সপ্তদশ শতাব্দীতে ভানগড় দুর্গ দখল করেন রাজা মাধো সিং | রাজস্থানের ভানগড় দুর্গ ভারতের ভুতুড়ে স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভূতে অবিশ্বাসী এমন অনেকেই আছেন যারা ভানগড়ের দুর্গ রহস্যের প্রতি কোনো মন্তব্য করতে নারাজ |
বিশ্বের সেরা দশটি হন্টেড স্থানের একটি হিসেবে ধরা হয় ভানগড় কেল্লাকে। কথিত আছে , ভানগড়ের রাজকুমারী রত্নাবলীর সৌন্দর্যে মোহগ্রস্ত হয়ে সিন্ধিয়া নামের এক তান্ত্রিক রাজকুমারীকে পাবার জন্য কালাজাদু বা ব্ল্যাক - ম্যাজিকের আশ্রয় নেন |
রাজকুমারীর দাসীর হাত দিয়ে উনি মন্ত্রপূত সুগন্ধি তৈল রাজকুমারীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন , যাতে ওই সুগন্ধি তৈল ব্যবহার করে রাজকুমারী ওনার বশীভূত হয়ে , তান্ত্রিকের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় |
কিন্তু তান্ত্রিকের বশীকরণ তেলের শিশি কোনোভাবে একটি বড়ো পাথরের ওপর পড়ে ভেঙে যায় | ফলস্বরূপ ওই বিশালাকার পাথর গড়াতে গড়াতে গিয়ে তান্ত্রিকের ওপর পড়ে এবং তান্ত্রিক সিন্ধিয়ার মৃত্যু হয় | মৃত্যুর পূর্বে তান্ত্রিক ভানগড়ের দুর্গ নিশ্চিহ্ন করে দেবার অভিশাপ দেন |
সেই রাত্রেই ভানগড় দুর্গের ভিতরে অবস্থিত দশ হাজার মানুষ অলৌকিকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায় | আজও সেই তান্ত্রিকের অতৃপ্ত আত্মা দুর্গের প্রতিটি আনাচে - কানাচে বিচরণ করে | ভান গড়ের দুর্গ হয়ে ওঠে শয়তানদের বিচরণভূমি |

আমার আজকের গল্প , গল্প না বলে সত্য ঘটনা বলা উচিত | ঘটনাটি ঘটেছিলো আমার স্বামীর একজন সহকর্মী এবং তার দুই বন্ধুর সাথে | মূল ঘটনাটিকে একই রেখে শুধুমাত্র নামগুলি পরিবর্তন করে এই কাহিনীটি লেখার দুঃসাহস করছি |
রাজবীর সিং , আমান আলী আর শান্তনু মুখার্জী অভিন্ন হৃদয় বন্ধু | ছুটিছাটা পেলেই তারা একসাথে শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের অলিগলিতেও ঘুরতে যায় |
রাজবীর খুব সাহসী ও রোমাঞ্চপ্রিয় ছেলে | একবার রাজবীর সপ্তাহান্তের ছুটিতে আমান আর শান্তনুর সাথে ভানগড়ের দুর্গ দেখার পরিকল্পনা বানালো | রাজবীরের সাহসিকতার ওপর নির্ভর করে বাকি দুই বন্ধুও ভানগড় যাবার জন্য একপায়ে খাড়া |
যেমন কথা তেমনি কাজ | ওরা তিনজন শুক্রবার সন্ধ্যায় আমানের গাড়ি করে এসে পৌঁছলো বহুচর্চিত অন্যতম ভুতুড়ে জায়গা ভানগড়ে | ওরা ঠিক করে যে , সেই রাত্রিটা একটা হোটেলে কাটিয়ে পরেরদিন সকাল থেকে ভানগড়ের দুর্গের সত্যান্বেষণ করবে |
পরিকল্পনামাফিক পরেরদিন সকালে প্রাতঃরাশ সেরেই ওরা বেরিয়ে পড়ে নিজেদের জীবনের এক অদ্ভুত অলৌকিক ঘটনার সম্মুখীন হবার জন্য |
ভানগড় দুর্গে প্রবেশের পর থেকেই কেমন একটা অজানা অস্বস্তি তিনজনই বোধ করে | কিন্তু পাছে বন্ধুরা মস্করা করে , তাই একে - অপরকে এই শিহরণের কথা কেউ জানালো না |
দুর্গে প্রবেশ করে , কিছুটা পথ যাবার পরেই ওরা একটি অতি প্রাচীন বজরংবলীর মন্দিরে প্রবেশ করে | বিগ্রহবিহীন মন্দির যেন ওদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত অজানা আশঙ্কার সৃষ্টি করে | মন্দির থেকে বেরিয়ে সারিবদ্ধ ছোট ছোট ছাদবিহীন ভগ্ন ঘর পেরিয়ে ওরা প্রবেশ করে মূল দুর্গের ভিতরে |
ওরা তিনজনই তিনদিকে ছড়িয়ে পড়ে নিজেদের মতো অন্বেষণকার্য শুরু করে দেয় | ক্যামেরা দিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে প্রচুর ছবি তুলতে তুলতে কেল্লার ওপরের দিকে উঠতে থাকে আমান ও রাজবীর | একদম ওপরে উঠে দুর্গের ছাদের দিকে তাকিয়ে রাজবীর চমকে ওঠে | কয়েক হাজার বাদুড় ঝুলে রয়েছে দুর্গের ছাদ থেকে | কিরকম একটা ভ্যাপসা গন্ধ আর গা ছমছমে অনুভূতি হয় রাজবীরের |

অন্যদিকে আমান ক্যামেরা দিয়ে দুর্গের ওপর থেকে নিচের জনপদের ছবি তুলতে ব্যস্ত | হটাৎ আমানের নজর পড়ে ওরই তোলা একটা ছবিতে | কেউ যদি ক্যামেরার সামনের দিকটা আড়াল করার চেষ্টা করে , তাহলে যেরকম ছবি ওঠে , ঠিক সেরকমই একটা ছবি | ওর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে যায় |
শান্তনু ক্লান্ত হয়ে একটা প্রাচীন বটগাছের নিচে বসে একটু বিশ্রাম করছিলো | নিস্তব্ধ দুপুরে খুব একটা বেশি কেউ ওই দুর্গে তখন ছিলোনা | গ্রীষ্মের দাবদাহ তখন সবেমাত্র শুরু হয়েছে | এমন সময় শান্তনু ওর ঠিক পেছনে একটা হাড়কাঁপানো শীতল হাওয়ার স্পর্শ অনুভব করলো | পড়ি কি মরি করে সেই প্রাচীন রহস্যময় বুড়ো বটগাছের তলা থেকে ছুটে পালিয়ে ও দিগন্তবিস্তৃত খোলা মাঠের ওপরে এসে হাঁপাতে লাগলো |
বাকি দুজন বন্ধুদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো বেচারা শান্তনু | ফোনে কারুর সাথেই যোগাযোগ করা যাচ্ছেনা | হয়তো নেটওয়ার্ক সীমার বাইরে আছে ওরা দুজন | খোলা মাঠে বসে , প্রাণ হাতে করে ও আমান আর রাজবীরের জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগলো |
প্রায় ৪৫ মিনিট পরে দুই বন্ধু একসাথে ওর কাছে এসে হাজির | ও দুই বন্ধুর ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়লো , ওকে একা ছেড়ে যাবার জন্য |
ইতিমধ্যে রাজবীরের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেছে | ও আমান আর শান্তনুর কাছে প্রস্তাব রাখলো , ' আজকে রাত্রিটা এই দুর্গে কাটালে কেমন হয় ' ?
আমান : কিকরে সেটা সম্ভব হবে ভাই ? বাইরে দেখলিনা , গভর্নমেন্টের নির্দেশিকা বোর্ড টাঙানো আছে যে , " সূর্যোদয়ের আগে এবং সূর্যাস্তের পরে এই দুর্গে প্রবেশ নিষেধ " !
শান্তনু : আমরা ঘুরতে এসেছি , ঘুরে চলে যাবো | কোনো উদ্ভট পরিকল্পনা করিসনা ভাই | এই জায়গাটা ঠিক ভালো লাগছেনা |
রাজবীর সঙ্গে সঙ্গে শান্তনুকে ভীতু , কাপুরুষ এসব বলে ভর্ৎসনা করা শুরু করলো | শেষ পর্যন্ত শান্তনু নিমরাজি হয়ে ওদের সাথে দিলো |
ওরা দুর্গের একটা ঘুপচি জায়গার মধ্যে তিনজন গুঁড়ি মেরে বসে রইলো | সন্ধ্যা আগত | দুর্গের কেয়ারটেকার এসে বাঁশি বাজিয়ে দুর্গ খালি করে চলে গেলো | বাইরে থেকে দুর্গের গেটে তালা পড়ে গেলো | ওরা এখন শুধুমাত্র তিনজন এই বিশাল অভিশপ্ত দুর্গে |
রাত্রি আগতপ্রায় | ওদের সাথে পর্যাপ্ত পরিমান শুকনো খাবার , জল এবং ফ্লাস্কে কফি রাখা আছে | সারাদিনের ক্লান্ত ছেলেগুলো গোগ্রাসে সেগুলো খেয়ে নিলো | তারপর কড়া কফি খেয়ে নিদ্রাকে সম্পূর্ণ দূরে পাঠানো চেষ্টা |
ওরা তখন জানতোনা যে , কিছুক্ষন পরে কি বিভীষিকাময় দীর্ঘ রাত ওদের জন্য অপেক্ষা করে আছে |
ঘড়ির কাঁটা দেখতে দেখতে ১১ টা পার করে ১২ টার পথে | আমান প্রচন্ড জোরে প্রস্রাবের বেগ অনুভব করলো | একটা সু-উচ্চ প্রাচীরের আড়ালে ও প্রস্রাব করার জন্য উদ্যত হলো | হটাৎ কিছু একটা যেন ওর পায়ের ওপর দিয়ে সরে গেলো | মোবাইলে চার্জ প্রায় শেষের পথে , তবুও ও মোবাইলে টর্চ জ্বালিয়ে দেখার চেষ্টা করলো বস্তুটা কি ! কিচ্ছু খুঁজে পেলোনা | কিন্তু ও স্পষ্টভাবে বুঝেছিলো , পায়ের ওপর দিয়ে কিছু সরে গেছে | তাড়াতাড়ি ও বন্ধুদের কাছে ফিরে এলো |
এদিকে রাজবীর হলো ওদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ধূমপায়ী | কিন্তু শান্তনু সিগারেটের গন্ধ মোটেই সহ্য করতে পারেনা | তাই রাজবীর উঠে দাঁড়িয়ে , কিছুটা তফাতে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো | সুখটান দিয়ে আমেজে ওর চোখ বন্ধ হয়ে এলো | সহসা কাঁধের ওপর কারুর হাত অনুভব করতে ও ভাবলো আমান এসেছে ওর থেকে সিগারেট খাবে বলে | কিন্তু ঘুরেই কাউকে আর দেখতে পেলোনা | কাঁধের ওপর হাতের অনুভুতিটা তখনো বিদ্যমান | ভয়ে ওর হাড় পর্যন্ত কেঁপে উঠলো | কিন্তু পাছে শান্তনু বেশি ভয় পায় , তাই ফিরে এসে কারুকে কিছু বললোনা |
ঘড়ির কাঁটা তখন ১ টা পেরিয়ে ২টোর দিকে ছুটে চলেছে | অকস্মাৎ , তিনজনেই একসাথে শুনতে পেলো অদূরেই কোথায় যেন ঘুঙুরের শব্দ | রাজপ্রাসাদে নর্তকী নৃত্য পরিবেশন করলে যেরকম তাল - লয় মেনে ঘুঙুরের আওয়াজ হতে পারে , ঠিক সেইরকম আওয়াজ |
আমান আর শান্তনু সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেলেও , রাজবীর তখনো অনেকটাই শক্ত | ও বন্ধুদেরকে সাহস যোগালো , ' ভয় কি ভাই ! আমরা তো তিনজন একসাথেই আছি , কোনো দুরাত্মা যদি এখানে থেকেও থাকে , আমাদের তিনজনকে একসাথে দেখা দেবার সাহস করবেনা | '
ওর মুখের কথা শেষ হতে না হতেই , কেউ যেন প্রচন্ড অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো | গগনবিদারী সেই হাসির আওয়াজ শুনে ওদের শরীরের সব রক্ত জল হয়ে যাবার উপক্রম | তিনজন একে - অপরকে জড়িয়ে ধরে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো | শান্তনুর দাঁতে দাঁত লেগে গেছে তখন | ও প্রায় অজ্ঞান হবার মুখে |
আবার সেই আকাশকাপাঁনো অট্টহাসি আর সাথে ঘুঙুরের শব্দটা যেন আরো কাছে চলে এলো | শান্তনু ততক্ষনে জ্ঞান হারিয়েছে | আমান আর রাজবীর পড়লো মহা বিপদে | আমান রাজবীরকে এই অভিশপ্ত দুর্গে থাকার দুর্বুদ্ধি দেবার জন্য দোষারোপ করতে লাগলো | শান্তনুর যদি কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে ওর মা- কে কি জবাব দেবে ওরা !
চোখেমুখে জলের ঝাপ্টা দিতে দিতে শান্তনুর জ্ঞান ফিরলো | ও দুই বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে কাঁদতে লাগলো | প্যান্টের মধ্যে প্রস্রাব করে ফেলেছে বেচারা |
ঘড়ির কাঁটা তখন ৩ টে পেরিয়ে 8 টের ঘরে | ওরা তিনজন প্রানপনে নিজেদের ইষ্টদেবতার নাম জপতে লাগলো | মাঝেমধ্যেই কানের পাশ দিয়ে হিমেল হওয়ার স্রোত বয়ে চলেছে আর ঘুঙুরের আওয়াজ হয়ে চলেছে |
এভাবে কতক্ষন কেটে গেছে ওরা আন্দাজ করার মতো পরিস্থিতিতে নেই |
একমনে ইষ্টনাম জপের ফলেই হোক বা ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশ ফর্সা হবার কারণেই হোক , ঘুঙুরের শব্দ আর গা ছমছমে অনুভূতি আস্তে আস্তে প্রশমিত হয়ে এলো |
ঘড়িতে তখন ভোর পৌনে ছয়টা | ওরা ক্লান্ত , অবসন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো | দুর্গের তালা খুলে কেয়ারটেকার ভেতরে এসে , দুর্গের ভিতরকার প্রাচীন বজরংবলীর মন্দিরের সামনে ওদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় আবিষ্কার করে |
প্রাণ বাঁচিয়ে সেই যাত্রা ফিরে এলেও ওরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনা , কিভাবে ওরা দুর্গের ভেতর থেকে বজরংবলীর মন্দিরে এসে পৌঁছলো | বাড়ি ফিরে বহুদিন ওরা অপ্রকৃতিস্থের মতো আচরণ করেছে | দীর্ঘদিন চিকিৎসা এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ওরা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ |
কিন্তু সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা প্রত্যেকের মনে এখনো তাজা |
Copyright © All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
ছবি সৌজন্যে: গুগল
+++++++++++++সমাপ্ত+++++++++++

দারুন লাগলো গল্পটা.....বা ছমছমে গল্প.....
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ 🍫🍫🍫🍫
মুছুনঅসাধারণ 💐💐💐💐💐💐💐আরও এমন চাই☺
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ বন্ধু 🤗🤗🤗🤗
মুছুনভানগড় নিয়ে অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী পড়েছি।এটি ব্যতিক্রম নয়।
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ বন্ধু । এর অনেকটাই সত্যি ।
মুছুনঅসাধারণ লিখেছো বন্ধু ।👌👌👌👌👌
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ বন্ধু🤗
মুছুনঅসাধারণ লিখেছো বন্ধু ।👌👌👌👌👌
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ বন্ধু🤗
মুছুনবাহ্! দুর্দান্ত লাগল। ধন্যবাদ 👌👌💫💥💥❤❤💅💅
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ দাদা🙏
মুছুনদুর্দান্ত লেখনী
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ বন্ধু 🤗🤗🤗🤗
মুছুন