রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

সিজোফ্রেনিয়া~পর্ব-২ (✍©অনিশা কুমার)

 সিজোফ্রেনিয়া (পর্ব-২)



"কি হয়েছে, খাবেন না কেনো ?",  সস্নেহে  কেউ আমার পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলো।  আমার মনে অভিমানের ঢেউ, "দেখুন না, একটা হিসাব মেলাতে পারছি না। কেউ একটা চক অব্দি দেয় না। মনে মনে এত হিসাব করা যায়, আপনিই বলুন? আর অঙ্ক না মিললে আমি খেতে পারি না।" ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে বললেন, "আপনাকে তো খাতা পেন দেওয়া হয়েছিল, কি হলো?" আমি অবাক হয়ে বললাম "জীবনের হিসাব একটা খাতায় ধরে? সে তো কবেই শেষ হয়ে গেছে। তাই তো একটা চক চাইছি।" "দেখেছেন স্যার, কত মিথ্যা কথা বলে। কিছুই লিখলো না খাতায়, ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঘরটাই নোংরা করছিল। আর কালকেই তো এল। বলে কি না কবেই শেষ হয়ে গেছে!", উফ্,  আবার সেই মহিলার কন্ঠ।  ভদ্রলোক বললেন, "তুমি একটু চুপ করো, আমি তো দেখছি ব্যাপারটা। পেশেন্টের সঙ্গে কথা বলার সময় ধৈর্য্য রাখতে শেখ।" পেশেন্টে কাকে বলছে? আমি তো সুস্থ, কই আমার কিছু হয়নি তো। জ্বর ও নেই। আর আমার শরীর খারাপ হলে মা আমায় বাড়ি থেকে বেরোতেই দিত না। যাই বলুক, ভদ্রলোককে আমার বেশ ভালোই লাগছিল। আমায় বললেন, "অতো চিন্তা করবেন না। আপনার হিসাব আমি মিলিয়ে দেব। এখন একটু খেয়ে নিন। আপনার মা যদি শুনতে পান আপনি খাননি, কত কষ্ট পাবে বলুন তো?" হ্যাঁ, সত্যিই আমি না খেলে মার খুব কষ্ট হয়।  কি জানি মায়ের কি হয়েছে, কয়েক দিন ধরে দেখছি, বাবু বাবু বলে আমার গায়ে হাত বোলাচ্ছে আর কাঁদছে। এই প্রথম মাকে এত কাঁদতে দেখলাম। তাহলে খেয়েই নিই। "আপনি বলছেন  আমার হিসাব টা মিলিয়ে দেবেন?", একটু ইতস্তত করে বললাম। "হ্যাঁ, বলছি তো। শুধু আপনাকে যা যা জিজ্ঞাসা করবো সব ঠিকঠাক ভাবে বলবেন।" আমি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিলাম। ওরা কি একটা ওষুধ দিলো। তারপর আমার কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছিল, কিন্তু ঘুমিয়ে পড়িনি। 

মনে মনে আবার জীবনের অঙ্ক গুলো মেলানোর চেষ্টা করলাম। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে রবীন্দ্র সদনে গেলাম। বলা ভালো বন্ধুই জোর করে নিয়ে গেল আমায় দেখানোর জন্য। দেখলাম মিতা শাড়ি পড়ে, মাটির গহনা পড়ে খুশীতে উচ্ছ্বসিত হয়ে আমারই এক বন্ধুর হাত ধরে বকবক করতে করতে চলেছে। তার বাঁধ ভাঙা হাসির বন্যায় সে বন্ধুর গায়ে ঢলে পড়ছে আর আমার বন্ধু সযত্নে তাকে ধরে রাখছে। অবশ্য বন্ধু কাকে বলছি? সে তো সব জানে, তাও সে আমার মিতাকে নিয়ে......... উফ্ , কি কষ্ট, কি তীব্র যন্ত্রনা। আমার মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। চিৎকার করে উঠলাম।


"তখনি বললাম, আর একটু কড়া ডোজের ওষুধ লাগবে," কোথায় কারা যেন কথা বলছে। "দেখি আর একটু, একবার চেঁচিয়ে তো চুপ করে গেল।"


সেদিন কিভাবে বাড়ি ফিরছিলাম মনে নেই। হয়তো যার সাথে গেছিলাম, সেই আমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। মা বন্ধুর কাছে পুরো ঘটনাটা শুনেছিলেন। তবে আমায় কোনোদিন এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেন নি। আমিও মা কে কিছু বলিনি।  এরপর আমর মনে প্রতিশোধের আগুন, আমায় যেনো নেশায় ধরে গেল। আমি লক্ষ্য করতাম চুপচাপ কোন বন্ধুর নতুন বান্ধবীর সাথে বিশেষ সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। তারপর আমি খুব সুন্দর করে সাজিয়ে গল্প শুরু করতাম। প্রথম কাজ ছিলো ওদের দুর্বলতাটা খুঁজে বের করা। কেউ গান করতে ভালোবাসে, কিন্তু বিশেষ কোনো কারণে সেটা ছাড়তে হয়েছে। আমি সেখান থেকেই শুরু করতাম। কোয়েল কে দিয়ে শুরু করেছিলাম। একটু আধটু কথা বলতে বলতে খুব নম্রস্বরে বললাম, "কিছু যদি না মনে করো, একটা কথা বলি? তোমার এত মিষ্টি গলা, তুমি কি গান করো?"  ব্যাস্, এরপর তো পুরো উপন্যাসের নায়ক তো আমি। আমার বন্ধু তখন খলনায়ক। আমি গান শোনাবার জন্য অনুরোধ করতে দু-একবার অভ্যাস নেই, এইসব বাহানা করলো। তারপর তো দেখা হলেই সেই গানের ব্যাপারেই কথা হতো। আমি নতুন করে শুরু করতে বলতাম। শেখার কোনো বয়স নেই। এত মিষ্টি গলা, নষ্ট কোরো না। এই কথাগুলো ওকে খুশী করার জন্য বলতাম ঠিকই, কিন্তু কথা গুলো সত্যি ও ছিলো। তখন আমার মনে দুটো সত্ত্বা আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করতো। প্রথমটা বন্ধুর থেকে ওর বান্ধবীকে ছিনিয়ে নেওয়া আর একটা মেয়েটিকে খুশী রাখা।  তারপর ওকে একদিন বাড়িতে নিয়ে এলাম। মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে আমার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসলাম। দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। দেখলাম কোয়েল সেটা লক্ষ্য করে ও কিছু বলল না। বুঝলাম মৌন সম্মতির লক্ষণ। আমি ওকে আমার বইয়ের আলমারিতে বইয়ের কালেকশন দেখালাম।  তারপর কিছু পুরোনো অ্যালবাম দেখলাম। ফটোগুলো দেখাতে গিয়ে আমার হাত ওর হাতকে স্পর্শ করলো। অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখলাম ওর আঙ্গুল গুলোর তিরতির করে কাঁপছে।  দেখা হয়ে গেলে আলতো করে পিঠে হাত রেখে বললাম, "চলো, আমার মায়ের হাতের চা খেয়ে বাড়ি যাবে।"  ও মাথা নিচু করে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার প্রথম স্পর্শ ওকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের কাছে চা খেয়ে ওকে বিদায় জানালাম। খুব আত্মতৃপ্তি হলো। ভাবতে লাগলাম এরপর কে? আর কোন বন্ধুর নতুন বান্ধবী হয়েছে ?



৫টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...