মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০

অনু গল্প : "সংস্কার" #কলমে~ পল্লবী



আজ শ্রীময়ীর বিয়ে। পাত্র আবীর ছেলে হিসেবে খুবই ভাল একটা ছেলে। উচ্চ শিক্ষিত, কর্পোরেট জব করে। কোন ধরণের বাজে অভ্যাস নেই। মনের দিক থেকেও খুবই উদার! শ্রীময়ী যে আবীরকে চেনে না তা নয়। বলতে গেলে, সেই স্কুল লাইফ থেকেই দেখে আসছে ওকে। ওর কাজিনের ক্লোজড ফ্রেন্ড। সে অর্থেই চেনা জানা। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আবীর চাকরি সূত্রে এখন দেশের বাইরে থাকে। এবার মূলত বিয়ে করার উদ্দেশ্য ই দেশে ফেরা। শ্রীময়ীর কাজিন যখন আবীরের ইচ্ছা ব্যক্ত করে, ও একটু অবাকই হয়ে ছিল প্রথম। আজকাল কার যুগে এরকম ছেলেও আছে নাকি যে, লাজুকতার কারণে মনের কথা বলতে ভয় পাই??


আবীর কে না বলার কোন কারন ছিলো না। ছুটি কম হাতে। তিন দিন পরেই এনগেজমেন্ট আর পাঁচ দিনের মাথায় বিয়ে! আবীরের সংস্কারপন্থী দিদিমা বেশ কিছু নিয়ম এরিমধ্যে চাপিয়ে দিয়েছেন শ্রীময়ীর কাঁধে। আবীরের মা, নিজের মায়ের কোন কথায় বিরুদ্ধাচারন করেনা। একমাত্র ছেলের মঙ্গল কামনা বলে কথা। আবীর বিরক্তবোধ করলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করেনা। গ্রহ - নক্ষত্র বিচার করে দেখা গেলো যে, বিয়ে রাত আট টার  মধ্যেই সেরে ফেলতে হবে, নাহলে অমঙ্গল হতে পারে। আবীরের ঠিকুজি তে নাকি কি কি সব অশুভ আছে।


বিয়ের মণ্ডপে বসার পর থেকেই কেমন যেনো অস্বস্তি হচ্ছিল শ্রীময়ীর। মনে মনে হিসেব মেলাতে চেষ্টা করল কয়েকবার। নাহ্ মাথা কাজ করছে না ঠিকঠাক। বিয়ের সমস্ত আচার অনুষ্ঠান শেষে শ্রীময়ী  রওনা হলো নতুন গন্তব্যে...। বিয়ের ভারী বেনারসী শাড়ি পাল্টাতে গিয়ে রক্তের দাগ থেকে বুঝতে পারে ঋতুস্রাব শুরু হয়েছে। সাথে আনা ওর লাগেজে আতিপাতি খুঁজে দেখলো কিন্তু পেলো না কিছুই। অসহায় শ্রীময়ী শেষ পর্যন্ত ওর জ্যাঠাতো জা'কে বলতে বাধ্য হলো প্রয়োজনীয়তার কথা। একটু পরেই থমথমে মুখে আবীরের দিদিমা এসে জিগ্যেস করলেন, " তা তোমার কয়দিন চলছে আজ??" উত্তর শুনে দিদিমার মুখ যেনো আরো বেশি ভারাক্রান্ত মনে হলো। তারও খানিকটা বাদে আবীর এসে স্যানিটারী ন্যাপকিনের প্যাকেটটা ওকে দিয়ে সরল হেসে জানতে চাইল আর কিছু লাগবে কিনা। শ্রীময়ীর দরকারি জিনিস কোথায় রাখা আছে, সে সব দেখিয়ে দিল। কিছু বলতে যাবে, এমন সময় জা এসে বললেন, ওদের বাসর রাত হবেনা, যেহেতু শ্রীময়ী অশুচি হয়ে আছে। তাছাড়া, আগামীকাল ভোরে শাশুড়ির ছেলের মঙ্গল কামনায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খুব ভোরে উঠতে হবে। তো শ্রীময়ী যেনো তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।


পাঁচ টার অ্যালার্ম বাজতেই সাথে থাকা জা এক ধাক্কায় শ্রীময়ীকে জাগিয়ে তোলে আর তাড়া দিতে থাকে জলদি স্নান সেরে আসার জন্য। এও বলে যে, এক ঘড়া জল রাখা আছে স্নান ঘরে। সেই জল দিয়ে যেনো  ভালো করে ওর অপবিত্র স্থান পরিস্কার করে। পৌষের ঠান্ডায় কম্পনরত শ্রীময়ী সেই জল দিয়ে  স্নান করতে করতে ভাবে, তবে কি সে মানুষ চিনতে ভুল করলো?? এই একবিংশ শতাব্দিতে এসেও নিজেদের মুক্ত মনা প্রগতিশীল বলে দাবি করা সোশ্যালিস্টরা যে নিজেদের পরিবার তথা ছেলের ভবিষ্যতের ব্যাপারে কতোটা "ট্যাবু" হতে পারে, ভাবতেই কেমন যেন লাগে। 


মেয়েদের রজ:স্রাব প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যা সাধারণত বারো থেকে তেরো বছর বয়সের মধ্যে শুরু হয়। এর মধ্য দিয়েই একজন কিশোরী আস্তে আস্তে নারীত্বের পথে পা বাড়ায়। বসুন্ধরায় নিজেকে চাষের উপযোগী করে তোলে। প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী সংসারের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে। একজন কন্যাশিশুর ঋতুমতী হওয়ার ব্যাপারটা বাবা - মায়ের জন্য একই সাথে আনন্দের এবং উদ্বেগেরও বটে। সন্তান সুস্থ, স্বাভাবিক আছে, এই চিন্তা করে যেমন বাবা মা রা আনন্দিত হোন, ঠিক তেমনি এই রজ:স্রাবের অপর নাম যে গর্ভস্রাব...যে কোন দুর্ঘটনা পুরো জীবনকে ওলোটপালট করে দিতে বাধ্য, এই ভেবে চিন্তিতও হোন একই সাথে। ঋতুবতী হওয়া প্রত্যেক মেয়ের জন্যই অত্যন্ত আনন্দের ও গর্ভের বিষয়। এখানে লজ্জা বা সংকোচের কিছুই নেই। আজ যে সমস্ত মাতৃকুল সামাজিক বিধি নিষেধ আরোপ করে মঙ্গলকামীতার দোহাই দিয়ে ফতোয়া জারি করেন, ভুলে যান যে, একসময় তাঁরাও এসব সামাজিক ট্যাবু কে দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করে এসেছেন। 


ভাবতে ভাবতে শ্রীময়ী বড় একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখে আবীর বসে আছে। মুখে অপরাধী ভাব। শ্রীময়ীকে দেখে লাজুক হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে আলতো ভাবে দুহাত তুলে নেয় ওর হাতের মুঠোয়। শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে নীরবে যেনো বলতে চাই, " ভয় পেওনা একদম। আমি আছি তোমার পাশে"!


সমাপ্ত।।


Copyright©️ All rights reserved

 Pallabi Barua

২৪টি মন্তব্য:

  1. উত্তরগুলি
    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ দিদি। আপনাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করি

      মুছুন
  2. খুব সুন্দর লাগল। চমৎকার। ধন্যবাদ। 👌👌💯💯💯💫💫💥💥❤❤

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. দাদার রিভিউ মানেই অন্যরকম অনুভূুতি।অনেক অনেক ধন্যবাদ দাদা

      মুছুন
  3. খুব সুন্দর লেখা দিদি...
    এটাই প্রতিটি মেয়ের স্বাভাবিক বিষয়...
    যার জন‍্য সংকোচ থাকা উচিত নয়।

    উত্তরমুছুন
  4. চমৎকার একটা গল্প লিখেছ দিদি👌👌👌💐💐💐💐🤗🤗🤗🤗

    উত্তরমুছুন
  5. মিষ্টি গল্পের মোড়কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. তোমার মন্তব্য আমার জন্য অনেক কিছু

      অনেক ধন্যবাদ

      মুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...