঝরাত্রে বিষ খেয়েছে ।" 


পিসির কথা শুনে, আর গত রাতে সৌরভের মুখটা মনে করে আমি জ্ঞান হারালাম ।


একটু ভেবে দেখুন তো, এখানে অর্থের জন্য একটা কচি প্রাণকে কি অর্থ চুকিয়ে চলে যেতে হলো । আত্মহত্যা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয় । কিন্তু, এমন পরিস্থিতি আসে কেন যাতে অর্থের কারণে কেউ মৃত্যুকে বেছে নিতে বাধ্য হয়!!! সামাজিক বৈষম্য হয়তো এর জন্য দায়ী কিংবা  অন্য কিছু । আমি এখনো সেই ঘটনা মন থেকে মেনে নিতে পারিনি ।

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

১২টি মন্তব্য:

  1. আমাদের মাথায় একটা ভ্রান্ত ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে পরাশুনো করে মানুষ হতে হবে। হ্যাঁ, এটা একটা ভুল ধারণা। পড়াশুনো না করেও মেধা ব্যবহার করে মানুষ সফল হতে পারে। তার উদাহরণ প্রচুর রয়েছে। সেই বাচ্চাটা যদি সেটা বুঝতো, বা তাকে যদি পড়াশুনো ছাড়াও মানুষ হওয়া যায়, সেটা বোঝানো যেতো, তাহলে একটা প্রাণ শেষ হয়ে যেতো না।

    উত্তরমুছুন
  2. মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো, আমার জীবনের একটা ইচ্ছা এই পয়সার অভাবে পূর্ন হয়নি।আজ তাই সেই স্বপ্ন ছেলের চোখে দেখবো সেই দিকেই চেয়ে আছি।যদিও সেটা আমার মনে আছে ছেলে জানে না।

    উত্তরমুছুন
  3. মন খারাপ হয়ে গেল।। গল্প বলবো না সত্য ঘটনা ঘটার জন্য দুঃখিত ,কারন কোথাও হয়ত এটা আমরাও মানি পড়া দরকার। কিন্তু কেন? একটা প্রানের জন্য তো । সেই প্রান বাঁচাতে পারি না।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব কষ্টের কাহিনী।এতো তাড়াতাড়ি মৃত্যুর পথ বেছেনেওয়া ঠিক হয়নি তবে মানুষের মন কখন কি হয় বলাযায়না।অর্থের অভাবে একটা তরুণ প্রান অকালে চলেগেলো।

    উত্তরমুছুন
  5. সত্যি মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। হয়তো চষ্টা করলে কিছু করা যেত কিন্তু ও টুকু ছেলেটার মনে এতটাই চাপ পড়েছিল আর হয়ত কিছু ভাবতেই পারেনি। সত্যি মানুষ কত অসহায়।

    উত্তরমুছুন
  6. সত্যিই এখনও সমাজে কত মানুষ অসহায়, এদের জন্য জীবনে কিছু করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব🙂। প্রাকৃতিক দৃষ্টান্ত👌

    উত্তরমুছুন
  7. বড় বেদনাদায়ক।তবে সৌরভ বড় তাড়াতাড়ি হার মেনে নিয়েছিল।জীবনের অর্ধেক পাতাই ওর অলিখিত ছিল।চেষ্টা করলে শিখরে হয়ত পৌঁছাত।উত্তর দেওয়ার জন্য আজ কেউ নেই😢😢।

    উত্তরমুছুন
  8. খুবই দুঃখজনক ঘটনা।
    শুনে মন টা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল

    উত্তরমুছুন
  9. অপূর্ব! লাল জবাব! ধন্যবাদ। 👌👌👍👍❤❤❤💫💫💥💥💯💯💯💯

    উত্তরমুছুন
  10. খুবই কষ্টের কাহিনী,,,,,, বাস্তবতার কাছে মানুষ খুবই অসহায়

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...